সম্পাদকীয়
সম্পাদকীয়
প্রকাশ : ১৪ মে ২০২৪ ১০:২৮ এএম
অতীতের যেকোনো সময়ের তুলনায় দেশের শিক্ষাক্ষেত্রে অগ্রগতির চিত্র
উল্লেখযোগ্য। শিক্ষার প্রতি সরকারের গুরুত্বারোপও সাধুবাদযোগ্য। এবার মাধ্যমিক ও সমমানের
পরীক্ষায় শিক্ষার্থীদের সাফল্যের চিত্র আমাদের সঙ্গতই ভবিষ্যৎ নিয়ে আশান্বিত করে। করোনা
দুর্যোগের ধাক্কা কাটিয়ে স্বাভাবিক ধারায় দেশের শিক্ষাব্যবস্থা ফিরিয়ে আনতে যূথবদ্ধ
প্রয়াসের সুফলও দৃশ্যমান হয়েছে এবার মাধ্যমিক ও সমমানের পরীক্ষার পাসের হারের মধ্য
দিয়ে। করোনা-পরবর্তী সময়ে এবার পূর্ণাঙ্গ সিলেবাস-নম্বরের এই পরীক্ষার ফলাফলে প্রতীয়মান
হয়, স্বাভাবিক ধারায় ফিরছে শিক্ষা খাত। আমরা দেখছি, তুলনামূলক বিশ্লেষণে গত বছরের তুলনায়
এবার পাসের হার বেড়েছে বটে কিন্তু জিপিএ-৫-এর হার কিছুটা কমেছে। সংশ্লিষ্টদের অভিমত,
এ হার কমার কারণ গণিতে ফল খারাপ হওয়া। ১৩ মে প্রতিদিনের বাংলাদেশ-এ বলা হয়েছে, মেয়েদের
এগিয়ে থাকার টানা রেকর্ড এবারও বজায় রয়েছে। ১২ মে গণভবনে ফল প্রকাশ অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী
শেখ হাসিনা ছেলেদের পিছিয়ে থাকার কারণ খোঁজার নির্দেশ দিয়েছেন।
শুধু নারীশিক্ষা নয়, সামগ্রিকভাবে নারীর উন্নয়ন-অগ্রগতিতে সরকারের
বিশেষ কর্মপরিকল্পনা রয়েছে। তারপরও আমরা দেখছি, মাধ্যমিক পর্যায়ের পর মেয়েদের শিক্ষায়
কোনো কোনো ক্ষেত্রে কিছুটা ভাটা পড়ছে। এর পেছনে আর্থসামাজিক প্রেক্ষাপট অনেকাংশে দায়ী।
আমরা মনে করি, ছেলেদের পিছিয়ে পড়ার কারণ অনুসন্ধানের পাশাপাশি পরবর্তী প্রতিটি ধাপে
মেয়েদের শিক্ষার ক্ষেত্রে আর্থসামাজিক প্রেক্ষাপটে বাড়তি নজর দেওয়া প্রয়োজন। আমরা ছেলে-মেয়ের
সমানতালে অগ্রগতি প্রত্যাশা করি। খুব দূর অতীতে নয়, নারী শিক্ষার্থীর সংখ্যা এমনিতেই
কম ছিল। নানা কারণে তাদের ঝরে পড়ার হার উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়ালেও অন্তত মাধ্যমিক
পর্যায় পর্যন্ত তা অনেকটাই হ্রাস পেয়েছে। নারীশিক্ষার অগ্রগতি নিঃসন্দেহে আশান্বিত
হওয়ার বিষয় তবে ছেলেদের পিছিয়ে থাকার কারণ অনুসন্ধানে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশ অত্যন্ত
সময়োপযোগী বলেই আমরা মনে করি। লিঙ্গ সমতার ব্যাপারে আমরা বরাবরই গুরুত্বারোপ করে আসছি।
কোনো কোনো শিক্ষা গবেষক-বিশ্লেষক অভিমত ব্যক্ত করেছেন, মোবাইল ফোন আসক্তি ছেলেদের পিছিয়ে
থাকার অন্যতম কারণ। পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, মাধ্যমিক পর্যায়ে ফলের ক্ষেত্রে টানা সাতবার
পিছিয়ে রয়েছে ছেলেরা।
মোবাইল ফোনের বহুমাত্রিক বিকাশ প্রযুক্তির অগ্রগতির স্মারক। এর আশীর্বাদ
যেমন আছে পাশাপাশি অভিশাপও কম নেই। মোবাইল আসক্তি নিয়ে অনেক গবেষণায় দেখা গেছে, মাধ্যমিক
থেকে উচ্চশিক্ষা পর্যন্ত এর বিরূপ অভিঘাত লেগেছে। আমরা মনে করি, এ ব্যাপারে পরিবারের
দায়িত্ব সর্বাধিক। পরিবারের পাশাপাশি মোবাইল আসক্তি নিরসনে শিক্ষকমণ্ডলীর গুরুত্বপূর্ণ
ভূমিকাও অনস্বীকার্য। জগৎখ্যাত বিজ্ঞানী আলবার্ট আইনস্টাইন বলে গেছেন, ‘শিক্ষা কখনোই
কোনো কিছু শেখার নাম নয়, বরং মনকে চিন্তা করতে শেখানোর নামই হলো শিক্ষা।’ এ-ও সত্য,
আমাদের আর্থসামাজিক প্রেক্ষাপটে বহিরাঙ্গনে প্রজন্মের বিশেষ করে ছেলেদের উল্লেখযোগ্য
অংশ প্রযুক্তির বহুমাত্রিক প্রলোভনে সাড়া দিয়ে লক্ষ্যচ্যুত হয়ে পড়ছে। এর দায় পরিবার-শিক্ষাঙ্গন
এবং সমাজের কম নয়।
যারা মাধ্যমিক কিংবা সমমানের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছে তারা আরেক ধাপ
পরেই উচ্চশিক্ষার পরিসরে পা রাখবে। কিন্তু সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে
যে প্রতিবন্ধকতাগুলো জিইয়ে আছে সেগুলো অচিহ্নিত নয়। মাদকাসক্তি আমাদের সমাজজীবনে বড়
ধরনের অভিশাপ হয়ে দাঁড়িয়েছে। একই সঙ্গে আমরা দেখছি, স্কুলগামী ছেলে শিক্ষার্থীদের একটা
অংশ কিশোর গ্যাংয়ের সঙ্গে জড়িয়ে অপরাধজগতে ডুবে যাচ্ছে। শিক্ষা অর্জনের ক্ষেত্রে প্রাতিষ্ঠানিক
অনেক ক্ষেত্রেই বৈষম্যও বিদ্যমান। আমরা মনে করি, সব দিকেই গভীর মনোযোগ দেওয়া জরুরি।
সুযোগ-সুবিধার ক্ষেত্রে এখন আর ছেলে-মেয়ের মধ্যে কোনো বৈষম্যর অবকাশ নেই। আমরা জানি,
বর্তমানে দেশে সাক্ষরতার হার বেড়ে ৭৬ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। শতভাগ সাক্ষরতার হার নিশ্চিত
করতে হলে সমাজের সব স্তরে সমভাবে দৃষ্টি দিতে হবে। বিনামূল্যে পাঠ্যবই বিতরণসহ প্রজন্মকে
বিদ্যালয়মুখী করার জন্য সরকারের নানা কর্মসূচি রয়েছে। প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায় থেকে শুরু
করে সামাজিক পর্যায়ের বিভিন্ন স্তরে শিক্ষা অর্জনে অনুপ্রাণিত করায় সরকারের যে প্রয়াস
অব্যাহত রয়েছে, তা প্রশংসার দাবি রাখে।
শিক্ষার নানা পর্যায় রয়েছে। প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায় মুখ্যত হলেও পারিবারিক
এবং সামাজিক অনুশাসনের বিষয়গুলোও সমভাবেই গুরুত্বপূর্ণ। সামগ্রিকভাবে শিক্ষার মান উন্নত
করতে হলে শুধু শিক্ষার্থীই নয়, শিক্ষা দানকারীদেরও অনুশীলন-প্রশিক্ষণের পাশাপাশি যুগোপযোগী
আরও কর্মপরিকল্পনার প্রয়োজন রয়েছে। শিক্ষা নিশ্চয়ই অলংকারের মতো নয়, কাজেই এর হারিয়ে
যাওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই। আমেরিকান নৃবিজ্ঞানী এডওর্য়াড হল যথার্থই বলেছেন, ‘অতি দ্রুত
বুঝতে চেষ্টা করো না, কারণ তাতে অনেক ভুল থেকে যায়।’ আমরা দেখছি, বিদ্যালয় পর্যায়ে
শিক্ষার্থীদের উল্লেখযোগ্য একটি অংশ গাইডনির্ভরতার পাশাপাশি মুখস্থবিদ্যাচর্চার মাধ্যমে
পরীক্ষা পাসের চিন্তা অধিকতর করে থাকে। মানুষের অন্তর্নিহিত পরিপূর্ণ বিকাশই হলো পরিপূর্ণ
শিক্ষা। যারা অকৃতকার্য হয়েছে, তাদের ভেঙ্গে পড়ার কারণ নেই। পারিবারিক ও প্রাতিষ্ঠানিক
পর্যায়ে তাদের প্রতিপালনে অধিকতর যত্নবান হলে এর ইতিবাচক প্রভাব দৃশ্যমান হবে তা আমরা
আশা করি।
এই প্রেক্ষাপটে আমরা স্মরণ করি মাইক্রোসফটের প্রতিষ্ঠাতা বিল গেটসকে।
তিনি একটি সেমিনারে বলেছিলেন, ‘একবার পরীক্ষায় কয়েকটি বিষয়ে আমি ফেল করেছিলাম। কিন্তু
আমার বন্ধু সব বিষয়েই পাস করেছিল। শেষ পর্যন্ত আমার সেই বন্ধুটি মাইক্রোসফটের একজন
ইঞ্জিনিয়ার হয় আর আমি মাইক্রোসফটের প্রতিষ্ঠাতা।’ বিল গেটসের উক্তিটি অকৃতকার্যদের
জন্য অনুপ্রেরণার বড় শক্তি। রবীন্দ্রনাথ বলেছেন, ‘তাকেই বলি শ্রেষ্ঠ শিক্ষা যা কেবল
তথ্য পরিবেশন করে না। একই সঙ্গে বিশ্বসত্তার সাথে সামঞ্জস্য রেখে আমাদের জীবনকে গড়ে
তোলে।’ অমূল্য এই উক্তিগুলোর প্রেক্ষাপটে আমরা যুগোপযোগী এবং কর্মমুখী শিক্ষার ওপর
জোর দিই। প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ে শিক্ষার ভিত যত মজবুত হবে পরবর্তী পর্যায়ে তা
তত বেশি ফলদায়ক হবে। আমরা শ্রেণিকক্ষের শিক্ষা কার্যক্রমের ওপরও অধিক গুরুত্বারোপ করি।
শ্রেণিকক্ষের শিক্ষার মান উন্নয়ন ব্যতীত কোচিং সেন্টারের ব্যবসানির্ভর শিক্ষা কার্যক্রম
দিয়ে কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছা সম্ভব নয়। সর্বজনীন শিক্ষার প্রসার এবং ভবিষ্যতের জন্য
ফলদায়ক শিক্ষার লক্ষ্য অর্জনে শিক্ষা নিয়ে বাণিজ্য বন্ধ করতেই হবে।
মাধ্যমিক ও সমমানের পরীক্ষায় যারা উত্তীর্ণ হয়েছে তাদের অভিনন্দিত
করার পাশাপাশি আমরা অকৃতকার্যদের অনুপ্রেরণা ধারণ করে অনুশীলনের মাধ্যমে পরিশীলিত হওয়ার
তাগিদও দিই। আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো, ভবিষ্যতের পথ সুগম করতে শ্রেণিকক্ষের শিক্ষার ওপর
জোর দেওয়ার পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের কোচিং সেন্টার ও গাইড বইয়ের আশ্রয় নেওয়ার প্রবণতা
অর্থাৎ এই দুই ‘ভূত’ তাড়ানোর ব্যবস্থা নিশ্চিত করতেই হবে।