পরিপ্রেক্ষিত
মো. মাহবুবুল আলম
প্রকাশ : ২৬ মে ২০২৪ ১৩:১০ পিএম
রাসেল ভাইপার
স্থানীয়ভাবে চন্দ্রবোড়া নামে পরিচিত। বরেন্দ্র এলাকায় এ জাতের সাপ অনেক কমে গিয়েছিল।
বাংলাদেশ বন্য প্রাণী সংরক্ষণ আইন-২০১২
অনুযায়ী রাসেল ভাইপার বিলুপ্তপ্রায় ও সংরক্ষিত প্রাণী। যদিও ২০০৯-এর পর রাসেল ভাইপারের
সংখ্যা বাড়তে শুরু করে। মাঝে কয়েক বছর এর প্রাদুর্ভাব কম হলেও গত চার-পাঁচ বছরে
সাপটি বরেন্দ্রসহ সারা দেশে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে। উচ্চপ্রজনন-ক্ষমতাসম্পন্ন বিষধর
এ সাপ চাঁপাইনবাবগঞ্জে প্রবাহিত মহানন্দা-পদ্মা অববাহিকা ধরে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ দিয়ে
দেশে প্রবেশ করেছে বলে স্থানীয়দের ধারণা। নদীসংযোগ থাকায় এ সাপটি চাঁদপুর ও শরীয়তপুরেও
দেখা গেছে এবং এ সাপের কামড়ে ইতোমধ্যে অনেকে মারা গেছে।
২০১৮ সালে পরিচালিত
জরিপ অনুযায়ী বাংলাদেশে প্রতি বছর ৭ হাজার ৫০০ মানুষ মারা যায় সাপের কামড়ে। স্থানীয়
এক হিসাবমতে, গত বছর রাসেল ভাইপারের কামড়ে চারশর বেশি মানুষ মারা গেছে। প্রকৃতপক্ষে
সাপের কামড় নিয়ে নতুন কোনো জরিপ নেই এবং গত তিন-চার বছরে কত মানুষ বা গবাদি পশু মারা
গেছে, তার প্রকৃত হিসাব নেই। ফলে রাসেল ভাইপারের আক্রমণের প্রকৃত ক্ষতি উঠে আসছে না।
কৃষকের জন্য রাসেল ভাইপার বিশেষ রকম ক্ষতিকর। গত আমন মৌসুমে বরেন্দ্রভূমি এলাকায় এর
প্রাদুর্ভাব ছিল। এবার বোরো মৌসুমে ধান কাটার সময় এর প্রাদুর্ভাব যেকোনো সময়ের চেয়ে
বেশি। স্থানীয় উপজেলা প্রশাসন ও কৃষি অফিস কিছু কৃষকের মাঝে গামবুট সরবরাহ করেছে এবং
গামবুট ব্যবহারে উদ্বুদ্ধ করছে। কিন্তু এ ব্যবস্থা অপ্রতুল এবং কার্যকর হওয়ার সম্ভাবনা
কম। কারণ, রাসেল ভাইপার এখন আর কৃষিজমিতে নয়, নদীর চরসহ মানুষের বসবাসের জায়গায় পৌঁছে
গেছে। সুতরাং এখনই রাসেল ভাইপারের প্রাদুর্ভাবের লাগাম টানতে না পারলে বরেন্দ্র অঞ্চলের
কৃষকের দুর্ভোগ বাড়বে। ভয়ের কারণ হলো, রাসেল ভাইপারের অ্যান্টিভেনমের অপ্রতুলতা এবং
বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই অ্যান্টিভেনম পাওয়ার পরও আক্রান্ত ব্যক্তি মারা গেছে। অর্থাৎ রাসেল
ভাইপারের আক্রমণে প্রতিষেধক অ্যান্টিভেনম এবং তার পরবর্তী ব্যবস্থাপনার সক্ষমতা নিয়ে
প্রশ্ন আছে।
প্রাকৃতিক বাস্তুসংস্থানে
প্রতিটি প্রাণীর ভূমিকা আছে। সে হিসেবে সাপেরও উপস্থিতির প্রয়োজন আছে। প্রাকৃতিক বাস্তুসংস্থানে
ইঁদুরেরও ভূমিকা আছে। কিন্তু কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর ইঁদুরকে ক্ষতিকর পেস্ট হিসেবে
ঘোষণা করেছে এবং প্রতি বছর ঘটা করেই ইঁদুর দমন অভিযান পরিচালনা করা হয়। ইঁদুর দমনে
উদ্বুদ্ধকরণ এবং স্থানীয় ও জাতীয় পর্যায়ে ইঁদুর নিধনকারী ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে পুরস্কৃত
করার প্রচলন আছে। ইঁদুর নিধনের এ অভিযানের যৌক্তিকতা রয়েছে কারণ ফসলভেদে ইঁদুরের জন্য
শস্যক্ষতির পরিমাণ ৫-২৫ শতাংশ পর্যন্ত হতে পারে। সুতরাং আর্থিক এবং খাদ্য নিরাপত্তা
নিশ্চিতকল্পেই ইঁদুর নিধন বৈধ করা হয়েছে।
আর্থিক নিরাপত্তা
নিশ্চিতকরণে ইঁদুর নিধন বৈধ হলে, রাসেল ভাইপারের কামড়ে মারা যাওয়া ‘কৃষকের’ জীবনের
মূল্য কত? বাংলাদেশে জনসংখ্যার সমস্যা নেই বলে কি কৃষক বা কৃষিশ্রমিকের জীবনের মূল্য
তার উৎপাদিত ফসলের চেয়ে কম? যদি তা না হয় তবে কেন এ ব্যাপারে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর
বা কৃষি মন্ত্রণালয় এখনও কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নিচ্ছে না? স্থানীয় কৃষক দলবদ্ধভাবে
রাসেল ভাইপার মেরে বা মরে আর কতকাল বেঁচে থাকবে?