অগ্নিকাণ্ড
একেএম শাকিল নেওয়াজ
প্রকাশ : ১৯ মে ২০২৪ ০৯:২৪ এএম
একেএম শাকিল নেওয়াজ
১৮ মে রাজধানীর ধোলাইখালে একটি বাণিজ্যিক ভবনের দ্বিতীয়তলায় অবস্থিত একটি বেসরকারি ব্যাংকে আগুন লাগে। একইদিন রাজধানীর কারওয়ান বাজারে কাঁচা বাজারেও অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। আগুন লাগার খবর পাবার পরই ফায়ার সার্ভিসকর্মীরা দ্রুততম সময়ে আগুন সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে আনতে সক্ষম হন। স্বস্তির কথা, দুটো অগ্নিকাণ্ডই দ্রুততম সময়ে নিয়ন্ত্রণে আসায় হতাহতের কোনো ঘটনা ঘটেনি। এই যে প্রায় ধারাবাহিকভাবে রাজধানীসহ দেশের নানাস্থানে অগ্নিদুর্ঘটনা ঘটছে, এসব মর্মস্পর্শী দুর্ঘটনা আমাদের সামনে বহুমাত্রিক প্রশ্ন দাঁড় করায়। এ প্রেক্ষাপটে সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের নানা বিশ্লেষণ সংবাদমাধ্যমে উঠে এসেছে। আমিও করেছি। কিন্তু সাম্প্রতিক তাপপ্রবাহের প্রেক্ষাপটে এ নিয়ে আরও ভিন্ন মাত্রায় বিশ্লেষণের দাবি রাখে। তীব্র গরমে ভবনে যেকোনো সময় অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার আশঙ্কা কম নয়। ভবনে অগ্নিদুর্ঘটনা প্রতিরোধে মূলত ভবন অবকাঠামোর বিষয়ে গুরুত্ব আরোপ করা জরুরি। অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা নিয়ন্ত্রণের চেয়ে অগ্নিদুর্ঘটনা প্রতিরোধ করতে আমাদের সচেষ্ট হওয়া প্রয়োজন। এক্ষেত্রে ভবন নির্মাণের সময়েই কিছু বিষয়ে বাড়তি মনোযোগ দিতে হবে। যদিও ভবন কর্তৃপক্ষ অধিকাংশ ক্ষেত্রেই অগ্নিদুর্ঘটনার বিষয়গুলো এড়িয়ে যায়। আবার অনেকে অসচেতনতাবশত অনেক বিষয় জানেন না ফলে তাদের ভবনগুলোতে নানা ত্রুটিবিচ্যুতি থেকে যায়।

স্থপতিরা অগ্নিনির্বাপণব্যবস্থা
ও অগ্নিঝুঁকি নিরসনে যা কিছু করণীয় তার ভিত্তিতেই একটি ভবনের নকশা প্রণয়ন করেন। তবে
শহর, গ্রাম- এ দুই অঞ্চলের মধ্যে কিছু সাধারণ পার্থক্য রয়েছে। এ পার্থক্যের ভিত্তিতেই
ভবনের নকশা করা জরুরি।
মহানগর-নগর কিংবা
গ্রামাঞ্চলেও আধুনিক অবকাঠামোর ছোঁয়া দেখা যাচ্ছে। কিন্তু অপরিকল্পিতভাবে অবকাঠামো
নির্মাণের কাজ করার ক্ষেত্রে অনেকেই কিছু ভুল করেন। মূলত ভবন অবকাঠামো নকশা করার সময়
স্থপতিকে কিছু বিষয়ে বাড়তি গুরুত্ব দিতে হবে। বিল্ডিং কোড যথাযথভাবে অনুসরণ করে নকশা
প্রণয়ন করা জরুরি। পাশাপাশি অবকাঠামো যেন পরিবেশসংবেদনশীল, অগ্নিঝুঁকিমুক্ত ও তাপনিরোধী
হয়ে উঠতে পারে সেসব বিষয়েও ভাবতে হবে।
নগরাঞ্চলের অবকাঠামোগত
নকশা প্রণয়নের ক্ষেত্রে স্থপতি বা নকশাকারের বাড়তি গুরুত্ব রয়েছে। যেকোনো অবকাঠামো
নির্মাণের আগে ভাবতে হবে কীভাবে ভবনের আশপাশে খালি জায়গা পাওয়া যায়। ভবনের ঘনত্ব ও
তার টেকসয়তার দিকেও বাড়তি মনোযোগ কাঙ্ক্ষিত। শুধু তাই নয়, অবকাঠামোর পাশে সবুজায়ন ও
নর্দমা-জলাশয় তৈরির বিষয়টি নিয়েও ভাবা জরুরি। অবকাঠামো নির্মাণের ক্ষেত্রে নকশা প্রণয়নের
বিষয়টি যতটা না গুরুত্বপূর্ণ তার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ সুপরিকল্পনা করা। এ ক্ষেত্রে
অগ্নিবিশেষজ্ঞ, পুরকৌশলী এবং এমইপি কনসালট্যান্টদের সমন্বয় জরুরি। প্রশ্ন হচ্ছেÑএ সমন্বয়
কেন জরুরি? জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে তাপমাত্রা বেড়েই চলেছে। বেশ কয়েকটি গবেষণা প্রতিবেদন
বলছে, নগর-মহানগরে মনুষ্যসৃষ্ট তাপ বেরোতে পারছে না। ফলে শহরে তাপমাত্রা ও দাবদাহের
প্রভাব আরও নেতিবাচক হয়ে উঠছে।
নগরের অবকাঠামো
তাপনিরোধী করে তোলার স্বার্থেই বিশেষজ্ঞদের সমন্বয় জরুরি। প্রথমত অগ্নিবিশেষজ্ঞ বা
ফায়ার সার্ভিসের কাজের সঙ্গে যারা যুক্ত আছেন তারা অগ্নিঝুঁকির বিষয়ে দক্ষতা অর্জন
করেছেন পেশাগত অবস্থানে থেকে। অগ্নিঝুঁকি নিরসনের ক্ষেত্রে তাদের এ অভিজ্ঞতা পরিকল্পনায়
নিরাপত্তার সর্বোচ্চ নিশ্চয়তা দিতে পারে। পুরকৌশলী মূলত নকশায় থাকা ধারণাটি বাস্তবে
প্রতিষ্ঠা সম্ভব কি না যাচাইবাছাই করবেন। একটি নকশায় যে ধরনের উপকরণ ব্যবহারের প্রস্তাব
বা পরিকল্পনা থাকে সেগুলো আদৌ ওই ভবনের সঙ্গে মানানসই হবে কি না তা তারা বিশ্লেষণ করে
কিছু সংশোধন করতে পারেন। ভবনের নান্দনিকতার সঙ্গে উপকরণের সমন্বয় ও অবকাঠামোগত বিষয়াবলি
এ ক্ষেত্রে অন্তর্ভুক্ত।
অবকাঠামো নির্মাণের
পরিকল্পনা ও পুরকৌশলগত দিক নিয়ে যখন সবিস্তার পর্যালোচনা হবে তার পরও মধ্যবর্তী কিছু
বিষয়ে পর্যালোচনা থাকা জরুরি। মেকানিক্যাল, ইলেকট্রিক্যাল, প্লাম্বিংব্যবস্থাÑএ তিনটি
বিষয় আলাদা বিবেচনা করতে হবে। মূলত এ তিনটি আলাদা বিভাগ নিয়ে সব সময় কাজ হয়। তবে এ
ব্যবস্থাগুলো আদৌ অগ্নিঝুঁকি কমাতে সক্ষম কি না এমন ভাবনা অন্তর্ভুক্ত করা হয় না। ধোঁয়ানির্বাপণ,
জরুরি অবস্থায় আলোর ব্যবস্থা, আগুন লাগলে তা যেকোনোভাবে নেভানোর ব্যবস্থা পরিকল্পনাগতভাবে
রাখতে হবে। আর এসব বিষয় সম্পর্কে কোনো অস্বস্তি থাকলে বিল্ডিং কোড সম্পর্কে জানা আবশ্যক।
বিল্ডিং কোড অনুসরণের পাশাপাশি অগ্নিঝুঁকি নিরসনে যেসব নিয়মনীতি রয়েছে তা নিশ্চিত করার
মাধ্যমেই ভবিষ্যৎ ঝুঁকি নিরসন সম্ভব। আবার কিছু ভবন আছে যেগুলো অনেক আগেই তৈরি হয়েছে।
এ ধরনের ভবনে কিছু সংস্কার আনতে হবে। প্রথমে ভাবতে হবে, ভবন নির্মাণের আগে অগ্নিঝুঁকি
নিরসনে কী কী পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। এ ক্ষেত্রে বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ নেওয়া জরুরি। আর
নতুন ভবনে যখন এসব বিষয় অন্তর্ভুক্ত রাখা হবে না তখন পরবর্তীতে বাড়তি ব্যয় হিসেবে এমন
সংস্কার চলে আসবে।
যেকোনো অবকাঠামোয় আগুন লাগলে প্রথমেই নকশা প্রণয়নকারীকে তার দায় সামলাতে হয়। একজন স্থপতি যদি কোনো নকশা তৈরির সময় দায়সারা কাজ করেন তাহলে নকশা ও অবকাঠামো নির্মাণের সময় কিছু কারিগরি ত্রুটিবিচ্যুতি থেকে যায়। এসব ত্রুটিবিচ্যুতি কখনই ভালো কিছু হতে পারে না। আবার অনেকে ভবন নির্মাণের ক্ষেত্রে ব্যয় কমানোর জন্য অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় এড়িয়ে যান। আপাতত তা ব্যয় হ্রাস করলেও শেষ পর্যন্ত কখনই ভালো কিছু এনে দিতে পারে না। শুধু তাই নয়, অনেক স্থপতি তার নিজস্ব ধরনের ভিত্তিতেই নকশা বানাতে পছন্দ করেন। বিল্ডিং কোড বা নতুন নিয়মের ভিত্তিতে যেসব বিষয় অন্তর্ভুক্ত থাকার কথা তা কোনোভাবেই অনুসরণ করতে চান না। পুরোনো নকশার ভিত্তিতেই তারা আধুনিক-নান্দনিক অবকাঠামো নির্মাণ করেন। এমনটি মোটেও ভালো কিছু নয়। তা বরং ভবনের ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে দেয়। আবার ভবনের নকশা করার ক্ষেত্রে যদি অত্যাধুনিক হওয়ার চেষ্টা করা হয় তা-ও ভালো কিছু হয় না। জটিল নকশা প্রণয়নের মতো দক্ষতা কর্মীদের রয়েছে কি না ভাবনায় রাখা জরুরি। অগ্নিঝুঁকি প্রতিরোধের নিয়ম-নীতিমালা অনুসরণ করার বিষয়গুলো সরল। কিন্তু ভবনের নকশা জটিল হয়ে গেলে তা ভালো কিছু দেয় না। অর্থাৎ ভবন নিরাপদ হবে কি না এর দায় একজন স্থপতিকেই পুরোপুরি নিতে হবে। যেকোনো অবকাঠামো পরিকল্পনায় সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যের পাশাপাশি ভবনবাসীর নিরাপত্তা সর্বাগ্রে গুরুত্ব দিতে হবে। নতুন নকশা প্রণয়ন করতে গিয়ে অতিগুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো এড়ানো যাবে না। অবকাঠামো ব্যবহারকারীদের জন্য সংবেদনশীল অবকাঠামোই শহরের নিরাপত্তা আরও সরল করতে পারে। যূথবদ্ধ প্রয়াসেই নিশ্চিত হতে পারে জননিরাপত্তা।