প্রবা প্রতিবেদন
প্রকাশ : ০৭ ডিসেম্বর ২০২২ ১৬:৫১ পিএম
আপডেট : ০৭ ডিসেম্বর ২০২২ ১৭:০৮ পিএম
মরমি কবি হাছন রাজা। ছবি: সংগৃহীত
অসংখ্য লোকগানের স্রষ্টা মরমি কবি হাছন রাজার শততম মৃত্যুবার্ষিকীতে তার জীবনদর্শন ও সঙ্গীত চর্চার জন্য একটি একাডেমি প্রতিষ্ঠার দাবি তুলেছেন পরিবারের সদস্যরা।
ইতোমধ্যে পরিবারের পক্ষ থেকে সুনামগঞ্জে একাডেমিটি প্রতিষ্ঠার উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে। এখন সরকারি সহযোগিতা পেলে তা বাস্তবায়ন করা যাবে বলে মনে করছে পরিবার।
বুধবার (৭ ডিসেম্বর) হাছন রাজার শততম মৃত্যুবার্ষিকী। ১৮৫৪ সালে ২১ ডিসেম্বর সিলেট জেলার সুনামগঞ্জ শহরের নিকটে সুরমা নদীর তীরে লক্ষণশ্রী পরগনায় তেঘরিয়া গ্রামে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। ১৯২২ সালে ৭ ডিসেম্বর তিনি মারা যান।
কবির পরিবারের সদস্যরা জানিয়েছেন, হাছন রাজার মৃত্যুর শতবার্ষিকীতে বাংলাদেশ সরকার তার গানগুলোর স্বরলিপি প্রণয়ন করে তা যথাযথভাবে সংরক্ষণের উদ্যোগ নিয়েছে। তবে এই উদ্যোগই যথেষ্ট নয়। তাই তার জীবনদর্শন ও সঙ্গীতের যথাযথ চর্চার জন্য একাডেমি হওয়া প্রয়োজন।
হাছন রাজার প্রপৌত্র সামারীন দেওয়ান প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘আমরা ইউনেস্কোর অর্থায়নে হাছন রাজার ৭০০ গান সংরক্ষণের উদ্যোগ নিয়েছি। ইতোমধ্যে সিলেটের লোকশিল্পীদের দিয়ে ১০০টি গান রেকর্ড করা হয়েছে। পরে সেগুলো হাছন রাজার নামে যে ওয়েবসাইট করা হয়েছে তাতে অন্তর্ভুক্তির কাজও চলছে। তবে আমরা মনে করি, এতে করে সব শেষ হয়ে গেল না। হাছন রাজার গান ও জীবনদর্শন নিয়ে আরও বিস্তর গবেষণার জন্য সুনামগঞ্জে একটি একাডেমি প্রতিষ্ঠার দাবি আমরা জানিয়েছি। এই একাডেমি প্রতিষ্ঠায় হাছন রাজার পরিবারের পক্ষ থেকে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, আমরা তাতে সরকারি সহযোগিতা প্রার্থনা করি।’
তিনি জানান, সুনামগঞ্জের তেঘরিয়ায় একাডেমি প্রতিষ্ঠায় সমীক্ষার কাজ শেষ হয়েছে। সমীক্ষা শেষে একাডেমির কার্যক্রম ও কারিকুলামও তারা চূড়ান্ত করবেন।
হাছন রাজার পিতার নাম দেওয়ান আলী রাজা চৌধুরী। হাছন ছিলেন তার তৃতীয় পুত্র।
তিনি আরবি খুব ভালো জানতেন, তার বহু দলিলে আরবি স্বাক্ষর পাওয়া যায়।
হাছনের দাদার মৃত্যুর পর তার বাবা মাতৃ এবং পিতৃবংশীয় সব সম্পদের মালিক হন।
১৮৬৯ সালে তার পিতা আলী রাজার মৃত্যুর চল্লিশ দিন পর তার বড় ভাই ওবায়দুর রেজা মারা যান। মাত্র ১৫ বছর বয়সে হাছন জমিদারিতে অভিষিক্ত হয়েছিলেন।
অপরিপক্ব বয়সে এত সম্পদের মালিক হয়ে হাছন রাজা বেপরোয়া হয়ে উঠেছিলেন। যৌবনে তিনি ছিলেন ভোগবিলাসী এক শৌখিন জমিদার। বর্ষায় বজরা নৌকা সাজিয়ে গান-বাজনা করে ঘুরে বেড়াতেন। এ সময় একের পর এক গান লিখতে থাকেন তিনি। বিলাসী জীবনের মাঝে আধ্যাত্মিক বোধের জন্ম নেয় তার মনে। ছেড়ে দেন জমিদারি। বিলাসী পোশাক ছেড়ে নেন সাধারণ পোশাক। অত্যাচারী জমিদার থেকে হয়ে ওঠেন এক বাউল সাধক।
১৮৯৭ সালের ১২ জুন আসাম এবং সিলেট এলাকায় ৮.৮ রিখটার স্কেলের এক ভয়াবহ ভূমিকম্পে মানুষসহ অনেক পশু-পাখি প্রাণ হারায়। পরে এলাকা পরিদর্শনে গিয়ে হাছন রাজা দেখেন তার অনেক নিকটাত্মীয়ের মৃত্যু হয়েছে। খাদ্যের অভাবে অনেক পশু-পাখির মৃত্যু হয়েছে। এরপর তার মনে জীবন সম্পর্কে কঠিন বৈরাগ্যের সূচনা হয়। প্রথম জীবনের কালো অধ্যায়ের ইতি ঘটে।
অনেকে বলে থাকেন একদিন হাছন রাজা আধ্যাত্মিক এক স্বপ্ন দেখলেন এবং এরপরই তিনি নিজেকে পরিবর্তন করা শুরু করলেন। বৈরাগ্যের বেশ ধারণ করলেন।
ভক্তরা বলেন, যেভাবেই পরিবর্তন ঘটুক এরপর থেকে হাছন রাজা নিয়মিত প্রজাদের খোঁজখবর রাখা থেকে শুরু করে এলাকায় বিদ্যালয়, মসজিদ এবং আখড়া স্থাপন করেন। সেই সঙ্গে চলতে থাকে গান রচনা। তার অন্তর্জগতেও বিরাট পরিবর্তন আসে। অত্যাচারী জমিদার থেকে বনে যান বাউল সাধক। সাধারণ মানুষের খোঁজখবর নেওয়া হয়ে ওঠে তার প্রতিদিনের কাজ। সেই সঙ্গে রচনা করেছেন গান।
একে একে রচনা করেন, ‘লোকে বলে, বলে রে’, ‘নিশা লাগিলো রে’, ‘কানাই তুমি খেল খেলাও কেনে’, ‘রঙের বারোই’, ‘আগুন লাগাইয়া দিলো’, ‘বাউলা কে বানাইলো রে’সহ অসংখ্য গান।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ১৯২৫ সালে ডিসেম্বর ইন্ডিয়ান ফিলোসফিক্যাল কংগ্রেসের প্রথম অধিবেশনে সভাপতি নির্বাচিত হন। সভাপতির অভিভাষণে তিনি প্রসঙ্গক্রমে হাছন রাজার দুটি গানের অংশবিশেষ উদ্ধৃত করে তার দর্শন চিন্তার পরিচয় দেন।
১৯৩০ সালে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘হিবার্ট লেকচারে’ রবীন্দ্রনাথ ‘দ্য রিলিজিওন অব ম্যান’ নামে যে বক্তৃতা দেন তাতেও তিনি হাছন রাজার দর্শন ও সঙ্গীতের উল্লেখ করেন।
হাছন রাজা ১৯২২ সালে মারা যান। সুনামগঞ্জের তেঘরিয়ার তাকে সমাহিত করা হয়। তার ২০৬টি গান নিয়ে ১৯০৭ সালে ‘হাছনউদাস’ নামে একটি সংকলন প্রকাশিত হয়। এর বাইরে আর কিছু গান ‘হাছন রাজার তিন পুরুষ’এবং ‘আল ইসলাহ্’সহ বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে।