রাহাত হুসাইন
প্রকাশ : ৩১ আগস্ট ২০২৫ ১১:০৪ এএম
ফাইল ফটো
জাতীয় পার্টি আর বিতর্ক যেন হাত ধরাধরি করে চলে। সর্বশেষ শুক্রবার গণঅধিকার পরিষদের সঙ্গে সংঘর্ষ এবং তার জেরে দলটির নেতা সাবেক ভিপি নুরুল হক নুরের ওপর হামলার ঘটনা জাপা নিয়ে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে। শুধু তা-ই নয়, এ ঘটনায় হঠাৎ করেই উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গন। ফ্যাসিবাদের দোসর আখ্যা দিয়ে জাতীয় পার্টিকে নিষিদ্ধ করার দাবি জোরালো হচ্ছে। এ দাবির পক্ষে মাঠের রাজনীতিতে সরব হয়েছে গণঅধিকার পরিষদসহ জুলাই গণঅভ্যুত্থানে যুক্ত বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও মহল। ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর আওয়ামী লীগের দীর্ঘদিনের মিত্র জাতীয় পার্টিকেও (জাপা) সরকারি উদ্যোগে দ্রুত নিষিদ্ধের দাবিতে নানা কর্মসূচির পাশাপাশি জাপার শীর্ষ নেতাদের গ্রেপ্তারের দাবিও উঠছে। রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় জাতীয় পার্টির কার্যালয়ে হামলার ঘটনা ঘটেছে।
গতকাল শনিবার রাজধানীর জাপা কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে হামলা হয়েছে। একদল বিক্ষোভকারী হামলার সময় ভবনটির নিচতলায় আগুন দেয়। এতে নিচতলায় লাইব্রেরির বই, গুরুত্বপূর্ণ কাগজ এবং আসবাবপত্র পুড়ে গেছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর সদস্যরা লাঠিচার্জ, জলকামান এবং সাউন্ড গ্রেনেড ছুড়ে হামলাকারীদের হটিয়ে দিয়ে আগুন নিয়ন্ত্রণ করেছে। ঘটনাস্থলে পুলিশ মোতায়েন রয়েছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে সতর্ক অবস্থানে রয়েছে দলটির নেতাকর্মীরা।
গত কয়েকদিন ধরে বিভিন্ন জেলার নেতাদের সঙ্গে জাতীয় পার্টির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে দলটির সাংগঠনিক আলোচনা চলছিল। কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে গতকাল শনিবার একদল লোক এসে হামলা চালায়। এর আগে গত শুক্রবার সন্ধ্যায় জাতীয় পার্টি ও গণঅধিকার পরিষদের নেতাকর্মীদের মধ্যে দফায় দফায় সংঘর্ষ হয়। পুলিশ ও সেনাবাহিনীর উপস্থিতিতেই দুই পক্ষ একে অপরকে ইটপাটকেল নিক্ষেপ করে। ওইদিন সন্ধ্যায় জাতীয় পার্টির কার্যক্রম নিষিদ্ধের দাবিতে বিক্ষোভ মিছিল বের করে গণঅধিকার পরিষদ। মিছিল নিয়ে দলটির নেতাকর্মীরা জাতীয় পার্টির কার্যালয়ের সামনে গেলে এ সংঘাত বাধে। পরিস্থিতি সামাল দিতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী অ্যাকশনে নামে। এতে গণঅধিকার পরিষদের সভাপতি নুরুল হক নুর আহত হন। নুরের আহত হওয়ার খবর ছড়িয়ে পড়লে জুলাই অভ্যুত্থানের পক্ষের শক্তিগুলোর মধ্যে তুমুল প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়। তারা ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি এবং সরকারের স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টার পদত্যাগ দাবি তোলেন।
জাতীয় পার্টির মাধ্যমে জুলাই গণঅভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগকে ‘রিফাইন্ড’ করা হচ্ছেÑ এমন অভিযোগ তুলেছে গণঅভ্যুত্থানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট নানা পক্ষ। মূলত এসব কারণেই জাতীয় পার্টিকে নিষিদ্ধের দাবি উঠেছে বলে জানান সংশ্লিষ্টরা।
গতকাল শনিবার জাপা মহাসচিব ব্যারিস্টার শামীম হায়দার পাটোয়ারী সাংবাদিকদের বলেন, ‘একটি দলকে নিষিদ্ধ করার দাবি কখনও আরেকটি দলের আদর্শ হতে পারে না। আবার একটি চেয়ারম্যানকে গ্রেপ্তারের জন্য কর্মসূচি দেওয়াও ভিন্ন আরেকটি রাজনৈতিক দলের আদর্শ হতে পারে না। জাতীয় পার্টি শান্তিপূর্ণ দল, গঠনতন্ত্র অনুযায়ী রাজনীতি করে। জাতীয় পার্টিকে এভাবে ট্যাগিং করার মাধ্যমে নব্য স্বৈরতন্ত্রের সৃষ্টি হচ্ছে। দেশের গণতন্ত্র হোঁচট খাচ্ছে, বিভাজনতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে। যে ঐক্যের মাধ্যমে বাংলাদেশের সৃষ্টি, সেই ঐক্যে চিড় ধরেছে। এ চিড় ধরা দেশ যেকোনো সময়ে খাদে পড়তে পারে।’
এদিকে গণঅধিকার পরিষদের সাধারণ সম্পাদক রাশেদ খান অভিযোগ করে বলেন, ‘জাতীয় পার্টিকে বিরোধী দলে বসানোর চক্রান্ত চলছে।’ তবে জনগণ সে চক্রান্ত প্রতিহত করবে বলেও তিনি হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে জাতীয় পার্টিকে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে নিষিদ্ধের দাবি জানান।
এদিকে গণঅধিকার পরিষদের সভাপতি নুরুল হক নুরের ওপর হামলার ঘটনায় প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)-এর দক্ষিণাঞ্চলীয় মুখ্য সংগঠক হাসনাত আবদুল্লাহ। গত শুক্রবার রাতে নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক আইডিতে তিনি লেখেন, ‘শুরুটা হয়েছিল রিফাইন্ড আওয়ামী লীগের পরিকল্পনা দিয়ে, যে পরিকল্পনা আমি ১১ মার্চ প্রকাশ করি। সেই প্ল্যান ভেস্তে গেলেও ওরা থামেনি। এবার আওয়ামী লীগ পুনর্বাসনের জন্য বেছে নিয়েছে জাতীয় পার্টিকে। ভারতের প্রত্যক্ষ মদদে জাপার মাধ্যমে আওয়ামী লীগকে ফের ব্যাক করানোর খেলায় প্রথম রক্ত দিলেন নুর ভাই।’
জাতীয় পার্টিকে নিষিদ্ধের দাবি তুলেছে হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশও। গতকাল শনিবার সংবাদ মাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে সংগঠনের মহাসচিব মাওলানা সাজেদুর রহমান ও সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব মাওলানা জুনাইদ আল হাবিব বলেন, ‘আমরা গণঅধিকার পরিষদের নেতা নুরুল হক নুরের ওপর আওয়ামী দোসর জাপার সন্ত্রাসী, পুলিশ ও সেনাবাহিনীর কিছু উচ্ছৃঙ্খল সদস্যের ন্যক্কারজনক হামলার তীব্র নিন্দা জানাই। হামলায় জড়িতদের বিরুদ্ধে তদন্ত করে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। একই সঙ্গে ভারতীয় আধিপত্যবাদের চিহ্নিত এজেন্ট জাতীয় পার্টিকেও বিচারিক প্রক্রিয়ায় নিষিদ্ধ করতে হবে।’
জাতীয় পার্টিকে নিষিদ্ধের আইনগত দিক যাচাই-বাছাই করে পদক্ষেপ নেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন অ্যাটর্নি জেনারেল মো. আসাদুজ্জামান। গতকাল শনিবার দুপুরে ঝিনাইদহ শহরের টেলিভিশন সেন্টার পাড়ায় জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের আঞ্চলিক কার্যালয়ের উদ্বোধন শেষে এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘জাতীয় পার্টি (জাপা) ১৯৮২ থেকে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত মানুষের রক্তের সঙ্গে বেইমানি করেছে। তারা জুলাই বিপ্লবে আওয়ামী লীগকে সহযোগিতা করে নিজেদের পুরনো ইতিহাস উন্মোচন করেছে। তাই দলটিকে নিষিদ্ধের যে দাবি উঠেছে, সেটির আইনগত দিক যাচাই-বাছাই করে পদক্ষেপ নেওয়া হবে।’
এদিকে ‘জুলাই রেভল্যুশনারি অ্যালায়েন্স’ ও ‘উত্তরা ছাত্র জনতা’র ব্যানারে গতকাল শনিবার বিকালে বিএনএস সেন্টারে বিক্ষোভ কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়। সেই সঙ্গে হামলাকারীদের শাস্তি, জাপা নিষিদ্ধের দাবিতে কর্মসূচি দেওয়া হয়।
উদ্ভূত পরিস্থিতিতে জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান গোলাম মোহাম্মদ (জিএম) কাদেরের বাসার নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। তার রাজধানীর উত্তরার বাসার সামনে বিপুল সংখ্যক পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। গতকাল শনিবার দুপুরের পর থেকে এ নিরাপত্তা জোরদার করা হয়।
জিএম কাদেরের স্ত্রী ও জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা শেরিফা কাদের বলেন, ‘সকাল থেকে আমাদের বাসভবনের আশপাশে বিভিন্ন ধরনের লোকজন মিছিল করছে, অনেক লোক জড়ো হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট থানা থেকে নিরাপত্তা বাড়ানো হয়েছে। জিএম কাদের বাসায় নেই। প্রশাসনের পক্ষ থেকে আমাদের বাসায় কোনো লোক থাকতে দেওয়া হচ্ছে না।’
জিএম কাদেরের বাসার সামনে অবস্থানরত পুলিশ কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ‘অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।’
এদিকে ঢাকার পরিস্থিতি আমলে নিয়ে দলটির দুর্গ বলে পরিচিত রংপুরেও সতর্ক অবস্থান নিয়েছেন দলটির নেতাকর্মীরা। শনিবার সকাল থেকে রংপুর নগরীর সেন্ট্রাল রোডস্থ দলটির কার্যালয়ে অবস্থান করেন তারা। এদিন দুপুরে জাপার কো-চেয়ারম্যান মোস্তাফিজার রহমান মোস্তফা সাংবাদিকদের বলেন, ‘জাতীয় পার্টি দেশের প্রাচীন দল, রাষ্ট্রক্ষমতায় ছিল, বিরোধী দলেও ছিল। বর্তমানে জাতীয় পার্টির পায়ে পাড়া দিয়ে ঝগড়ার চেষ্টা করা হচ্ছে। আমরা হুঁশিয়ারি দিয়ে স্পষ্ট করে বলতে চাইÑ রংপুরে এসব বরদাশত করা হবে না। দেহে একবিন্দু রক্ত আছে যতদিন, ততদিন কোনো অন্যায় বরদাশত করা হবে না।’