প্রবা প্রতিবেদক
প্রকাশ : ০৫ আগস্ট ২০২৫ ১২:১৮ পিএম
আপডেট : ০৫ আগস্ট ২০২৫ ১২:২৮ পিএম
বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। ফাইল ফটো
ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে শেখ হাসিনার পতনের বর্ষপূর্তিতে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান বলেছেন, হাজারো শহীদের রক্তে স্নাত রাজপথে গড়ে উঠেছে ফ্যাসিবাদবিরোধী জাতীয় ঐক্য। বাংলাদেশে আর কখনোই ফ্যাসিবাদ প্রতিষ্ঠিত হবে না, গণতন্ত্র হত্যা কিংবা তাবেদার রাষ্ট্রে পরিণত করার কোনো সুযোগ কাউকে দেওয়া হবে না। এসব প্রশ্নে জাতীয় ঐক্য অটুট ছিল, আছে এবং ভবিষ্যতেও থাকবে।
মঙ্গলবার (৫ আগস্ট) সকালে গণঅভ্যুত্থান দিবস উপলক্ষে দেওয়া এক ভিডিও বার্তায় তিনি এসব কথা বলেন।
তারেক রহমান বলেন, ৫ আগস্ট, এক ঐতিহাসিক দিন। এক বছর আগে এই দিনে (২০২৪ সালে) ফ্যাসিস্ট সরকার পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়েছিল। বাংলাদেশ রাহুমুক্ত হয়েছিল। স্বাধীনতা ও গণতন্ত্রকামী জনগণের জন্য দিনটি এক অনন্য বিজয়ের। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দিনটিকে ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান দিবস’ হিসেবে ঘোষণা করেছে। এখন থেকে এটি সরকারি ছুটির দিন হিসেবে উদযাপিত হবে এবং জাতি নতুন করে স্বাধীনতা ও গণতান্ত্রিক অধিকারের অঙ্গীকারে উদ্বুদ্ধ হবে।
তিনি বলেন, একুশ শতকে পলাতক স্বৈরাচার দেশে গুম, খুন, অপহরণ, মামলা, নির্যাতনের রাজত্ব চালিয়েছিল। দীর্ঘ দেড় দশকের আন্দোলনে বিএনপিসহ গণতন্ত্রপন্থী শক্তির লাখো নেতাকর্মী নির্যাতিত হয়েছেন। অনেকেই মিথ্যা মামলায় ঘরছাড়া, কেউ হারিয়েছেন পরিবার। গোপন বন্দিশালা ‘আয়নাঘর’-এ মানুষকে বছরের পর বছর আটকে রাখা হয়েছিল। ইলিয়াস আলী ও চৌধুরী আলমের মতো নেতাদের আজও খোঁজ মেলেনি।
বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান বলেন, বিচার বিভাগ, নির্বাচন কমিশনসহ সব সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান ছিল ভেঙে পড়া। শিক্ষাব্যবস্থা ধ্বংসের পাঁয়তারা, রাজনীতির নামে শিক্ষার্থীদের হাতে অস্ত্র তুলে দেওয়ার চিত্র ছিল বাস্তব। ব্যাংক খাত লুটপাট হয়ে পড়েছিল, দেশ থেকে পাচার হয় প্রায় ২৮ লাখ কোটি টাকা।
তারেক রহমান বলেন, দেশের সব শ্রেণিপেশার মানুষ- ছাত্র-জনতা, কৃষক-শ্রমিক, রিকশাওয়ালা, গার্মেন্টস কর্মী, সাংবাদিক, সংস্কৃতিকর্মী, নারী ও শিশুরাও ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে একাট্টা হয়েছিল। হেলিকপ্টার থেকে গুলি চালিয়ে মানুষ হত্যা করা হয়, শহীদ হন আবু সাঈদ, ওয়াসিম, মুগ্ধসহ দেড় হাজারেরও বেশি মানুষ। আহত হন ৩০ হাজারের বেশি মানুষ, অনেকে পঙ্গু বা দৃষ্টিশক্তি হারিয়ে আজীবনের জন্য অন্ধ হয়েছেন।
তিনি আরও বলেন, ১৯৭১ ছিল স্বাধীনতা অর্জনের যুদ্ধ, আর ২০২৪ ছিল স্বাধীনতা রক্ষার যুদ্ধ। যেমন ৭১-এর শহীদদের বাংলাদেশ ভুলেনি, তেমনি ২৪-এর গণঅভ্যুত্থানের শহীদদেরও জাতি ভুলবে না।
তিনি বলেন, শহীদদের রক্তের ঋণ শোধ করতে হবে ইনসাফভিত্তিক গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ গড়ে। জনগণের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করতে হবে। জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে নির্বাচিত, জবাবদিহিমূলক সরকার প্রতিষ্ঠা এখন সময়ের দাবি।
তারেক রহমান হুঁশিয়ার করে বলেন, ‘পলাতক ফ্যাসিস্টের শাসনকে কেউ যেন গৌরবের অংশ না মনে করে। হিটলারের নাৎসিবাদ যেমন গর্বের নয়, তেমনি ২০০৯-২০২৪ সময়কালের ফ্যাসিবাদী শাসনও লজ্জার অধ্যায়।’ তিনি সবাইকে সতর্ক করে বলেন, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সাময়িক দুর্বলতা তুলে ধরে কেউ যেন ফ্যাসিবাদ পুনর্বাসনের সুযোগ না করে।
তিনি বলেন, ৫ আগস্ট শুধু বাংলাদেশের নয়, বিশ্ব ইতিহাসেও ব্যতিক্রম- গণভবন, সংসদ, আদালত, বায়তুল মোকাররম, মন্ত্রিসভা, সব জায়গা ছেড়ে ফ্যাসিস্টরা পালিয়ে গিয়েছিল। কিন্তু তবু তাদের মধ্যে অনুশোচনার চিহ্ন নেই।
তারেক রহমান আরও বলেন, ‘গণতান্ত্রিক বাংলাদেশে দলীয় মতভেদ থাকবে, এটিই গণতন্ত্রের সৌন্দর্য। তবে এসব ভিন্নমত যেন চরমপন্থা ও উগ্রবাদের জন্ম না দেয়, সে বিষয়ে রাজনৈতিক দল ও জনগণকে সতর্ক থাকতে হবে।’
তিনি বলেন, রাজনৈতিক দলগুলোর উচিত জনগণের আদালতে গিয়ে নিজেদের এজেন্ডা পেশ করা। কে গ্রহণ করবে, কে বর্জন করবে—তা সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার একমাত্র জনগণের।
তারেক আরও বলেন, ‘স্থানীয় সরকার থেকে সংসদ পর্যন্ত সব স্তরে জনগণ সরাসরি ভোট দিয়ে প্রতিনিধি নির্বাচন করতে না পারলে জনগণের ক্ষমতা প্রতিষ্ঠিত হবে না। তাই আমাদের এখনই সময়- রাষ্ট্র ও সরকারের সব পর্যায়ে জনগণের শক্তি প্রতিষ্ঠার।’
বার্তার শেষে তিনি বলেন, ‘২০২৪ সালের ৫ আগস্টের বিজয়ে আমি বলেছিলাম- বিজয়ীর কাছে পরাজিতরা নিরাপদ থাকলে বিজয় মহিমান্বিত হয়। কেউ আইন নিজের হাতে তুলে নেবেন না, নারীর প্রতি সহিংসতা নয়, অন্যের স্বাধীনতার প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকুন।’
তারেক রহমান বলেন, ‘আমরা এমন একটি বাংলাদেশ গড়তে চাই, যেখানে দল, মত, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে সব মানুষ নিরাপদে ও সম্মানের সঙ্গে বাঁচবে। আজ এবং প্রতিটি ৫ আগস্ট হয়ে উঠুক গণতন্ত্র, সুশাসন এবং মানবিকতা প্রতিষ্ঠার দিন। এই যাত্রায় আমরা বিএনপি ও গণতন্ত্রকামী জনগণের সহযোগিতা ও সমর্থন প্রত্যাশা করি।’