বে অব বেঙ্গল সম্মেলনে বক্তারা
প্রবা প্রতিবেদক
প্রকাশ : ১৭ নভেম্বর ২০২৪ ২০:৪২ পিএম
আপডেট : ১৭ নভেম্বর ২০২৪ ২৩:৩৮ পিএম
ভূ-রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক সব দিক বিবেচনায় বঙ্গোপসাগর খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এটি বিশ্ব বাণিজ্যের একটি বড় রোড, যা আবহমানকাল থেকেই চলে আসছে। ইন্দো-প্যাসিফিকের সামুদ্রিক করিডোরগুলো বিশ্ব বাণিজ্যের জন্য অতীব গুরুত্বপূর্ণ কিন্তু আঞ্চলিক বিরোধ, জলদস্যুতা এবং পরিবেশগত হুমকি ও নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জগুলোতে এটি পরিপূর্ণ। তা ছাড়া দক্ষিণ চীন সাগরে উত্তেজনা এবং বঙ্গোপসাগরে অবৈধ মাছ ধরার মতো বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। এসব সমস্যা সমাধানে আসিয়ান দেশগুলোর উদ্যোগ বাড়ানো প্রয়োজন বলে মন্তব্য করেছেন বক্তারা।
রবিবার (১৭ নভেম্বর) রাজধানীর প্যান প্যাসিফিক সোনারগাঁও হোটেলে সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজের (সিজিএস) উদ্যোগে চলমান ‘বে অব বেঙ্গল কনভারসেশনের’ (বিওবিসি) তিনদিনের আন্তর্জাতিক সম্মেলনের দ্বিতীয় দিনে ‘টার্বোলেন্ট ওয়াটার্স: নেভিগেটিং মেরিটাইন সিকিউরিটি ইন এ ডিভাইডেড ইন্দো-প্যাসিফিক’ শীর্ষক প্লেনারি সেশনে তারা এসব কথা বলেন।
এ সেশনে অংশ নেন বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব মেরিটাইম রিসার্চ এন্ড ডেভেলপমেন্টের ডিরেক্টর জেনারেল কমোডর সৈয়দ মিসবাহ উদ্দীন আহমেদ, অস্ট্রেলিয়ার ন্যাশনাল সিকিউরিটি কলেজের সিনিয়র রিসার্চ ফেলো ডেভিড ব্রিউস্টের, ভারতের জওহরলাল নেহেরু ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক সঞ্জয় কুমার, মাদাগাস্কারের সাবেক ন্যাশনাল ডিফেন্স মিনিস্টার ডমিনিক রেকোটজাফি প্রমুখ।
এদিন দুটি একক সেশনসহ মোট ১২টি সেশন অনুষ্ঠিত হয়। তৃতীয়বারের অনুষ্ঠিত এই আন্তর্জাতিক সম্মেলনটি সোমবার (১৮ নভেম্বর) শেষ হবে। সম্মেলনে বিশ্বের ৮০টি দেশের দুই শতাধিক আলোচক ও আট শতাধিক ব্যক্তি অংশ নিয়েছে।
এ সময় বক্তারা বলেন, এ অঞ্চলের সামুদ্রিক নিরাপত্তায় নৌবাহিনীর সহযোগিতা বাড়াতে হবে। তা ছাড়া প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ জলসীমায় স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি অর্জনে পারস্পারিক সহযোগিতা করতে হবে।

সৈয়দ মিসবাহ উদ্দীন আহমেদ বলেন, বঙ্গোপসাগরের সম্পদ চিহ্নিত করা ও গবেষণার জন্য এবং সমুদ্রসম্পদের রক্ষণাবেক্ষণের জন্য জাহাজ দরকার। কিন্তু সেটি আমাদের নেই। পাশাপাশি নৌবাহিনীর বাজেট বাড়ানো দরকার। গবেষকদের নিরাপত্তাসহ গভীর সমুদ্রে নিয়ে যাবে নৌবাহিনী। নৌবাহিনীর এসব কাজ অর্থনৈতিক উৎস খোঁজে দিচ্ছে অর্থাৎ অর্থের যোগান দিবে যা অন্য কোনো বাহিনী দিবে না।
তিনি বলেন, বঙ্গোপসাগরে আমাদের সমুদ্র অঞ্চলে কী ধরনের সম্পদ আছে তা নিজেরাই জানি না। আমাদের সমুদ্রজ্ঞান নেই। সমুদ্রে আমাদের অংশে কী পরিমাণ সম্পদ আছে তা এখন পর্যন্ত আমরা নিজেরাই জানি না। আমরা উপকূলীয় এলাকা থেকে সর্বোচ্চ একশ কিলোমিটার গভীরে গিয়ে মাছ ধরি। আমাদের অর্থনৈতিক এলাকা আছে ৪০০ কিলোমিটার, গভীর ও অতি গভীর সমুদ্র আছে। সমুদ্রের পাদদেশে কি সম্পদ আছে তাও আমরা জানি না।
সৈয়দ মিসবাহ উদ্দীন আহমেদ বলেন, আপনার নিজের কী সম্পদ আছে সেটি যদি না জানে তাহলে কীভাবে তা কাজে লাগাবেন? আমাদের ছোট্ট দেশটিতে প্রায় ১৮ কোটি মানুষ। এদেরকে কী ভুখা রেখে যাব। এদের জন্য কি সম্পদ রেখে যাব সেই বিষয়ে চিন্তা করার জন্য সমুদ্রে সম্পদের হিসাব নির্ণয় করতে হবে। আমরা যদি তা চিহ্নিতও করতে পারি তাহলে আগামী প্রজন্ম তা উত্তোলন করতে পারবে। তাদের কাজে লাগাতে পারবে।
আলোচনায় অংশ নিয়ে ডমিনিক রেকোটজাফি বলেন, বঙ্গোপসাগরে মাত্রাতিরিক্ত মাছ আহরণ আমাগীদিনের খাদ্যনিরাপত্তায় একটি সংকট তৈরি করবে। এজন্য এ সাগরের অধিবাসীদের এখন থেকেই পরিকল্পিত মাছসহ অন্যান্য সম্পদ আহরণে মনযোগ দেওয়া দরকার।
বাংলাদেশ বিশ্বের জনগণত্বপূর্ণ দেশগুলোর একটি। তাদের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিও দিন দিন শক্তিশালী হচ্ছে বলে মন্তব্য করেছেন ডেভিড ব্রিউস্টের। তিনি বলেন, এই বিপুল পরিমাণ জনগোষ্ঠীকে জনশক্তিতে পরিণত করলে এটি হবে আরো শক্তিশালী অর্থনৈতিক ভীত।
‘মানি ট্রেইলস এন্ড ব্রোকেন প্রমিজেস ফাইটিং করাপশন ইন পাবলিক সার্ভিস’ শীর্ষক সংলাপে বলা হয়, অবৈধ অর্থ, ঘুষ, এবং দুর্নীতি দীর্ঘকাল ধরে অনেক অঞ্চলে জনসেবা প্রদানের কার্যকারিতাকে ক্ষুণ্ন করেছে। স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা এবং অবকাঠামোর মতো অত্যাবশ্যকীয় পরিষেবাগুলোর সম্পদগুলোকে সরিয়ে দেওয়া হচ্ছে। এসব দুর্নীতিমূলক কাজের জন্য সরকারি প্রতিষ্ঠানের প্রতি আস্থা দুর্বল করে বৈষম্যকে বাড়িয়ে তোলা হয়েছে।
ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের দ্রুত অর্থনৈতিক বৃদ্ধি এবং নগর সম্প্রসারণের কারণে বায়ুর গুণমানে একটি ক্রমবর্ধমান সংকটের সম্মুখীন হচ্ছে বলে মন্তব্য করা হয় ‘চকিং অন প্রোগ্রেস: এয়ার কোয়ালিটি এন্ড ফসিল ফুয়েল ডিলেমাস ইন এ গ্রোয়িং ইন্দো-প্যিাসিফিক’ শীর্ষক সংলাপে। এই সমস্যার কেন্দ্রস্থলে রয়েছে জীবাশ্ম জ্বালানি নির্ভরতা বলে উল্লেখ করা হয়। এতে জীবাশ্ম জ্বালানি নির্গমনের পরিবেশগত এবং স্বাস্থ্যের প্রভাব, শিল্পায়ন এবং জলবায়ুর ওপর অভিঘাত এবং সামাজিক ও রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জগুলো নিয়ে আলোচনা করা হয়।
এশিয়াকে সাপ্লাই চেইনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আভাস্থল হিসেবে উল্লেখ করা হয় ‘সাপ্লাইন চেইন ডিসরাপশনস নেভিগেটিং ইকোনোমিক রিকোভারি ইন এ ফ্রেজিল ওয়ার্ল্ড’ শীর্ষক সংলাপে। সেখানে বলা হয়Ñ তাইওয়ান এবং দক্ষিণ কোরিয়ার ইলেকট্রনিক্স পণ্য উৎপাদন থেকে শুরু করে বাংলাদেশে পোশাক উৎপাদন পর্যন্ত এশিয়া বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সাপ্লাই চেইনের আবাসস্থল। চীন এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা বৃদ্ধির কারণে এই অঞ্চলে সেমিকন্ডাক্টরের ঘাটতি থেকে শুরু করে জাহাজ চলাচলেও ব্যাঘাত ঘটছে। জাপান, মালয়েশিয়া এবং ভারতের মতো অর্থনীতিতে এই ব্যাঘাতের প্রভাব পড়ছে। এর ফলে বিশ্বব্যাপী সরবরাহ নেটওয়ার্কগুলোর ভঙ্গুরতা দেখা দিচ্ছে। তাই ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের অর্থনীতিকে শক্তিশালী করতে সরবরাহ চেইন পুনর্গঠন করা দরকার বলে মন্তব্য করেন বক্তারা।