× ই-পেপার প্রচ্ছদ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি ফিচার চট্টগ্রাম ভিডিও সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

সম্পাদকীয়

উন্নয়ন পরিকল্পনা হোক পরিবেশবান্ধব

সম্পাদকীয়

প্রকাশ : ১৮ মে ২০২৪ ১০:০৫ এএম

উন্নয়ন পরিকল্পনা হোক পরিবেশবান্ধব

বিজ্ঞানী জগদীশচন্দ্র বসু পরীক্ষা করে দেখিয়েছিলেন, উদ্ভিদেরও প্রাণীর মতো সুখদুঃখের অনুভূতি আছে। সেও উদ্দীপিত হয় গরম, ঠান্ডা, শব্দে। তারপরও ঘটছে বৃক্ষনিধন-যজ্ঞ। সেখানে মাথা উঁচু করে দাঁড়াচ্ছে গগনচুম্বী অট্টালিকা। প্রশস্ত হচ্ছে সড়ক। তৈরি হচ্ছে নতুন নতুন উড়াল সড়ক, দ্রুতগতির মহাসড়ক, সম্প্রসারণ হচ্ছে রেললাইনও। এত এত উন্নয়নের অর্থ- কমছে খোলা প্রান্তর। সঙ্গে পাল্লা দিয়ে কমছে সবুজ। দেশে মাসাধিক কালজুড়ে চলেছে তীব্র তাপপ্রবাহ। মাঝে কদিন স্বস্তির বৃষ্টি শেষে আবারও বিস্তৃত হয়েছে তাপপ্রবাহ। ১৭ মে প্রতিদিনের বাংলাদেশ-এ প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশের ৮ বিভাগেই তাপপ্রবাহ বিস্তৃত হয়েছে। তাপপ্রবাহের কারণে ১৬ মে সিলেট নগরীতে এক যুবকের মৃত্যুর কথাও এসেছে প্রতিবেদনে। যখন বৃষ্টিহীন খরতাপে পুড়ছে পুরো দেশ, তখন শুরু হয়েছে গাছ কাটারও মহোৎসব। তারই জলজ্যান্ত উদাহরণ ১৭ মে প্রতিদিনের বাংলাদেশ-এ প্রকাশিত ‘১৫ হাজার গাছের মৃত্যু পরোয়ানা!’ শিরোনামের প্রতিবেদন। সড়ক প্রশস্তকরণ প্রকল্পের অংশ হিসেবে জারি হয়েছে এই গাছগুলোর মৃত্যু পরোয়ানা। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, লক্ষ্মীপুরের রামগতি-কমলনগর আঞ্চলিক সড়ক প্রশস্তকরণের নামে চলছে গাছ কাটার আয়োজন। সড়কের পাশে ১৫ হাজার ২৪২টি গাছ কাটার অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। গাছ কাটার এই চিত্র শুধু লক্ষ্মীপুরেরই নয়, সারা দেশেরই। দেশজুড়ে যেন একযোগে শুরু হয়েছে গাছ কাটার মহোৎসব। প্রতিদিনের বাংলাদেশসহ সহযোগী দৈনিকগুলোতে প্রকাশিত প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, এপ্রিল ও মে মাসজুড়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে, উন্নয়ন প্রকল্প, সড়ক প্রশস্তকরণ এবং সামাজিক বনায়ন কর্মসূচির আওতায় জারি হয়েছে হাজার হাজার গাছের মৃত্যু পরোয়ানা। যেমন তিস্তা সেচ প্রকল্পের প্রধান ক্যানেলসহ টারশিয়ারি ও সেকেন্ডারি খাল সংস্কারের জন্য চার লাখ গাছ কেটে ফেলা হচ্ছে। ঠাকুরগাঁওয়ে জেলার ধনতলা ও পাড়িয়া ইউনিয়নের ৩৭ কিলোমিটার দীর্ঘ রাস্তার দুপাশ থেকে দরপত্রের মাধ্যমে চার হাজার গাছ কাটতে শুরু করেছে স্থানীয় বন বিভাগ।

প্রসঙ্গত, গত বছরও ঠাকুরগাঁওয়ের বালিয়াডাঙ্গী উপজেলার বড়বাড়ী, আমজানখোর ও চাড়োল ইউনিয়নের প্রায় ৪০ কিলোমিটার রাস্তায় বেড়ে ওঠা পাঁচ হাজার গাছ কেটে ফেলা হয়। রাস্তা সম্প্রসারণের জন্য টাঙ্গাইল শহীদ স্মৃতি পৌর উদ্যানের গাছগুলো কাটার উদ্যোগ নিয়েছে পৌরসভা কর্তৃপক্ষ। সুনামগঞ্জ সদরের টুকেরবাজার থেকে ১৯ কিলোমিটার সড়কের দুই পাশের গাছগুলো কাটতে দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে। সড়ক প্রশস্ত করার প্রয়োজনে নাটোরের লালপুরে ঢালাওভাবে কাটা হচ্ছে রাস্তার পাশের প্রায় এক হাজার গাছ। মুন্সীগঞ্জের লৌহজং উপজেলার কারপাশায় সামাজিক বনায়নের ৪৯৭টি গাছ কাটা হচ্ছে। বগুড়ার আদমদীঘি উপজেলার সান্তাহার ইউনিয়নের রক্তদহ বিলে যাওয়ার রাস্তার ধারে প্রায় কুড়ি বছরের ১ হাজার ২০০ গাছ কাটা হচ্ছে। যশোরে ২ হাজার ৪৪টি বড় গাছ কাটার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সামাজিক বন বিভাগ। দিনাজপুর জেলার বোচাগঞ্জ উপজেলার সেতাবগঞ্জে সড়ক প্রশস্তকরণের জন্য কাটা হচ্ছে ৩৫ বছর বয়সি ২৯৮টি গাছ। কুষ্টিয়ার কুমারখালীতে বাঁধবাজার থেকে মাদুলিয়া পর্যন্ত রাস্তার পাশের প্রায় তিন হাজার গাছ কাটার দরপত্র সম্পন্ন করেছে বন বিভাগ। সম্প্রতি নওগাঁ জেলার আলতাদীঘির মায়াঘেরা শালবন উজাড় করার যে ছবি সংবাদমাধ্যমে এসেছে, তা উন্নয়নের নামে লোভী হাতের কারসাজির অনন্য উদাহরণ। মানুষ যেখানে প্রকৃতির সান্নিধ্যে আশ্রয় খুঁজছে, সেখানে লোভী হাতের থাবায় উন্নয়নের নামে কৃত্রিমতা দিয়ে ভরিয়ে রাখার উদ্যোগ যেমন বেদনার, তেমনি নিন্দনীয়। এই যে এত এত সুস্থ সবল গাছ কেটে ফেলা হচ্ছে, তবুও যেন আমাদের কোনো উদ্বেগ নেই। অথচ সরকার প্রতিবছর জলবায়ু অভিযোজন কর্মকাণ্ডের জন্য ৩৫০ কোটি ডলার ব্যয় করছে। ১৬ মে রাজধানীতে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ (বিআইআইএসএস) আয়োজিত অ্যাপ্লিকেশন অব কার্বন ফাইন্যাসিং : চ্যালেঞ্জেস অ্যান্ড পলিসি অপশনস ফর বাংলাদেশ শীর্ষক এক সেমিনারে এ তথ্য জানিয়েছে অর্থ প্রতিমন্ত্রী ওয়াসিকা আয়শা খান। জাতীয় পর্যায়ে জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় বছরে ৮০০ কোটি ডলার প্রয়োজন বলেও তিনি জানিয়েছেন, যা ১৭ মে প্রতিদিনের বাংলাদেশ-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। একদিকে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় সরকারের প্রাণান্ত উদ্যোগ, অন্যদিকে নির্বিচারে গাছ নিধন, যা দেখে-শুনে মনে হয় আমরা জেগে ঘুমাচ্ছি।

পরিবেশবাদীরা জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য মাত্রাতিরিক্ত হারে গাছ কাটাকেও অন্যতম কারণ হিসেবে দায়ী করছেন। রাস্তা সম্প্রসারণ হলে স্বাভাবিকভাবেই আশপাশে বাড়ি-ঘরও ভাঙা পড়ে। নতুন বাড়ি-ঘর ওঠে। এতে করেও গাছ কাটা পড়ে। অথচ দীর্ঘদিনের গাছগুলোকে ঘিরে যে পাখি, কাঠবিড়ালি, কীটপতঙ্গের বাস, আমরা ভাবছি না তারা কোথায় যাবে? বাস্তুতন্ত্রের এ ধরনের ক্ষতির প্রভাব সুদূরপ্রসারী। আমরা উন্নয়নের বিরোধী নই। আমরাও উন্নয়ন চাই। তবে সে উন্নয়ন হোক পরিকল্পিত। তা শুধু কংক্রিটের জঞ্জাল হয়ে না উঠুক। চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রেললাইন ঘিরে গত বছরের বন্যার কথা আমরা বিস্মৃত হইনি। আমরা উন্নয়ন চাই, সেই সঙ্গে এও চাইÑ সরকার যেভাবে গাছ লাগানোর প্রচার-প্রচারণা চালাচ্ছে, সেই প্রচারণায় অংশ নিয়ে সবাই নিজের সাধ্যের মধ্যে গাছ লাগাবে এবং গাছগুলোকে বেড়ে ওঠার সুযোগ দেবে। একটি গাছ কাটলে পাঁচটি গাছ লাগানোর কথা বলা হয়। আমাদের প্রশ্নÑ আদৌ সেই গাছ কি লাগানো হয়? লাগানো গাছ কি বেড়ে ওঠার সুযোগ পায়? যদি সঠিকভাবে গাছ লাগানোই হয়, তাদের পরিচর্যা ও বেড়ে ওঠা নিশ্চিত হয়, তাহলে ‘কই গেল ২৬ হাজার তালগাছ’ শিরোনামে ১৬ তারিখ প্রতিদিনের বাংলাদেশ-এ প্রতিবেদন প্রকাশের প্রয়োজন হতো না।

বৃক্ষরোপণের ওপর সরকার জোর দিয়েছে। বৃক্ষরোপণে উৎসাহিত করতে সরকারের প্রচারণাও রয়েছে। এই প্রচারণাতেও খরচ হয়ে যাচ্ছে বিপুল অর্থ। অথচ এরই বিপরীত চিত্র যেন উন্নয়নের নামে দেশের নানা প্রান্তে হাজার হাজার গাছ কেটে ফেলা। সড়কের দুধারেই গাছ রয়েছে। অথচ আমরা আন্তরিক হলে দুধারের গাছগুলোই অক্ষত রেখে সড়ক প্রশস্তকরণ করা সম্ভব। এক্ষেত্রে সড়কের একপাশের গাছগুলো অক্ষত রেখে, অন্যপাশের গাছগুলোকে যদি রাস্তার বিভাজক হিসেবে রেখে সড়ক প্রশস্ত করা হয়, তাহলে দুদিকের গাছগুলোই রক্ষা পায়। রক্ষা পায় প্রাণ-প্রকৃতিও। উন্নয়ন অবশ্যই প্রয়োজন। তবে সেটা করতে হবে পরিবেশকে বিনষ্ট না করে। আজ আমাদের সচেতন হওয়ার সময় এসেছে। আমরা চলে এসেছি খাদের কিনারে। এখনই যদি সতর্ক না হই, লোভী হাতগুলোকে থামাতে না পারি, উন্নয়নের নামে অপরিকল্পিত এবং অদূরদর্শী প্রকল্পের মাধ্যমে সাবাড় করতে থাকি প্রকৃতিকে। তবে যে বিপদ আমাদের দিকে ধেয়ে আসছে, তা থেকে রক্ষার সকল পথই বন্ধ হয়ে যাবে। তখন আঙুল কামড়ানো ছাড়া কিছু করারও থাকবে না। গাছ বাঁচিয়ে রাখার দায়িত্ব শুধু সরকারের নয়, জনগণেরও। 

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মুস্তাফিজ শফি

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০১৯১১০৩০৫৫৭, +৮৮০১৯১৫৬০৮৮১২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০১৭১২০৩৩৭১৫ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা