× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

বুদ্ধপূর্ণিমা

সকলেই সুখী হই

স্বরুপানন্দ ভিক্ষু

প্রকাশ : ২২ মে ২০২৪ ১০:৪৯ এএম

স্বরুপানন্দ ভিক্ষু

স্বরুপানন্দ ভিক্ষু

বুদ্ধপূর্ণিমা বৌদ্ধধর্মাবলম্বীদের পবিত্র উৎসব। এ উৎসব বৈশাখের পূর্ণিমা তিথিতে উদ্‌যাপিত হয় বলে একে ‘ভেসাক’ও বলে। পালি ভাষায় বৈশাখ ভেসাক নামে পরিচিত। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বুদ্ধজয়ন্তী নামেও বেশ পরিচিত। জাতিসংঘসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে প্রতি বছর নানা আয়োজনের মাধ্যমে বুদ্ধপূর্ণিমা উদ্‌যাপন করা হয়। সিদ্ধার্থের জন্ম, বুদ্ধত্বলাভ এবং মহাপরিনির্বাণ লাভের মতো মহান ত্রিস্মৃতিবিজড়িত শুভবুদ্ধপূর্ণিমা এখন সর্বজনীন উৎসব।

বাংলাদেশেও নানা আয়োজনের মধ্য দিয়ে যথাযথ ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্য ও উৎসাহ-উদ্দীপনায় সাড়ম্বরে বুদ্ধপূর্ণিমা উদ্‌যাপিত হয়। এদিনে সরকারি ছুটি থাকে। বুদ্ধপূর্ণিমা উপলক্ষে বৌদ্ধদের একাংশ বিশেষ ব্যক্তি হিসেবে রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী ও সংসদে বিরোধীদলীয় নেতার সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করে শুভেচ্ছা বিনিময় করে। তা ছাড়া প্রতিটি বৌদ্ধ বিহারে বুদ্ধপূজা, ত্রিরত্ন বন্দনা, শীল গ্রহণ, প্রদীপ ও ধূপ প্রজ্বালন এবং বুদ্ধপূর্ণিমার তাৎপর্য নিয়ে আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। ঢাকা, চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন জায়গায় বৃহৎ পরিসরে শান্তি শোভাযাত্রা অনুষ্ঠিত হয়, এখানে সব সম্প্রদায় স্বতঃস্ফুর্ত অংশগ্রহণ করে। বুদ্ধপূর্ণিমার তাৎপর্য শুধু কোনো জাতি, গোষ্ঠী, সম্প্রদায় কিংবা বিশ্বের বৌদ্ধধর্মাবলম্বীদের জন্য নয়, এটি সমগ্র বিশ্বের মুক্তিকামী, মানবতাবাদী ও শান্তিকামী মানুষের জন্য।

ত্রিপিটকে উল্লেখ আছে : জগৎ অনাচার, পাপাচারে নিমজ্জিত হলে জগতের কল্যাণে এবং মানুষকে জীবনের সঠিক পথ দেখাতে, জীবের দুঃখমোচনে সম্যক সম্বুদ্ধের আবির্ভাব ঘটে। ভারতবর্ষ মানুষে মানুষে ভেদাভেদ, জাতপাতের চরম বৈষম্য, ধর্মের নামে প্রাণযজ্ঞ আর হিংসায় যখন মেতে উঠল; মানুষকে আলোর পথ দেখাতে বুদ্ধ মুক্তির পথপ্রদর্শক হিসেবে ধরায় আবির্ভূত হয়েছিলেন। মানুষ থেকে ক্ষুদ্র কীটপতঙ্গ পর্যন্ত সবার সুখ কামনা করার মতো উদার শিক্ষা তিনি দিয়েছেন। ‘জগতের সকল প্রাণী সুখী হোক’ এ কথা বুদ্ধের সৃষ্টি এবং ব্যাপ্তি কতটা এর ব্যাখ্যা-বিশ্লেষ্ণণ নতুন করে নিষ্প্রয়োজন। বুদ্ধের এ মহান বাণীকে আমরা আমাদের করে নেওয়ার সাধনায় কতটুকু সফল এবং সার্থক হতে পেরেছি সেটাই বিবেচ্য। 

বিশ্ব মৈত্রী সূত্রে বুদ্ধ বলেছেন, ‘যেসব প্রাণী দৃশ্য বা অদৃশ্য, যারা দূরে বাস করে বা কাছে বাস করে, যারা জন্মেছে বা জন্মিবে অর্থাৎ যারা মাতৃগর্ভে অথবা ডিম্বের ভেতরে আছে, যেখান থেকে পরে জন্মগ্রহণ করবে সবাই সুখী হোক।’ বুদ্ধ সকল জীবের সুখ কামনা করার মাধ্যমে এ শিক্ষাই দিয়েছেন যে, জীবের সুখ বিনষ্ট হয় এমন কর্ম করা থেকে বিরত থাকতে হবে এবং জীবের সুখ আনয়ন ও বৃদ্ধি হয় এমন কর্মই আমাদের সব সময় করতে হবে। ‘জগতের সকল প্রাণী সুখী হোক’ কেবল মুখে আওড়ালে ফল পাওয়া যাবে না। তাই বুদ্ধের পঞ্চনীতি অনুশীলনের বিকল্প নেই। ব্যক্তিগত, পারিবারিক, সামাজিক সর্বোপরি বিশ্বের সবাইকে সুখী হতে বা করতে হলে পঞ্চনীতি আঁকড়ে ধরে বাঁচতে হবে। সমাজ, রাষ্ট্রে কিংবা বিশ্বময় যত অশান্তি সৃষ্টি হচ্ছে এর সবকিছুর মূলে রয়েছে পঞ্চনীতির লঙ্ঘন। হত্যা, অদত্ত বস্তু গ্রহণ, মিথ্যা কামাচার, মিথ্যাচার, মাদক সেবন ও বাণিজ্যÑএসব নৈতিকতাবিরোধী কাজের কারণেই যত অশান্তির জন্ম হচ্ছে।

বুদ্ধ নিজে যা আচরণ করতেন তা জীবজগৎকে শিক্ষা দিতেন। প্রায়োগিক জীবনে বুদ্ধের সর্বজনীন ও বিশ্বমৈত্রীর এ শিক্ষা প্রতিফলন ঘটানোর বিকল্প নেই। ক্ষুধায় কাতর কোনো ব্যক্তিকে সুখী হতে বললে সে সুখী হবে না, তার ক্ষুধা নিবারণ করতে পারলে সে সুখ অনুভব করতে বাধ্য। রোগগ্রস্ত ব্যক্তির প্রয়োজন চিকিৎসা, রোগ থেকে আরোগ্য লাভ করতে পারলে সে অবশ্যই সুখী হবে। আজ দেশে দেশে নেতৃত্ব-কর্তৃত্বের ও আধিপত্যের জন্য যুদ্ধের দামামা, মানুষ থেকে প্রাণী সর্বোপরি প্রকৃতির ওপর মানুষের সহিংসতা, সন্ত্রাস ও নৈরাজ্য বিশ্বকে প্রতিনিয়ত অশান্ত করে তুলছে। সারা বিশ্বে আজ মানবতা ভূলুণ্ঠিত। বিশ্ববিবেক অকার্যকর। মানবের বিবেক পশুর বিবেকের চেয়েও অধমে নেমে গেছে। আজ বিজ্ঞানে নতুন নতুন আবিষ্কারে মানববিশ্ব অনেক সমৃদ্ধ হলেও মনুষ্যত্ব ও বিশ্বমানবতায় সমৃদ্ধ হতে পারেনি। ক্ষমতাধর ব্যক্তি, রাষ্ট্র এবং এসব দেশে জন্মগ্রহণকারী মানুষ আরও বেশি বিবেকবিবর্জিত হয়েছে। তারা নিত্যনৈমিত্তিক বিবেক-মানবতা বিরোধী এবং লোভ, দ্বেষ, মোহ, সংঘাত কিংবা হিংসা-প্রতিহিংসা ও জিঘাংসা-প্রবৃত্তিতে এবং সাম্রাজ্যবাদী মনোভাবে প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হয়েছে। এসব থেকে পরিত্রাণের জন্য বুদ্ধের শিক্ষার বিকল্প নেই। 

গৌতম বুদ্ধ সর্বক্ষেত্রে চেয়েছিলেন সমতা। এজন্যই বুদ্ধের মতবাদগুলো বিশ্বের নানা মতাদর্শের দার্শনিক ও পণ্ডিতরা গ্রহণ করেছিলেন। কারণ তার মতবাদে ছিল ‘সর্বজনীনতা’ ও নিরপেক্ষতা। বুদ্ধের সমাজ, রাষ্ট্র, ব্যক্তি কিংবা অর্থনৈতিক ভাবনায় কোনো ধরনের পক্ষপাতদুষ্ট ছিল না। বুদ্ধ ৪৫ বছর শান্তির নির্বাণধর্ম প্রচার করার পর ৮০ বছর বয়সে কুশিনগরের মল্লদের শালবনে মহাপরিনির্বাণ লাভ করেন। তিনি ধর্ম প্রচারের প্রথমেই তার নবদীক্ষিত শিষ্যদের উপদেশ দিয়ে বলেছিলেন, ‘হে ভিক্ষুগণ! তোমরা বহুজনের হিতের জন্য, বহুজনের সুখের জন্য এবং জগতের প্রতি অনুকম্পাবশত চারদিকে ছড়িয়ে পড়ো। তোমরা এমন ধর্ম প্রচার করো, যা মানুষের আদিতে কল্যাণ, মধ্যে কল্যাণ এবং অন্তেও কল্যাণপ্রদ হয়।’ যেখানে অশান্তি ও অস্থিতিশীলতা সেখানে সুখ বিরাজ করতে পারে না। 

তাই প্রাত্যহিক জীবন কেবল প্রার্থনামুখী না হয়ে আচরণ তথা অনুশীলনমুখী হতে হবে। তাই আজ বুদ্ধপূর্ণিমার এ শুভদিনে আমরা মহামতি গৌতম বুদ্ধকে স্মরণ করি, তার সাম্য, অহিংসা ও মৈত্রী, করুণা, মুদিতা, উপেক্ষার বাণী দিয়ে সব ধরনের হিংসা, যুদ্ধ, সংঘাত থেকে বিরত থেকে মানবিক আচরণ ও মানবধর্ম বজায় রাখি। বুদ্ধপূর্ণিমার আলোয় আমরা বলি, ‘জগতের সকল প্রাণী সুখী হোক।’

  • আবাসিক ভিক্ষু, ঢাকা আন্তর্জাতিক বৌদ্ধ বিহার
শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা