রাকসু নির্বাচন
প্রান্ত কুমার দাশ, রাবি
প্রকাশ : ২৩ আগস্ট ২০২৫ ১৪:৩৭ পিএম
রাকসু ভবন
দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর রাকসু নির্বাচনের তফসিল ঘোষণায় যখন পুরো ক্যাম্পাসে উৎসবমুখর পরিবেশ। আগামী ১৫ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে বহুল প্রতীক্ষিত রাকসু, হল সংসদ ও সিনেটে ছাত্র প্রতিনিধি নির্বাচন। তফসিল অনুযায়ী, গত বুধবার মনোনয়নপত্র বিতরণের কথা থাকলেও শেষ মুহূর্তে তা স্থগিত করা হয়। এরপরে ছাত্র নেতাদের ক্ষোভের মুখে রবিবার থেকে পুনরায় বিতরণের সিদ্ধান্ত নেয় নির্বাচন কমিশন। এই সময়সীমাকে সামনে রেখে যখন ক্যাম্পাসের অন্য ছাত্র সংগঠনগুলো নির্বাচনী মাঠে সক্রিয়, সেখানে ছাত্রদলের তাঁবুতে যেন এখনও নীরবতা। কে হবেন ভিপি (সহসভাপতি, জিএস (সাধারণ সম্পাদক) বা এজিএস (সহসাধারণ সম্পাদক) প্রার্থী তা নিয়ে সংগঠনের ভেতরে বা বাইরে কোনো আলোচনাই নেই। তাদের এই অবস্থাকে অনেকেই এখন তুলনা করছেন ‘নির্বাচনী ট্রেনে যখন সবাই, ছাত্রদল তখন স্টেশনে’Ñ এই পরিস্থিতির সঙ্গে।
অন্যান্য ছাত্রসংগঠন যেখানে ‘সম্মিলিত প্যানেল’ গোছাতে নড়েচড়ে বসেছে, সেখানে ছাত্রদল প্রস্তুতিই শুরু করেনি। এখন পর্যন্ত সংগঠনটির নেতাকর্মীদের প্রকাশ্যে কিংবা কৌশলে প্রচারে দেখা যায়নি। সংগঠনের অভ্যন্তরে রাকসু নির্বাচনের প্রস্তুতি নিয়ে গতকাল শুক্রবার পর্যন্ত কোনো আলোচনা হয়নি বলে জানিয়েছেন একাধিক দায়িত্বশীল নেতা। ছাত্রদলের এমন অবস্থানের পেছনের কারণ নিয়ে শিক্ষার্থীদের মধ্যেও চলছে নানা আলোচনা। সবশেষ রাকসু নির্বাচনে সফলতা পাওয়া ছাত্র সংগঠনটির এমন অবস্থান শেষ পর্যন্ত অন্তর্ভুক্তিমূলক ও সুষ্ঠু নির্বাচন আয়োজন নিয়ে শঙ্কার কথাও আলোচনায় আছে।
রাকসু নির্বাচনের জন্য ক্যাম্পাসে যথাযথ পরিবেশ নেই বলে অভিযোগ করে আসছে ছাত্রদল। সেই সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা ও গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে অভিযোগ করে আসছিলেন নেতাকর্মীরা। তারা বলছেন, প্রশাসন তড়িঘড়ি করে একপক্ষের চাপে নির্বাচনের সিদ্ধান্ত নিলেও উপযুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করতে পারেনি। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন একপক্ষের সাবেক রাজনৈতিক নেতাকে রাকসুর কোষাধ্যক্ষের পদে বসিয়ে রেখেছে। এ ছাড়া বিতর্কিত শিক্ষকদের নিয়ে নির্বাচন কমিশন গঠন করেছে। ছাত্রদলসহ সংগঠনগুলো নানা দাবি জানালেও তা আমলে নেয়নি প্রশাসন। সবশেষ শিক্ষক-কর্মকর্তাদের কর্মবিরতিতে বিশ্ববিদ্যালয়ে অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে।
সুষ্ঠু নির্বাচন আয়োজন নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করে শাখা ছাত্রদলের সভাপতি সুলতান আহমেদ বলেন, শিক্ষক-কর্মকর্তাদের কর্মবিরতির জন্য একদিকে যেমন ক্লাস হচ্ছে না, অন্যদিকে আমরাসহ ছাত্র সংগঠনগুলোর কোনো দাবি-প্রস্তাবনাও মেনে নেয়নি প্রশাসন। নির্বাচন কমিশনও মগবাজার থেকে পাওয়া প্রেসক্রিপশনে একটা সংগঠনের দাবি বাস্তবায়ন করছে। এমন প্রেক্ষাপটে সুষ্ঠু নির্বাচন আয়োজন নিয়ে আমরা শঙ্কায় আছি। আমরা অংশগ্রহণমূলক ও প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক রাকসু নির্বাচন চাই।
এ বিষয়ে রাকসুর নির্বাচন কমিশনার অধ্যাপক মো. আমিনুল হক বলেন, বৃহৎ একটি ছাত্র সংগঠন নির্বাচনে অংশ না নিলে প্রশ্ন উঠতেই পারে। আমরা সবাইকে নিয়েই অন্তর্ভুক্তিমূলক নির্বাচন উপহার দিতে চাই। এ ক্ষেত্রে ক্যাম্পাসের উদ্ভূত পরিস্থিতিতে নির্বাচন সম্পন্ন করাটা বেশ চ্যালেঞ্জিং হবে। ছাত্রদলের যেসব অভিযোগ, সেগুলো বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের সমন্বয় করতে হবে। আমাদের এ ক্ষেত্রে তেমন কিছু করার নেই।
চার বছর আহ্বায়ক কমিটি দিয়ে কার্যক্রম চলার পর ১৬ আগস্ট বিশ্ববিদ্যালয় শাখার ১১৩ সদস্যবিশিষ্ট আংশিক পূর্ণাঙ্গ কমিটি ঘোষণা করে কেন্দ্রীয় ছাত্রদল। পাশাপাশি ছাত্রদের ১১টি হলে আংশিক কমিটি গঠন করা হয়। তবে কমিটিতে স্থান পাওয়া অধিকাংশ নেতাকর্মীই হলের বাইরে অবস্থান করেন। এদিকে নবগঠিত কমিটির সভাপতি, সাধারণ সম্পাদকসহ অন্তত ২০ নেতার নিয়মিত ছাত্রত্ব নেই। বিষয়টি নিয়ে এক ধরনের ইমেজ সংকটে ভুগছে সংগঠনটি। শীর্ষ নেতাদের নিয়মিত ছাত্রত্ব না থাকায় রাকসু নির্বাচনে তারা প্রার্থী হতে পারবেন না। তাদের এই ছাত্রত্বকে ‘যাত্রার টিকিটের’ সঙ্গে তুলনা করছেন কেউ কেউ। বাকি যাদের ছাত্রত্ব আছে, তাদের ক্যাম্পাসে পরিচিতি কম। ফলে নেতৃত্ব সংকটে পড়েছে সংগঠনটি।
ছাত্রদলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক পদে আছেন এমন একজন সক্রিয় নেতা নাম প্রকাশ না করা শর্তে বলেন, অন্যান্য ছাত্র সংগঠন যেখানে রাকসু নির্বাচন নিয়ে নানা তৎপরতা চালাচ্ছে, সেখানে আমাদের দলের অভ্যন্তরে কোনো আলাপ-আলোচনা হয়নি। শীর্ষ নেতাদের নিয়মিত ছাত্রত্ব না থাকায় একধরনের নেতৃত্ব সংকট তৈরি হয়েছে। তবে হল পর্যায়ে যাদের নির্বাচন করার ইচ্ছা আছে, তাদের ভালো কাজ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। একই সুরে কথা বলেন দলটির সহসভাপতি পদে আছেন এমন দুজন নেতা।
শীর্ষ নেতারা নির্বাচনে অংশ নিতে না পারায় নিয়মিত ছাত্রত্ব আছেÑ এমন নেতাদের শীর্ষ পদে বেছে নিতে হবে দলটিকে। তবে কে হবেন ভিপি (সহসভাপতি), জিএস (সাধারণ সম্পাদক), এজিএস (সহসাধারণ সম্পাদক) পদপ্রার্থী, সেটি এখন পর্যন্ত ঠিক হয়নি। দলের নেতাদের মধ্যে নিয়মিত ছাত্রত্ব ও ক্যাম্পাসে পরিচিতি আছে, এমন নেতার সংখ্যা হাতে গোনা কয়েকজন। তবে শেষ পর্যন্ত যদি ছাত্রদল নিজেদের প্যানেল গঠন করে তাহলে যারা শীর্ষ পদপ্রার্থী হতে পারেন, তারা হলেনÑ ছাত্রদলের সাংগঠনিক সম্পাদক মাহমুদুল মিঠু, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক জাহিন বিশ্বাস এষা, দপ্তর সম্পাদক নাফিউল জীবন, সহসভাপতি শেখ নূর উদ্দীন আবির।
বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন, ছাত্রদলের দায়িত্বশীল তিনজন নেতা ও অন্য ছাত্রনেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, দীর্ঘদিন পর ছাত্রদলের কমিটি ঘোষণা হওয়ায় তারা এখনও সবকিছু গুছিয়ে উঠতে পারেনি। এজন্য বিএনপিপন্থী জ্যেষ্ঠ শিক্ষক ও ছাত্রদল নেতারা মৌখিকভাবে প্যানেল গোছাতে সময় চেয়ে ‘অনুরোধ’ করেছেন। তবে ক্যাম্পাসের পরিস্থিতি বিবেচনায় সময় বৃদ্ধি করতে নারাজ বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের দায়িত্বশীল এক কর্মকর্তা বলেন, ছাত্রদল অন্তর্ভুক্তিমূলক নির্বাচনের জন্য মৌখিকভাবে সময় চেয়ে প্রশাসনের কাছে অনুরোধ করেছে। এ ছাড়া শীর্ষ নেতারা যেন নির্বাচনে অংশ নিতে পারে, সেজন্য ডাবল মাস্টার্স কিংবা এমফিলের শিক্ষার্থীদের যেন সুযোগ দেওয়া হয়Ñ সেই অনুরোধও জানান নেতারা। তবে ক্যাম্পাসের পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে তাদের সময় দেওয়া হয়নি। এজন্য প্রশাসনের প্রতি ছাত্রদলের ব্যাপক ক্ষোভ সৃষ্টি হয়েছে।