× ই-পেপার প্রচ্ছদ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি ফিচার চট্টগ্রাম ভিডিও সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

নিরাপদ কৃষিব্যবস্থা

জৈব কীটনাশকের ব্যবহার বাড়ুক

ড. বিভূতি ভূষণ মিত্র

প্রকাশ : ২০ মে ২০২৪ ০৮:১৩ এএম

ড. বিভূতি ভূষণ মিত্র

ড. বিভূতি ভূষণ মিত্র

কীটনাশক একটি বিষাক্ত পদার্থ। এটি ফসলের ক্ষেত, শিল্প কারখানা, ঘরবাড়িতে ব্যবহার করা হয়Ñ যা কীটপতঙ্গ মেরে ফেলতে পারে। মূলত উৎপাদন বাড়াতে ফসলের ক্ষেতে কীটনাশকের ব্যবহার করা হলেও কীটনাশকের ক্ষতিকর প্রভাবও রয়েছে। কীটনাশক মূলত পোকামাকড়, ছত্রাক, ইঁদুর, বিভিন্ন প্রাণী মারার জন্য ব্যবহৃত হয়। এটি তিনভাবে পাওয়া যায়। গুঁড়ো, তরল ও অ্যারোসল। পোকা দমনে কীটনাশক ব্যবহার করা হয়। এ ছাড়া হাসপাতালে অস্ত্রোপাচারের যন্ত্র জীবাণুমুক্ত করতে এসব ব্যবহার হয়ে থাকে। একটি তথ্য অনুযায়ী কীটনাশকের ব্যবস্থা গ্রহণ না করলে ৭০% পর্যন্ত ফলন নষ্ট হয়ে যেতে পারে। এই ৭০%-এর ৩০-৩৫% ফলন নষ্ট হয় আগাছার কারণে, ২০-২৫% ফলন নষ্ট হয় পোকামাকড়ের কারণে, ১৫-২০% ফলন নষ্ট হয় রোগবালাইয়ের কারণে। আমেরিকার এক গবেষণা অনুযায়ী কীটনাশকের জন্য একগুণ টাকা খরচ করলে চারগুণ বেশি আয় করা যায়। কীটনাশক ব্যবহার না করলে ১০% পর্যন্ত ফলন কমে যেতে পারে।

বাংলাদেশে ৩৭৭টি কীটনাশক বাজারজাতকরণের জন্য নিবন্ধনকৃত। এসব কীটনাশকের সবই কম-বেশি বিপজ্জনক। রাসায়নিক কীটনাশকের কিছু আছে যা ব্যবহারের পর ৩-২১ দিন পর ফসল তোলা যায়। আবার কিছু রাসায়নিক কীটনাশক আছে যেটি ব্যবহার করলে ৬ মাস পর ফসল তুলতে হয়। আমরা তা মানছি না। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে, কীটনাশক প্রয়োগের দুয়েক দিনের মধ্যেই আমরা তা বাজারে বিক্রি করে দিচ্ছি। রাসায়নিক কীটনাশক ব্যবহারে উৎপাদন বাড়লেও পরিবেশ ও মানুষের অনেক ক্ষতি করে। রাসায়নিক কীটনাশক ব্যবহারের সফলতা অনেক। এর ফলে ফসল পোকামাকড় তো বটেই, ক্ষতিকর প্রাণী থেকেও রক্ষা পায়। খাদ্যশস্য নষ্ট কম হয়। অনেক পোকামাকড় ডেঙ্গু ম্যালেরিয়াসহ বিভিন রোগের বাহক। এসব পোকামাকড় দমনের ফলে রোগের সংক্রমণ কম ঘটে। কৃষক অর্থনৈতিকভাবে বেশি লাভবান হন।

রাসায়নিক কীটনাশক ব্যবহারে মাটি, পানি, বাতাস দূষিত হয়। পোকামাকড় মেরে ফেলার কারণে জীববৈচিত্র্য হ্রাস পায়। জনস্বাস্থ্যের ওপর মারাত্মক প্রভাব পড়ে। এর ফলে ক্যানসারসহ নানাবিধ রোগ দেখা যায়। সবচেয়ে বড় সমস্যা দেখা যাচ্ছে এর অতিমাত্রিক ব্যবহারে। কীটনাশক পরিমিত ব্যবহার না করার কারণে মানুষ ও পরিবেশের জন্য এটি মারাত্মক হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। এখন রাসায়নিক কীটনাশকের বিকল্প ব্যবস্থা নিয়ে ভাবা হচ্ছে। বিকল্প হিসেবে বিজ্ঞানীরা জৈব কীটনাশক ব্যবহারের কথা বলছেনÑ যা পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর নয়। এ ছাড়া ফসলের ঘূর্ণায়মান ব্যবস্থা ও নানাবিধ জৈব নিয়ন্ত্রণও হতে পারে। রাসায়নিক কীটনাশকের মাত্রাতিরিক্ত ব্যবহারের ফলে জমির উর্বরতা হ্রাস পাচ্ছে। রাসায়নিক কীটনাশক ব্যবহারে সবচেয়ে বেশি দূষিত হচ্ছে জলাশয় ও জলাশয়ের জীববৈচিত্র্য। এসব কীটনাশক বৃষ্টি হলে পুকুর, নদী, নালা, খাল, বিলে জমা হয়। পানিতে ভাসমান বিভিন্ন ফাইটোপ্লাংকটন ও জুওপ্লাংকটন মেরে ফেলে। মাছের খাদ্য ঘাটতি দেখা যায়। মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের তথ্য মতে, আমাদের দেশে ব্যবহৃত রাসায়নিক কীটনাশকের ৬০% চরম বিষাক্ত, ৩০% কম বিষাক্ত ও ১০% বিষাক্ত নয়। অর্থাৎ সবই কমবেশি ক্ষতিকর।

কীটনাশক আমাদের দেশে যথেচ্ছভাবে ব্যবহৃত হয়। একটি তথ্য অনুযায়ী আমাদের দেশে ৫৫ হাজার টনেরও বেশি রাসায়নিক সার এবং ৪০ হাজার টন কীটনাশক ব্যবহৃত হয়। অধিকাংশ কৃষকই এসব ব্যবহারের সঠিক নিয়ম জানেন না। কখন, কীভাবে এগুলো ব্যবহার করতে হবে এবং এসব ব্যবহারের পর কখন ফসল উত্তোলন করা যাবে, তা জানা নেই অনেক কৃষকের। কীটনাশকের যথেচ্ছ ব্যবহারে সবচেয়ে ঝুঁকিতে পড়ছে জনস্বাস্থ্য। খাদ্যের বিষক্রিয়ায় মানুষের বিভিন্ন অঙ্গ বিকল হয়ে পড়ছে। শ্বাসকষ্ট, কিডনি ও লিভারে নানা রকম সমস্যা দেখা দিচ্ছে। বিকলাঙ্গ শিশু জন্মাচ্ছে। কীটনাশকের বংশবিস্তার আমাদের দেশে বেশি। এখানকার তাপমাত্রা ও আর্দ্রতা পোকামাকড় বংশবিস্তারে বেশি সহায়ক। এজন্য বাণিজ্যিকভাবে কৃষকরা কিছু উৎপাদন করতে চাইলে পোকামাকড় দমন করা একটা চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়। এক্ষেত্রে কৃষকরা এত বেশি কীটনাশক ব্যবহার করেন যে, কিছু কিছু সবজির ক্ষেত্রে প্রায় প্রতিদিনই কীটনাশক ব্যবহার করা হয়। আম উৎপাদনে দেখা গেছে ১৫ থেকে ১৬ বার কীটনাশক ব্যবহার করা হয়।

কীটনাশক বিভিন্ন রকমের হতে পারে। জৈব, অজৈব, কৃত্রিম, জৈবিক ইত্যাদি। আবার কিছু কীটনাশক ইঁদুরনাশক হিসেবে, কিছু ব্যাকটেরিয়ানাশক হিসেবে, কিছু ছত্রাকনাশক হিসেবে কাজ করে। কীটনাশক প্রয়োগে আমাদের সতর্ক হওয়া জরুরি। কেননা কীটনাশকে যেসব রাসায়নিক উপাদান ব্যবহার করা হয় সেগুলো হলোÑ অক্সিজেন, ক্লোরিন, সালফার, ফসফরাস, নাইট্রোজেন, ব্রোমিন, আর্সেনিক, কপার, সালফেট, সিসা, পারদ ইত্যাদি। প্রয়োগকৃত এসব কীটনাশক ও আগাছানাশকের ৯৮ ও ৯৫ ভাগই বাতাসে, পানিতে ও মাটিতে মিশে যায়। ব্যবহৃত কীটনাশকের একেবারে মিহি দানাগুলো বাতাসে মিশে যায় এবং বাতাসকে দূষিত করে। আর মোটা দানাগুলো মাটিতে গিয়ে মিশে উপকারী ও ক্ষতিকর উভয় ধরনের পোকামাকড়ই মেরে ফেলে। এসবের কিছু অংশ গাছে শোষিত হয়ে ফল ও ফুলের মধুতে থেকে যায়Ñ যা মৌমাছিসহ অন্যান্য পরাগায়নকারী কীটপতঙ্গকে মেরে ফেলতে পারে। ব্যবহৃত কীটনাশক উপকারী অণুজীব মেরে ফেলে বলে সেসব অণুজীব যেসব জৈব পদার্থ ভেঙে উদ্ভিদের শোষণ উপযোগী করতে পারত তা ব্যাহত হবে। এতে করে উদ্ভিদের পুষ্টি সরবরাহ বিঘ্নিত হবে।

ব্যবহৃত রাসায়নিক কীটনাশকের বিকল্প হিসেবে এখন জৈব বালাই ব্যবস্থাপনা, ফেরোমন ফাঁদ ব্যবহার এসব রয়েছে। গত দুই দশকে সারা বিশ্বে রাসায়নিক কীটনাশকের বিকল্প হিসেবে জৈব কীটনাশকের ব্যবহার অনেক বেড়েছে। নিরাপদ জৈব কীটনাশকের ব্যবহার নিয়ে নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে আলোচনা বেশি হওয়া দরকার। কেননা আমরা যেসব কীটনাশক ব্যবহার করি তার কোনোটাই পরিবেশের জন্য ভালো নয়। নিরাপদ কীটনাশক পরিবেশবান্ধব। এটি কীটনাশ করলেও মাটি, পানি, বায়ু ও ফসলের কোনো ক্ষতি করে না। বরং পরিবেশ রক্ষা করে।

এখন কীটনাশক প্রাকৃতিকভাবেও তৈরি করা হয়। এই ধরনের কীটনাশক এখন ব্যবহার করা হচ্ছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, কানাডার মতো দেশগুলোতে। পোকামাকড়, ছত্রাক, ব্যাকটেরিয়া দমনে ভেষজ কীটনাশক যেমনÑ কেনোলা তেল, নিম তেল, নিম বীজ ও পাতার নির্যাস এসব ব্যবহার হচ্ছে। এসব ব্যবহারে পরিবেশের কোনো ক্ষতি হয় না। কোনো ধরনের স্বাস্থ্যঝুঁকি থাকে না। তাই নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে এসবের ব্যবহার যেন বেশি হয়, সেদিকে এগিয়ে আসতে হবে। জৈব বালাইনাশক বাজারজাতকরণে মনোযোগ বাড়াতেই হবে। তাহলেই দীর্ঘস্থায়ী নিরাপদ কৃষিব্যবস্থা গড়ে উঠবে।

  • শিক্ষক ও গবেষক
শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মুস্তাফিজ শফি

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০১৯১১০৩০৫৫৭, +৮৮০১৯১৫৬০৮৮১২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০১৭১২০৩৩৭১৫ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা