সম্পাদকীয়
সম্পাদকীয়
প্রকাশ : ১৫ মে ২০২৪ ০৯:৪৬ এএম
আপডেট : ১৫ মে ২০২৪ ০৯:৫৬ এএম
সেই কবে অমর কথাশিল্পী
শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় বাঙালি সমাজে বিদ্যমান অন্ধকারের চিত্র তার গল্প-উপন্যাসে তুলে
এনেছিলেন। সেই অন্ধকার যে এখনও কাটেনি এবং দুর্বলের ওপর সবলের অত্যাচারও যে বন্ধ হয়নি,
এরই চিত্র উঠে এসেছে ১৩ মে প্রতিদিনের বাংলাদেশ-এর প্রতিবেদনে। ‘বিয়ের ভোজ না দেওয়ায়
আট পরিবার সমাজচ্যুত’ শিরোনামের প্রতিবেদনের গর্ভে যা উঠে এসেছে তা আমাদের বিস্মিত
যুগপৎ ক্ষুব্ধ না করে পারে না। একই সঙ্গে করে প্রশ্নমুখরও। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রাজশাহীর
বাগমারা উপজেলার বাজেখোলা গ্রামের তফাদারপাড়ায় আট পরিবারকে সমাজচ্যুত করা হয়েছে বিয়ের
ভোজ না দেওয়ার কারণে! বিয়ে করলে সমাজের লোকজনকে এক সপ্তাহের মধ্যে একবেলা খাওয়াতে হবেÑ
এমন তথাকথিত রীতি ওই অঞ্চলে বিরাজমান। দারিদ্র্যের কশাঘাতে জর্জরিত সাখাওয়াত হোসেন
ছেলেকে বিয়ে করানোর পর সমাজের লোকজনকে খাওয়াতে না পারায় তার ওপর নেমে এসেছে স্বেচ্ছাচারীদের
নিপীড়নের খড়গ। আমরা যেমন ওই তথাকথিত রীতির নিন্দা জানাই, তেমনি সমাজের বলবানদের তথাকথিত
বিচারেরও তীব্র প্রতিবাদ জানাই। যে অভিযোগে আট পরিবারের নারী-শিশুসহ প্রায় ৪০ জনকে
সমাজচ্যুত করা হয়েছে, তারা মানসিকভাবে ভেঙে পড়ার দুঃখজনক বার্তাও ওই প্রতিবেদনেই মিলেছে।
পরদিন অর্থাৎ ১৪ মে প্রতিদিনের বাংলাদেশ-এ ভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অভিযোগের পরও
স্থানীয় প্রশাসন এ ব্যাপারে কোনো ব্যবস্থা নেয়নি ! আমরা প্রশাসনের দায়িত্বশীলদের কাছে
প্রশ্ন রাখতে চাই, তারা তাদের দায় এড়াবেন কীভাবে।
সমাজচ্যুত করার
এমন ঘটনা এই যে প্রথম ঘটল, তা-ও নয়। আমাদের স্মরণে আছে, ২০২১ সালের এপ্রিলে হবিগঞ্জ
সদর উপজেলার তেগুরিয়া ইউনিয়নের রামপুরা গ্রামে ঝগড়া-বিবাদ কেন্দ্র করে গ্রামের সালিশে
সমাজপতিরা বীর মুক্তিযোদ্ধা সুরুজ আলীকে সমাজচ্যুত করার পাশাপাশি সামাজিক সব কর্মকাণ্ডে
তাকে নিষিদ্ধ করেন। বীর মুক্তিযোদ্ধা সুরুজ আলীর পরিবারকে সমাজচ্যুতর ঘটনায় হাইকোর্টের
রিটের পরিপ্রেক্ষিতে আদালত জেলা প্রশাসককে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশদানের
পাশাপাশি রুলও জারি করেছিলেন। স্থানীয় প্রশাসনের নাকের ডগায় এ রকম ঘটনা কী করে ঘটে?
এমন ঘটনার খবর পাওয়ার পরও প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের মৌনতা কিংবা উদাসীনতা কোনোভাবেই মেনে
নেওয়া যায় না। তথাকথিত সমাজপতিদের কর্মকাণ্ডের এ রকম গর্হিত নজির থাকা সত্ত্বেও দৃষ্টান্তযোগ্য
প্রতিবিধানের উদাহরণ প্রায় বিরল বলা যায়।
অনেক ক্ষেত্রেই
আমরা দেখেছি, এমন অনাকাঙ্ক্ষিত-অনভিপ্রেত এবং আইনবিরুদ্ধ কর্মকাণ্ডের পর স্থানীয় প্রশাসনের
দায়িত্বশীলরা বলবানদের এবং নিগৃহীতদের ডেকে প্রতিবিধানের নামে গ্রাম্য সালিশের মতোই
‘মিটমাট’ করে দেন। সংবিধানে নাগরিকের অধিকারের ক্ষেত্রে কোনো বৈষম্য নেই। দারিদ্র্যপীড়িত
ব্যক্তি কিংবা পরিবারের যেখানে স্বাভাবিক জীবনযাপন করাই অনেক ক্ষেত্রে দায়, সেখানে
তথাকথিত সমাজপতিদের ‘ভূরিভোজ’ করানোর রীতি কোনো সভ্য কিংবা মানবিক সমাজে জিইয়ে থাকতে
পারে না। ২০২১ সালের মার্চে ঢাকার ধামরাইয়ে একটি পরিবারকে থানায় জিডি করার দায়ে প্রায়
পনেরো দিন একঘরে করে রাখা হয়েছিল। ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে মৌলভীবাজারের কুলাউড়া উপজেলার
ভুকশিমইলয়েও গ্রাম্য সালিশ না মানার কারণে তিনটি পরিবারকে পাঁচ বছরের জন্য সমাজচ্যুত
করা হয়েছিল। এমন নজির দিয়ে কলেবর বৃদ্ধি না করে আমরা প্রশ্ন রাখি, কবে কাটবে আঁধার।
আমরা জানি, নিজেকে
যতটা অদৃশ্য রাখা যায়, সংযম ততটাই পরিপুষ্ট হয়। যাদের অসংযম দৃশ্যমান তারা কোনোভাবেই
সমাজের জন্য হিতকর নন। সমাজ হবে আলোকিত-বিকশিত-সাম্যের আলো ছড়ানো অধিকারের উর্বর মাঠ
এবং সেটা আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম অঙ্গীকার। আমরা দেখছি, বিচারের নামে অবিচারের
তীরবিদ্ধ হচ্ছে সমাজের দুর্বল শ্রেণি বলবানদের দ্বারা। বিচারের এমন অধিকার তথাকথিত
সমাজপতিরা কীভাবে নিজেদের মুঠোবন্দি করে রাখেন, এ-ও প্রশ্ন। সুআচার-সুনীতি ইত্যাদিই
পারে সমাজকে স্বস্তিতে রাখতে। প্রশাসন ও সমাজের শুভবোধসম্পন্ন সবাইকে যূথবদ্ধ হয়ে এই
গুরুদায়িত্ব পালন করতে হবে। অস্বীকার করার উপায় নেই, এত কিছুর পরও আমরা এক অদ্ভুত সমাজে
বাস করছি। এখানে নীতিনৈতিকতা ও মূল্যবোধের গুরুত্ব অনেক ক্ষেত্রেই নেই, গুরুত্ব আছে
জবরদস্তির। আসলে অর্থনৈতিকভাবে আমাদের অনেক অগ্রগতি হলেও সামাজিক চিন্তাচেতনায় কোনো
কোনো ক্ষেত্রে আমরা পড়ে আছি সেই অন্ধকার যুগে। এ অবস্থার অবসান ঘটাতে হলে আইনের প্রয়োগ
নিশ্চিত করতে হবে। বদলাতে হবে দৃষ্টিভঙ্গি। বৈষম্যহীন সমাজ নিশ্চিত করার দায়িত্ব সর্বাগ্রে
রাষ্ট্রের। একসময় আমাদের সমাজব্যবস্থা তুলনামূলক বিচারে অনেক বেশি পিছিয়ে ছিল, কিন্তু
তখনও সমাজের শুভবোধসম্পন্নরা ন্যায়দণ্ডধারী ছিলেন। আমাদের সংবিধানের মৌলিক অধিকার প্রতিপালনের
পাশাপাশি সমাজে ক্ষত সৃষ্টি করে এমন বিধির উপশমে কার্যকর পদক্ষেপের বিকল্প নেই।
আমরা সমাজের পচন
ঠেকাতে দায়িত্বশীল প্রত্যেকের স্ব স্ব ক্ষেত্রে দায়িত্বশীলতার দৃশ্যমান ভূমিকা চাই।
আমরা দেখছি, সামাজিক অপরাধ ও বৈষম্য ক্রমাগত উৎকট রূপ নিচ্ছে। এর নিরসনে স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি
পরিকল্পনা গ্রহণের পাশাপাশি সুচিন্তিত ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। সবচেয়ে বড় কথা, সমাজে
যেভাবে পচন ধরেছে; তার গতি থামিয়ে দিতে হবে । ভুলে যাওয়া অনুচিত, সমাজের লেজে আগুন
লাগলে পুরো সমাজই ক্রমে ক্রমে দগ্ধ হবে। এমনটি কোনোভাবেই কাম্য হতে পারে না। সামাজিক
কদাচার-অনাচারের হোতাদের চিহ্নিত করে যথাযথ প্রতিবিধান নিশ্চিত করতে হবে বসবাসোপযোগী
সমাজ নিশ্চিত করার লক্ষ্যে। একটি পদক্ষেপ যদি সাহস দেয়, স্বেচ্ছাচারিতার পথ রুদ্ধ করে,
তাহলে পরবর্তী ধাপে নিশ্চয়ই এর ইতিবাচক প্রভাব দৃশ্যমান হবে। আমাদের দাবি, রাজশাহীর
বাগমারা উপজেলার বাজেখোলা গ্রামে যাদের সমাজচ্যুত করা হয়েছে এবং যারা এই গর্হিত কর্মকাণ্ডে
যুক্তÑ এ দুয়েরই যথাযথ প্রতিবিধান নিশ্চিত করতে হবে।