দীপক দেব
প্রকাশ : ২১ আগস্ট ২০২৫ ১১:২০ এএম
ফাইল ফটো
জুলাই জাতীয় সনদ-২০২৫ পূর্ণাঙ্গ খসড়ার মতামত দিয়েছে বিএনপিসহ পাঁচটি রাজনৈতিক দল। এর মধ্যে জুলাই জাতীয় সনদের যেসব জায়গায় অসামঞ্জস্যতা ও অস্পষ্টতা রয়েছে সেগুলো তুলে ধরে বিএনপি নিজেদের মতামত দিয়েছে। জানা গেছে, দলটি তাদের মতামতে বলেছে, জুলাই সনদকে সংবিধানের ওপরে প্রাধান্য দেওয়া হলে তাতে খারাপ নজির তৈরি হবে। এ সনদ নিয়ে আদালতে প্রশ্ন তোলা যাবে না, সরাসরি এমন বিধান রাখারও বিপক্ষে বিএনপি। বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন তুলে মতামত দিয়েছে জাতীয়তাবাদী গণতান্ত্রিক আন্দোলন (এনডিএম)ও। তারা বলেছে, কোনো আইন বা বিধানকে সংবিধানের ওপরে স্থান দেওয়ার সুযোগ নেই।
বিএনপি এবং এনডিএম জুলাই সনদ নিয়ে মতামত দিলেও জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় নাগরিক পার্টিসহ (এনসিপি) ২৫টি দল এখনও তাদের মতামত প্রদান করেনি। অন্যদিকে বাম ঘরানার পাঁচটি দলের পক্ষ থেকে জুলাই সনদে মতামত দিতে আরও সময় চাওয়া হয়েছে। এর প্রেক্ষিতে জাতীয় ঐকমত্য কমিশন মতামত দেওয়ার জন্য সময় দুদিন বৃদ্ধি করে শুক্রবার বেলা ৩টা পর্যন্ত নির্ধারণ করেছে।
জানা গেছে, গতকাল বুধবার বিকাল ৪টা পর্যন্ত জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সংলাপে অংশ নেওয়া ৩০টি দলের মধ্যে মাত্র পাঁচটি দল তাদের মতামত দিয়েছে। দলগুলো হলোÑ বিএনপি, এনডিএম, খেলাফত মজলিশ, আমার বাংলা পার্টি (এবি পার্টি) ও আমজনতার দল। বিএনপির পক্ষ থেকে ২০ আগস্ট দলের মতামত দেওয়ার নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কমিশনের ইমেইলে দলের মতামত পাঠানো হয় বলে জানান দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘আমাদের দলের মতামত বিকাল ৫টার সময় ইমেইলের মাধ্যমে পাঠিয়েছি।’ এ সময় কমিশনের পক্ষ থেকে প্রাপ্তি স্বীকার করা হয়েছে বলেও তিনি জানান।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিএনপির স্থায়ী কমিটির এক নেতা বলেন, ‘জুলাই সনদের যেসব অসামাঞ্জস্যতা ও অস্পষ্টতা রয়েছে সেগুলো তুলে ধরে বিএনপির পক্ষ থেকে মতামত দেওয়া হয়েছে।’
এদিকে এনডিএম কমিশনের পাঠানো তাদের মতামতে উল্লেখ করেছেÑ ‘জুলাই জাতীয় সনদ’ কোনো নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্ত নয় বরং এটি ঐকমত্যের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক সমঝোতা এবং সুস্পষ্ট প্রতিশ্রুতি। এই সনদের বিধান, নীতি এবং সিদ্ধান্ত ভিন্ন বিদ্যমান সংবিধান বা অন্য কোনো আইনে কিছু থাকলে এই সনদের বিধান/ প্রস্তাব/ সুপারিশ প্রাধান্য পাবে বলে যা উল্লেখ করা হয়েছে তা পরবর্তী সময়ের জন্য ‘স্বেচ্ছাচারিতার নজির’ হয়ে থাকবে। কোনো আইন বা বিধানকে সংবিধানের ওপরে স্থান দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই।
এ ছাড়া দলটি উল্লেখ করেছেÑ ‘হাইকোর্ট এবং আপিল বিভাগ মিলেই বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট সাংবিধানিকভাবে সৃষ্ট। সংবিধানের ব্যাখ্যা দেওয়ার এখতিয়ার হাইকোর্টের। সংবিধানের ১০৬ অনুচ্ছেদ অনুসারে রাষ্ট্রপতি রেফারেন্সের জন্য আপিল বিভাগের কাছে কিছু না প্রেরণ করলে আপিল বিভাগ মতামত ব্যক্ত করতে পারে না। সংবিধানের ১০৩ অনুচ্ছেদে আপিল বিভাগের এখতিয়ার বর্ণনা করা হয়েছে। সুতরাং ‘জুলাই জাতীয় সনদের’ কোনো বিধান, প্রস্তাব বা সুপারিশের ব্যাখ্যা সংক্রান্ত যেকোনো প্রশ্নের চূড়ান্ত মীমাংসার এখতিয়ার বাংলাদেশের সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের ওপর ন্যস্ত থাকার প্রস্তাবকে অঙ্গীকারনামা থেকে বাদ দিতে হবে।
একইভাবে দলটি মতামতে বলেছেÑ বাংলাদেশের সংবিধানের ৩১ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী দেশের প্রত্যেক নাগরিকের আইনের আশ্রয় লাভের অধিকার রয়েছে। ‘জুলাই জাতীয় সনদ-২০২৫’ এর প্রতিটি বিধান, প্রস্তাব ও সুপারিশ সাংবিধানিক ও আইনগতভাবে কার্যকর হিসেবে গণ্য হবে বিধায় এর বৈধতা, প্রয়োজনীয়তা কিংবা জারি কর্তৃত্ব সম্পর্কে কোনো আদালতে প্রশ্ন তোলা যাবে না মর্মে উল্লিখিত প্রস্তাবকে অঙ্গীকারনামা থেকে বাদ দিতে হবে। ‘জুলাই জাতীয় সনদ-২০২৫’ এর যেসব বিধান সংবিধান সংশোধনের সঙ্গে সম্পর্কিত নয় সেগুলো বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার ইচ্ছা করলেই অধ্যাদেশের মাধ্যমে বাস্তবায়ন করতে পারে। সুতরাং অঙ্গীকারনামায় উল্লিখিত ‘পরবর্তী জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে’ শব্দসমূহ বাদ দিতে হবে।
অন্যদিকে আমার বাংলাদেশ পার্টির পক্ষ থেকে দেওয়া মতামতে উল্লেখ করা হয়েছে, ‘জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নের অঙ্গীকারনামার অনুচ্ছেদ-৮ এ উল্লিখিত প্রস্তাবের সঙ্গে আমরা দৃঢ়ভাবে একমত পোষণ করছি। তবে আমরা মনে করি যে, যে সকল প্রস্তাব/সুপারিশ অবিলম্বে বাস্তবায়নযোগ্য এবং যে সকল প্রস্তাব/সুপারিশ অবিলম্বে বাস্তবায়নযোগ্য নয় তার একটি সুস্পষ্ট তালিকা প্রস্তুত করা প্রয়োজন। অন্যথায়, এই বিষয়টি নিয়ে সন্দেহ, সংশয় ও বিভ্রান্তির সৃষ্টি হতে পারে।’ দলটি দ্রুত তৃতীয় পর্যায়ের আলোচনা শুরুরও আহ্বান জানিয়েছে।
অন্যদিকে দল ও জোটের শরিকদের সঙ্গে জুলাই সনদের খসড়া পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পর্যালোচনা করে মতামত প্রদান করার জন্য পাঁচটি দল সময় বৃদ্ধির প্রস্তাব করেছে। এরই প্রেক্ষিতে কমিশনের পক্ষ থেকে সময় বৃদ্ধি করা হয়। সময় বৃদ্ধির প্রস্তাব করা দলগুলো হচ্ছেÑ বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি), বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল (বাসদ), বাসদ মার্ক্সবাদী, বাংলাদেশ জাসদ ও গণফোরাম।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, গতকাল বুধবার দুপুরে বাসদ অফিসে নিজেদের মধ্যে বৈঠক করে এই পাঁচটি দল সময় বৃদ্ধির প্রস্তাব করে। তারা জুলাই সনদের খসড়া নিয়েই নিজেদের মধ্যে আলোচনা করে। দলগুলো মনে করে, বিভেদ এড়াতে রাজনৈতিক দলগুলো মধ্যে যেসব বিষয়ে ঐকমত্য হয়েছে সেগুলোকে রেখেই সনদ প্রণয়ন করতে হবে।
এ ছাড়া সংবিধানের মূলনীতির মতো মৌলিক বিষয় ও অঙ্গীকারের বিষয়গুলো সনদে না রেখে তা পরবর্তী সংসদের ওপর ছেড়ে দেওয়ার বিষয়ে মতামত বাম দলগুলো কমিশনের কাছে দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে বলে জানা গেছে।
সময় চাওয়ার কারণ প্রসঙ্গে সিপিবি সাধারণ সম্পাদক রুহিন হোসেন প্রিন্স প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘এখানে অনেকগুলো বিষয় আছে যেগুলো নিয়ে পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে আলোচনার দরকার আছে। এছাড়া আইনের অনেকগুলো বিষয় আছে যেগুলো নিয়ে দলের আইনজীবীদের সঙ্গেও বসা দরকার। এজন্যই আমরা বলেছি আমাদের মতামত দিতে আরেকটু সময় লাগবে।’
এদিকে গতকাল বিকালে জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সহ-সভাপতি অধ্যাপক ড. আলী রীয়াজ দলগুলোর মতামত দেওয়ার সময় শুক্রবার বেলা ৩টা পর্যন্ত সময় বৃদ্ধির বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। এর আগে জুলাই জাতীয় সনদের পূর্ণাঙ্গ খসড়া দলগুলোর কাছে পাঠিয়ে ২০ আগস্টের মধ্যে মতামত দিতে বলা হয়েছিল। দলগুলোর মতামতের ভিত্তিতে সনদে পরিবর্তন পরিমার্জন এনে আগামী ২৫ আগস্ট তৃতীয় দফায় দলগুলোর সঙ্গে সংলাপে বসার কথা ঐকমত্য কমিশনের।