বিএনপির টার্গেট
বিশেষ প্রতিবেদক
প্রকাশ : ১৪ জুলাই ২০২৫ ১১:১৪ এএম
আগামী জাতীয় নির্বাচনে জনগণের ম্যান্ডেট নিয়ে সরকার গঠনের সুযোগ পেলে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) দেশকে একটি ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে পরিণত করার উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। এর মাধ্যমে বিশ্বের শীর্ষ অর্থনীতির দেশগুলোর কাতারে বাংলাদেশকে অন্তর্ভুক্ত করাই দলটির প্রধান উদ্দেশ্য। এই বিশাল অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পাশাপাশি, বিএনপি তাদের ক্ষমতা গ্রহণের ১৮ মাস অর্থাৎ দেড় বছরের মধ্যেই এক কোটি নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির প্রতিশ্রুতিও দিয়েছে। এই দুই প্রধান লক্ষ্য অর্জনে এবং আরও কিছু উল্লেখযোগ্য সাফল্য নিশ্চিত করতে দলটি এখন থেকেই জোর প্রস্তুতি শুরু করেছে।
দলীয় সূত্রে জানা গেছে, এই উচ্চাকাঙ্ক্ষী কর্মপরিকল্পনা নির্ধারণে এবং প্রয়োজনীয় পরামর্শ গ্রহণের জন্য বিএনপি আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন আর্থিক পরিষেবা কোম্পানি Osiris-কে নিয়োগ দিয়েছে। লন্ডনে অবস্থানরত দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নির্দেশনায় দলের জাতীয় স্থায়ী কমিটির একজন সদস্য এই সমগ্র পরিকল্পনা ও যোগাযোগের দায়িত্ব পালন করছেন।
ট্রিলিয়ন ডলার অর্থনীতি : একটি স্বপ্নীল লক্ষ্য
বিশ্বের ট্রিলিয়ন ডলার ইকোনমির দেশগুলোর মধ্যে শীর্ষস্থানে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র, চীন, জাপান ও জার্মানি। এ ছাড়া ভারত, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, ইতালি, কানাডা ও ব্রাজিলও ট্রিলিয়ন ডলারের বেশি অর্থনীতির দেশ। বিএনপি বাংলাদেশকে এই ট্রিলিয়ন ডলার ইকোনমির ক্লাবভুক্ত করতে চায় সরকার গঠনের পাঁচ বছরের মধ্যে।
বর্তমানে বাংলাদেশের অর্থনীতি প্রায় ৪৫০ বিলিয়ন ডলারের কাছাকাছি (বিভিন্ন সংস্থার অনুমান অনুযায়ী কিছুটা তারতম্য হতে পারে)। সেখান থেকে ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে পৌঁছানো একটি বিশাল চ্যালেঞ্জ এবং এর জন্য ধারাবাহিক উচ্চ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি প্রয়োজন। বিএনপি এই লক্ষ্য অর্জনে কোনো নির্দিষ্ট সময়সীমা উল্লেখ না করলেও, তাদের এই উচ্চাকাঙ্ক্ষা দেশের অর্থনৈতিক সম্ভাবনাকে নতুন করে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে এসেছে। এটি অর্জনের জন্য রপ্তানি বৃদ্ধি, বৈদেশিক বিনিয়োগ আকর্ষণ, অবকাঠামো উন্নয়ন, মানবসম্পদ উন্নয়ন এবং ডিজিটাল অর্থনীতির প্রসারে ব্যাপক গুরুত্ব দিতে হবে বলে বিশ্লেষকরা মনে করেন।
বাংলাদেশের বর্তমান অর্থনৈতিক অবস্থা ও চ্যালেঞ্জসমূহ
গত দেড় দশকে বাংলাদেশ অর্থনৈতিকভাবে কিছু ইতিবাচক পরিবর্তন দেখলেও, এখনও অনেক মৌলিক চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে। উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপ, ক্রমবর্ধমান ঋণ এবং সীমিত কর্মসংস্থানের সুযোগ অর্থনীতির জন্য উদ্বেগের কারণ। এ ছাড়া বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দা এবং ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা বাংলাদেশের অর্থনীতিকেও প্রভাবিত করছে। এই প্রেক্ষাপটে, ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি এবং এক কোটি নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্য অর্জনে বিএনপিকে সুনির্দিষ্ট, বাস্তবসম্মত এবং উদ্ভাবনী অর্থনৈতিক নীতি প্রণয়ন করতে হবে।
বিএনপির অতীত অর্থনৈতিক সাফল্য : একটি পর্যালোচনা
বিএনপি অতীতে যখন রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় ছিল, তখন তাদের কিছু অর্থনৈতিক সাফল্য ছিল। নব্বইয়ের দশকে মুক্তবাজার অর্থনীতি এবং বেসরকারি খাতের প্রসারে দলটির ভূমিকা ছিল উল্লেখযোগ্য। টেলিযোগাযোগ খাতে বেসরকারি বিনিয়োগ উন্মুক্তকরণ, গার্মেন্টস শিল্পের বিকাশ এবং ক্ষুদ্রঋণ কর্মসূচির প্রসারে তাদের অবদান স্মরণীয়। তবে বর্তমান বৈশ্বিক এবং অভ্যন্তরীণ প্রেক্ষাপট আগের চেয়ে অনেকটাই ভিন্ন। তাই অতীতের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে বর্তমান ও ভবিষ্যতের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় নতুন কৌশল অবলম্বন করতে হবে।
Osiris-এর ভূমিকা : কর্মপরিকল্পনা প্রণয়নে সহায়তা
Osiris-এর মতো একটি আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন ফার্মকে নিয়োগ করা বিএনপির একটি কৌশলগত পদক্ষেপ। এই ধরনের ফার্মগুলো অর্থনৈতিক পূর্বাভাস, বাজার বিশ্লেষণ, নীতি প্রণয়ন এবং বাস্তবায়নে বিশেষজ্ঞ পরামর্শ দিয়ে থাকে। Osiris-এর মাধ্যমে বিএনপি তাদের ট্রিলিয়ন ডলার অর্থনীতির লক্ষ্য অর্জনে প্রয়োজনীয় রোডম্যাপ, খাতভিত্তিক উন্নয়ন কৌশল, বিনিয়োগের ক্ষেত্র চিহ্নিতকরণ এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা তৈরি করবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এই পেশাদারী সহায়তা দলের অর্থনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গিকে আরও সুসংহত এবং বাস্তবসম্মত করতে সাহায্য করবে।
রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সমন্বয়
বিএনপির এই অর্থনৈতিক লক্ষ্য অর্জনের জন্য শুধু কর্মপরিকল্পনা তৈরি করলেই হবে না। এর জন্য একটি স্থিতিশীল রাজনৈতিক পরিবেশও অত্যন্ত জরুরি। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে হলে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, সুশাসন ও স্বচ্ছতা অপরিহার্য। এই চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলা করে বিএনপি কীভাবে তাদের অর্থনৈতিক লক্ষ্য অর্জন করে এবং জনগণের প্রত্যাশা পূরণ করেÑ সেটাই এখন দেখার বিষয়।