× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

ইরানে হেলিকপ্টার দুর্ঘটনা

রাইসির প্রাণহানী যেসব প্রশ্ন তুললো

শাহরাম খোলদি

প্রকাশ : ২১ মে ২০২৪ ০৯:৫৬ এএম

রাইসির প্রাণহানী যেসব প্রশ্ন তুললো

হেলিকপ্টার দুর্ঘটনায় ইরানের প্রেসিডেন্ট ইব্রাহিম রাইসির মৃত্যুর পরে প্রেসিডেন্ট কে হবেন- এ নিয়ে ইতোমধ্যে নানা জল্পনা-কল্পনা শুরু হয়েছে। কারণ নতুন প্রেসিডেন্ট ইরানের ভবিষ্যৎ রাজনীতির গতিবিধি পরিবর্তনে প্রভাব রাখতে পারেন। প্রেসিডেন্ট রাইসির মৃত্যুর পর দেশটির প্রধান নেতা দেশের মানুষকে আশ্বস্ত করে জানিয়েছেন, রাইসির মৃত্যুতে দেশটির অভ্যন্তরীণ প্রশাসনিক ব্যবস্থায় কোনো সংকট দেখা দেবে না। ইরানের রাজনৈতিক ব্যবস্থার সঙ্গে যারা পরিচিত নন তারা দেশটির অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সংকট নিয়ে নানা আশঙ্কা প্রকাশ করেন। এর যুক্তিসংগত কারণও আছে। দেশটির রাজনৈতিক পরিস্থিতি বৈচিত্র্যপূর্ণ এবং প্রতিদ্বন্দ্বী রাজনৈতিক পক্ষগুলো সবসময় চূড়ান্ত ক্ষমতায় যাওয়ার সুপ্ত প্রতিযোগিতায় লিপ্ত। সমস্যা হলো, ইরানের রাজনীতির বৈধতা প্রসঙ্গে গোটা বিশ্বমানসে যে ধারণা রয়েছে তা পরিপূর্ণভাবে প্রকাশ পায় রাইসির মৃত্যুর পর তাকে নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নানা মিম দেখার মাধ্যমে। ইরানের ভেতরে এমনকি বাইরে এসব মিম দেখলে দেশটির রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা এবং আঞ্চলিক সংকট প্রকট হয়ে ওঠে। রাইসির মৃত্যু ইতোমধ্যে দেশটিতে নানা সংকট তৈরি করেছে, যা বাইরে থেকে অনুমান করা কিছুটা কঠিন। ইরানে প্রেসিডেন্টের ভূমিকা এবং তার অনুপস্থিতি কেমন সংকট তৈরি করে তা খতিয়ে দেখতে হবে।

ইরানে প্রেসিডেন্টের কার্যালয়ে যিনি দায়িত্বপালন করেন তার ভূমিকা নিয়ে অত্যুক্তি করার সুযোগ নেই। সেন্ট এন্ড্রুজ বিশ্ববিদ্যালয় ইরানের প্রেসিডেন্ট পদের ভূমিকা নিয়ে একটি জরিপ প্রকাশ করে। জরিপে বলা হয়, প্রেসিডেন্ট সব সময় ইরানের সুপ্রিম নেতার আজ্ঞাবাহীর ভূমিকায় থাকেন। এ ধরনের ক্ষমতার কাঠামো অনেকাংশে সালতানাতের মতোই ভূমিকা পালন করেছে। দেশটির সংবিধানের ১০৮ ধারা অনুসারে, সুপ্রিম নেতার কার্যালয়েই রাষ্ট্রের সর্বময় ক্ষমতা রয়েছে। ইরানের সুপ্রিম নেতাই মূলত ক্ষমতা প্রয়োগে স্বাধীন। ধর্মীয়, রাজনৈতিক, প্রশাসনিক এমনকি আমলাতান্ত্রিক কাঠামোতেও তার ক্ষমতাই চূড়ান্ত। এ ধরনের ক্ষমতাকাঠামো মধ্যযুগের পোপ কিংবা খিলাফত ব্যবস্থার সঙ্গে তুলনীয়। ইরানের সুপ্রিম নেতা খামেনি প্রেসিডেন্ট পদটিকে সামান্য মুখ্য কর্মকর্তার ভূমিকায় পরিণত করেছেন।

প্রেসিডেন্ট রাইসি তার পূর্ববর্তী প্রেসিডেন্টদের থেকে কিছুটা ভিন্ন ছিলেন। তিনি সুপ্রিম নেতার সবচেয়ে অনুগত ‘কর্মকর্তা দাস’-এর ভূমিকা পালন করেছিলেন। তার রাজনৈতিক হালনাগাদও পূর্ববর্তী সব প্রেসিডেন্ট থেকে ভিন্ন দেখায়। রাইসি মূলত শিয়া মাধ্যমিক স্কুল অর্থাৎ হাক্কানি স্কুলের অ্যালামনাই ছিলেন। তিনি ও তার সহপাঠীদের একটি অংশ পরবর্তীকালে সুপ্রিম নেতার ক্ষমতাকে রূপদান করেন। সুপ্রিম নেতার অনুগত এবং দক্ষ ব্যক্তিদের প্রশাসনের বিভিন্ন স্থানে নিয়োগ দেন তারা। জুডিসিয়ারি কর্মকর্তা থেকে দ্রুতই তিনি প্রাদেশিক প্রসিকিউটর পদে পদোন্নতি লাভ করেন। ১৯৮৮ সালে রাইসি বিপ্লবী কারাভোগকারীদের অনেককে মৃত্যুদণ্ডাদেশ দেন। রাইসির রাজনৈতিক সিভি পর্যালোচনা করলে তাকেও বিপ্লবী আখ্যা দিতে হয়। তবে তিনি ছিলেন আমলাতান্ত্রিক বিপ্লবী। খোমেনির মৃত্যুর পর রাইসি তেহরানের চিফ প্রসিকিউটর হন। খামেনি রাইসির মধ্যে সেই আনুগত্য দেখতে পেয়েছিলেন এবং এজন্য রাইসিকে ১৯৯৪ সালে স্টেট জেনারেল ইন্সপেক্টরেটের প্রধান নিয়োগ দেওয়া হয়। ২০০৪-২০১৪ সাল পর্যন্ত রাইসি জুডিসিয়ারি চিফ ডেপুটির দায়িত্বপালন করেন। ২০১৫-১৯ সাল পর্যন্ত ইরানের মাল্টিবিলিয়ন ডলারের ধর্মীয় ট্রাস্ট আস্তান এ কুদসের চিফ ট্রাস্টির দায়িত্বপালন করেন। আস্তে আস্তে তিনি তার পদোন্নতি ঘটানÑ যা মূলত খামেনির প্রতি তার আনুগত্যের প্রকাশের মাধ্যমেই সম্ভব হয়েছে।

২০১৬ সালে রাইসিকে অ্যাসেম্বলি অব এক্সপার্টসের সদস্যপদ দেওয়া হয়। ২০১৯ সালেই তিনি জুডিসিয়ারি চিফের দায়িত্ব পান। খামেনির প্রতি নিজের আনুগত্য প্রকাশ করতে রাইসি ওই সময় দুর্নীতিবিরোধী বিচার পরিচালনায় বেশি জোর দেন। এই বিচারকার্যের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক প্রভাবশালী লারিজানি ভাইদেরও তিনি বিচারের আওতায় নিয়ে আসেন। ২০২১ সালে রাইসি খামেনির গার্ডিয়ান কাউন্সিলে নিয়োগ পাওয়ার পাশাপাশি প্রেসিডেন্ট হিসেবে নির্বাচিত হন। গার্ডিয়ান কাউন্সিল ওই সময় অনেক যোগ্য প্রার্থীদেরও প্রেসিডেন্ট পদের জন্য বিবেচনা করেনি। এভাবেই রাইসিকে সুপ্রিম নেতার সবচেয়ে অনুগত প্রশাসনিক কর্মকর্তা হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার কাজটি সম্পন্ন হয়। প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের সময় ভোটকেন্দ্রে ভোটারের উপস্থিতিও আশানুরূপ হয়নি। বহু ইরানিই ওই নির্বাচন বয়কট ঘোষণা করেছিল।

প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে তার জয়ই বলে দিয়েছিল রাইসি খামেনির প্রধান অস্ত্র। অন্তত প্রশাসনিক কার্যক্রমের ক্ষেত্রে। এই মুহূর্তে আইআরজিসি দেশটির অর্থনৈতিক কার্যক্রমের সিংহভাগ পরিচালনা করে। ইরানের সামরিক প্রক্সিগুলোর ওপরও তাদের বড় নিয়ন্ত্রণ রয়েছে। আইআরজিসি মূলত সুপ্রিম নেতার সর্বময় কর্তৃত্বকে আরও পোক্ত করে। রাইসির মৃত্যুর পর এ বিষয়টি নিয়ে যে শঙ্কা দেখা গিয়েছে তা নিয়ে ভাবার অত কারণ নেই। কারণ ইরানের সংবিধান অনুসারে প্রেসিডেন্টের আকস্মিক মৃত্যু কিংবা নির্বাচনী ব্যবস্থার মাধ্যমে কার্যপরিচালনাকারী নিয়োগ করতে না পারলে প্রেসিডেন্টের সহকারী তার দায়িত্ব পালন করবেন। ইসলামিক কনসালটেটিভ অ্যাসেম্বলির স্পিকার কাউন্সিলের সদস্য। তারা প্রেসিডেন্টের ডেপুটির সঙ্গে সমন্বয় করে পঞ্চাশ দিনের মধ্যে একটি নির্বাচন আয়োজন করবেনÑ এ কথাও উল্লেখ রয়েছে। কিন্তু প্রেসিডেন্টের যদি কোনো ডেপুটি না থাকে এমনকি ডেপুটিও যদি আকস্মিকভাবে মৃত্যুবরণ করেন কিংবা নিজের দায়িত্বপালনে অক্ষমতা প্রদর্শন করেন, তাহলে সুপ্রিম নেতা প্রেসিডেন্ট নিয়োগ দেওয়ার এখতিয়ার রাখেন। তবে নতুন প্রেসিডেন্ট নিয়োগের কাজটি বেশ জটিল হয়ে গেছে

প্রেসিডেন্ট নিয়োগের আগে সুপ্রিম নেতা খামেনি মারা গেলে পুরো দেশে অরাজক পরিস্থিতি দেখা দেবে। এমন ঘটনা অতীতেও ঘটেছে খোমেনির মৃত্যুর পর। তবে গোটা বিশ্বে ইরান রাষ্ট্রটির গ্রহণযোগ্যতা এই মুহূর্তে অনেক কম হওয়ায় জটিলতা আরও বেড়েছে। ২০২২-২৩ সালে ইরানে ‘নারী, জীবন, মুক্তি’ আন্দোলনের মাধ্যমে ইরানের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিস্থিতির জটিলতা আমরা শনাক্ত করতে পেরেছি। বিশেষত ইরানের অর্থনৈতিক অবস্থাও বেশ নাজুক। দেশটির ষাট শতাংশ মানুষ দরিদ্র। তা ছাড়া দেশটি গ্রহণযোগ্যতার সংকটেও ভুগছে। ফলে খামেনির পতনই ইরানের জন্য সবচেয়ে বড় শংকার কারণ হতে পারে। এই মুহূর্তে গোটা ইরানের প্রশাসনিক ব্যবস্থা ‘সারভাইভ্যাল অব দ্য রেজিমে’ মূলনীতির ওপর প্রতিষ্ঠিত। অ্যাসেম্বলি অব এক্সপার্টস হয়তো সায়েদ মোজতবা খামেনিকে প্রেসিডেন্ট নিয়োগ দিতে পারে।

মোজতমা খামেনি নিজেও আইআরজিসির অন্যতম অনুগত ব্যক্তি এবং তিনি এই আনুগত্যকে সানন্দেই গ্রহণ করেছেন। তিনি যদি প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন, তাহলে এই অঞ্চলে আবার পুরোনো ব্যবস্থা চালু হতে পারে। তার নেতৃত্বে ইরানে আবার ধর্মতান্ত্রিক ব্যবস্থা চালু হতে পারে। মধ্যযুগের শিয়া ইমামতি সাম্রাজ্যের মতোই তিনি তার কার্যক্রম পরিচালনা করবেন, যা এই অঞ্চলকে আরও পিছিয়ে দিতে পারে। এই শঙ্কা এখন অনেকের। শঙ্কা থেকে যদিও সদুত্তর পাওয়া কঠিন।

  • শিক্ষাবিদ ও প্রদায়ক, ইরান ইন্টারন্যাশনাল

ইরান ইন্টারন্যাশনাল থেকে সংক্ষেপিত অনুবাদ: আমিরুল আবেদিন

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা