প্রবা প্রতিবেদন
প্রকাশ : ০২ নভেম্বর ২০২৪ ০০:৪৩ এএম
আপডেট : ০২ নভেম্বর ২০২৪ ০০:৪৪ এএম
একাত্তরে বাংলাদেশ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার যে প্রতিশ্রুতিগুলো ছিল, বাস্তবে ’৭২-এর সংবিধানের মধ্যদিয়ে কার্যত তার উল্টোদিকে গিয়েছে। ৫৩ বছরেও রাষ্ট্র সেসব আকাঙ্ক্ষা ও প্রতিশ্রুতি পূরণ করতে পারেনি। তবে এবারের ২০২৪ সালের ছাত্র-শ্রমিক-জনতার অভ্যুত্থান একাত্তরকে রিক্লেইম করেছে। সাম্য, মানবিক মর্যাদা এবং সামাজিক ন্যায়বিচার- এ তিনটি শব্দ ‘বৈষম্যহীন’- শব্দের মধ্যে একাত্তরের রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতিকে নতুন করে ধারণ করেছে। দেশের নতুন বাস্তবতায় স্বাধীন বিচার বিভাগ নিশ্চিত করতে এবং বিচারপতি নিয়োগে পৃথক সাংবিধানিক কমিশনের মাধ্যমে বিচারক নিয়োগ হওয়া দরকার।
শুক্রবার (১ নভেম্বর) দি ইউনিভার্সিটি প্রেস লিমিটেডের (ইউপিএল) প্রধান কার্যালয়ে ‘বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও রাষ্ট্রের সার্বিক সংস্কার: মাসদার হোসেন মামলা, রায়ের রজতজয়ন্তী ও বাস্তবায়নের ১৭ বছর’ শিরোনামে অনুষ্ঠিত আলোচনায় এ সব কথা বলেন আলোচকেরা।
ইউপিএল থেকে ২০২৪ সালে প্রকাশিত মিল্লাত হোসেন অনূদিত ও সম্পাদিত গ্রন্থ বিচার বিভাগ পৃথক্করণ প্রসঙ্গ: মাসদার হোসেন মামলার রায়ের পূর্ণাঙ্গ অনুবাদ ও মূল ইংরেজি ভাষ্য- বই নিয়ে এ আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়।
আলোচনায় অংশ নেন- বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ও ব্লাস্টের অনারারি পরিচালক ব্যারিস্টার সারা হোসেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগ সাবেক অধ্যাপক, ড. রিদওয়ানুল হক, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার জ্যোতির্ময় বড়ুয়া, দ্য নিউ এইজের সম্পাদক নূরুল কবীর, গণসংহতি আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়কারী জোনায়েদ সাকি, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের সহ-আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা, লেখক ও গবেষক মিল্লাত হোসেন।
আলোচনায় মাসদার হোসেন মামলাকে রাষ্ট্রীয়ভাবে ঐতিহাসিক অর্জন হিসেবে উল্লেখ করা হয়। এই মামলার ১৭ বছর উদযাপন উপলক্ষে আয়োজিত এই আলোচনায় মাসদার হোসেন উপস্থিত ছিলেন।
আলোচকেরা বলেন, চব্বিশের অভ্যুত্থান নতুন আশা, স্বপ্ন ও প্রত্যাশার পরিসরকে বাড়িয়েছে। রাজনৈতিক সংগ্রাম যতদূর পৌঁছেছিল, প্রত্যাশা তার চেয়ে বহুগুণ বেড়ে গিয়েছিল। অনেক রক্ত, অনেক তরুণের যুক্ততা বাংলাদেশে নতুন সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। এ জায়গায় বিচার বিভাগের কাছ থেকে প্রত্যাশা বেড়েছে।
আলোচকেরা বলেন, বর্তমানে দেশে সংবিধানের সংস্কার ও নতুন সংবিধানের দাবি সরাসরি বিচার বিভাগের স্বাধীনতার প্রশ্নকেও সামনে তুলে এনেছে। মাসদার হোসেন মামলার রায়ে যা বলা হচ্ছে তা বাস্তবায়ন হচ্ছে কি না- তা একটা গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। কারণ বিচার বিভাগকে নির্বাহী বিভাগ থেকে আলাদা করার অর্থ হচ্ছে, নিম্ন আদালতও আর আইন মন্ত্রণালয়ের অধীনে থাকবে না। কারণ আইন মন্ত্রণালয় নির্বাহী বিভাগের একটি অংশ এবং এর অধীনে থাকলে বিচার বিভাগকে স্বাধীন বলা যায় না। এবার স্পষ্ট দাবি উঠেছে, বিচার বিভাগ ও তার অধস্তন আদালত পুরোটাই সুপ্রিম কোর্টের অধীনে থাকবে। এ জন্য প্রথমত, নিম্ন আদালতে সম্পূর্ণভাবে সুপ্রিম কোর্টের অধীনে ন্যস্ত করা, এবং দ্বিতীয়ত, সুপ্রিম কোর্ট ও নিম্ন আদালতের বিচারক নিয়োগ করার প্রক্রিয়া কীভাবে হবে তার নীতিমালা ঠিক করা জরুরি।
আলোচনায় উঠে আসে, ন্যায়পাল তৈরি হওয়ার ভারতের উদাহরণ সামনে রেখে সাংবিধানিক কমিশনের মধ্য দিয়ে বিচারক নিয়োগ হওয়া দরকার। দেশে সত্যিকার জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধির মধ্য দিয়ে সংসদ গঠিত হলে, সরকারি দল, বিরোধী দল ও বিচার বিভাগের প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে একটি সাংবিধানিক কমিশন হতে পারে।
আলোচকেরা বলেন, দিনশেষে দেশের ক্ষমতা জনগণের। আর জনগণের পক্ষে ক্ষমতার চর্চা করেন রাজনীতিবিদেরা। বুদ্ধিজীবী ও সাধারণ মানুষেরা আইন-কানুন-সংবিধান-এ বিষয়গুলোকে পাশ কাটিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন। কিন্তু এসব বিষয় কেবল জজ-ব্যারিস্টারদের বিষয় না। এগুলো প্রতিটি নাগরিকের প্রতিদিনের ইনসাফ বা ন্যায়বিচার পাওয়ার অধিকার পাওয়ার সাথে সম্পর্কিত।
তারা বলেন, আইন হলো ক্ষমতার রাষ্ট্রভাষা। রাজনীতি, রাষ্ট্র এসব আইনের ভাষায় কথা বলে। রাষ্ট্র যা বলতে চায়, করতে চায়, তা আইন দিয়ে প্রকাশ করে। যদি এ ভাষা আমরা বুঝতে না চাই, এড়িয়ে যাই, তাহলে রাষ্ট্রের অঙ্গ-প্রতিষ্ঠানকে বুঝতে পারব না। রাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মধ্য দিয়ে জনগণকে নজরদারিতে রাখে। এগুলোকে পাল্টা জবাবদিহির মধ্যে রাখতে হলে নাগরিকদের ঐক্যবদ্ধ হতে হবে।
আলোচকেরা বলেন, একটা ফ্যাসিস্ট সরকারকে উৎখাত করার পর বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও রাষ্ট্রের সংস্কার নিয়ে জোরালোভাবে কথা বলা যাচ্ছে। এগুলো জারি রাখা দরকার। কারণ রাষ্ট্র একটি রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান। বিচার বিভাগ কোনো আলাদা বিষয় নয়। এখন বিচার বিভাগ স্বাধীন নয়, কারণ রাজনীতিবিদেরা বিচার বিভাগকে প্রভাবিত রাখতে চান। স্বাধীনতার পর সব কয়টি সরকার বিচার বিভাগকে নিয়ন্ত্রণ করেছে। মাসদার হোসেন মামলার শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত বিএনপি ও আওয়ামী লীগ- দুটি সরকার ক্ষমতায় এসেছে। মামলার অন্যান্য বাস্তবায়ন আরও দীর্ঘায়িত হয়েছে। তারা মাসদার হোসেন মামলার রায়কে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা রক্ষা ও বাস্তবায়নের জন্য ফ্রেমওয়ার্ক বলে মনে করেন।
আলোচকেরা আরও বলেন, বিচারক নিয়োগের একটা সুনির্দিষ্ট নীতিমালা তৈরি করতে হবে। বিচার বিভাগের জন্য স্বতন্ত্র সচিবালয় তৈরি করা জরুরি। উচ্চ আদালতের বিচারক নিয়োগ কার্যত প্রধানমন্ত্রীর হাতে থাকলে বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে অনুগত হওয়ার এবং রাজনৈতিক বাধ্যবাধকতার মধ্যে থাকার চর্চার কারণে প্রভাবমুক্ত থাকতে পারবে না।