সহিংসতা প্রতিরোধ
দীপক দেব
প্রকাশ : ২৮ জুলাই ২০২৪ ০৯:২৯ এএম
আপডেট : ২৮ জুলাই ২০২৪ ০৯:৩১ এএম
সাম্প্রতিক সহিংসতা প্রতিরোধে ব্যর্থতার রাজনৈতিক মূল্যায়ন শুরু করেছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ। বিশেষ করে, সাংগঠনিক দুর্বলতা চিহ্নিত করার পাশাপাশি পরিস্থিতি মোকাবিলায় দায়িত্বশীলদের কার কী ভূমিকা ছিল, কারা পদে থেকেও মাঠে ছিলেন না, তা চিহ্নিত করার নির্দেশনা দিয়েছেন দলীয় সভাপতি শেখ হাসিনা। সে লক্ষ্যে এরই মধ্যে কাজ শুরু করেছেন আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদকের নেতৃত্বে দলটির দায়িত্বশীল নেতারা।
গত মঙ্গল থেকে বৃহস্পতিবার ধারাবাহিকভাবে দলটির নগর ও এর অন্তর্গত থানা-ওয়ার্ড এবং সংশ্লিষ্ট এলাকার এমপিদের সঙ্গে সমন্বয় সভা করেছেন তারা। এসব সমন্বয় সভায় কেন্দ্রীয় নেতাদের সামনেই নেতাদের ব্যর্থতা নিয়ে কথা বলেন অনেকে।
এ ছাড়া মাঠে থাকা না-থাকা নিয়েও পাল্টাপাল্টি অভিযোগের তীর ছুড়ে দেন একে অপরের বিরুদ্ধে। এমনকি কোনো কোনো এমপির পক্ষে সাফাই গাইতে গিয়েও প্রতিবাদের মুখে পড়তে হয়েছে কাউকে কাউকে। দলীয় বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাদের সঙ্গে এবং এলাকায় বিভিন্নভাবে খোঁজ নিয়ে রাজনৈতিক মূল্যায়ন করতে কাজ করছেন দায়িত্বশীল নেতারা। দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হয়েছেন- এমন নেতার তালিকা করা হচ্ছে দলটির পক্ষ থেকে। প্রাথমিকভাবে রাজধানীর প্রায় অর্ধেক এমপি ও দায়িত্বশীল নেতা মাঠে ছিলেন না- এমন চিত্র উঠে এসেছে।
সংশ্লিষ্ট অনেকেই মনে করেন, রাজধানীর সব এমপি ও আওয়ামী লীগ নেতা মাঠে থাকলে সন্ত্রাসীরা বিভিন্ন স্থাপনায় এ রকম সহিংসতা ও নাশকতা চালাতে পারত না।
আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় একাধিক নেতার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সাম্প্রতিক সহিংসতা প্রতিরোধে ব্যর্থ হওয়ার কারণগুলো চিহ্নিত করার অংশ হিসেবে সমন্বয় সভা শুরু করা হয়েছে। দলীয় সভাপতির নির্দেশে এই সভায় এরই মধ্যে বেশ কিছু বিষয় উঠে এসেছে। বিশেষ করে, রাজধানী, থানা-ওয়ার্ড নেতাদের কে কে মাঠে ছিলেন, তার একটি মূল্যায়ন শুরু হয়েছে। শুধু দায়িত্বশীল নেতাদের নয়, ঢাকা মহানগরের অন্তর্গত ১৬টি নির্বাচনী এলাকার এমপিদের মূল্যায়নও করা হচ্ছে। সহিংসতা চলাকালে ১৮ ও ১৯ জুলাই রাজধানীর দুয়েকটি জায়গা ছাড়া অধিকাংশ জায়গায় আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের উপস্থিতি লক্ষ করা যায়নি। দলের হাইকমান্ড বিষয়টি নিয়ে ক্ষুব্ধ। টানা চতুর্থ মেয়াদে ক্ষমতায় আসার পরেও আওয়ামী লীগের মতো বৃহৎ একটি রাজনৈতিক দলের কেন এমন অবস্থা হলোÑ এ নিয়ে চলছে চুলচেরা বিশ্লেষণ।
দলীয় সূত্রে জানা গেছে, সহিংসতা প্রতিরোধে কার্যকর ভূমিকা না রাখার অভিযোগে গত বৃহস্পতিবার রাতে ঢাকা মহানগর উত্তর আওয়ামী লীগের মোহাম্মদপুর, আদাবর ও শেরেবাংলা নগর থানার ১০৮টি ইউনিট কমিটির মধ্যে ২৭টি কমিটি ভেঙে দেওয়া হয়েছে। তথ্য সংগ্রহ ও মূল্যায়নের পর আরও অনেক কমিটিও ভেঙে দেওয়া হবে। এ ছাড়া গত তিন সমন্বয় সভা থেকে সমন্বয়হীনতা কাটিয়ে ঐক্য গড়ে তোলার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। সংগঠনকে আরও শক্তিশালী ও ঐক্যবদ্ধ করতে দলের সিনিয়র নেতা, দলীয় সংসদ সদস্য, দলীয় কাউন্সিলর এবং সহযোগী সংগঠনের শীর্ষ নেতাদের সমন্বয় করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারণী ফোরামের এক নেতা ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক দুর্বলতার কথা উল্লেখ করে বলেছেন, সম্মেলনের প্রায় দুই বছর পার হয়ে যাওয়ার পরেও ঢাকা মহানগর উত্তর ও দক্ষিণের থানা ও ওয়ার্ড কমিটি না থাকায় নেতাকর্মীদের মধ্যে একধরনের গাছাড়া ভাব ও হতাশা কাজ করেছে। এই কারণে সংগঠনের নেতাকর্মীরা অনেকটাই ঝিমিয়ে পড়েছেন। এই সুযোগে শনিরআখড়া, রায়েরবাগ, যাত্রাবাড়ী, মালিবাগ আবুল হোটেল, রামপুরায় বাংলাদেশ টেলিভিশন, বাড্ডা, নতুন বাজার, প্রগতি সরণি, কুড়িল, খিলক্ষেত, উত্তরা, উত্তরখান, দক্ষিণখান, মিরপুর ১০ নম্বর ও কাজীপাড়া মেট্রোরেল স্টেশন, মোহাম্মদপুর, শংকর, ধানমন্ডি, জিগাতলা, আসাদগেট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, গুলিস্তান, বনানীর সেতু ভবন, জাতীয় দুর্যোগ ভবন, ডেটা সেন্টার, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরসহ বিভিন্ন এলাকায় তাণ্ডব করতে পেরেছে নাশকতাকারীরা।
দলীয় সূত্রসহ বিভিন্ন মাধ্যমে খবর নিয়ে জানা গেছে, ঢাকা মহানগরীর দুই পাশে ১৬টি সংসদীয় এলাকার মধ্যে ঢাকা-১৩ আসনে আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য জাহাঙ্গীর কবির নানক, ঢাকা-৮ আসনের সংসদ সদস্য আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম, ঢাকা-১২ আসনের সংসদ সদস্য ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন, ঢাকা-১৪ আসনের এমপি মো. মাইনুল হোসেন খান, ঢাকা-১৫ আসনের এমপি কামাল আহমেদ মজুমদার, ঢাকা-১৭ আসনের এমপি ও তথ্য প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ আলী আরাফাত, ঢাকা-৬ আসনের এমপি সাঈদ খোকন, ঢাকা-৫ আসনের স্বতন্ত্র এমপি মশিউর রহমান মোল্লা ও ঢাকা-১১ আসনের এমপি মোহাম্মদ ওয়াকিল উদ্দিনের মাঠে তৎপরতা দেখা গেছে। এর মধ্যে মন্ত্রিপরিষদের সদস্য ও আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতাদের তৎপরতা ছিল নানামুখী। ঢাকা মহানগরীর প্রায় অর্ধেক এমপিরই তেমন কোনো তৎপরতা ওই সময় চোখে পড়েনি। কেউ কেউ অবস্থান করছেন বিদেশে। তবে উল্টো ঘটনাও ঘটেছে। এমপিদের মধ্যে কেউ কেউ জরুরি প্রয়োজনে বিদেশে অবস্থান করলেও সংঘাত ও নৈরাজ্যের কথা জানার পর নির্ধারিত সময়ের আগেই দেশে ফিরে এসেছেন।
ঢাকা নগরীতে যেসব এলাকাতে সংঘাত ও নৈরাজ্য সবচেয়ে বেশি হয়েছে, সেগুলোর মধ্যে রয়েছেÑ ঢাকা-৪ ও ৫ আসনের এলাকাধীন যাত্রাবাড়ী, দনিয়া, শনিরআখড়া ও রায়েরবাগ এলাকা। দলীয় নেতাকর্মীদের নিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করা হয়েছে দাবি করে ঢাকা-৫ আসনের স্বতন্ত্র এমপি মশিউর রহমান মোল্লা গত শনিবার প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘পরিবারের এক সদস্যের চিকিৎসার প্রয়োজনে ভারতে গেলেও পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে ১৬ তারিখ রাতেই দেশে ফিরে আসি। এরপর ১৭ জুলাই এক বৈঠকে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে যেভাবে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল, সেভাবেই মাঠে ছিলাম। এখনও মাঠেই আছি।’ রাজনৈতিকভাবে পরিস্থিতি মোকাবিলায় ব্যর্থ হওয়ার কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘ব্যক্তিস্বার্থকে গুরুত্ব দেওয়া এবং দলের অনৈক্য ও সমন্বয়হীনতা এর প্রধান কারণ। এ ছাড়া ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগ থেকে ইউনিট কমিটিগুলোতে যাদের নেতা বানানো হয়েছে, তাদের অধিকাংশকেই মাঠে দেখা যায়নি। আর থানা ও ওয়ার্ডে যাদের নাম প্রস্তাব করা হয়েছে বলে আলোচনা আছে, তাদের পেছনে যে একটা মানুষও নেই সেটা প্রমাণ হয়ে গেছে।’ অন্যদিকে ঢাকা-৪ আসনের আরেক সংসদ সদস্য আওলাদ হোসেন সংঘর্ষের সময় পোস্তগোলায় ফ্লাইওভারের নিচে কয়েকজন কর্মী নিয়ে বসেছিলেন। তবে তাকে খুব বেশি তৎপরতা চালাতে দেখা যায়নি বলে অভিযোগ করেছেন ওই এলাকার বিভিন্ন পর্যায়ের নেতারা।
সংঘর্ষের সময় থেকে এখনও মাঠে আছি দাবি করে সংরক্ষিত আসনের সংসদ সদস্য ও এই আসনের সাবেক এমপি সানজিদা খানম প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘নেত্রী আমাকে যে দায়িত্ব দিয়েছেন আমি যথাযথভাবে পালন করার চেষ্টা করেছি। আমাদের নেতাকর্মীদের সতর্ক অবস্থানের কারণে চেষ্টা করেও ধোলাইপাড় এলাকায় কোনো সহিংসতা চালাতে পারেনি।’
ঢাকা-১১ আসনের এমপি মোহাম্মদ ওয়াকিল উদ্দিন চিকিৎসার জন্য ব্যাংককে অবস্থান করলেও দেশের উদ্ভূত পরিস্থিতির কথা জানতে পেরে দেশে ফিরে এসে নেতাকর্মীদের মাঠে রাখতে তৎপরতা চালিয়েছেন বলেও জানা গেছে। যাত্রাবাড়ীর পর সবচেয়ে বেশি ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ড পরিচালিত হয়েছে তার নির্বাচনী এলাকায়। এই এলাকায় বাংলাদেশ টেলিভিশন ভবনে আগুন দেওয়া হয়। এ ছাড়া রামপুরা বাড্ডা সড়ক এলাকাতেও ব্যাপক সংঘাত-সংঘর্ষ হয়েছে। এই এলাকায় থানা, ওয়ার্ড ও ইউনিট আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক দুর্বলতার বিষয়টিও কেন্দ্রীয় নেতাদের সামনে ভালোভাবেই উঠে এসেছে বলেও দলীয় সূত্রে জানা গেছে।
গত বৃহস্পতিবার পল্লবী থানা আওয়ামী লীগের অন্তর্গত ঢাকা উত্তরের ৬ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর তাইজুদ্দিন বাপ্পী সন্ত্রাসীদের মোকাবিলায় ঢাকা-১৬ আসনের এমপি ইলিয়াস উদ্দিন মোল্লাহর তৎপরতা তুলে ধরতে গিয়ে অন্য নেতাদের তোপের মুখে পড়েন। বাপ্পীর দাবি ছিল, ইলিয়াস লন্ডনে অবস্থান করলেও টেলিফোনে এলাকার পরিস্থিতির খোঁজখবর রেখেছেন। তবে অন্য নেতারা তার কোনো ভূমিকা ছিল না বলে দাবি করে উল্লিখিত বক্তব্যের প্রতিবাদ করেন।
দলীয় সূত্রে জানা গেছে, সমন্বয় সভা আয়োজন করা হলেও প্রথমটি ছাড়া বাকি দুটি সভা নির্ধারিত সময়ের আগেই শেষ করতে বাধ্য হন আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতারা। নগর আওয়ামী লীগের নেতাদের ওপর থানা ও ওয়ার্ড আওয়ামী লীগ নেতাদের প্রকাশ্যে ক্ষোভ ও কমিটি নিয়ে কেন্দ্রীয় নেতাদের উদাসীনতা নিয়ে এসব সভায় প্রশ্ন তুলেছেন অনেকেই। বিষয়গুলো গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনায় নিয়ে সকলকে ঐক্যবদ্ধ করতে কাজ করা হচ্ছে বলেও দাবি করেছেন কেন্দ্রীয় নেতারা।
জানা গেছে, ২৩ জুলাই (মঙ্গলবার) প্রথম সমন্বয় সভায় আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের দলীয় সভাপতির বরাত দিয়ে বলেন, ‘দায়িত্বশীল পদে থেকেও যারা এ সময় মাঠে ছিলেন না, বরং আত্মগোপনে চলে গেছেন, তাদের তালিকা তৈরির নির্দেশও দেওয়া হয়েছে।’
জানতে চাইলে আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘আমরা ধারাবাহিকভাবে বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীদের সঙ্গে বসছি, কোথায় কী ভুল ছিল সেগুলো চিহ্নিত করা হচ্ছে। সেগুলো দূর করে সমন্বয় করা হচ্ছে। সবার মনোবল চাঙ্গা করার চেষ্টা করা হচ্ছে এবং দলের মধ্যে ঐক্য সুদৃঢ় করতে কাজ চলছে। সাধারণ মানুষকে সঙ্গে নিয়ে বিএনপি-জামায়াতের এই সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড মোকাবিলা করতে নেতাদের মানুষের কাছে যাওয়ারও পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।’
এ প্রসঙ্গে ঢাকা মহানগর উত্তর আওয়ামী লীগের সভাপতি শেখ বজলুর রহমান প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘আজ (শনিবার) আমাদের ওয়ার্কিং কমিটির বৈঠকে সাংগঠনিক অনেক বিষয় নিয়ে কথা হয়েছে। সেখানে মাঠে নেতাকর্মীদের ভূমিকা কী ছিল, সেটার তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করার জন্য কমিটি করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। আগামী সপ্তাহ থেকে সেই কমিটি কাজ শুরু করবে।’ নগর আওয়ামী লীগের একটি সূত্রে জানা গেছে, মাঠে না-থাকা কর্মীদের তালিকা করার জন্য আগের যে ২৬টি টিম রয়েছে, সেগুলোকে নতুন করে পুনর্গঠন করে দায়িত্ব দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।