দিবস
ডা. মুহাম্মাদ মাহতাব হোসাইন মাজেদ
প্রকাশ : ২২ মে ২০২৪ ১০:৪৪ এএম
প্রাণপ্রকৃতির ভিত্তি জীববৈচিত্র্য। মানুষ, কর্মসংস্থান, টেকসই উন্নয়নসহ অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির সব ক্ষেত্র যেমন কৃষিকাজ, বনায়ন, মৎস্যসম্পদ, পর্যটনের সঙ্গে জীববৈচিত্র্য গভীরভাবে সম্পর্কযুক্ত। জীববৈচিত্র্যের ক্ষতি রোধ করার অর্থ হচ্ছে মানুষের জীবনজীবিকা সুরক্ষা ও ভালোভাবে বেঁচে থাকার জন্য বিনিয়োগ করা। স্বাধীনতার পর ১৯৭৪ সালে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান জীববৈচিত্র্য ও পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষার জন্য দূষণ নিয়ন্ত্রণ সেল ও বন্য প্রাণী সংরক্ষণ আইন প্রণয়ন করেন। এরই ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশ ১৯৯২ সালের ২২ মে কেনিয়ার রাজধানী নাইরোবিতে বায়োডাইভার্সিটি (সিবিডি) চুক্তিতে স্বাক্ষর করে। পরে ৫ জুন, ১৯৯২ সালে ব্রাজিলের রিওডি জেনিরোয় জাতিসংঘের পরিবেশ কর্মসূচির ধরিত্রী সম্মেলনে সিবিডি বিভিন্ন দেশের স্বাক্ষরের জন্য উন্মুক্ত করা হয়। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বিশ্বের ১৬৮টি দেশ সিবিডি চুক্তিতে স্বাক্ষর করে এবং সিবিডি ওই বছরের ২৯ ডিসেম্বর থেকে কার্যকর হয়। বর্তমানে এ চুক্তিতে স্বাক্ষরকারী দেশের সংখ্যা ১৯৫। পৃথিবীতে অসংখ্য জীব রয়েছে। সব জীবের সম্মিলনই জীববৈচিত্র্য, মানুষও এর বাইরে নয়। তবে গ্রামীণ বিভিন্ন পেশার মানুষ ও তাদের কর্মসংস্থানের সঙ্গে জীববৈচিত্র্যের সম্পর্ক অত্যন্ত গভীর।
জীববৈচিত্র্য
বাস্তুতন্ত্রের ভারসাম্য তৈরি করে এবং পৃথিবীকে বাসযোগ্য করে তোলে। বায়োটিক প্রজাতির
টেকসইতার জন্য এটি প্রয়োজনীয়। জীববৈচিত্র্য শিল্প, ফিশারি, পশুপালন, বনজ, ফার্মাসি
এবং কৃষিকাজের মতো ক্ষেত্রগুলোয় পরিষ্কার বাতাস এবং জল সরবরাহে ব্যবহৃত হয়। উচ্চ জীববৈচিত্র্য
অর্থনৈতিক লাভ এবং কৃষি, প্রযুক্তি এবং বিজ্ঞানের বিকাশে অবদান রাখে। ‘বায়োডাইভার্সিটি’
কথাটি সর্বপ্রথম ১৯৮৫ সালে ডব্লিউ জি রোজেন ও পরে ১৯৮৮ সালে ব্যবহার করেন পতঙ্গবিদ
ইও উইলসন। আর আমাদের প্রধান খাদ্যশস্য উদ্ভিজ্জ। বেঁচে থাকার জন্য আমাদের প্রয়োজন ৯০
ভাগ ক্যালরি। আমরা পেয়ে থাকি ৮০ রকমের উদ্ভিদ থেকে। প্রত্যক্ষ অবদান ছাড়াও জীববৈচিত্র্য
অনেক জাতিগোষ্ঠীর ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। প্রকৃতি
ও জীববৈচিত্র্য আমাদের বিশ্রাম ছাড়াও শান্তি, আনন্দ, সৌন্দর্য ও চিন্তার খোরাক জোগায়।
এ ছাড়া পরিবেশ ও প্রতিবেশের যথাযথ ভূমিকা পালনে জীবজগতের প্রাচুর্যতা খুবই সহায়ক ভূমিকা
পালন করে, যেমন পরাগায়নের জন্য অনেক সপুষ্পক উদ্ভিদ মৌমাছি, প্রজাপতি, পাখি ও বাদুড়ের
উপস্থিতি ও প্রাচুর্যতার সঙ্গে সম্পর্কিত।
পানির প্রধান
উৎস সমুদ্র নানাভাবে দূষণের শিকার। সকল প্রকার বর্জ্য আবর্জনা এবং পারমাণবিক পরীক্ষার
শেষ স্থল সাগর-মহাসাগর। এক জরিপে দেখা গেছে, প্রতি বছর প্রায় ২০ বিলিয়ন টন বর্জ্য ও
বিভিন্ন প্রকার আবর্জনা সাগরে নিক্ষিপ্ত হচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে জাহাজ ও ট্যাংকার থেকে
নিষ্কাশিত পরিশোধিত ও অপরিশোধিত তেল ও বিষাক্ত রাসায়নিক পদার্থ। নার্ভ গ্যাস, বড় ও
মাঝারি আকারের পাট, কাগজ, টেক্সটাইল, সার, প্লাস্টিক, ট্যানারি, খাদ্য ও পানীয়, চিনি,
তামাক, অ্যালকোহলজাতীয় শিল্পকারখানার নির্গত তেজস্ক্রিয় বর্জ্য পদার্থ সরাসরি এবং মৃত্তিকা
থেকে নিঃসরিত হয়ে সমুদ্রে নিক্ষিপ্ত হচ্ছে। এসব বিষাক্ত বর্জ্য ও রাসায়নিক পদার্থ সমুদ্রে
প্রতিনিয়ত নিক্ষেপের ফলে সামুদ্রিক পরিবেশ বিষাক্ত হয়ে উঠেছে। এতে সামুদ্রিক বিভিন্ন
প্রজাতির উদ্ভিদ, প্রাণী ও মৎস্যকুলের অস্তিত্ব বিপর্যস্ত হতে চলেছে। সুতরাং সেদিকে
আমাদের দিতে হবে সজাগ দৃষ্টি। পরিবেশদূষণ, সামুদ্রিক দূষণ কোনোভাবেই কাম্য নয়।
আমাদের প্রজন্মের সবার সমবেত এবং শক্তিশালী প্রচেষ্টাই পারে প্রতিবেশকে অক্ষুণ্ন এবং সমৃদ্ধ রেখে টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করতে। হারানো প্রকৃতি ও প্রতিবেশ পুনরুদ্ধারের মাধ্যমেই আমরা এ ধরিত্রী টিকিয়ে রাখতে সক্ষম হব। তাই পরিবেশ পুনরুদ্ধারই হোক আজকের প্রজন্মের একমাত্র অঙ্গীকার। পরিবেশ হবে আমাদের অনুকূলে। সুগঠিত সমাজ পাব, পাব নয়নাভিরাম, মুগ্ধকর পরিবেশ। তাই পরিবেশবান্ধব বাসযোগ্য বিশ্ব গড়ে তুলতে জীববৈচিত্র্য রক্ষা জরুরি। এজন্য সবাইকে দায়িত্বসচেতন হতে হবে।