ভাঙ্গনের রাজনীতি
প্রবা প্রতিবেদক
প্রকাশ : ১০ আগস্ট ২০২৫ ০০:৫১ এএম
ছবি: সংগৃহীত
বৃহত্তর ঐক্য প্রক্রিয়ার ব্যানারে ফের ভাঙল হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ প্রতিষ্ঠিত জাতীয় পার্টি (জাপা)। এরশাদের ভাই জিএম কাদেরকে ছাড়াই দলটির একটি অংশের ১০তম কাউন্সিল অনুষ্ঠিত হয়েছে। কাউন্সিল থেকে নতুন চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছেন ব্যারিস্টার আনিসুল ইসলাম মাহমুদ ও মহাসচিব হয়েছেন এবিএম রুহুল আমিন হাওলাদার। এদিকে জিএম কাদেরের নেতৃত্বে জাতীয় পার্টি ঐক্যবদ্ধ বলে দাবি করেছেন জাপার অপর অংশের মহাসচিব ব্যারিস্টার শামীম হায়দার পাটোয়ারী।
শনিবার (০৯ আগস্ট) রাজধানীর গুলশানে ইমানুয়েল কমিউনিটি সেন্টারে আয়োজিত পার্টির দশম জাতীয় কাউন্সিলে সারা দেশ থেকে আগত প্রায় দুই হাজার কাউন্সিলরের কণ্ঠভোটে তারা নির্বাচিত হন।
কাউন্সিলের দ্বিতীয় অধিবেশনে, জাতীয় পার্টির গঠিত ৩ সদস্যের নির্বাচন কমিশনের আহ্বায়ক মো. জহিরুল ইসলাম জহির নির্বাচিত চেয়ারম্যান হিসেবে আনিসুল ইসলাম মাহমুদ ও মহাসচিব হিসেবে এবিএম রুহুল আমিন হাওলাদারের নাম ঘোষণা করেন। কমিশনের অন্য সদস্যরা হলেনÑ মোস্তফা আল মাহমুদ, মো. আরিফুর রহমান খান। এ ছাড়া কাজী ফিরোজ রশিদ সিনিয়র কো-চেয়ারম্যান ও মুজিবুল হক চুন্নু নির্বাহী চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। এই সময় সারা দেশ থেকে আগত কাউন্সিলরদের পাশাপাশি প্রায় তিন হাজারের অধিক প্রতিনিধি কাউন্সিলে উপস্থিত ছিলেন। এর আগে সকালে জাতীয় ও দলীয় সংগীত পরিবেশনের মধ্য দিয়ে কাউন্সিলের উদ্বোধন করা হয়। জাতীয় পতাকা উত্তোলন করেন ব্যারিস্টার আনিসুল ইসলাম মাহমুদ ও দলীয় পতাকা উত্তোলন করেন মুজিবুল হক চুন্নু।
প্রথম অধিবেশনের উদ্বোধনী আলোচনা সভায় সভাপতিত্ব করেন ব্যারিস্টার আনিসুল ইসলাম মাহমুদ। প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন জাতীয় পার্টির (জেপি) একাংশের চেয়ারম্যান আনোয়ার হোসেন মঞ্জু। স্বাগত বক্তব্য রাখেন এবিএম রুহুল আমিন হাওলাদার। সাংগঠনিক রিপোর্ট পেশ করেন মুজিবুল হক চুন্নু।
উদ্বোধনী অধিবেশনে আরও বক্তব্য রাখেন, এ বি এম রুহুল আমিন হাওলাদার, কাজী ফিরোজ রশিদ, সৈয়দ আবু হোসেন বাবলা, প্রেসিডিয়াম সদস্য সাহিদুর রহমান টেপা, এটিইউ তাজ রহমান, সোলায়মান আলম শেঠ, নাসরিন জাহান রতনা, নাজমা আকতার, লিয়াকত হোসেন খোকা, মোস্তফা আল মাহমুদ, মাসরুর মওলা, জসিম উদ্দিন ভূঁইয়া, আরিফুর রহমান, নুরুল ইসলাম মিলন, জিয়াউল হক মৃধা, খান ইসরাফিল খোকনসহ দলটির অধিকাংশ সিনিয়র নেতা ও বিভিন্ন জেলা কমিটির সভাপতি সাধারণ সম্পাদকরা। কাউন্সিলে সংহতি জানিয়ে বক্তব্য রাখেন, জাতীয় পার্টি (জেপি) মহাসচিব শেখ শহিদুল ইসলাম, জাতীয় পার্টি (কাজী জাফর) প্রেসিডিয়াম সদস্য, দিদারুল আলম দিদার, বাংলাদেশ জাতীয় পার্টির (মতিন) মহাসচিব জাফর আহমেদ জয় প্রমুখ।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে জেপির চেয়ারম্যান আনোয়ার হোসেন মঞ্জু বলেন, মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে এই দেশ সৃষ্টি হয়েছে। অনেক চড়াই-উতরাই পেরিয়ে আমাদের দেশকে একটা অবস্থানে নিয়ে এসেছিলাম। আজকে সবাই সব কথা বলে, কিন্তু মুক্তিযুদ্ধ-স্বাধীনতার কথা কেউ বলে না। এখন সরকার বলছে, সংস্কার করতে হবে। সংস্কার কি আমরা করিনি। শিক্ষানীতি, ওষুধ নীতি, উপজেলা পদ্ধতি এসবই সংস্কারের অংশ ছিল। সারা দেশে দখলবাজি চলছে, বাড়ি দখল-দোকান দখল, হাটবাজার দখল, সব জায়গায় দখলবাজি হচ্ছে। কোনোকিছুতেই নিয়মকানুনের বালাই নেই। এইসব বন্ধ করতে সরকারের দৃশ্যমান উদ্যোগও চোখে পড়ছে না।
সভাপতির বক্তব্যে ব্যারিস্টার আনিসুল ইসলাম মাহমুদ বলেন, সরকার সংস্কার করছে, কিন্তু এই সংস্কার তারা বাস্তবায়ন করতে পারবে না। সংস্কার বাস্তবায়ন করতে হলে নির্বাচিত সংসদ দরকার। আর সংসদের জন্য দরকার জাতীয় নির্বাচন। যদিও সরকার নির্বাচনের কথাও বলছে। কিন্তু আদৌ গ্রহণযোগ্য নির্বাচন হবে কি না তা নিয়ে সন্দেহ আছে।
স্বাগত বক্তব্যে রুহুল আমিন হাওলাদার বলেন, জাতীয় পার্টিকে আমরা নিয়ে যাব সাধারণ মানুষের কাছে। ফিরিয়ে দিব তৃণমূলের মর্যাদা। পল্লীবন্ধু হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের গড়া জাতীয় পার্টি কারও একক সম্পত্তি নয়, এই পার্টি জনগণের আশা ও অধিকার রক্ষার আন্দোলনে রাজপথে থাকবে। এই সম্মেলনের মধ্য দিয়ে জাতীয় পার্টির বিভক্তিকে ভেঙে নতুন নবযাত্রায় পল্লীবন্ধু এরশাদের জাতীয় পার্টিকে গড়ে তোলার শপথ নিচ্ছি। আদালতের আদেশ ও গঠনতান্ত্রিক উপায়ে আজকের কাউন্সিল অনুষ্ঠিত হয়েছে। আজ থেকে জাতীয় পার্টি কোনো একক নেতৃত্বে চলবে না, জাতীয় পার্টি পরিচালিত হবে যৌথ নেতৃত্বের মাধ্যমে। এখন থেকে জাতীয় পার্টিতে আর বিভাজনের আশঙ্কা নেই। বরং খণ্ডিত জাতীয় পার্টিগুলোকে এক ছাতার নিচে নিয়ে এসে ঐক্যবদ্ধ করে পল্লীবন্ধু এরশাদের স্বপ্ন বাস্তবায়নে কাজ শুরু করব।
আওয়ামী লীগের আমলে বিতর্কিত নির্বাচনে অংশ নেওয়ায় দেশবাসীর কাছে ক্ষমা চেয়েছেন মুজিবুল হক চুন্নু। তিনি বলেন, আমরা দলীয়ভাবে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে কোনো বেআইনি কাজ করিনি। যদি নৈতিকভাবে কোনো ভুল হয়ে থাকে, কোনো ভ্রান্তি হয়ে থাকে তাহলে এই কাউন্সিলে দাঁড়িয়ে জাতীয় পার্টির পক্ষ থেকে দেশবাসীর কাছে আমরা নিঃশর্ত ক্ষমা চাই। চুন্নু বলেন, গত প্রায় চার বছর আমি জাতীয় পার্টির মহাসচিব হিসেবে ছিলাম। ভুলভ্রান্তি আমার থাকতে পারে। যে সমস্ত ভুলভ্রান্তি ছিল, সেগুলো আপনারা ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন। জাতীয় পার্টির মহাসচিব হিসেবে আমি দেশবাসীর কাছে একটি কথাই বলব, আমরা রাজনীতি করতে গিয়ে দলীয় সিদ্ধান্তে সব সময় হয়তো সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারিনি। আমরা বিগত অনেকগুলো নির্বাচন করেছি। অনেক সময় অনেকে আমাদের বিভিন্নভাবে কটূক্তি করেন, বিভিন্ন দলের সহযোগী বা স্বৈরাচার সহযোগী হিসেবে আমাদের আখ্যায়িত করেন।
জিএম কাদেরের নেতৃত্বে জাতীয় পার্টি ঐক্যবদ্ধ
এদিকে জাতীয় পার্টির জিএম কাদেরের অংশের মহাসচিব ব্যারিস্টার শামীম হায়দার পাটোয়ারী বলেছেন, ইতিহাস বলে, মূলস্রোতের বাইরে গিয়ে যারা জাতীয় পার্টিকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে চেয়েছে, তারাই নিশ্চিহ্ন হয়েছেন। জাতীয় পার্টির বিরুদ্ধে সকল ষড়যন্ত্র নস্যাৎ করে দেবে পল্লীবন্ধু হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ ও জিএম কাদেরের অনুসারীরা। এদিন সকালে রাজধানীর কাকরাইলে জাতীয় পার্টির কেন্দ্রীয় কার্যালয় মিলনায়তনে জাতীয় তরুণ পার্টির সঙ্গে মতবিনিময়ের সময় তিনি এসব কথা বলেন। শামীম হায়দার বলেন, জাতীয় পার্টি চেয়ারম্যান গোলাম মোহাম্মদ কাদেরের নেতৃত্বে তৃণমূল নেতাকর্মীরা ঐক্যবদ্ধ আছে। জিএম কাদেরের নেতৃত্বেই জাতীয় পার্টি বাংলাদেশের রাজনীতিতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে। কোনো ষড়যন্ত্রে বিভ্রান্ত না হয়ে ঐক্যবদ্ধ থাকতে নেতাকর্মীদের প্রতিও আহ্বান জানান তিনি।