এটিএম শামসুজ্জামান
প্রকাশ : ২০ আগস্ট ২০২৫ ১৬:১০ পিএম
২০১৮ সালে খালেদা জিয়ার মুক্তির দাবিতে পদযাত্রায় অংশগ্রহণকারীদের সাথে বিএনপির যুগ্ন মহাসচিব। ছবি: সংগৃহীত
২০১৮ সালের জুলাই মাস- বাংলাদেশের রাজনীতির ইতিহাসে এক স্মরণীয় সময়। যখন গণতন্ত্রের সংকটে দেশের শাসনব্যবস্থা এক অনিশ্চয়তার মুখোমুখি। দেশনেত্রী খালেদা জিয়া দুর্নীতির মামলায় কারাবন্দি। বিরোধী দলের দাবি, মামলাটি রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। ফ্যাসিবাদের ছায়ায় ন্যায্য দাবির কণ্ঠরোধ যেন আরও ঘনীভূত হয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে ব্যতিক্রমী প্রতিবাদের এক নতুন অধ্যায় রচনা করে ছয় তরুণ। যারা ভালোবাসা, আবেগ ও রাজনৈতিক আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে চট্টগ্রাম থেকে ঢাকার পথে পায়ে হেঁটে বেরিয়ে পড়েন খালেদা জিয়ার মুক্তির দাবিতে।
চট্টগ্রাম মহানগর বিএনপি কার্যালয় নাসিমন ভবন থেকে ৫ জুলাই বেলা ১১টার দিকে শুরু হয় পদযাত্রা। শহীদুজ্জামান, সাইফুল আলম রানা ও আজিম উদ্দিনের সাথে সীতাকুণ্ড, পদুয়া বাজার ও কুমিল্লা ক্যান্টনমেন্ট থেকে একে একে যুক্ত হন সোহেল মন্টু, সাদ্দাম মজুমদার ও সোহেল রানা। তাদের টি-শার্টে লেখা ছিল : ‘Walk for justice, for nation, for mother -Chittagong to Dhaka.’
পদযাত্রায় অংশগ্রহণকারীরা দলের খুব বড় কোনো হস্তি ছিল না, কিন্তু দল ও নেত্রীর প্রতি ছিল অগাধ ভালোবাসা। সেদিন পদযাত্রায় অংশগ্রহণকারীরা হলেনÑ চট্টগ্রাম মহানগর যুবদলকর্মী শফিউল আলম রানা, ছাত্রদলকর্মী শহীদুজ্জামান, আজিম উদ্দিন, সোহেল, কুমিল্লা ছাত্রদল নেতা সাদ্দাম মজুমদার, মনোহরগঞ্জ ছাত্রদল নেতা সোহেল রানা।
১২ ঘণ্টা হাঁটা, পথের ক্লান্তি, ব্যথা ও রক্তাক্ত পা; তবুও থেমে যায়নি তাদের যাত্রা। মেটোপথ, পিচঢালা রাস্তা, প্রশাসনিক বাধা কিংবা স্থানীয় বাধাবিপত্তিও টলাতে পারেনি তাদের সংকল্প। পিচঢালা অথবা মেটোপথে হাঁটতে গিয়ে পা কেটেছে, ফুলে গিয়েছে, ব্যথায় কাতর হলেও দল ও নেত্রীর প্রতি ভালোবাসার উত্তেজনায় সেদিন এসব কোনো কিছুই মনে হয়নি সেই তরুণদের। যেন পায়ের প্রত্যেকটি ধাপ মনের উত্তেজনা বাড়িয়েছে, ক্ষুধার্ত শরীরের শক্তি জুগিয়েছে। প্রতিটি ধাপে তারা যেন এক দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন- প্রতিবাদের, ভালোবাসার এবং রাজনৈতিক অঙ্গীকারের।
১১ জুলাই নয়াপল্টনের বিএনপি কার্যালয়ে পৌঁছলে, ফুল দিয়ে তাদের বরণ করে নেন দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ শীর্ষ নেতারা। তরুণদের এই পদক্ষেপ শুধু একটি দাবির প্রতীক ছিল না; এটি ছিল নিপীড়নের বিপরীতে এক শান্তিপূর্ণ অথচ দুর্বার প্রতিবাদ, যা ভবিষ্যতের জন্য রেখে গেছে এক অনুপ্রেরণার গল্প।
এই পদযাত্রার অন্যতম অংশগ্রহণকারী শহীদুজ্জামান সেদিন বলেছিলেন, ‘আমাদের চেয়ারপারসন কারাগারে যাওয়ার আগে শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি পালনের কথা বলেছেন। এটি সবচেয়ে নিরাপদ কর্মসূচি, অনেকটা মৌন কর্মসূচির মতো। এখানে জনদুর্ভোগসহ অশান্তি সৃষ্টিরও সুযোগও নেই। সেকারণেই এই প্রতিবাদী আয়োজন।’
সেদিন পদযাত্রায় অংশ নেওয়া ছাত্রদলকর্মী শহীদুজ্জামান, সাদ্দাম মজুমদার, আজিম উদ্দিন, সোহেল রানা বলেন, আপসহীন দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার সঙ্গে সাক্ষাতের সুযোগ পেলে নিজেকে ধন্য মনে করব, এর বেশি চাওয়া-পাওয়া নাই। তবে এখন দলে তেমন কোনো মূল্যায়ন না হওয়ায় খারাপ লাগে।
সেদিনের অনুভূতি প্রকাশ করতে গিয়ে পদযাত্রায় অংশ নেওয়া চট্টগ্রাম মহানগর যুবদলকর্মী শফিউল আলম রানা বলেন, সেদিন দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে যখন সম্পূর্ণ অন্যায়ভাবে স্বৈরাচারী শেখ হাসিনা গ্রেপ্তার করে- বিষয়টি আমি কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছিলাম না। নেত্রীর মুক্তি দাবিতে দলের উদ্যোগে নেওয়া কর্মসূচিগুলোও তেমন কার্যকর ভূমিকা রাখবে বলেও মনে হয়নি। তাই আমি চট্টগ্রাম থেকে পায়ে হেঁটে ঢাকায় নাজিমুদ্দিন রোডের পুরনো কারাগার অভিমুখী পদযাত্রা কর্মসূচি গ্রহণ করে নেতৃবৃন্দের দৃষ্টি আকর্ষণ করে বোঝাতে চেষ্টা করেছি যে, নেত্রীর মুক্তির জন্য সারা দেশ থেকে ঢাকা অভিমুখে পদযাত্রা করে ঢাকা অচল করে দেশনেত্রীকে মুক্তি দিতে বাধ্য করতে হবে।
এই আন্দোলনের তাৎপর্য শুধু রাজনীতি নয়, মানবিকতা ও সাহসের পরিমণ্ডলেও অনন্য। ছয় তরুণের সেই পদযাত্রা আজও স্মরণীয়- ন্যায়, গণতন্ত্র ও নেতৃত্বের প্রতি ভালোবাসার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।