প্রবা প্রতিবেদক
প্রকাশ : ০৭ আগস্ট ২০২৫ ১৮:১৮ পিএম
আপডেট : ০৭ আগস্ট ২০২৫ ১৮:২০ পিএম
এনসিপির মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী। ফাইল ফটো
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের প্রথম বর্ষপূর্তির দিনে হঠাৎ কক্সবাজার ঘুরতে গিয়ে নানা আলোচনা আর গুঞ্জনের জন্ম দেন এনসিপির পাঁচ শীর্ষ নেতা। সরগরম হয়ে উঠে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ রাজনৈতিক অঙ্গনও। গুঞ্জন উঠে বাংলাদেশে যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক রাষ্ট্রদূত পিটার হাসের সঙ্গে বৈঠক করতে কক্সবাজার গিয়েছেন তারা। এ গুঞ্জন সত্য না হলেও দলকে না জানিয়ে কক্সবাজারে যাওয়ায় ওই পাঁচ নেতাকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেয় এনসিপি।
সেই নোটিশের জবাব দিয়েছেন এনসিপির মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী। তিনি জানিয়েছেন, রাজনীতির ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনাসহ নানা বিষয় নিয়ে নিজের মতো করে গভীর ভাবনায় ডুব দিতেই কক্সবাজার গিয়েছেন তিনি।
বৃহস্পতিবার (৭ আগস্ট) বিকেলে নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক অ্যাকাউন্টে কারণ দর্শানোর নোটিশের জবাব পোস্ট করেছেন তিনি। এতে তুলে ধরেছেন নিজেসহ দলের অন্য চার নেতার কক্সবাজারে ঘুরতে যাওয়ার প্রেক্ষাপট।
ফেসবুক পোস্টে নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী বলেন, ‘সাগরের পাড়ে বসে আমি গভীরভাবে ভাবতে চেয়েছি গণ-অভ্যুত্থান, নাগরিক কমিটি, নাগরিক পার্টির কাঠামো, ভবিষ্যৎ গণপরিষদ এবং একটি নতুন গণতান্ত্রিক সংবিধানের রূপরেখা নিয়ে। আমি এটিকে কোনো অপরাধ মনে করি না, বরং একজন রাজনৈতিক কর্মীর জন্য এটি একটি দায়িত্বশীল মানসিক চর্চা।’
তিনি লিখেছেন, ৫ আগস্ট তার কোনো পূর্বনির্ধারিত রাষ্ট্রীয় বা সাংগঠনিক কর্মসূচি ছিল না। দল থেকেও তাকে এ সংক্রান্ত কোনো দায়িত্ব বা কর্মপরিকল্পনা জানানো হয়নি। ৪ আগস্ট রাতে দলের মুখ্য সংগঠক (দক্ষিণাঞ্চল) হাসনাত আবদুল্লাহ তার কোচিং অফিসের সহকর্মীর ফোন ব্যবহার করে তাকে জানান, তিনি তাঁর স্কুলবন্ধুদের সঙ্গে দুই দিনের জন্য ঘুরতে যাবেন। তিনি হাসনাতকে দলের আহ্বায়ককে বিষয়টি অবহিত করতে বলেন। হাসনাত জানান যে বিষয়টি জানাবেন এবং তাকেও জানাতে বলেন, যেহেতু হাসনাতের নিজস্ব ফোন পদযাত্রায় (জুলাই মাসজুড়ে জেলায় জেলায় জুলাই পদযাত্রা) চুরি হয়ে গিয়েছিল।
নাসীরুদ্দীন লেখেন, ‘৪ আগস্ট রাতে দলীয় কার্যালয়ে আমি এনসিপির আহ্বায়কের (নাহিদ ইসলাম) সঙ্গে দেখা করে বিষয়টি জানাই। একই রাতে আমি দলের সদস্যসচিবের (আখতার হোসেন) সঙ্গে ফোনে যোগাযোগ করে জানতে পারি যে, রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানে (জুলাই ঘোষণাপত্র পাঠের অনুষ্ঠান) দল থেকে তিনজন প্রতিনিধি যাচ্ছেন এবং সেখানে আমার কোনো কাজ নেই। আমি কোনো দায়িত্বে না থাকায় এবং ব্যক্তিগত প্রয়োজন ও মানসিক প্রস্তুতির অংশ হিসেবে ঘুরতে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিই। সফরসঙ্গী হিসেবে সস্ত্রীক সারজিস আলম ও তাসনিম জারা-খালেদ সাইফুল্লাহ দম্পতি যুক্ত হন।’
নোটিশের জবাবে এনসিপির মুখ্য সমন্বয়ক লিখেছেন, ‘আমি ঘুরতে গিয়েছিলাম। তবে এই ঘোরার লক্ষ্য ছিল, রাজনীতির ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনা নিয়ে একান্তে চিন্তা-ভাবনা করা। সাগরের পাড়ে বসে আমি গভীরভাবে ভাবতে চেয়েছি গণ–অভ্যুত্থান, নাগরিক কমিটি, নাগরিক পার্টির কাঠামো, ভবিষ্যৎ গণপরিষদ এবং একটি নতুন গণতান্ত্রিক সংবিধানের রূপরেখা নিয়ে। আমি এটিকে কোনো অপরাধ মনে করি না, বরং একজন রাজনৈতিক কর্মীর জন্য এটি একটি দায়িত্বশীল মানসিক চর্চা।’
তাদের সফর ঘিরে গুজব ছড়িয়ে পড়া প্রসঙ্গে এনসিপি নেতা লেখেন, ‘কক্সবাজার পৌঁছানোর পর হঠাৎ গুজব ছড়িয়ে পড়ে যে আমরা নাকি সাবেক মার্কিন রাষ্ট্রদূত (ঢাকায় নিযুক্ত) পিটার হাসের সঙ্গে দেখা করতে এসেছি! আমি তাৎক্ষণিকভাবে গণমাধ্যমকে জানাই যে, এটি সম্পূর্ণ মিথ্যা এবং উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অপপ্রচার। হোটেল কর্তৃপক্ষ নিশ্চিত করে জানায়, সেখানে পিটার হাস নামে কেউ নেই। পরে বিভিন্ন সূত্র থেকে জানা যায়, তিনি তখন ওয়াশিংটনে অবস্থান করছিলেন। এই গুজব একটি পরিকল্পিত ষড়যন্ত্র এবং আমাদের ভাবমূর্তি নষ্ট করার অপচেষ্টা। অতীতেও আমি এই হোটেলে থেকেছি এবং কখনো কোনো বিতর্ক সৃষ্টি হয়নি। অতীতেও আমি বেশ কয়েকবার ঘুরতে গিয়েছি, কিন্তু ঘুরতে এলে দলের বিধিমালা লঙ্ঘন হয়, এমন কোন বার্তা আমাকে কখনো দল থেকে দেওয়া হয়নি।’
পরিস্থিতির আলোকে দলের শোকজ নোটিশটি বাস্তবভিত্তিক নয় বলেও মন্তব্য করেছেন এনসিপির মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী। তিনি লিখেছেন, ‘আমার সফর ছিল স্বচ্ছ, সাংগঠনিক নীতিমালাবিরোধী নয় এবং একান্ত ব্যক্তিগত চিন্তা-ভাবনার সুযোগ মাত্র। তবুও দলীয় শৃঙ্খলার প্রতি শ্রদ্ধা রেখে এবং রাজনৈতিক শালীনতা বজায় রেখে আমি এই লিখিত জবাব দিচ্ছি। অসভ্য জগতে সভ্যতার এক নিদের্শন হিসেবে। আমার বক্তব্য স্পষ্ট: “ঘুরতে যাওয়া অপরাধ নয়।” কারণ ইতিহাস কেবল বৈঠকে নয়, অনেক সময় নির্জন চিন্তার ঘরে বা সাগরের পাড়েও জন্ম নেয়।’
উল্লেখ্য, জুলাই অভ্যুত্থানের প্রথম বর্ষপূর্তির বিশেষ দিনে (৫ আগস্ট) মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী ছাড়াও দলের জ্যেষ্ঠ যুগ্ম সদস্যসচিব তাসনিম জারা, উত্তরাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক সারজিস আলম ও তার স্ত্রী, দক্ষিণাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক হাসনাত আবদুল্লাহ এবং যুগ্ম আহ্বায়ক খালেদ সাইফুল্লাহ (তাসনিম জারার স্বামী)।
উখিয়ার ইনানী সৈকতের পাঁচ তারকা হোটেল সি পার্ল বিচ রিসোর্ট অ্যান্ড স্পা-তে (আগের নাম রয়েল টিউলিপ) ওঠেন তারা।
তাদের হঠাৎ কক্সবাজার আগমনকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক মহলে নানা গুঞ্জন ও আলোচনা তৈরি করে। এটাকে কেন্দ্র সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও বিষয়টি নিয়ে নানা আলোচনা তৈরি হয়। এমনকি বাংলাদেশে যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক রাষ্ট্রদূত পিটার হাসের সঙ্গে বৈঠক করছেন বলেও গুঞ্জন ছড়ায়। যদিও পিটার হাস বাংলাদেশে থাকার কোনো সত্যতা পাওয়া যায়নি। তিনি ওয়াশিংটনেই আছেন বলে পরে গণমাধ্যমে খবর বের হয়েছে।