পরিপার্শ্ব
দেবব্রত চক্রবর্তী বিষ্ণু
প্রকাশ : ১৫ মে ২০২৪ ০৯:২৭ এএম
‘ভরা থাক স্মৃতিসুধায়’ গ্রন্থের বর্ণাঢ্য মোড়ক উন্মোচন অনুষ্ঠানে সমাজের নানা স্তরের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি। প্রবা ফটো
ব্যক্তিও যে নিজেই প্রতিষ্ঠান হয়ে ওঠেন বা উঠতে পারেন এর নজির আমাদের সমাজেও কম নেই। প্রতিষ্ঠানসম এই ব্যক্তিদের আলোচনা-পর্যালোচনা গণমানুষের কাছে গণ্য হয় নানাভাবে। হবিগঞ্জের বানিয়াচং উপজেলা সদরে অবস্থিত লোকনাথ রমণ বিহারি উচ্চবিদ্যালয়ের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক তপন বিশ্বাস তেমনই একজন। অসংখ্যজনের শিক্ষাগুরু, সৃজনের স্মারক তপন স্যার শৈশব থেকে শুরু করে এ পর্যন্ত যা কিছু দেখেছেন, অনুশীলন-পর্যবেক্ষণ করেছেন সমাজ-পরিবার-শিক্ষাঙ্গন ও পেশাগত জীবনে; তা তিনি মলাটবদ্ধ করেছেন। গত ১০ মে সিলেটে পারিবারিক উদ্যোগে খণ্ড খণ্ড স্মৃতিগুলো মলাটে আবৃত করা ‘ভরা থাক স্মৃতিসুধায়’ গ্রন্থটির যে মোড়ক উন্মোচন অনুষ্ঠান হয়েছে তা শেষ পর্যন্ত ব্যক্তি উদ্যোগের গণ্ডিবদ্ধ থাকেনি, হয়ে ওঠে সর্বজনীন অনুষ্ঠান হিসেবে।
ব্যক্তি উদ্যোগের
আয়োজনটি সর্বজনীনতা পাওয়ার মধ্য দিয়ে যে রূপ বহিরাঙ্গনে পরিস্ফুট হলো তা যে মানুষের
অন্তর্জগতে রেখাপাত করা অপার ভালোবাসার নির্মোহ প্রকাশ এর ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ নিরর্থক।
কারণ কোনো আবেদনে-আয়োজনে তখনই অংশীজনেরা সারিবদ্ধ হন সোৎসাহে, যখন ব্যক্তির দায় সমষ্টির
হয়ে যায়। অনুষ্ঠানটির মুখ্য আয়োজক স্যারের আত্মজ জয়দ্বীপ বিশ্বাসসহ পরিবারপরিজন হলেও
ওই আয়োজনে যারা শরিক হয়েছিলেন সবাই একজন ব্যক্তি তপন বিশ্বাস ও প্রতিষ্ঠান তপন বিশ্বাসকে
ধারণ করেই মিলিত হন।
‘ভরা থাক স্মৃতিসুধায়’ গ্রন্থটির পাতায় পাতায় যা রয়েছে
সেখানে যেমন আছে সামাজিক-প্রাতিষ্ঠানিক-পারিবারিকসহ বহুবিধ কথন এবং এর কোনো কোনো ক্ষেত্রে
অনুষ্ঠানের অংশীজনেরাও রয়েছেন। নানামাত্রিক বিশ্লেষণে ও দৃষ্টিকোণে এ গ্রন্থটি আমাদের
কাছে সম্পদ, সংগ্রহে রাখার মতো মূল্যবান দলিল। আত্মকথা কিংবা স্মৃতিকথাও কোনো কোনো
ক্ষেত্রে সমষ্টির সম্পদ হয়ে ওঠে যার ব্যতিক্রম নয় ‘ভরা থাক স্মৃতিসুধায়’ গ্রন্থটিও। স্যার তার সতীর্থ,
শিক্ষার্থী, পরিচিতমণ্ডলসহ প্রজন্মের সামনে যা তুলে দিলেন অনেক কিছু স্মৃতিহরণের কবলে
পড়ার আগেই এজন্য অভিবাদন ও কৃতজ্ঞতা।
বর্ণাঢ্য ওই মোড়ক
উন্মোচন অনুষ্ঠানে আলোচনায়, মূল্যায়নে, কথনে-কথনে সেই সন্ধ্যা গড়িয়ে রাত পর্যন্ত যে
প্রাজ্ঞজনরা আলোকিত করেছিলেন তারা সমাজের নানা স্তরের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি। স্যারের
কাছে শিক্ষা-দীক্ষা গ্রহনকারী অংশীজনও ছিলেন অনেকেই যারা সমাজ ও প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ে
খ্যাতির জয়মাল্য ধারণকারী। তাদের নাম ক্রমানুসারে লিখলে এ নিবন্ধের কলেবর অনেক দীর্ঘ
হয়ে যাবে বিধায় শুধু তাদের অভিবাদন জানাই এজন্য, যেকোনো অনুষ্ঠানের শোভা বর্ধিত হয়
অংশীজনদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে এবং এ গুরুদায়িত্বই তারা পালন করলেন তপন স্যারকে
পাঁজরের ভাঁজে ভাঁজে রেখে। আলোচনা পর্বের পর সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের দ্যুতি আয়োজনের
আরও শোভা বর্ধন করেছিল।
এ সবই স্যারের ক্রমাগত মানুষের জন্য নিজেকে নিঃশেষ
করে অন্যকে অশেষ করার ও মানুষ গড়ার জন্য অক্লান্ত-প্রাণান্ত-নিবেদিত দীর্ঘ প্রয়াসের
প্রতিফল। মানুষ গড়ার কারিগর তপন স্যারের এটুকু প্রাপ্তি তো প্রাপ্যই ছিল। আরও অনেক
পাওনা তার রয়ে গেছে আমাদের কাছে। আমরা যারা স্যারের অপার দানে পুষ্ট হয়েছি তারা তো
বটেই, এমন মহতীকে বানিয়াচংবাসীরও কিছু দেওয়ার দায় রয়েছে। আমার দাবি, স্যারের জন্ম ও
কর্মস্থল বানিয়াচংয়ে আড়ম্বরপূর্ণ অনুষ্ঠান আয়োজনের মধ্য দিয়ে এই দায় পূরণের সামাজিক
উদ্যোগ নেওয়া হোক।
‘ভরা থাক স্মৃতিসুধায়’ গ্রন্থটির আগ্রহী সংগ্রাহকরা
তা সংগ্রহ করতে পারেন অনলাইন প্ল্যাটফর্ম রকমারি ডট কম, বাতিঘর, পূর্ব জিন্দাবাজার,
সিলেট এবং ছাত্রবন্ধু লাইব্রেরি, বানিয়াচং থেকে। ‘ভরা থাক স্মৃতিসুধায়’ গ্রন্থটি নিশ্চয় সুখপাঠ্য এবং
তাতে কেউ কেউ নিজেকে খুঁজেও পাবেন নানা ঘটনার দৃশ্যপটে, যেখানে স্যারের সঙ্গে অনেকেরই
লাভ ফর পাস্ট অর্থাৎ অতীতের ভালোবাসার স্মৃতির আলো জ্বলবে। স্যার, দীর্ঘায়ু হোন সুস্থ
থাকুন।
শেষ করি ঋষিপুরুষ
রবীন্দ্রনাথকে স্মরণ করে। তিনি বলেছেন, ‘বিদ্যা যে দেবে এবং বিদ্যা যে নেবে তাদের উভয়ের
মাঝখানে যে সেতু সেই সেতুটি হচ্ছে ভক্তিস্নেহের সম্বন্ধ। সেই আত্মীয়তার সম্বন্ধ না
থেকে যদি কেবল শুষ্ক কর্তব্য বা ব্যবসায়ের সম্বন্ধই থাকে তাহলে যারা পায় তারা হতভাগ্য,
যারা দেয় তারাও হতভাগ্য।’ তপন স্যারেরা নিশ্চয় রবিঠাকুরের এ উক্তির দ্বিতীয় লাইনের
ঊর্ধ্বে। স্যারের সঙ্গে আমাদের অসংখ্যজনের সম্পর্ক, ভক্তিস্নেহের।