× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

আন্তঃরাষ্ট্রীয় অপরাধ

কলকাতায় সংসদ সদস্য হত্যায় অনেক প্রশ্ন

ড. নাসির উদ্দিন আহাম্মেদ

প্রকাশ : ২৪ মে ২০২৪ ১৩:৩৫ পিএম

কলকাতায় সংসদ সদস্য হত্যায় অনেক প্রশ্ন

সংসদ সদস্য আনোয়ারুল আজিম আনার সম্প্রতি ভারতের পশ্চিমবঙ্গে গিয়ে নিখোঁজ হন। এর কয়েক দিন পর তার পরিধেয় রক্তমাখা কাপড়চোপড় কলকাতার একটি ফ্ল্যাট থেকে উদ্ধার হলেও লাশ খুঁজে পাওয়া যায়নি। আন্তঃরাষ্ট্রীয় অপরাধ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে হলেও বাংলাদেশ এ অভিশাপ থেকে মুক্ত ছিল। নিঃসন্দেহে এমন একটি হত্যাকাণ্ড অত্যন্ত অনভিপ্রেত এবং দেশ ও জাতি তথা জনগণের নিরাপত্তার জন্য বিশেষ হুমকি। এর আগে বিভিন্ন সময়ে বাংলাদেশের নাগরিকরা গুম হয়েছেন বলে বিভিন্ন মহল থেকে অভিযোগ করা হয়েছে। তবে তাদের অধিকাংশই ছিলেন কোনো না কোনোভাবে বিরোধী রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সম্পৃক্ত। এবং তাদের কারওই কোনো হত্যাকাণ্ডের প্রমাণ বা মৃতদেহের হদিস কখনওই পাওয়া যায়নি। এই প্রথম ক্ষমতাসীন কোনো রাজনৈতিক নেতার সর্বোপরি মহান জাতীয় সংসদে নির্বাচিত একজন জনপ্রতিনিধির এমন হত্যাকাণ্ড নিঃসন্দেহে উদ্বেগজনক, যা নানা ধরনের জটিল পরিস্থিতির ইঙ্গিত বহন করে।

২২ মে স্বরাষ্ট্র ও পররাষ্ট্র মন্ত্রী এ ব্যাপারে আলাদা বক্তব্য দিতে গিয়ে বলেছেন, এ ঘটনার তদন্ত চলছে এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন, ঘটনার সঙ্গে ভারতের কেউ জড়িত নয়, বাংলাদেশের সন্দেহভাজন কয়েকজনকে পুলিশ আটক করেছে। এ বিষয়ে আমি বিনয়ের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করব। অপরাধী, সে যতই উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন হোক না কেন, অন্য দেশে অপরাধ করার ক্ষেত্রে তারা অবশ্যই কোনো না কোনোভাবে সে দেশের অপরাধী চক্রের সহায়তা নিয়ে থাকে। এমনকি নিজের অপরাধ ঢাকার জন্য কখনও কখনও তারা তৃতীয় একটি দেশকে ব্যবহার করে অর্থাৎ যে অপরাধটি মূলত ঘটায়, তার সঠিক অবস্থান সম্পর্কেও জানতে পারে না। অপরাধ ও গোয়েন্দা জগতে এ বিষয়টিকে ‘সার্কিট ব্রেকার’ হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়। সুতরাং ভারতীয় কারও সহায়তা ছাড়া সে দেশে এমন একটি হত্যাকাণ্ড ঘটেছে বলে আমার মনে হয় না।

কলকাতায় খুন হয়েছেন আনার, এ তথ্য উভয় দেশের পুলিশই যৌথভাবে দিয়েছে। প্রশ্ন হচ্ছে, কলকাতায় কিংবা পশ্চিমবঙ্গের অন্যত্র বাংলাদেশি সন্ত্রাসীদের ঘাঁটিতে পরিণত হওয়ার বিষয়টি দীর্ঘদিন ধরে আলোচনায় রয়েছে। কিন্তু উভয় দেশের পক্ষেই এ ব্যাপারে কোনো কার্যকর পদক্ষেপ না নেওয়ার কথাও উঠেছে। এ বিষয়টি আমরা কীভাবে দেখব এরও ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ প্রয়োজন।

এত দিন বিষয়টি আলাপ-আলোচনা পর্যায়ে থাকলেও এমন করুণ ও মর্মান্তিক হত্যাকাণ্ড প্রমাণ করেছে, কলকাতা ও বাংলাদেশের সন্ত্রাসীরা একজোট হয়ে অপরাধ ঘটানোর যে তথ্য ইতঃপূর্বে প্রকাশিত হয়েছিল তা অনেকাংশেই সত্য হওয়ারই সম্ভাবনা বেশি‌। সুতরাং বিষয়টি আমলে নিয়ে অত্যন্ত গুরুত্বসহকারে তা প্রতিরোধে উভয় দেশের পুলিশ বাহিনী বিশেষত গোয়েন্দারা তৎপর হবেন বলে প্রত্যাশা করি। বিষয়টি তো হেলাফেলার নয়। দেশের দাগী অপরাধীরা ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে নিরাপদ আশ্রয় গাড়ছে।

আমরা জানি, বাংলাদেশের পার্বত্য চট্টগ্রাম মিজোরাম, আসামসহ আরও কয়েকটি রাজ্যের সন্ত্রাসীদের আশ্রয়কেন্দ্র হয়ে উঠেছিল। শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকার ক্ষমতায় এসে সন্ত্রাসীদের এ ঘাঁটি ভেঙে দেয় এবং এর পর থেকে ভারত সরকার বাংলাদেশের কাছে এ ব্যাপারে নানাভাবে তাদের ইতিবাচক মনোভাব ব্যক্ত করেছে। তা-ও সংবাদমাধ্যমেরই খবর।  ব্যক্তিগতভাবে আমি পার্বত্য চট্টগ্রামে চাকরি করার সুবাদে এতটুকু বলতে পারি, পাহাড়ি অঞ্চল এবং সেনাবাহিনী কেবল নয়, বাংলাদেশের ভূখণ্ড থেকে সন্ত্রাস দমনের মাধ্যমে পুরো দেশ-জাতি এবং এ উপমহাদেশ সার্বিকভাবে উপকৃত হয়েছে। একসময় আমাদের জাতীয় বাজেট এবং প্রতিরক্ষা বাজেটের একটা বড় অংশ এ পার্বত্য চট্টগ্রামে সন্ত্রাস দমনে ব্যয় করতে বাধ্য হতাম। অন্যদিকে ভারত বিপুল অর্থ ব্যয় করত তাদের ভূখণ্ডে সন্ত্রাসীরা যাতে কার্যক্রম চালাতে এবং পার্বত্য চট্টগ্রামের সন্ত্রাসীদের সঙ্গে একজোট হয়ে শক্তি বৃদ্ধি করতে না পারে। আবার বাংলাদেশ এবং ভারতের সরকারকে যারা অস্থিতিশীল করার মানসিকতা পোষণ করত, তারাও বিভিন্নভাবে অর্থায়ন করত এ সন্ত্রাসীদের পেছনে। ১০ ট্রাক অস্ত্র উদ্ধার মামলা এ বিষয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ ও ইঙ্গিতবাহী ঘটনা ছিল। বর্তমানে এ ধরনের কার্যকলাপের বিরুদ্ধে শূন্য সহিষ্ণুতা বা জিরো টলারেন্স নিঃসন্দেহে একটি বিচক্ষণ সিদ্ধান্ত বলে মনে করি এবং যারা এমন একটি সিদ্ধান্ত গ্রহণে নানাভাবে কাজ করেছেন তাদের কাছে দেশ ও জাতির কৃতজ্ঞ থাকা উচিত।

সংসদ সদস্য আনারের হত্যাকাণ্ডের অনুসন্ধান করতে গিয়ে আমাদের গোয়েন্দাসহ সংশ্লিষ্ট সব পক্ষই বিভিন্ন যোগসূত্র খতিয়ে দেখছে। অসমর্থিত সূত্রে এ ব্যাপারে নানা নেতিবাচক চিত্রও সামনে আসছে। এরই বা পর্যালোচনা কীভাবে আমরা করবো? বর্তমানে যে মানুষটি এ জগতে আর নেই, তাকে নিয়ে কোনো প্রমাণ ছাড়া নেতিবাচক কথা না বলাটাই যুক্তিযুক্ত। কারণ তার পক্ষে এসব অপবাদের জবাব দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। কিংবা আত্মপক্ষ সমর্থণের অবকাশ নেই। তবে সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে যদি কোনো অপরাধ বা নেতিবাচক তথ্য পাওয়া যায়, তা অবশ্যই আমলে নিতে হবে এবং ভবিষ্যতে তা থেকে শিক্ষা নিয়ে আমাদের জনপ্রতিনিধি এবং উচ্চ পর্যায়ে যারা আছেন তারা নিজেদের আরও সতর্ক রাখবেন প্রয়োজনে সংশোধন করবেন বলে আমি প্রত্যাশা করি। মনে রাখতে হবে, মানুষ ভুল করতেই পারে তবে ভুল থেকে শিক্ষা নেওয়াটাই হলো সবচেয়ে বড় কথা।

বাংলাদেশ-ভারতের মধ্যে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক এখন অতীতের যেকোনো সময়ের তুলনায় ভিন্ন মাত্রা লাভ করে অনন্য উচ্চতায় আছে। এ প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের সন্ত্রাসীদের ভারতের আশ্রয়ের যে অভিযোগ রয়েছে এর পরিপ্রেক্ষিতে উভয় দেশের মধ্যে কিংবা আন্তঃদেশীয় পর্যায়ে কী কী ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে, এ প্রশ্নও সঙ্গতই সামনে আসে।

আমি মনে করি এখন উভয় দেশের গোয়েন্দা ও অপরাধবিজ্ঞানীদের একজোট হয়ে কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন করতে হবে, যার মধ্যে স্বল্পমেয়াদি, মধ্যমেয়াদি ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা অবশ্যই থাকতে হবে। আর এ কথা অবশ্যই মনে রাখতে হবে যে, প্রতিকার নয়, প্রতিরোধই সর্বোত্তম ব্যবস্থা। আমরা দেখছি সম্প্রতি দেশে খুনখারাবি মারাত্মকভাবে বেড়ে গেছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটাতে নানা অশুভ মহলের তৎপতার খবরও সংবাদমাধ্যমে উঠে আসছে। সংসদ সদস্য আনারের হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে এ ধরনের কোনো সম্পৃক্ততা থাকতে পারে বলে কি মনে করেন?

যারা রাজনীতি করেন এবং বিভিন্নভাবে দল পরিচালনা করেন তাদের শত্রু থাকাটাই স্বাভাবিক। কারণ কোনো রাজনীতিবিদের পক্ষেই সব দল-উপদল-কোন্দল সৃষ্টিকারীর মন রক্ষা করা সম্ভব হয় না। সুতরাং বিরাগভাজন কেউ তার চরম ক্ষতির সিদ্ধান্ত নিতে পারে এমনটা হলেও হতে পারে। তবে এ বিষয়ে প্রত্যাশা করি যে, স্বল্পতম সময়ে যথাযথ অনুসন্ধান ও গোয়েন্দা কার্যক্রম চালিয়ে সঠিক তথ্যটি প্রকাশিত হলে সব কল্পনা ও গুজবের অবসান ঘটবে। আনারের হত্যাকাণ্ড নিয়ে বিভিন্ন ধরনের তথ্য যেমন দুই দেশের আইনি সংস্থাগুলোর পক্ষে মিলছে, তেমন আমাদের জনসমাজের পরিসরেও বিভিন্ন ধরনের প্রশ্ন উত্থাপিত হচ্ছে। এ ব্যাপারে রাজনীতিসংশ্লিষ্ট কোনো কিছু হতে পারে এমন অভিযোগও আছে কোনো কোনো মহলের। এ ব্যাপারে আপনার পর্যবেক্ষণ এবং বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের মধ্যে কোনোরকম সন্দেহ প্রোথিত হওয়ার আশঙ্কার বীজ রোপিত রয়েছে কিনা এমন প্রশ্নও সামনে এসেছে।

দুই দেশের সম্পর্ক বা আন্তঃরাষ্ট্রীয় যোগাযোগের ক্ষেত্রে এ ঘটনা খুব বেশি প্রভাব ফেলবে বলে মনে করি না। আমরা ইতঃপূর্বে দেখেছি, কানাডায় একজন শিখ নেতার অবস্থান বিষয়ে ভারত-কানাডার মধ্যে সম্পর্ক নষ্ট হয়েছিল। এ রকম আরও অনেক উদাহরণ পৃথিবীতে রয়েছে। তবে এ ঘটনাটি তেমন প্রভাব ফেলবে বলে মনে করি না। কারণ বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক এখন অনন্য উচ্চতায় রয়েছে এভং এক্ষেত্রে আস্থার কোনো সংকট নেই। 


  • অবসরপ্রাপ্ত মেজর, নিরাপত্তা-বিশ্লেষক ও গবেষক
শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা