প্রবা প্রতিবেদক
প্রকাশ : ০৮ আগস্ট ২০২৪ ১০:৪০ এএম
আপডেট : ০৮ আগস্ট ২০২৪ ১০:৫৮ এএম
রাজধানীর নয়াপল্টনে বুধবার দলীয় কার্যালয়ের সামনে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) সমাবেশে নতাকর্মীদের ঢল নামে। প্রবা ফটো
দীর্ঘ প্রায় সাত বছর পর রাজধানীর নয়াপল্টনের সড়কে জনাকীর্ণ দলীয় এক সমাবেশে বক্তব্য দিলেন বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। সমাবেশে তিনি নেতাকর্মীদের প্রতিশোধ, প্রতিহিংসা ভুলে শান্তিপূর্ণ দেশ গড়ার বার্তা দিয়ে বলেন, ‘দীর্ঘদিনের নজিরবিহীন দুর্নীতি ও গণতন্ত্রের ধ্বংসস্তূপের মধ্য থেকে আমাদের নির্মাণ করতে হবে এক সমৃদ্ধ বাংলাদেশ।’
ছাত্র-জনতার তুমুল আন্দোলনের মুখে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর গতকাল বুধবার কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনের সড়কে প্রথমবারের মতো সমাবেশ করে বিএনপি। তাতে লন্ডন থেকে ভার্চুয়ালি যুক্ত হয়ে দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান বক্তব্য দেবেন, তা দলের তরফ থেকে আগেই জানিয়ে দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর তার সভাপতির বক্তব্য শেষ করার সময় সমাবেশের সবার সামনে ঘোষণা করেন, এবার বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া বক্তব্য দেবেন।
তারেক রহমানের বক্তব্যের পর হাসপাতালে থাকা খালেদা জিয়ার ছবি মঞ্চের পেছনে স্থাপিত বিশাল স্ক্রিনে ভেসে উঠলে উল্লাসে ফেটে পড়েন নেতাকর্মীরা। মুহুর্মুহু করতালি ও স্লোগানে প্রকম্পিত হয়ে ওঠে পুরো নয়াপল্টন এলাকা।
খালেদা জিয়া তাদের উদ্দেশে বলেন, ‘ধ্বংস নয়, প্রতিশোধ নয়, প্রতিহিংসা নয়। আসুন ভালোবাসা, শান্তি ও জ্ঞানভিত্তিক সমাজ গড়ে তুলি। আসুন আমরা তরুণদের হাত শক্তিশালী করি।’
সাবেক এই প্রধানমন্ত্রী দুর্নীতি মামলায় দণ্ডিত হয়ে ২০১৮ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি কারাগারে যান। এরপর এই প্রথম নেতাকর্মীরা তার ভাষণ শুনলেন। ২০১৭ সালের ১২ নভেম্বর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে আয়োজিত বিএনপির এক সমাবেশে সর্বশেষ বক্তব্য দেন তিনি।
২০২০ সালে সরকারের নির্বাহী আদেশে সাময়িক মুক্তি মিললেও সরকারের শর্তের কারণে তাকে গুলশানের বাড়িতে একপ্রকার বন্দি জীবনযাপন করতে হয়েছে। এ সময় দলের কোনো রাজনৈতিক কর্মসূচিতে তাকে দেখা যায়নি। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর রাষ্ট্রপতি দণ্ড মওকুফের সিদ্ধান্ত জানালে গত মঙ্গলবার তিনি পুরোপুরি মুক্তি পান। তবে অসুস্থতার কারণে বেশ কিছু দিন ধরেই তিনি আছেন হাসপাতালে। সেখান থেকেই তিনি সমাবেশে ভিডিও কনফারেন্সে ভাষণ দেন।
নেতাকর্মীদের শুভেচ্ছা জানিয়ে খালেদা জিয়া বলেন, ‘আল্লাহর প্রতি শুকরিয়া আদায় করছি। আমি কারাবন্দি অবস্থায় আপনারা আমার কারামুক্তি ও রোগমুক্তির জন্য সংগ্রাম করেছেন, দোয়া করেছেন, সেজন্য আমি আপনাদের সকলকে ধন্যবাদ জানাচ্ছি। দীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রাম-ত্যাগের মধ্য দিয়ে আমরা ফ্যাসিবাদী অবৈধ সরকারের কাছ থেকে মুক্তি পেয়েছি। আমি আন্তরিক ধন্যবাদ জানাতে চাই আমাদের বীর সন্তানদের, যারা মরণপণ সংগ্রাম করে এই অসম্ভবকে সম্ভব করেছে। শত শত শহীদকে জানাই শ্রদ্ধা।’
তিনি বলেন, ‘ছাত্র-তরুণরা আমাদের ভবিষ্যৎ। তারা যে স্বপ্ন নিয়ে বুকের রক্ত ঢেলে দিয়েছে সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নে প্রত্যেককে মেধা, যোগ্যতা ও জ্ঞানভিত্তিক গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ গড়ে তুলতে হবে, শোষণহীন সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ে তুলতে হবে। সকল ধর্মের, বর্ণের, গোত্রের অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। শান্তি, প্রগতি আর সাম্যের ভিত্তিতে আধুনিক বাংলাদেশ নির্মাণে আসুন আমরা তরুণদের হাত শক্তিশালী করি।’
দুপুর ২টায় বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে এই সমাবেশ শুরু হয় কোরআন তেলাওয়াতের মধ্য দিয়ে। সমাবেশের শুরুতেই শিক্ষার্থীদের আন্দোলনসহ গণতান্ত্রিক আন্দোলনে নিহতদের আত্মার মাগফিরাত কামনা করে বিশেষ মোনাজাত করা হয়।
কাকরাইল থেকে শুরু করে ফকিরাপুল মোড় পর্যন্ত হাজার হাজার মানুষের উপস্থিতিতে সমাবেশ জনসমুদ্রের রূপ নেয়। বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের সভাপতিত্বে সমাবেশের শুরুতে বক্তব্য দেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সেলিমা রহমান। সদ্য কারামুক্ত স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, মির্জা আব্বাস, নজরুল ইসলাম খান, আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, গয়েশ্বর চন্দ্র রায়সহ বিভিন্ন কেন্দ্রীয় নেতা যোগ দেন সমাবেশে।
জ্যেষ্ঠ নেতাদের বক্তব্যের পর ভিডিও কলে বক্তৃতা দেন সমাবেশের প্রধান অতিথি, বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। আদালতের নিষেধাজ্ঞার কারণে গত কয়েক বছরে তারেক রহমানের বক্তব্য দেশের কোনো গণমাধ্যমে প্রচার করা হয়নি।
সর্বশেষ গত বছরের ২৮ জুলাই শেখ হাসিনার পদত্যাগের দাবিতে ঢাকায় বিএনপির সমাবেশে তিনি লন্ডন থেকে বক্তব্য দেন এবং সরকারের বিরুদ্ধে সর্বাত্মক আন্দোলন ঘোষণা করেন। তার এই বক্তব্য ওই সময় বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যমে প্রচার করা যায়নি।
দ্রুততম সময়ের মধ্যে নির্বাচন চান তারেক রহমান
ছাত্র-জনতার আন্দোলনের মুখে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠন নিয়ে আলোচনা চলার মধ্যেই বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান এ সমাবেশে দ্রুততম সময়ের মধ্যে নির্বাচন করার আহ্বান জানিয়ে বলেছেন, ‘বৈষম্যহীন গণতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থা গঠন করতে দ্রুততম সময়ের মধ্যে নির্বাচন করতে হবে। দ্রুততম সময়ের মধ্যে জনগণের ভোটে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করতে হবে।’
তারেক রহমান বলেন, ‘স্বাধীনতা প্রিয় মানুষ স্বাধীনতা রক্ষায় কোনো শর্ত মানে না। ছাত্র-জনতার আন্দোলনের ফলে ২০২৪ সালে দেশের জনগণ দেখেছে এক নতুন স্বাধীনতা।’
তিনি অভিযোগ করেন, ‘দেশের চলমান অর্জনকে নষ্ট করতে ষড়যন্ত্র চলছে। ধর্ম, বর্ণ, পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে সবাইকে নিরাপত্তা দিতে হবে। যে যেখানে বসবাস করছেন, সেখানে ধর্মীয় পরিচয় যাই হোক না কেন, সকলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ঢাল হিসেবে দাঁড়িয়ে দৃষ্টান্ত স্থাপন করুন। বাংলাদেশের ভূখণ্ডে দাঁড়িয়ে সকল জনগণের পরিচয় একটিইÑ সবাই বাংলাদেশি।’
তিনি বলেন, ‘পুলিশ জনগণের শত্রু নয়। বিনা ভোটে নির্বাচিত শেখ হাসিনা পুলিশকে জনগণের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে বাধ্য করেছে। তিনি পালানোর পর একটি চক্র পুলিশের মনোবল ভাঙতে চেষ্টা চালাচ্ছে। দেশে অস্থিতিশীল পরিবেশ সৃষ্টি করতে চাইছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘বিএনপির নামে কেউ যদি অপকর্ম করতে চায়, তাকেও আইনের হাতে তুলে দিন। কেউ যদি নিয়ম ভঙ্গ করে তার বিরুদ্ধেও পুলিশের কাছে অভিযোগ করুন। কেউ আইন নিজের হাতে তুলে নেবেন না। বিচারের ভার দয়া করে নিজ হাতে তুলে নেবেন না। সমালোচনা বা নৈরাজ্যের সমাধান নৈরাজ্য হতে পারে না। প্রশাসনকে সময়োপযোগী করে গড়ে তোলাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।’
তারেক রহমান বলেন, ‘নিয়োগ বা প্রমোশনে মেধার সর্বাধিকার অগ্রাধিকার থাকতে হবে। উন্নয়নে বৈদেশিক নির্ভরতা কমিয়ে আনতে হবে। দেশে কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে বেকার সমস্যার সমাধান করতে হবে। সবার জন্য সুবিচার নিশ্চিত করতে আইনের শাসন নিশ্চিত করতে হবে।’
সমাবেশের সভাপতি বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর অবিলম্বে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠন করার আহ্বান জানিয়ে বলেন, ‘এ সরকার তিন মাসের মধ্যে নির্বাচন করার ব্যবস্থা করবে।’
উল্লেখ্য, সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবিতে আন্দোলনকে ঘিরে সংঘর্ষের ঘটনায় ১৬ জুলাই রাতে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের ভেতরে অভিযান চালিয়ে ফটকে তালা লাগিয়ে দিয়েছিল ঢাকা মহানগর পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগ (ডিবি)।
এ ছাড়া কার্যালয়টির প্রধান ফটকের সামনে ‘ক্রাইম সিন’ লেখা হলুদ ফিতাও টাঙিয়ে দেওয়া হয়েছিল। গ্রেপ্তার এড়াতে ওই দিনের পর থেকে দলটির কোনো পর্যায়ের নেতাকর্মী কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে যাননি। শেখ হাসিনার পদত্যাগের খবর জানাজানির পর দলের ভাইস চেয়ারম্যান ড. আসাদুজ্জামান রিপনের নেতৃত্বে গত সোমবার বিকালে ওই কার্যালয়ের মূল ফটকের তালা খুলে বিএনপির নেতাকর্মীরা ভেতরে প্রবেশ করেন। গতকাল এই কার্যালয়ের সামনে সমাবেশ হয়।