বাছির জামাল
প্রকাশ : ২৭ আগস্ট ২০২৪ ০৮:৪০ এএম
আপডেট : ২৭ আগস্ট ২০২৪ ১০:৫৮ এএম
অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের দায়িত্ব নেওয়ার পর গত রবিবার প্রধান উপদেষ্টা নোবেলজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূস জাতির উদ্দেশে যে ভাষণ দিয়েছেন, তা নিয়ে প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর নেতাদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। ভাষণে গণতন্ত্রের উত্তরণ বা জাতীয় নির্বাচনের রোডম্যাপ না থাকায় হতাশ প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে বিএনপি। গণতন্ত্র মঞ্চের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, প্রধান উপদেষ্টার ভাষণে অনেক কিছুই পরিষ্কার নয়। তবে বিএনপির দীর্ঘদিনের জোট শরিক জামায়াতে ইসলামী বলেছে, প্রধান উপদেষ্টা একটা দায়িত্বশীল ভাষণ দিয়েছেন। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ঠিক পথেই এগোচ্ছে।
প্রসঙ্গত, গত রবিবারের বক্তব্যে প্রধান উপদেষ্টা কতদিন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ক্ষমতায় থাকবে বা নির্বাচন কবে দেওয়া হবেÑতা সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ করেননি। ভাষণে ড. ইউনূস বলেছেন, ‘একটা বিষয়ে সবাই জানতে আগ্রহী, কখন আমাদের সরকার বিদায় নেবে। এটার জবাব আপনাদের হাতে, কখন আপনারা আমাদের বিদায় দেবেন।’ নির্বাচনের সময়সীমা নিয়েও তিনি সুস্পষ্ট কিছু বলেননি। তিনি বলেছেন, ‘কখন নির্বাচন হবে সেটা সম্পূর্ণ রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত, আমাদের সিদ্ধান্ত নয়। দেশবাসীকে ঠিক করতে হবে আপনারা কখন আমাদের ছেড়ে দেবেন।’
এ বক্তব্যের প্রতিক্রিয়ায় রাজনৈতিক দলগুলোর নেতারা দেরি না করে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারকে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে সংলাপ করে প্রয়োজনীয় সংস্কার করার এবং তারপর নির্বাচনের রোডম্যাপ তৈরির পরামর্শ দিয়েছেন।
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন মোর্চার গড়ে তোলা আন্দোলনের পথ বেয়ে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে গত ৫ আগস্ট প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আওয়ামী লীগ সরকারের ১৫ বছরের শাসনামলের অবসান ঘটে। রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন সংসদ ভেঙে দিয়ে ৮ আগস্ট ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠন করেন। শপথ নেওয়ার দুই সপ্তাহের বেশি সময় পর জাতির উদ্দেশে ভাষণ দেন তিনি।
সংস্কার স্বল্প সময়ে সম্ভব নয় : মির্জা ফখরুল
প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূসের এ ভাষণে নির্বাচন নিয়ে রোডম্যাপ না দেখে হতাশ হয়েছেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। ভাষণে যেসব সংস্কারের কথা বলা হয়েছে, সেগুলো স্বল্প সময়ে করা সম্ভব হবে না বলে মন্তব্য করে তিনি নির্বাচন নিয়ে রাজনৈতিক সংলাপের দাবি জানিয়েছেন।
সাবেক প্রধানমন্ত্রী কাজী জাফর আহমদের নবম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে গতকাল সোমবার জাতীয় প্রেস ক্লাবে এক আলোচনায় তিনি এই দাবি জানান। বিএনপির এই নেতা এ নিয়ে টানা তৃতীয় দিন ইউনূস সরকারের সংস্কার নিয়ে প্রশ্ন তুললেন, নির্বাচন নিয়ে আলোচনার দাবি করলেন।
জাতির উদ্দেশে ভাষণে ড. ইউনূস তার সরকারের যে কর্মপরিকল্পনা ঘোষণা করেছেন, সে বিষয়ে ফখরুল বলেন, ‘এখনও আমি ধোঁয়াশায়, যে অবস্থাটা সেটা আমার পরিষ্কার হয়নি। আমরা আশা করেছিলাম যে, প্রধান উপদেষ্টা (জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে) একটি রোডম্যাপ উপস্থাপন করবেন। কিন্তু তার বক্তব্যে আমরা গণতন্ত্রের দিকে যাওয়ার সেই রোডম্যাপ খুঁজে পাইনি।’
তিনি বলেন, ‘রিফর্মসের কথা বলেছেন, সেই রিফর্মগুলো কোন কোন বিষয়… সেটারও কিছু কিছু তিনি আভাস দিয়েছেন… আমি জানি, সেগুলো এই অল্প সময়ের মধ্যে সম্ভব না।’
নির্বাচন ‘রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত’Ñ ড. ইউনূসের এ বক্তব্য প্রসঙ্গে বিএনপি মহাসচিব বলেন, ‘উনি সঠিক বলেছেন। অবশ্যই রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত হবে। এই রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য তো রাজনৈতিক নেতা, রাজনৈতিক দল, রাজনৈতিক ব্যক্তিদের সঙ্গে আলোচনা করতে হবে। আমি আশা করব, আমাদের প্রধান উপদেষ্টা সেই প্রক্রিয়াটির দিকে যাবেন, খুব দ্রুত যাবেন এবং তিনি রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে কথা বলবেন।’
তিনি নির্বাচনের সময়সীমা উল্লেখ না করলেও জানান যে, ‘এই সরকার অবশ্যই কাজ করার জন্য এসেছে। সেই কাজ করার সুযোগ তাদের দিতে হবে। এই কথা আমরা বারবার বলছি, যৌক্তিক সময় অবশ্যই তাদের দিতে চাই।’
তবে তিনি বলেন, ‘নির্বাচন যাতে সুষ্ঠু-অবাধ হয়, সবাই যেন ভোট দিতে পারে এবং এই নির্বাচনের ফলে এমন একটা অবস্থা তৈরি যেন না হয় যে, আবার সেই আগের অবস্থা ফিরে আসে। তা হলে সেটা কখনই জনগণ মেনে নেবে না। সেজন্য ধৈর্য ধরে আমরা অপেক্ষা করছি, জনগণ অপেক্ষা করছে। কিন্তু সেটা অবশ্যই একটা যৌক্তিক সময় পর্যন্ত হতে হবে। আমি বিশ্বাস করি, সেই যৌক্তিক সময়ের মধ্যে অবশ্যই একটা নির্বাচন হবে, জনগণের সরকার প্রতিষ্ঠা হবে।’
দেশবাসীর আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটেছে : জামায়াত
জামায়াতে ইসলামী প্রধান উপদেষ্টার ভাষণকে স্বাগত জানিয়েছে। ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে শিক্ষার্থী ও আনসারদের সংঘর্ষে আহত সমন্বয়ক হাসনাত আব্দুল্লাহসহ অন্যদের সঙ্গে সাক্ষাতের পর এ ভাষণের বিষয়ে দলটির আমির ডা. শফিকুর রহমান বলেন, ‘আমরা মনে করি, উনি (ইউনূস) একটা দায়িত্বশীল ভাষণ দিয়েছেন। এসময় এটা দরকার ছিল। জাতিকে সামনের দিকে এগিয়ে নিতে আশাজাগানিয়া কথা শোনানোর দরকার ছিল। তার বক্তব্যে এর প্রতিধ্বনি রয়েছে বলে আমরা মনে করি। তবে এটা ঠিক, এই প্রতিধ্বনির মধ্যে আমার আকাঙ্ক্ষা পূরণ নাও হতে পারে। আরেকজনের আকাঙ্ক্ষা পূরণ নাও হতে পারে। দেখতে হবে সামগ্রিকভাবে সারা দেশবাসীর আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন হয়েছে কিনা। আমরা মনে করি, সেটা হয়েছে।’ তিনি বলেন, ‘আমরা মনে করি তারা এখনও রাইট ডিরেকশনে (সঠিক পথে) আছেন। তারা সেভাবে এগিয়ে গেলে আল্লাহও সাহায্য করবেন, দেশের জনগণও সাহায্য করবেন।’
যা শুনতে চেয়েছি তা এখানে আছে : সেলিম
সিপিবির সাবেক সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিমও মনে করেন প্রধান উপদেষ্টার ভাষণ ঠিকই আছে। তিনি প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘আমি যা শুনতে চেয়েছি তা এখানে (প্রধান উপদেষ্টার ভাষণ) পেয়েছি। আশা করি, শুধু কথার ভেতরে নয়, এ সরকার কাজের মধ্য দিয়ে তা প্রমাণ দেবে।’
তিনি বলেন, ‘এ সরকার একটা অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। এটার আসল উদ্দেশ্য প্রয়োজনীয় গণতান্ত্রিক সংস্কার করে নির্বাচনের উপযুক্ত পরিবেশ তৈরির সঙ্গে সঙ্গে একটা নির্বাচিত সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করে দেওয়া। সুতরাং আমাদের এ বিষয়ে তাড়াহুড়া করা উচিত নয়। তার যেটুকু ম্যান্ডেট, তার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকা উচিত এবং সেই ম্যান্ডেটের অধীনের কাজগুলো খুব দক্ষতার সঙ্গে করা উচিত। ভবিষ্যতে যাতে স্থায়ীভাবে গণতান্ত্রিক রূপান্তর নিশ্চিত হয়, সেজন্য অবিলম্বে রাজনৈতিক নেতৃত্বের সঙ্গে আলোচনা শুরু করা প্রয়োজন বলে মনে করি। গোটা ব্যাপারটা একটা রাজনৈতিক প্রক্রিয়া। একথা ভুলে যাওয়া মারাত্মক আত্মঘাতী হবে।’
জাতীয় ঐকমত্যের ভিত্তিতে রোডম্যাপ করতে হবে : আ স ম রব
জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জেএসডি) সভাপতি আ স ম আবদুর রব বলেন, ‘অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা জাতির উদ্দেশে যে ভাষণ দিয়েছেন, তা ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের অভিপ্রায় পূরণে সহায়ক। তিনি বৈষম্যহীন ছাত্রসমাজের আকাঙ্ক্ষা পূরণে অঙ্গীকারবদ্ধ বলে যে প্রতিশ্রুতি জাতির সামনে জ্ঞাপন করেছেন তা সংগ্রামী ছাত্র-জনতাকে নতুন বাংলাদেশ বিনির্মাণে আশাবাদী করেছে।’
তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশে কোনোক্রমেই যেন আর ফ্যাসিবাদের উত্থান না হয়, তার জন্য ঔপনিবেশিক শাসনব্যবস্থার বিকল্প স্বাধীন দেশের উপযোগী শাসনব্যবস্থা প্রবর্তন, রাষ্ট্রের ক্ষমতা কাঠামোগত ও সাংবিধানিক সংস্কার, স্বাধীন বিচার বিভাগ ও মানবিক পুলিশ বাহিনী গঠন এবং স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব সুরক্ষায় প্রাপ্তবয়স্ক সকল নাগরিকের বাধ্যতামূলক সামরিক প্রশিক্ষণ অন্তর্ভুক্তিসহ জাতীয় প্রতিরক্ষা নীতি প্রণয়ন করে আধুনিক দক্ষ সেনাবাহিনী গড়ে তোলার ঐতিহাসিক গুরুত্বপূর্ণ কাজ এই সরকারকেই সম্পন্ন করতে হবে।’
তিনি বলেন, ‘এই সরকার স্বতঃস্ফূর্ত গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে সকল শ্রেণি-মানুষের সমর্থিত সরকার। এই সরকার ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনের মধ্য দিয়ে গড়ে ওঠা জাতীয় ঐকমত্যের ফসল। এই সরকারকে প্রশাসন ও পুলিশের অভ্যন্তরে ফ্যাসিবাদের সহযোগী দোসর আমলাদের দ্রুত পরিবর্তন করতে হবে। সংস্কারের প্রয়োজনীয় কাজ শুরু করতে হবে। বন্যা নিয়ন্ত্রণের পর রাজনৈতিক দল, গণঅভ্যুত্থানকারী শক্তি তথা বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনসহ সকল সমাজ শক্তি ও অংশীজনের সঙ্গে ধারাবাহিক ‘সংলাপ’ করে জাতীয় ঐকমত্যের ভিত্তিতে রোডম্যাপ প্রণয়ন করে নতুন বাংলাদেশ বিনির্মাণের অভিযাত্রা শুরু করতে হবে।’
কীভাবে যাবেন সেটা তাকেই পরিষ্কার করতে হবে : মান্না
গণতন্ত্র মঞ্চের সমন্বয়কারী ও নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান বলেন, ‘প্রধান উপদেষ্টার ভাষণে অনেক কিছুই পরিষ্কার হয়নি। এর মধ্যে তিনি গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় দেশকে নিয়ে যেতে কী কী সংস্কার করবেন, কীভাবে করবেনÑ তা বলেননি। সংস্কারের অন্যতম বিষয় সংবিধান; যেখানে অনেক কিছুর পরিবর্তন, পরিবর্ধন করা দরকার। সেটার কাজ এখনও শুরুই হয়নি। এই পরিবর্তনটা এমন হতে হবেÑ যাতে আর কোনো স্বৈরাচার তৈরি না হয়। নির্বাচন কমিশন সংস্কারের কাজ স্পর্শই করতে পারেননি তিনি।’
মান্না বলেন, ‘উপদেষ্টা বলেছেনÑ যখন বলবেন তখন চলে যাব। এই কথাটার ভিত্তি কী? তিনি কীভাবে যাবেন সেটা তাকেই পরিষ্কার করতে হবে। রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের কথা বলেছেন। তাহলে তাকে তো রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে বসতে হবে। তিনি যেভাবে বলেছেন, তাতে কোনো রোডম্যাপ নেই।’
ক্ষমতার নির্দিষ্ট সীমা না থাকা উদ্বেগের : সাইফুল হক
বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক বলেন, ‘প্রধান উপদেষ্টা তার ভাষণে জনপ্রত্যাশা অনুযায়ী অনেক কথা বলেছেন। তিনি সংস্কারের অঙ্গীকারের কথা বলেছেন। তবে নির্বাচনের বিষয়ে তিনি কৌশলী বক্তব্য রেখেছেন। নির্দিষ্ট কোনো সময়সীমা দেননি। তবে যে ক্ষমতার নির্দিষ্ট সময় থাকে না, চৌহদ্দি থাকে না, সেই ক্ষমতা সবার জন্য উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠার। এই সরকারকে সবাই সমর্থন জানিয়েছেÑ এটা যেমন সত্য; তেমনি এটাও বাস্তবতা যে, কোনো সমর্থনই শর্তহীন হয় না। তাদের উচিত বিগত ১৬ বছরের ময়লা-আবর্জনাকে পরিষ্কার করে বাসযোগ্য রাষ্ট্রব্যবস্থার মধ্য দিয়ে দ্রুত গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় ফিরে যাওয়া। সমস্ত সংস্কারের দায়িত্ব তাদের নয়। এটা জনগণের প্রতিনিধিত্বশীল সরকার করবে। আশা করছি, দ্রুত বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে বসে একটি নির্দিষ্ট রোডম্যাপ তারা ঘোষণা করবে।’