প্রবা প্রতিবেদন
প্রকাশ : ১১ ডিসেম্বর ২০২২ ১৭:৫৪ পিএম
আপডেট : ১১ ডিসেম্বর ২০২২ ২০:০০ পিএম
শনিবার রাজধানীর গোলাপবাগে বিএনপির সমাবেশ। ছবি : প্রবা
ঢাকার গণসমাবেশ থেকে দেওয়া বিএনপির ১০ দফা দাবির মধ্যে নতুন কিছু নেই বলে দাবি করেছেন আওয়ামী লীগ ও ১৪ দলের নেতারা। তারা বলেছেন, এই দাবিগুলোর মধ্যে নতুন কিছু নেই। বিএনপি আগে থেকেই এসব দাবি করে আসছে। এসব অযৌক্তির দাবি মূল্যায়নের কোনো সুযোগ নেই। ক্ষমতাসীন জোটের নেতারা আরও বলেন, বিএনপি ১০ দফা দাবি বাস্তবায়নের মধ্য দিয়ে সংবিধানের কবর রচনা করতে চায়। তারা দেশের সাম্প্রদায়িক ও জঙ্গিবাদী শক্তির পুনরুত্থান ঘটানোর জন্য এই দাবি জানিয়েছে। দেশবাসী ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের মধ্যে যারা বিএনপিকে সমর্থন জোগাচ্ছেন তাদের নতুন করে ভাবার দাবি জানিয়েছে ক্ষমতাসীনরা।
বিএনপির ১০ দফার প্রসঙ্গে আওয়ামী লীগ ও ১৪ দলের নেতারা প্রতিদিনের বাংলাদেশকে এসব কথা বলেন।
আওয়ামী লীগ ও ১৪ দলের নেতারা জানান, বিএনপি ২০১৪ সালের নির্বাচনের আগে থেকে যা বলে আসছিল শনিবার (১০ ডিসেম্বর) সমাবেশ করে তাই বলেছে। এতে নতুনত্ব বলে কিছু নেই। যেহেতু তাদের দাবিতে নতুন কিছু নেই, স্বাভাবিকভাবেই আওয়ামী লীগ ও ১৪ দলের অবস্থান একই থাকবে। বিএনপির এই ১০ দফার মধ্যে কিছু দফা শুধু সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিকই নয়, সন্ত্রাসী ও জঙ্গিদের পক্ষে তাদের অবস্থানের সুস্পষ্ট ধারণা রয়েছে, যা নজিরবিহীন। বিএনপির এই দফাগুলোর মধ্যে যেহেতু যৌক্তিক কোনো বিষয় নেই, তাই এসব দাবি মূল্যায়নের কোনো সুযোগ নেই। তারা (বিএনপি) তাদেরটা করেছে, আওয়ামী লীগ ও ১৪ দল শেখ হাসিনার নেতৃত্বে কাজ করছে, সুতরাং ১৪ দল তারটা করবে। আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন ১৪ দল গণতন্ত্রে বিশ্বাস করে। গণতান্ত্রিক রীতিনীতি অনুযায়ী যেভাবে দেশে নির্বাচন হওয়ার সেভাবেই হবে। কে কী দাবি জানাল, সেটা নিয়ে নতুন করে কিছু ভাবার সুযোগ নেই।
এই প্রসঙ্গে আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর অন্যতম সদস্য বেগম মতিয়া চৌধুরী প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘বিএনপি যে ১০ দফা দিয়েছে তাতে নতুন কিছু নেই। মূলত তারা তাদের কর্মীদের উজ্জীবিত করার জন্যই এসব ১০ দফা দিয়ে গরম গরম বক্তব্য দিচ্ছে। তাই বলে আমরা উত্তেজিত হয়ে পড়ব বিষয়টা কিন্তু তেমন নয়। যেহেতু তাদের ১০ দফার মধ্যে নতুন কিছু নেই, তাই এসব দাবি মূল্যায়ন করার কোনো কারণ নেই।’
বিএনপির দাবিগুলোর মধ্যে কয়েকটি দাবিকে গণতন্ত্র ও সংবিধানের দৃষ্টিতে দেখার পরামর্শ দিয়ে তিনি বলেন, ‘দেশ চলবে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে। অন্য কোনো প্রক্রিয়াতে দেশ পরিচালনা হবে না। আওয়ামী লীগ ও তার নেতৃত্বাধীন সরকার গণতন্ত্রিক প্রক্রিয়াতে বিশ্বাসী। নির্বাচন সংবিধান অনুযায়ী যথাসময়ে হবে। কে কী বলল তা নিয়ে উত্তেজিত হওয়ার কিছু নেই।’
ঢাকার গোলাপবাগ থেকে বিএনপি যে ১০ দফা ঘোষণা করেছে সেই দাবিগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে—সরকারের পদত্যাগ, অন্তর্বর্তীকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠন, নিরপেক্ষ নির্বাচন কমিশন গঠন, আরপিও সংশোধন ও ইভিএম পদ্ধতির পরিবর্তে ব্যালট পেপারে ভোটগ্রহণ।
ইভিএম ছাড়া বাকি দাবিগুলো নিয়ে ২০১৪ সালের দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে থেকেই আন্দোলন করে আসছে বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০-দলীয় জোট। ১০ দফার মধ্য দিয়ে বিএনপির আরও যেসব দাবি জানিয়েছে তার মধ্যে রয়েছে—খালেদা জিয়াসহ সব বিরোধীদলীয় নেতাকর্মী, পেশাদারত্বের সঙ্গে দায়িত্ব পালনকারী সব মানবাধিকারকর্মী ও সাংবাদিক এবং আলেমদের সাজা বাতিল, মিথ্যা মামলা প্রত্যাহার ও রাজনৈতিক কারাবন্দিদের অনতিবিলম্বে মুক্তি।
১০ দফার ৫ নম্বর দফা হচ্ছে—ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন ২০১৮, সন্ত্রাস দমন আইন-২০০৯ এবং বিশেষ ক্ষমতা আইন-১৯৭৪-সহ মৌলিক মানবাধিকার হরণকারী সব কালাকানুন বাতিল করতে হবে।
বিএনপি ঘোষিত ১০ দফার ৫ নম্বর দফায় আইন বাতিলের দাবিটি নিয়ে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ও ১৪ দলের অনেকেই ভীতি প্রকাশ করে এটাকে অশনীসংকেত হিসেবেও উল্লেখ করেছেন।
তাদের দাবি, বিএনপি এর মধ্য দিয়ে সন্ত্রাসী ও সাম্প্রদায়িক জঙ্গিবাদী শক্তির প্রতি তাদের অবস্থান আবারও জানান দেওয়ার চেষ্টা করেছে। বিএনপির পক্ষে অবস্থান নেওয়া দেশি-বিদেশি শক্তিকে বিষয়টি নিয়ে নতুন করে ভাববার আহ্বান জানিয়েছে তারা।
জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জাসদ) সভাপতি ও সংসদ সদস্য হাসানুল হক ইনু বলেন, ‘বিএনপির ১০ দফা হলো সংবিধানের কবর দেওয়ার ষড়যন্ত্র ও দুর্নীতিবাজ, চিহ্নিত জঙ্গি-রাজাকারদের মুক্তি আবদারের দলিল। ওই ১০ দফা মিথ্যার দলিল, চক্রান্তের ও অপরাধীদের রক্ষার দলিল।’
বিএনপির ১০ দফাকে প্রত্যাখ্যান করে তিনি বলেন, ‘ওই ১০ দফা দিয়ে বিএনপি আরেকবার প্রমাণ করল, তারা দেশটাকে সংবিধানের বাইরে ঠেলে দিতে চায়। অস্বাভাবিক সরকার গঠনের রাজনীতিতেই থেকে গেল তারা। কোনো আদালতই তারা মানেন না।’
হাসানুল হক ইনু বলেন, ‘বিএনপি যাদের আলেম বলছে, তারা কেউই আলেম নন। আলেম হবার জন্য কাউকে গ্রেপ্তার করা হয়নি। যারা কারাগারে আছে তারা নারী ধর্ষণকারী, জঙ্গি সন্ত্রাসী ও খুনি। অর্থ পাচার নিয়ে ১০ দফায় যে প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে তা হাস্যকর। কারণ তারা ক্ষমতায় থাকতে হাওয়া ভবন বানিয়ে অর্থ পাচার করেছে। তার একটি অংশ ইতোমধ্যে ফেরত এসেছে। ১০ দফায় বৈশ্বিক সংকট নিয়ে কিছু বলেনি তারা। তাদের কাছে সবই সম্ভব, এত সমালোচনার পরেও তাদের বগলে জামায়াত যুদ্ধাপরাধী।’
১০ দফা দাবি ঘোষণা করে সেই দাবি আদায় এবং সরকার পদত্যাগ না করা পর্যন্ত বিএনপি নির্বাচনে অংশ নেবে না দলটির এমন ঘোষণা প্রসঙ্গে সাম্যবাদী দলের সাধারণ সম্পাদক ও ১৪ দলের আরেক নেতা দিলীপ বড়ুয়া প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘তারা (বিএনপি) তাদের দাবি উত্থাপন করে তাদের কাজ করেছে। আমরা আমাদের কাজ করব। আমরা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আছি, তার নেতৃত্বেই কাজ করে যাচ্ছি। আগামীতেও তার নেতৃত্বেই এগিয়ে যাব। যেটা করার দরকার হবে করব।’
আওয়ামী লীগের অন্যতম যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দীন নাছিম ১০ দফা নিয়ে প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘এটার মধ্যে নতুন কিছু নেই। তাই এটা নিয়ে কথা বলার কোনো সুযোগ নেই। তবে এর মধ্যে একটি দফা (৫ নম্বর দফা) যেটাতে তারা সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদ দমন আইন বাতিলের দাবি জানিয়েছে সেটা নিয়ে কথা বলতে হয়। যে আইনটি আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ও প্রশংসিত সেই আইন বাতিল করতে বলার মধ্য দিয়ে বিএনপি আসলে আসল চেহারাকে সামনে নিয়ে এসেছে। তারা যে সন্ত্রাসী জঙ্গিবাদীদের লালনপালন করে, তাদের নিয়ে চলে, আইন বাতিল করতে বলার মধ্য দিয়ে সেটা আবারও প্রমাণিত হয়েছে। এই দাবি নিয়ে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী, প্রগতিশীল ও সংখ্যালঘু সম্প্রদায় শঙ্কিত। এটা একটি নজীরবিহীন ঘটনা।’
তিনি এই দাবিকে অশনীসংকেত হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, ‘দেশবাসী ও বিএনপির পক্ষে যারা কথা বলছেন তাদের সেই বিদেশি প্রভুদের বলব, আর কালক্ষেপণ না করে কেন তারা এই দাবি জানাল তা খতিয়ে দেখেন। গণতান্ত্রিক রাজনীতির আড়ালে তাদের আসল পরিচয় কী, বিষয়গুলো নিয়ে নতুন করে চিন্তা করার সময় এসেছে।’