ডোনাল্ড লু’র সফর
ড. ফরিদুল আলম
প্রকাশ : ১৬ মে ২০২৪ ১০:০০ এএম
ড. ফরিদুল আলম
ডোনাল্ড লু বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে পরিচিত একটি নাম। বিগত সাধারণ নির্বাচনের আগে মার্কিন সরকারের সঙ্গে বাংলাদেশের বর্তমান সরকারের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ক্ষেত্রে কিছু টানাপড়েন সৃষ্টি হয়, যার নেপথ্য কারিগর হিসেবে মার্কিন সরকারের দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়া বিষয়ক সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডোনাল্ড লু এবং বাংলাদেশে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত পিটার হাসের নাম বহুলভাবে আলোচিত হয়। যদিও গত বছরের জুলাইয়ের পর এটা লু’র প্রথম বাংলাদেশ সফর, তবে এ প্রসঙ্গে এও বলে রাখা সঙ্গত, বাংলাদেশ নিয়ে মার্কিন সরকারের দৃষ্টিভঙ্গি ডোনাল্ড লু দ্বারা প্রভাবিত এবং গত বছর এপ্রিলে বাংলাদেশ নিয়ে মার্কিন সরকারের ঘোষিত ভিসানীতির ক্ষেত্রেও লু এবং পিটার হাসের ভূমিকাই ছিল মুখ্য।

শুধু এবার নয়,
ডোনাল্ড লু যতবারই বাংলাদেশ সফর করেছেন, ততবারই তার সফর নিয়ে সর্বত্র এক ধরনের আগ্রহ
দেখা যায়। ধারণা করা হয়, ২০২২ সালে পাকিস্তানের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের
ক্ষমতাচ্যুতির পেছনের কারিগর ছিলেন তিনি। যদিও বিষয়টি নিয়ে পরবর্তীতে তার কোনো ভূমিকার
কথা তিনি অস্বীকার করেছেন। তার সর্বশেষ সফরেও বাংলাদেশের জাতীয় নির্বাচন এবং গণতান্ত্রিক
পরিবেশ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের উদ্বেগের কথা সরকারকে জানানো হয়। সেই সঙ্গে সে সময় দেশের
প্রধান রাজনৈতিক দল বিএনপির সরকারবিরোধী আন্দোলন এবং সরকারের বিরুদ্ধে তাদের অভিযোগের
বিষয়ে লু’র বক্তব্যের অনেক সাদৃশ্য দেখা যায়। সঙ্গত কারণেই বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে
দেশের জাতীয় ইস্যুতে বিদেশি রাষ্ট্রের হস্তক্ষেপ বা কোনো ধরনের সম্পৃক্ততার বিষয়টি
অন্য রাষ্ট্রের জন্য অনুচিতÑএটা স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয়।
যুক্তরাষ্ট্রের
পক্ষ থেকে অনেকভাবেই বিগত নির্বাচনে হস্তক্ষেপের চেষ্টা ব্যর্থ করে যথাসময়ে নির্বাচন
হয়ে যায় এবং আওয়ামী লীগ সরকারের রাষ্ট্র পরিচালনার ধারাবাহিকতা বজায় থাকে। এরই মধ্যে
এ নির্বাচনকে স্বীকৃতি জানিয়ে বিভিন্ন দেশের পক্ষ থেকে যখন বার্তা দিয়ে সরকারের সঙ্গে
ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করার আগ্রহ দেখানো হয় একপর্যায়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকেও
বর্তমান সরকারকে অভিনন্দন জানানো হয় এবং দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক আরও এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার
প্রত্যাশা ব্যক্ত করা হয়। লু’র এবারের সফর নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের পক্ষ
থেকে জানানো হয়েছে, দুই দেশের মধ্যকার সম্পর্ক আরও এগিয়ে নিতে এবং জলবায়ু পরিবর্তনের
বিরূপ প্রভাব মোকাবিলা এবং রোহিঙ্গা সমস্যা নিয়ে আলোচনা করতে তাকে ঢাকায় পাঠানো হচ্ছে।
তার পরও রাজনৈতিকভাবে তার সফর নিয়ে বেশ চর্চা হচ্ছে। অবাক করার বিষয় হচ্ছে, লু’র এবারের
সফর নিয়ে বিএনপির ভূমিকা বেশ রহস্যজনক। প্রতিবারই তার সফর বা যুক্তরাষ্ট্র সরকারের
কোনো প্রতিনিধির সফর নিয়ে তাদের এক ধরনের বাড়তি আগ্রহ দেখা গেছে। এবার অনেকটাই নীরবতা
দেখানো হচ্ছে। বিষয়টি নিয়ে মুখ খুলেছেন ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল
কাদের। তিনি বিএনপির উদ্দেশে লু’র সফর নিয়ে বলেছেন, লু আসছেন দুই দেশের মধ্যকার সম্পর্কোন্নয়নের
বার্তা নিয়ে, তাদের ক্ষমতায় যাওয়ার দিবাস্বপ্ন দেখা শেষ। এ ধরনের নানা রকম কথাবার্তার
একপর্যায়ে মুখ খুলেছেন বিএনপি নেতৃবৃন্দ।
মহাসচিব মির্জা
ফখরুল ইসলাম আলমগীর জানিয়েছেন, লু’র সফর নিয়ে তাদের কোনো আগ্রহ নেই। তবে তাদের আরেকজন
নেতার কথায় কিছুটা রহস্যের গন্ধ পাওয়া যায়। তিনি বলেছেন, নির্বাচনের আগে যুক্তরাষ্ট্রের
পরামর্শগুলো মানেনি সরকার। এ কারণে যুক্তরাষ্ট্র যদি আড়ালে কোনো কিছু করে তা সরকারের
জন্য মঙ্গলজনক হবে না। ‘আড়াল’ বলতে তিনি কী বোঝাতে চেয়েছেন স্পষ্ট নয়। এখানে একই সঙ্গে
এক ধরনের ভীতি এবং হুমকির আভাস পাওয়া যায়, অর্থাৎ যুক্তরাষ্ট্র যদি সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক
ভালো করতে চায়, তাহলে তা দেশের জন্য মঙ্গলজনক হবে না, অথবা লু’র আগমনের মধ্য দিয়ে যুক্তরাষ্ট্র
সরকার বর্তমান সরকারের বিরুদ্ধে নতুন কোনো ষড়যন্ত্র করতে পারে। তবে একথা নিঃসংশয়ে বলা
চলে, বিএনপির এ নীরবতারও ভাষা রয়েছে।
লু’র সফর নিয়ে
আমরা যদি সার্বিকভাবে মার্কিন দৃষ্টিকোণ থেকে বিশ্লেষণ করতে যাই তাহলে দেখতে পাব, এ
মুহূর্তে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য বাংলাদেশ বেশ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। দক্ষিণ এশিয়ায়
ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের দৃষ্টিকোণ থেকে, সেই সঙ্গে এ অঞ্চলে
সাম্প্রতিক বছরগুলোয় চীনের প্রভাববলয় যেভাবে বিস্তৃত হচ্ছে এর প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্রের
জন্য আস্থার পরিবেশ সৃষ্টি করা ভীষণ জরুরি হয়ে দাঁড়িয়েছে। গত তিন দশকের বেশি সময় ধরে
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ভারতের কৌশলগত সম্পর্ক চলমান থাকলেও এ অঞ্চলের প্রতিটি দেশের
রাজনীতিতেই চীনের এক ধরনের প্রচ্ছন্ন প্রভাব লক্ষণীয়। আর তাই চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড
ইনিশিয়েটিভের পাল্টা পদক্ষেপ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশল নিয়ে এগোতে
চাইছে। হোঁচট খাচ্ছে বাংলাদেশসহ অন্য রাষ্ট্রগুলোর দিক থেকে ইতিবাচক সাড়া না পাওয়ার
কারণে। আর তাই বিগত নির্বাচনের আগে বাংলাদেশের সরকার পরিবর্তনের জন্য তাদের প্রচেষ্টা
সচেতন মহলের দৃষ্টি এড়াতে পারেনি। এ ক্ষেত্রে নির্বাচনোত্তর সময়ে বাংলাদেশের বর্তমান
সরকারের পক্ষে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির বিষয়টি চলমান থাকার পরিপ্রেক্ষিতে যুক্তরাষ্ট্র
নড়েচড়ে বসেছে। লু’র সফরের আগে তাই মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র বেদান্ত
প্যাটেল সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, বাংলাদেশের রাজনীতি নিয়ে ভাবার সময় তাদের নেই, বরং পারস্পরিক
অর্থনৈতিক সম্পর্ক এবং দ্বিপক্ষীয় স্বার্থসংশ্লিষ্ট সম্পর্ক তারা এগিয়ে নিয়ে যেতে চান।
এরই অংশ হিসেবে এর আগের সফরগুলোয় লু রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা এবং মতবিনিময় করলেও
এবারের সফরে তা বাদ দেওয়া হয়েছে, বরং নাগরিক সমাজ ও সরকারের নীতিনির্ধারক পর্যায়ের
আলোচনায় মূলত অর্থনৈতিক স্বার্থের বিষয়টি প্রাধান্য পেয়েছে বেশি।
ডোনাল্ড লু’র
এবারের সফর আমাদের জন্য বিশেষ মনোযোগের দাবি রাখে। তার সফরসূচি অনুযায়ী তিনি সরকারের
নির্ধারিত ব্যক্তিদের সঙ্গে সাক্ষাতের বাইরে ঢাকাস্থ মার্কিন রাষ্ট্রদূতের বাসভবনে
নাগরিক সমাজের সঙ্গে বৈঠক করেন। বৈঠকে আগের অবস্থানের বাইরে গিয়ে আলোচনায় বিশেষ গুরুত্ব
পেয়েছে জলবায়ু পরিবর্তন, আদিবাসী মানুষের অধিকার, শ্রমিক অধিকার এবং রোহিঙ্গা সংকটের
মতো বিষয়গুলো। এর বাইরে গণতন্ত্র এবং মানবাধিকারের বিষয়গুলো যে আসেনি তা নয়, তবে বিষয়গুলোয়
তাদের পরিবর্তিত পরিকল্পনার অংশ হিসেবে কম গুরুত্ব পেয়েছে, যার অর্থ দাঁড়ায়Ñতারা দুই
দেশের সম্পর্ক এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার ব্যাপারেই বেশি উৎসাহী। তার এ অঞ্চলে ছয় দিনের সফরের
শেষ পর্যায়ে তিনি বাংলাদেশ সফর করেন। এর আগে ভারত ও শ্রীলঙ্কা সফর করেন। আমরা জানি
শ্রীলঙ্কায় বর্তমান চীনপন্থি সরকার ক্ষমতাসীন, বাংলাদেশের সঙ্গেও সাম্প্রতিক সময়ে চীনের
দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। আগামী দিনগুলোয় চীনের ব্যাপক বিনিয়োগের
মধ্য দিয়ে এটি আরও বিস্তৃত হওয়ার অবকাশ রয়েছে। এ ক্ষেত্রে ভারতকে আস্থায় রেখে শ্রীলঙ্কা
এবং বাংলাদেশের সঙ্গে তারা সম্পর্কোন্নয়নে আগ্রহী। তারা এখন এ মুহূর্তে দুই দেশের মধ্যে
সাম্প্রতিক বছরগুলোর তিক্ততা ভুলে যেতে চাইছে। এর ধারাবাহিকতায় তাদের মুখ থেকে বাংলাদেশ
নিয়ে আজকাল স্তুতিবাক্য উচ্চারিত হতে শুনছি আমরা।
গত ৯ মে ঢাকায়
হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে ইউএস ট্রেড শোর এক অনুষ্ঠানে মার্কিন রাষ্ট্রদূত একপর্যায়ে
বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের প্রশংসা করে বলেন, ‘গত এক দশকে বাংলাদেশের উন্নয়ন জাতীয়
বিজ্ঞাপনের সবচেয়ে বড় অস্ত্র।’ এর সঙ্গে তিনি যুক্তরাষ্ট্র-বাংলাদেশ অর্থনৈতিক সম্পর্কের
গুরুত্বও তুলে ধরতে ভুললেন না। জানালেন, যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের সরাসরি বৈদেশিক বিনিয়োগের
সবচেয়ে বড় উৎস, যার আকার ৪ বিলিয়ন বা ৪০০ কোটি ডলার। এর বাইরে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের
পণ্য ও সেবা রপ্তানির একক বৃহত্তম গন্তব্য। তিনি এও স্বীকার করেন যে, মার্কিন বিনিয়োগকারীরা
আগে থেকেই ঠিক করে রাখেন না যে তারা কোথায় বিনিয়োগ করবেন, বরং কোথায় কম ঝুঁকিতে ব্যবসা
করা যায়, সেটাই সর্বাগ্রে বিবেচনায় রাখেন। রাষ্ট্রদূত হাসের এ বক্তব্য থেকে যে তাগিদটি
অনুভূত হয়, তা হলো দেরিতে হলেও তারা তাদের ভুল সংশোধন করে বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্কের
উন্নয়ন ঘটিয়ে এ অঞ্চলে তাদের ভাষায় একটি মুক্ত, অবাধ ও সমৃদ্ধ ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চল
প্রতিষ্ঠা করতে মরিয়া। আর এ ক্ষেত্রে তারা যত দেরি করবেন, চীনের প্রভাবের সঙ্গে পেরে
ওঠা তদের জন্য ততটাই কঠিন হয়ে উঠবে।
সম্প্রতি যুক্তরাজ্যের
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী এবং ভারতের পররাষ্ট্র সচিব বাংলাদেশ সফর করে গেছেন। যুক্তরাজ্য
তাদের দিক থেকে বাংলাদেশের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় সামগ্রিক সম্পর্কের উন্নয়নে আগ্রহ দেখিয়েছে।
ভারত আমাদের বিশ্বস্ত প্রতিবেশী হলেও বাংলাদেশের সঙ্গে চীনের উত্তরোত্তর সম্পর্কোন্নয়ন
নিয়ে উদ্বিগ্ন। এই বাংলাদেশে তিস্তা বহুমুখী প্রকল্প নিয়ে চীনের তরফ থেকে অর্থনৈতিক
বিনিয়োগের আগ্রহ প্রদর্শনের পর এ নিয়ে ভারতের পক্ষ থেকেও একই আগ্রহ দেখানো হয়েছে। আসলে
আমাদের সামনে এখন অবারিত সুযোগের হাতছানি। এ ক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সম্ভাব্য
ভারত সফরে বহুপ্রতীক্ষিত তিস্তা পানি বণ্টন নিয়ে একটি চুক্তিতে পৌঁছানোর বিষয়ে আমাদের
দিক থেকে ভারতের ওপর নতুন চাপ সৃষ্টির ক্ষেত্র তৈরি হয়েছে।
বাংলাদেশ সরকারের দৃষ্টিভঙ্গি দেখে বোঝা যাচ্ছে লু’র সদ্যসমাপ্ত সফর নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের তরফ থেকে যতটা না আগ্রহ দেখানো হয়েছে, আমাদের দিক থেকে এর বিপরীত চিত্রই প্রদর্শিত হয়েছে। আমাদের জন্য নতুন করে দরকষাকষির একটি ক্ষেত্র প্রস্তুত হয়েছে। জিএসপি সুবিধা ফেরত পাওয়া এবং বাংলাদেশের জন্য মার্কিন ভিসানীতি ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কতিপয় সদস্যের ওপর চাপানো নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের বিষয়টি সম্পর্কোন্নয়নের অন্যতম শর্ত হিসেবে প্রয়োগের মোক্ষম সুযোগ এটি।