উপজেলা নির্বাচন
মুনিরা খান
প্রকাশ : ২৩ মে ২০২৪ ১০:০৫ এএম
মুনিরা খান
দ্বিতীয় ধাপের উপজেলা পরিষদ নির্বাচন ২১ মে হয়ে গেল। অনিয়মের পাশাপাশি সংঘাত-সহিংসতাও ঘটেছে। ভোটার উপস্থিতি এবারও কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় পরিলক্ষিত হয়নি। ২২ মে প্রতিদিনের বাংলাদেশ-এ বলা হয়েছে, ‘নির্বাচনের দ্বিতীয় ধাপে মঙ্গলবার (২১ মে) নানা অনিয়ম ও সংঘর্ষ ঘটেছে। ভোট শেষে কক্সবাজারের নবগঠিত ঈদগাঁও উপজেলায় প্রতিপক্ষের ছুরিকাঘাতে খুন হয়েছেন এক প্রার্থীর কর্মী। ভোটের হারও কম। অনেক কেন্দ্র ছিল ভোটারশূন্য। ঢাকার সাভার উপজেলার অনেক কেন্দ্র ছিল প্রায় ফাঁকা। নোয়াখালীর চাটখিল এবং কুমিল্লার বরুড়ায়ও প্রায় একই পরিস্থিতি দেখা যায়। এদিন ভোটগ্রহণ হয় ১৫৬ উপজেলায়।’ ‘ভোটারের খরা’ হাল আমলে আমাদের নির্বাচনব্যবস্থায় একটি নেতিবাচক অনুষঙ্গ হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কাজী হাবিবুল আউয়াল সাংবাদিকদের জানান, ‘প্রদত্ত ভোটের হার থার্টি প্লাস হতে পারে। এর আগে ৮ মে অনুষ্ঠিত প্রথম ধাপের উপজেলা নির্বাচনে ভোট পড়ার হার ছিল ৩৬ দশমিক ১ শতাংশ। স্থানীয় সরকারের এ নির্বাচনে এত কম ভোট আগে কখনও পড়েনি এও বলা হয়েছে সংবাদমাধ্যমে।

‘ভোটারের
খরা’ নিশ্চয় গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার জন্য মোটেও কোনো শুভসংবাদ নয়। কেন ভোটারের খরা,
এও সচেতন মানুষমাত্রই নয় অজানাও। অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন বলতে আমরা যা বুঝি এর
অন্যতম অংশীজন ভোটার। ভোটারকে কেন্দ্রে আসতে উৎসাহিত করার দায় যেমন নির্বাচন
কমিশনের, তেমনি রাজনৈতিক দলসহ নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী সব পক্ষেরই। উপজেলা নির্বাচন
বাকি আছে আরও কয়েক ধাপ। একজন নির্বাচন পর্যবেক্ষক হিসেবে মনে করি, অতীতের অভিজ্ঞতা
থেকে ভবিষ্যৎ পরিপুষ্ট করার সর্বতো প্রয়াসে মুখ্যত নির্বাচন কমিশনকে, একই সঙ্গে
সরকার এবং নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী সব পক্ষকেই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে হবে। জাতীয়
পর্যায় হোক কিংবা স্থানীয় সরকার কাঠামোর নির্বাচনই হোক, যেকোনো নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা
ও স্বচ্ছতাই মূল বিষয়। গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক ব্যবস্থায় যেকোনো নির্বাচনই
গুরুত্বপূর্ণ। তৃণমূল থেকে জাতীয় পরিসরের নির্বাচনে স্বচ্ছতা, গ্রহণযোগ্যতা ও
ভোটবান্ধব পরিবেশ সমানভাবে নিশ্চিত করার দায়িত্ব নির্বাচন কমিশনের।
অবশ্যই
সব নির্বাচনই ক্রেডিবল অর্থাৎ গ্রহণযোগ্য হতে হবে। একজন নির্বাচন পর্যবেক্ষক মূলত
নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতাকেই বেশি গুরুত্ব দিয়ে থাকেন। এ স্তম্ভেই লিখেছি,
ভোটাধিকার এক ধরনের মানবাধিকার। অতি কম সংখ্যক ভোটারের উপস্থিতি মানে উল্লেখযোগ্য
ভোটার তাদের অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। নির্বাচন মানে পছন্দ। একজন ভোটার তার
পছন্দের প্রার্থীকে প্রতিনিধি হিসেবে পছন্দ করে ভোট দেন। ভোটার প্রার্থীকে ভোট
দিয়ে সন্তুষ্টি পান। তার পছন্দের প্রার্থী জয়ী না হলেও ব্যক্তিপর্যায়ে তিনি তার
রাজনৈতিক মতপ্রকাশের সুযোগ পেয়েছেন। রাজনৈতিক মতপ্রকাশের এ বিষয়টিকে আমরা এখনও
গুরুত্ব দিতে পারিনি। নির্বাচন পর্ব শেষে নির্বাচন কমিশনের তরফে নির্বাচন আয়োজন
সম্পর্কে প্রত্যয়ী উত্তর পাওয়া না গেলে নির্বাচনকে গ্রহণযোগ্য বলা যাবে না। নির্বাচন
কমিশন যখন বলে, ভোটার উপস্থিতি আশানুরূপ কিংবা পর্যাপ্ত হয়েছে তখন জনগণ মেনে নেবে
না। কমিশনকে বিতর্কের ঊর্ধ্বে নির্বাচন আয়োজন করতে হবে।
স্থানীয়
সরকার কাঠামোর বিভিন্ন স্তরের নির্বাচন ইসির জন্য আর কিছু বিষয়ে শেখার জায়গা। যেহেতু
এ ধরনের নির্বাচন তৃণমূল পর্যায় থেকেও হয় তাই ভোটারকে ভোট দেওয়ার বিষয়ে আগ্রহী করে
তোলা এবং প্রশিক্ষণ দেওয়ার সুযোগ রয়েছে। ভোটার এডুকেশন নিশ্চিত করার এ সুযোগ কাজে
লাগাতে পারলে জনগণ ভোটাধিকার সম্পর্কে বাস্তব পর্যায়ে সচেতন হবে। অভিযোগ আছে,
মন্ত্রী হিসেবে যারা নির্বাচিত হন তাদের অনেকেই জাতীয় সংসদ তো বটেই, স্থানীয়
পর্যায়ে তার দায়িত্ব সম্পর্কে পর্যাপ্ত ধারণা রাখেন না। প্রশ্ন হচ্ছেÑতাহলে তারা
নির্বাচিত হন কীভাবে। স্থানীয় পর্যায়ে কোনো রাজনীতিক যদি বেশি পরিচিত হন তাহলে
অনেক ভোটার আগে থেকেই ধরে নেন, তাকে ভোট দিতে হবে। আবার ওই অঞ্চলে কোনো প্রার্থীর
প্রতিদ্বন্দ্বী যদি শক্তিশালী না হন তখন অনেক ভোটার ভোট দেওয়ার বিষয়ে আগ্রহ প্রকাশ
করেন না। তারা ধরেই নেন শক্তিশালী প্রার্থী জিতবেন তাই ভোট দেওয়ার প্রয়োজন নেই। কিন্তু
ভোটার যদি তার ভোটাধিকারের গুরুত্ব সম্পর্কে সচেতন হয়ে ওঠেন তখন রাজনৈতিক দল তো
বটেই, এমনকি প্রার্থীরাও নিজ নিজ দায়িত্ব সম্পর্কে সচেতন হবেন এবং এজন্য প্রয়োজনীয়
সব প্রশিক্ষণ বা জ্ঞান অর্জন করবেন।
জাতীয়
পর্যায়ের নির্বাচনে দলীয় স্বার্থই প্রাধান্য পায়। স্থানীয় সরকার কাঠামোর নির্বাচনে
নির্দিষ্ট এলাকার মানুষের স্বার্থ ও প্রার্থীর কার্যক্রমের সক্ষমতাই বেশি গুরুত্ব
পেয়ে থাকে। ফলে এ দুই ধরনের নির্বাচনের সূক্ষ্ম পার্থক্য সম্পর্কে জনগণকে অবহিত
করার দায়িত্ব নির্বাচন কমিশন নিলে স্বতঃস্ফূর্ত ভোটার উপস্থিতি বাড়ানোর সুযোগ
রয়েছে। নির্দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবি পূরণ না হওয়ায় বিএনপি ও সমমনা
দলগুলো দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নেয়নি। উপজেলা পরিষদ নির্বাচনের ক্ষেত্রেও
তারা অনড় অবস্থান রেখেছে। বিএনপির অনেক প্রার্থী নির্বাচনে অংশ নেওয়ায় তাদের দলীয়
শৃঙ্খলাভঙ্গের দায়ে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে এবং হচ্ছে। স্থানীয় সরকার কাঠামোর
নির্বাচনে অংশ না নিয়ে বিএনপি ভুল করেছে, এমন দাবি অনেকের যা পুরোপুরি অস্বীকার
করার সুযোগও নেই। বহুদলীয় গণতন্ত্রে রাজনৈতিক দলের মধ্যে আস্থা থাকা জরুরি। প্রতিটি
রাজনৈতিক দলের নিজস্ব ম্যানিফেস্টো রয়েছে। এ মেনিফেস্টো মতাদর্শ সৃষ্টি করে। ভোটাররা
মূলত রাজনৈতিক মতাদর্শের বহুমাত্রিকতা থেকে তার রুচিবোধের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ মতাদর্শ
পছন্দ করে। আর এভাবেই বিভিন্ন দলের সমর্থক তৈরি হয়। দলীয় প্রতীকে নির্বাচন হোক বা
না হোক, প্রায় সব প্রার্থীই একটি দল কিংবা দলীয় মতাদর্শের অনুসারী হন। ফলে ভোটার
যখন ভোট দেন তখন তিনি ওই দলীয় মতাদর্শের ওপর আস্থা রাখেন বলেই পছন্দসই প্রার্থী
নির্বাচন করেন। মতাদর্শিক পরিবর্তন ঘটলে তিনি অন্য কাউকে ভোট দেওয়ারও এখতিয়ার
রাখেন। ফলে রাজনৈতিক দলগুলোকে ভোটারের এ পছন্দকে সম্মান দেওয়া জরুরি।
দ্বাদশ
জাতীয় সংসদ নির্বাচনেই আমরা দেখেছি, অনেকে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে
অংশ নিয়েছেন। উপজেলা পরিষদ নির্বাচনেও অনেকে ডামি প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা
করছেন। সংবাদমাধ্যমে এও বলা হয়েছে, বিনা ভোটে অনেকে নির্বাচিত হয়েছেন। অর্থাৎ
ভোটারের উপস্থিতি কিংবা ভোটাধিকারের বিষয়টি গুরুত্ব দেওয়া হয়নি। সবাই ভোট দিতে
যাবেন, এ শিক্ষা দেওয়ার কাজ নির্বাচন কমিশনের পাশাপাশি রাজনৈতিক দলকেও নিতে হবে। স্থানীয়
সরকার কাঠামোর নির্বাচনে বর্জনকারী দলের কোনো সদস্য প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা
করলে ওই প্রার্থীর সমর্থকরা সচরাচর দুটো বিষয় বিবেচনা করে। প্রথমত, প্রার্থী ওই
অঞ্চলে তার দায়িত্ব কতটা ভালোভাবে পালন করেন। দ্বিতীয়ত, ওই প্রার্থীর দলীয়
মতাদর্শিক অবস্থান কী। বিজয়ী হওয়ার পর কিংবা আগে যখন প্রার্থীকে দল থেকে বহিষ্কার
করা হয় তখন ভোটারও আশাহত হয়।
আমরা
দেখছি, সম্প্রতি ডামি প্রার্থী বাড়ছে। এমনটি বহুদলীয় গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক
ব্যবস্থার জন্য শুভবার্তা নয়। কারণ রাজনৈতিক মতাদর্শীয় ভিত পোক্ত করার জন্যই
রাজনীতিকরা দলের সঙ্গে যুক্ত হন। একজোট হয়ে গণতন্ত্রচর্চায় তাদের একত্র রাখে এ
মতাদর্শীয় ভিত। ভোটার মূলত এ মতাদর্শীয় ভিতের ওপরই আস্থা রাখতে চায়। যখন কোনো
প্রার্থীকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয় তখন তিনি ওই মতাদর্শীয় ভিতের সঙ্গে সংযুক্ত
থাকেন না। কিন্তু দলবহির্ভূত হয়ে গেলে। তার একার পক্ষে আর রাজনৈতিক কার্যক্রম
চালানো সম্ভব হয় না। ফলে প্রার্থী তার দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হলে ভোটাররা তাকে
সমালোচনা করতে পারেন। কিন্তু ভোটার তার কাছে জবাবদিহি প্রত্যাশা করতে পারেন না।
ভোটার সব সময় কোনো রাজনৈতিক দলের কাছে জবাবদিহি প্রত্যাশা করেন। ফলে নির্বাচন
বর্জন কিংবা অংশ নেওয়ায় দল থেকে বহিষ্কার করা হলে তা ভোটারদের পছন্দকে অসম্মান করা
হয়।
একজন ভোটার বহু কষ্ট সহ্য করে কেন্দ্রে আসেন। আবার অনেকের জন্য তা উৎসবের মতোই কিছু। কিন্তু রাজনৈতিক দল যদি ভোটারকে সুশিক্ষিত করতে না পারে এবং এর বিপরীত দিকে যাত্রা করে তখন ভোটারেরও ভোটাধিকারের আগ্রহ কমে যায়। বস্তুত আমরা দেখছি, ভোট দেওয়ার ক্ষেত্রে জনমনে এক ধরনের অনাগ্রহ তৈরি হয়েছে। নির্বাচন বর্জনকারী দলগুলোর অনড় অবস্থানের ফলে অনেকে ভোট নিয়ে আগ্রহী নন। আবার ডামি প্রার্থীর সংখ্যাধিক্যের ফলেও ভোটার কিছুটা দ্বিধান্বিত অবস্থানে পড়ে যায় বলে কেন্দ্রে আসতে পারে না। এ দায় রাজনৈতিক দলগুলো এড়াতে পারে না। দেশের সব দলকেই তাদের মেনিফেস্টো আরও সংবেদনশীল করতে হবে। নির্বাচন কমিশন এ ক্ষেত্রে তাদের সহায়ক হিসেবে ভূমিকা পালন করবে। কিন্তু নির্বাচন গ্রহণযোগ্য ও তর্কাতীত করার জন্য যা কিছু করণীয় তা নিশ্চিত করার দায় ইসির। নির্বাচন কমিশন ভোটারের আমানতকারী। এ আমানত যেন কোনোভাবেই খেয়ানত না হয় সেজন্য কমিশনকে সতর্ক থাকতে হবে। নির্বাচন কমিশন এ ক্ষেত্রে স্বাধীনভাবে করবে। কারণ তারা জনগণের অধিকারের রক্ষণাবেক্ষণকারী। তারা যেহেতু জনগণের কাছে জবাবদিহি করতে বাধ্য তাই তাদের স্বাধীনভাবে নির্বাচনী পরিবেশ সুষ্ঠু-অবাধ-নিরপেক্ষ করার চেষ্টা করতেই হবে। ভোট দেওয়ার ক্ষেত্রে ভোটার যেন কোনো দুর্ভোগে না পড়েই এমন ব্যবস্থা গড়ে তোলার দায় নির্বাচন কমিশন এড়াতে পারে না।