উপজেলা নির্বাচন
ড. মোসলেহউদ্দিন আহমেদ
প্রকাশ : ১৫ মে ২০২৪ ০৯:৪৪ এএম
ড. মোসলেহউদ্দিন আহমেদ
৮ মে স্থানীয় সরকার কাঠামোর অন্যতম স্তর উপজেলা পরিষদ নির্বাচনের প্রথম ধাপ অনুষ্ঠিত হয়েছে। উপজেলা স্থানীয় সরকার কাঠামোর গুরুত্বপূর্ণ ক্ষমতাবলয়। উপজেলা পরিষদ বাদেও ইউনিয়ন পরিষদ কাঠামো অনেক আগে থেকেই ছিল। ইউনিয়ন পরিষদে সাধারণ মানুষ বিভিন্ন সেবা নিয়ে থাকে। কিন্তু জাতীয় পর্যায়ের রাজনীতির বিবেচনায় উপজেলা গুরুত্বপূর্ণ। কারণ উপজেলা পরিষদ জেলা পরিষদের সঙ্গে অনেকাংশে জড়িত। ব্রিটিশ শাসনামলে জেলা পরিষদ জেলা বোর্ড নামে অভিহিত হতো। ব্রিটিশরা যে দৃষ্টিভঙ্গি অনুসরণ করে জেলা বোর্ড তৈরি করেছিল তা পরবর্তীতে কোনোকালেই শক্তিশালী হয়নি। ১৮৮০ সালে ব্রিটিশরা জেলা বোর্ডকে আইনের মাধ্যমে যথেষ্ট শক্তিশালী কাঠামো হিসেবে দাঁড় করাতে চেয়েছিল। পরবর্তীতে পাকিস্তান শাসনামলে এটিকে জেলা কাউন্সিলে রূপান্তর করা হয়।

স্বাধীনতার পর
বঙ্গবন্ধু সর্বপ্রথম জেলা পরিষদ ধারণাটি প্রবর্তন করেন। স্থানীয় সরকার কাঠামোতে তিনি
ইউনিয়ন পঞ্চায়েত এবং পরবর্তীতে থানা পরিষদ ধারণা উপস্থাপন করেন। শহরে মিউনিসিপ্যালিটি,
পৌরসভা ও টাউন কমিটি—এই কয়েকটি ধাপ ছিল স্থানীয় সরকার কাঠামোর অংশ। এসব কিছু বাদ দিয়ে
বঙ্গবন্ধু শহরে মিউনিসিপ্যালিটি কমিটি চালু করেন। বঙ্গবন্ধু ভেবেছিলেন, টাউন কমিটির
মতো ছোট ছোট কমিটি না গড়ে কেন্দ্রীয় একটি স্থানীয় সরকার কাঠামো যেন গড়ে তোলা যায়। ছোট
শহরে টাউন কমিটি এবং বড় শহরগুলোতে মিউনিসিপ্যাল কমিটির বিভাজন আর থাকল না। সবগুলোই
মিউনিসিপ্যাল কমিটি হিসেবে পরিচিত হতে শুরু করে। স্থানীয় সরকার কাঠামোর সংক্ষিপ্ত এই
ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, থানা পর্যায়ে সব সময়ই স্থানীয় সরকারের গুরুত্বপূর্ণ
কোনো না কোনো স্তর ছিল। এই স্তরগুলো ইউনিয়ন পরিষদকে নানাভাবে সহযোগিতা করত।
১৯৮২ সালে ক্ষমতারোহণের
পর এরশাদ থানাকে স্থানীয় সরকার কাঠামোর গুরুত্বপূর্ণ স্তর বিবেচনা করলেন এবং আপগ্রেডেড
থানা ধারণার প্রবর্তন করলেন। এই আপগ্রেডেড থানা পরবর্তীতে উপজেলায় পরিণত হয়। হুসেইন
মুহাম্মদ এরশাদ ফোর ফিফটি টু থানাকে ফোর নাইনটি টু থানায় উন্নীত করলেন। বর্তমানে তা
ফোর নাইনটি সিক্স। প্রশাসন থেকেই কর্মকর্তা নিয়োগ দেওয়া হলো। এভাবেই প্রশাসনিক কর্মকর্তারা
টিএনও হিসেবে নিয়োগ পেতে শুরু করেন। আপগ্রেডেড থানা ব্যবস্থার মাধ্যমে উপজেলা পর্যায়ে
গুরুত্বপূর্ণ একটি পরিবর্তন লক্ষ করা গেল। আপগ্রেডেড থানা ব্যবস্থায় টিএনও প্রশাসনিক
প্রধানের দায়িত্ব পান। অথচ পূর্বে তিনি পরিষদের সেক্রেটারির দায়িত্বপালন করতেন। রাজনৈতিকভাবে
নির্বাচিত উপজেলা চেয়ারম্যানের ক্ষমতা এভাবেই অনেকাংশে খর্ব হয়ে পড়ে।
১৯৮২ সালে প্রশাসনিক
পুনর্গঠন ও সংস্কার কমিটি গঠনের পর তাদের প্রস্তাবনার ভিত্তিতে উপজেলা পরিষদ ব্যবস্থা
চালু করা হয়। নতুন এই ব্যবস্থায় গ্রাম সরকার ব্যবস্থা বিলুপ্ত করা হয়। ১৯৮৫ সালে প্রথম
উপজেলা পরিষদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়, যা ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করে। থানা পর্যায়ে তখন
অনেক প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় স্থানীয় শাসন পৌঁছে
দেওয়ার বিষয়ে হুসাইন মোহাম্মদ এরশাদ বেশ গুরুত্ব দিয়েছিলেন বলে ভোটাররাও এ নির্বাচনে
অংশ নেওয়ার বিষয়ে ব্যাপক আগ্রহ দেখিয়েছিলেন। এজন্য প্রয়োজনীয় বরাদ্দও দেওয়া হয়েছিল।
প্রথম উপজেলা নির্বাচনে চেয়ারম্যান ও ভাইস চেয়ারম্যান পদে প্রার্থীরা প্রতিদ্বন্দ্বিতা
করেছিলেন। ১৯৯১ সালে ক্ষমতায় ফেরার পর বিএনপি এই ব্যবস্থা বিলোপ করে।
স্থানীয় সরকার
কাঠামোর জন্য এ সিদ্ধান্ত একটি খারাপ নজির। বিএনপি চাইলেই জনগণের কাছ থেকে সেবাদানের
সুযোগটি ধরে রাখতে পারত। ১৯৯৬ সালের শেষের দিকে আওয়ামী লীগ আবার ক্ষমতায় ফিরে উপজেলা
ব্যবস্থা চালু করে। এরশাদের সময়ের ব্যবস্থাকে জিইয়ে রেখে তারা নতুন একটি বিষয় সংযোজন
করে। উপজেলা পর্যায়ে প্রশাসনিক সব কর্মকর্তাকে এক্স অফিসিয়াল মেম্বার হিসেবে রাখা হয়
এবং বর্তমানেও এই ব্যবস্থা চালু রয়েছে। ২০০১ সালে বিএনপি আবার ক্ষমতায় ফিরলেও এ ব্যবস্থা
বাতিল করেনি। বিএনপি বুঝতে পেরেছিল, সারা দেশে তাদের দলীয় ক্ষমতাবলয় টিকিয়ে রাখার স্বার্থে
উপজেলা পরিষদ গুরুত্বপূর্ণ। ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পরও স্থানীয় সরকার কাঠামোর
এই গুরুত্বপূর্ণ ক্ষমতাবলয়ে বিশেষ কোনো সংযোজন-বিয়োজন ঘটেনি। বরং উপজেলা পরিষদকে পরবর্তীতে
ক্ষমতাসীন দলের বর্ধিত অংশ হিসেবেই বিবেচনা করতে শুরু করে।
উপজেলা পরিষদ
এখন স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের ওপর নির্ভরশীল। স্থানীয় স্বশাসন
বলতে যা বোঝায় তা এখন উপজেলা পরিষদের নেই। উপজেলা পরিষদে কেউ নির্বাচিত হয়ে এলেও মূল
ক্ষমতা প্রশাসনের হাতে থাকে। যেকোনো সরকারের আমলেই প্রশাসনিক কর্মকর্তারা বিভিন্ন কারণ
দেখিয়ে নির্বাচিত সদস্যদের পদচ্যুত করেন, এ অভিযোগ নতুন নয়। মুখ্যত স্থানীয় সরকার কাঠামোর
প্রতিটি স্তর এখন সরকারের তাবেদারে পরিণত হয়েছে। স্থানীয় উন্নয়ন কার্যক্রম থেকে শুরু
করে নাগরিক সেবার মানোন্নয়নের জন্য তারা নির্দিষ্ট মন্ত্রণালয়ের সহায়তার ওপর নির্ভর
করে। স্থানীয় পর্যায়ে উপজেলা পরিষদ নিজস্ব আয় বা রাজস্ব আদায়ের সুযোগ পায় না। স্থানীয়
সরকার কাঠামোর যেকোনো স্তরের নির্বাচন জাতীয় নির্বাচন থেকে ভিন্ন হওয়ায় অনেক সময় বিরোধীদলীয়
প্রার্থীরাও বিজয়ী হতে পারেন। কিন্তু তারা যদি সরকার কিংবা সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের
সঙ্গে আঁতাত না করেন, তাহলে স্থানীয় পর্যায়ে কোনো উন্নয়ন কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারেন
না। এজন্যই একেক উপজেলায় বরাদ্দ দেওয়ার ক্ষেত্রেও একধরনের বৈষম্য পরিলক্ষিত হয়।
২০১৫ সালে চতুর্থ
উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ দলীয় প্রতীকে নির্বাচনের বিধান চালু করে। ষষ্ঠ উপজেলা
পরিষদ নির্বাচনে দলীয় প্রতীকে নির্বাচনের বিধান তারাই বাতিল করে দেয়। স্থানীয় সরকার
ব্যবস্থার কাঠামো বিলুপ্ত হয়ে এখন স্থানীয় শাসনে রূপ পেয়েছে। বিভিন্ন মেয়াদে সরকার
স্থানীয় সরকারকে তাদের বর্ধিত অংশ হিসেবে বিবেচনা করে নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালাচ্ছে
এবং এর ফলে স্থানীয় স্বশাসন প্রতিষ্ঠার পথ কণ্টকাকীর্ণ হয়ে উঠছে। ষষ্ঠ উপজেলা পরিষদ
নির্বাচনে দলীয় প্রতীকে নির্বাচন না করার ক্ষেত্রে দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রভাব
রয়েছে। আমরা জানি, দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অনেকেই স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা
করেছেন। একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি এড়াতে সরকার দলীয় প্রতীকে উপজেলা পরিষদ নির্বাচন না
করার সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকতে পারে। উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে অপ্রত্যক্ষভাবে বিএনপি তাদের
গ্রহণযোগ্যতা প্রমাণ করতে পারত বলেই মনে করি। এই স্তম্ভেই ইতঃপূর্বে লিখেছি, বিএনপি
যেহেতু দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নেয়নি এবং দলীয় সরকারের অধীনে তারা কোনো নির্বাচনে
অংশ নেবে না বলে সিদ্ধান্ত নিয়েছেÑ এই বিষয়কেই বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। উপজেলা পরিষদ নির্বাচন
দলীয় প্রতীকে হচ্ছে না বিধায় এক্ষেত্রে দলীয় শৃঙ্খলাভঙ্গের অভিযোগ এনে দলীয় কর্মীদের
বহিষ্কার করার সিদ্ধান্তটি আপাতদৃষ্টে যৌক্তিক প্রতীয়মান হচ্ছে না।
আলোচনার মুখ্য
উদ্দেশ্য স্থানীয় সরকার কাঠামোর হারানো দর্শন ও কাঠামোর বিষয়টিকে গুরুত্ব দেওয়া। যেমনটি
বলেছি, স্থানীয় সরকার কাঠামোর প্রতিটি স্তর এখন সরকারের তাবেদারে পরিণত হয়েছে। স্থানীয়
স্বশাসন ধারণাটি বিলুপ্তির পথে। যেকোনো নির্বাচন আয়োজনের জন্য নির্দিষ্ট বরাদ্দ থাকে
এবং রাজনৈতিক স্রোতধারার গতিবিধিও সময়ের নিরিখে নির্ধারিত হয়। এত অর্থ ব্যয় করার পরও
যদি স্থানীয় সরকার কাঠামোর ইতিবাচক ফল দৃশ্যমান না হয়, তাহলে এ ধরনের নির্বাচন আনুষ্ঠানিকতাসর্বস্ব
হয়ে ওঠে। দেশে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে আস্থার সংকট ক্রমেই গাঢ় হচ্ছে। আমাদের অর্থনীতিতেও
নানা ঘাত-প্রতিঘাত দৃশ্যমান হচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে স্থানীয় সরকার কাঠামোকে শক্তিশালী
করার বিষয়টিকে বাড়তি গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
আমরা দেখছি, উপজেলা নির্বাচনের প্রথম ধাপে ভোটার খরা দৃশ্যমান হওয়ায় ফের কিছু প্রশ্ন উঠেছে। ভোটার অনুপস্থিতির বিষয়ে নির্বাচন কমিশনের তরফে ব্যাখ্যা উপস্থাপন করা হয়েছে যা হাস্যকর। ভোটার উপস্থিতি তখনই বাড়বে যখন গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক ব্যবস্থায় রাজনীতিকদের মধ্যে আস্থা, পারস্পরিক সৌহার্দ্য ও পরমতসহিষ্ণুতা বাড়বে। একই সঙ্গে স্থানীয় সরকার কাঠামোর সুফল মানুষের কাছে পৌঁছাতে পারলে ভোটাররাও এ বিষয়ে আগ্রহী হয়ে উঠবেন। এখনও সময় আছে এ নিয়ে ভাবার। স্থানীয় সরকার কাঠামোর সুফল আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতের বেশ কয়েকটি প্রদেশ ভোগ করছে। আমাদের দেশেও তা চালু করা গেলে উন্নয়ন, অগ্রগতিসহ নানাবিধ বিষয়ে লাভবান হব আমরাই।