× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

আবহাওয়ার বৈরী আচরণ

অপরিণামদর্শী কর্মকাণ্ডের কঠিন অভিঘাত

ড. মোহাম্মদ জহিরুল হক

প্রকাশ : ১৩ মে ২০২৪ ০৯:৪৬ এএম

ড. মোহাম্মদ জহিরুল হক

ড. মোহাম্মদ জহিরুল হক

উনিশ শতকের শুরুতে উত্তর মেরুর বরফ গলা ও গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমনের নেতিবাচক প্রভাব নজরে আসার পর জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়টি একটি গবেষণা প্রপঞ্চ হিসেবে একাডেমিক আলোচনায় স্থান পায়। জলবায়ুর পরিবর্তন কখন শুরু হলো তা একেবারে স্থানকাল নির্ধারণ করে বলা আরেক গবেষণার বিষয়। তবে যখনই আবহাওয়ার নেতিবাচক প্রভাব বা তাপমাত্রার হেরফের হয় তখন জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে আলাপ-আলোচনা হয়। ১৯৩০-এর দশকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও উত্তর আটলান্টিক অঞ্চলে উষ্ণতা বেড়ে গেলে জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়টি সামনে আসে। সে সময় গ্রিনহাউস গ্যাসের নির্গমনের বিষয়টিও চলে আসে। তখন ঋতুচক্রের প্রভাব বলে বিষয়টিকে তেমন পাত্তা দেওয়া হয়নি। ১৯৫০-এর দশকে আবহাওয়া ও জলবায়ু বিষয়ক কয়েকটি বিজ্ঞানভিত্তিক নির্দেশক ও পরিমাপকের ব্যবহার শুরু হয়। তখন থেকে বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়টি বেশ গুরুত্ব পেতে থাকে। যদিও তখন পরিবেশগত বিপর্যয় নিয়েই বেশি আলাপ-আলোচনা হয়। কারণ হিসেবে চিহ্নিত হয় কার্বন ডাইঅক্সাইড গ্যাসের নির্গমন বৃদ্ধি। যদিও এটি জলবায়ু পরিবর্তনের একমাত্র কারণ নয়; এর পেছনে রয়েছে বহুবিধ কারণ।

১৯৬০-এর দশকের শেষ দিকে বলা শুরু হলো এভাবে কার্বন ডাইঅক্সাইডের নির্গমন বাড়লে একুশ শতকে গড় তাপমাত্রা বেড়ে যাবে, ওজোন স্তরের ক্ষয় হবে বা আয়তন হ্রাস পাবে, ভূপৃষ্ঠের তাপমাত্রা বাড়বে, আটলান্টিক ও হিমালয়ের বরফ গলা শুরু করবে, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়বে, উপকূলীয় দেশসমূহের অনেক ভূমি সমুদ্রে বিলীন হয়ে যাবে, অতিবৃষ্টি-অনাবৃষ্টির অভিজ্ঞতা বাড়বে, আবহাওয়া দিনে দিনে চরমভাবাপন্ন হবে, বন্যার প্রকোপ বাড়বে ইত্যাদি। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলাফল বা নির্দেশক নিয়ে আলোচনার পাশাপাশি এ অবস্থা উত্তরণের উপায় নিয়েও বিজ্ঞানী ও গবেষকরা আলোকপাত করছেন সে সময় থেকেই। তখন একুশ শতক বেশ দূরে ধরে নিয়ে জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়টি তেমন গুরুত্ব পায়নি যতটা পাওয়া উচিত ছিল। জলবায়ু পরিবর্তনে সব দেশ ও অঞ্চলের ভূমিকা এক নয়। আবার এর প্রভাবও দেশ ও অঞ্চল ভেদে ভিন্ন। অনেক দেশ অবস্থানগত কারণে জলবায়ু পরিবর্তনে ক্ষতিগ্রস্ত। বাংলাদেশ অবস্থানগত কারণে যেমন ক্ষতির হুমকিতে; আবার নিজেদের অপরিণামদর্শী উন্নয়ননীতি ও কর্মকাণ্ডের জন্য প্রাণপ্রকৃতির অস্তিত্ব আজ খাদের কিনারায়। প্রতি বছর গ্রীষ্মকাল দীর্ঘায়িত হচ্ছে, শীতকালের মেয়াদ কমে যাচ্ছে। আর স্বল্পকালের শীত হয় তীব্র থেকে তীব্রতর। অসহ্য গরম অসহ্য শীত। সমভাবাপন্ন আবহাওয়ার বাংলাদেশ আজ চরমভাবাপন্ন আবহাওয়ার অভিজ্ঞতা নিচ্ছে।

তাপপ্রবাহ থেকে মানুষ যখন মুক্তি চেয়ে আকাশপানে চাতক পাখির মতো তাকিয়ে ছিল বৃষ্টির অপেক্ষায়, হিমশীতল বাতাসের অপেক্ষায়; তার সবকিছু অবশ্য প্রকৃতি দিয়েছে। তবে তা প্রাণপ্রকৃতির জন্য অনুকূলে নয়। এ রকম শিলা ও ভারী বৃষ্টি যতটা না স্বস্তি দিয়েছে; তার চেয়ে বেশি অস্বস্তিতে ফেলেছে। মানুষের দুর্ভোগের কারণ হয়েছে। তাপমাত্রা বৃদ্ধির ফলে বাষ্পীভবন ও ভূপৃষ্ঠের শুষ্কতা উভয়েই বৃদ্ধি পাওয়ায় গড় বৃষ্টিপাতের পরিমাণ বেড়েছে। গত রমজানে সিলেট মহানগর ও আশপাশে এবং গত সপ্তাহে হবিগঞ্জে কালবৈশাখীর সঙ্গে বর্ষিত শিলার আকার ছিল স্বাভাবিকের চেয়ে কয়েক গুণ বড়। সারা দেশে বজ্রপাত বেড়েছে কয়েক গুণ। যদিও তীব্র তাপদাহের পর ভারী বৃষ্টিপাত আবহাওয়ার স্বাভাবিক আচরণ।

মে মাসে বাংলাদেশে গড়ে ১৮ থেকে ২০ দিন বৃষ্টিপাত হবে সেটি স্বাভাবিক ঘটনা। কিন্তু এ বছর মে মাসে আবহাওয়া বিভাগ বৃষ্টিপাতের যে পূর্বাভাস দিল তা স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি। এতে বন্যার কবলে পড়তে পারে দেশের অনেক অঞ্চল। যে বৃষ্টির জন্য মানুষ নামাজ পড়েছে, মোনাজাত করেছে, হাহাকার করেছে এখন সেই বৃষ্টি আবার সংকটে ফলতে যাচ্ছে। মে মাসে ঢাকা বিভাগে বৃষ্টিপাতের গড় পরিমাণ থাকে ২৯২ মিলিমিটার। এবার হতে পারে ৩৫০ মিলিমিটার। ময়মনসিংহ বিভাগে গড়ে ৩৮০ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়ে থাকলেও এবার হতে পারে ৩৬০ থেকে ৪৫৫ মিলিমিটার। সিলেট অঞ্চলে মে মাসে সাধারণত বৃষ্টির পরিমাণ বেশি থাকে। মে মাসের শেষ ২৪ দিনে সিলেট বিভাগে ৫১০-এর জায়গায় হতে পারে ৪৮৫ থেকে ৬১০ মিলিমিটার বৃষ্টি। অর্থাৎ স্বাভাবিকের তুলনায় ১০০ মিলিমিটার বৃষ্টি বেশি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে (প্রতিদিনের বাংলাদেশ : ৬ মে, ২০২৪)। অথচ গত মাস তথা এপ্রিল ছিল ৪৩ বছরের ইতিহাসে সবচেয়ে কম বৃষ্টিপাতের। গড়ে ৮১ শতাংশ কম বৃষ্টিপাত হয়েছে গত মাসে। ১৯৮১ সালের পর এ বছরের এপ্রিল ছিল সবচেয়ে শুষ্কতম মাস। এ যে আবহাওয়ার তারতম্য তা এক দিনে সৃষ্টি হয়নি। আমাদের দীর্ঘদিনের অপরিণামদর্শী আচরণের ফল হলো আজকের সংকট। তাই বায়ুদূষণ কমিয়ে, কার্বন ও অন্যান্য গ্রিনহাউস গ্যাসের নির্গমন হ্রাস করে, গাছপালা লাগিয়ে ও বনাঞ্চল বাড়িয়ে যে সংকট মোকাবিলার কথা বলা হয়েছে তা থেকে রাতারাতি ফল আসবে না। জলবায়ু পরিবর্তন যেভাবে ধীরে ধীরে হয়েছে তা উত্তরণে আরও বেশি সময় লাগবে। তাও আগের অবস্থায় ফিরে যাওয়া সম্ভব নয়। চাইলেই আমরা আগের অবস্থায় ফিরে যেতে পারব না। পুরোপুরি জীবাশ্ম জ্বালানিমুক্ত বিশ্ব গড়ে তোলা সম্ভব নয়। পরিবেশ দূষণ শূন্যে নামানো অসম্ভব। তার মানে এই নয় যে, একেবারে হাল ছেড়ে দিতে হবে। পরিবেশ বিপর্যয় ও জলবায়ু পরিবর্তন রোধকল্পে আমাদের যা যা করণীয় তা করে যেতে হবে।

বন্যার তীব্রতা বাড়া জলবায়ু পরিবর্তনের একটি সাধারণ দিক। আমাদের দেশে সাধারণত ১০ বছর পর পর বড় আকারে বন্যা হয়। এ চক্রে পরিবর্তন এসেছে। আমাদের এ মুহূর্তে দরকার এ পরিবর্তনে খাপ খাওয়ানো। বাংলাদেশে উত্তর-পূর্বাঞ্চল থেকে শুরু করে সারা দেশের বন্যার অন্যতম কারণ উজানের দেশ তথা ভারত থেকে নেমে আসা পানি এবং দেশের ভারী ও অতি বৃষ্টিপাত। এতেও পরিস্থিতি এত নাজুক হতো না যদি আমাদের পানি নিষ্কাশনের প্রাকৃতিক ব্যবস্থাটি বিনষ্ট না করা হতো। বাংলাদেশ হলো শুধু বাংলাদেশ নয়; বরং এশিয়ার উজানের দেশসমূহের পানি নিষ্কাশনের ড্রেন বা নালা। সেজন্য আমাদের দেশে জালের মতো নদ-নদীগুলো ছড়িয়ে রয়েছে। বিস্তীর্ণ হাওর, বিল ও জলাধার প্রাকৃতিকভাবেই তৈরি হয়েছে মূলত অতি ও ভারী বৃষ্টি ও উজানের ঢলের পানির আধারের জন্য। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে আমাদের দেশে প্রাকৃতিক দুর্যোগ হচ্ছে এটা যেমন সত্য; আমাদের নিজেদের অপরিণামদর্শী কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে সে সংকট ত্বরান্বিত ও দীর্ঘায়িত হচ্ছে সেটা হচ্ছে সবচেয়ে বড় বাস্তবতা। নদ-নদী, হাওর, জলাশয় তথা পানি ব্যবস্থাপনায় আমাদের দক্ষতা থাকার কথা ছিল নেদারল্যান্ডস থেকে শীর্ষে। জলবায়ু তহবিলের ন্যায্য হিস্‌সা আমরা পাচ্ছি না সেটা যতটুকু সত্য তার চেয়ে নির্মম বাস্তবতা হচ্ছে, যতটুকু পাচ্ছি তার যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করতে পারছি না। সিলেট অঞ্চলে ২০২২ সালের বন্যার পর প্রধানমন্ত্রী সরেজমিনে এসে কিছু নির্দেশনা দিয়েছিলেন। সরকারের বিভিন্ন দপ্তর ও বিশেষজ্ঞ পর্যায় থেকেও বিভিন্ন করণীয় উঠে এসেছিল। বিপদ কেটে গেলে সবকিছু ভুলে যাওয়া আমাদের জাতীয় চরিত্রের একটি দিক। তার পরিচয় জলবায়ু পরিবর্তন ও পরিবেশগত বিপর্যয় মোকাবিলার বেলায়ও পাওয়া যায়। ২০২২ সালের বন্যা ও বন্যা দীর্ঘায়িত হওয়ার কারণ হিসেবে সুরমার তলদেশ ভরাট, হাওরের বিভিন্ন জায়গায় পলি জমে গভীরতা কমে যাওয়া, পরিবেশ ও প্রতিবেশগত প্রভাব সমীক্ষার দিক বিবেচনায় না এনে হাওর এলাকায় নানা উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন।

২০২২ সালের ভয়াবহ বন্যার পর সিলেট মহানগরের কোলঘেঁষে বয়ে যাওয়া সুরমার ১৫ কিলোমিটার (কুশিঘাট থেকে বিশ্বনাথের দশগ্রাম পর্যন্ত) এলাকা খননের জন্য ৫০ কোটি টাকার প্রকল্প নেওয়া হয়। ২০২৩ সালের জানুয়ারিতে খননকাজ শুরু করে অর্ধেকও শেষ করতে পারেনি পানি উন্নয়ন বোর্ড। কয়েক মাস আগে আন্তর্জাতিক নদীকৃত্য দিবসে পরিবেশকর্মীরা সুরমার বুকে নাগরিকবন্ধন করে সংশ্লিষ্ট দপ্তরের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিলেন বন্যার মৌসুমের আগে খননকাজ শেষ করার জন্য। অথচ ২০ মাস পর খোদ পানি উন্নয়ন বোর্ড দাবি করছে, ৬০ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে (প্রতিদিনের বাংলাদেশ : ৬ মে, ২০২৪)। সিলেট সিটি করপোরেশনসহ বিভাগের কোনো একটি পৌরসভায় পানি নিষ্কাশনের সুষ্ঠু ব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি; বরং অপরিকল্পিত উন্নয়ন ও নগরায়ণের মাধ্যমে প্রাকৃতিক পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থাও ধ্বংস করা হয়েছে। ‘গ্রাম হবে শহর’ নীতির মূলে ছিল শহরের সুযোগসুবিধা গ্রামে নিয়ে যাওয়া। তার বিপরীতে গ্রামগুলোয় অপরিকল্পিত অবকাঠামো গড়ে উঠেছে। ইউনিয়ন পরিষদগুলোর তা মোকাবিলা করারও সামর্থ্য নেই। গ্রামগুলোয় প্রাকৃতিক যেসব জলাধার ছিল তার অনেকটি ভরাট করা হয়েছে; সরু করা হয়েছে। বক্স কালভার্ট নির্মাণের মাধ্যমে আমাদের খাল-নদী তথা পানি চলাচল ব্যবস্থা ধ্বংস করা হয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে হা-হুতাশ না করে এর প্রভাবের সঙ্গে খাপ খাওয়ানোর পাশাপাশি তা মোকাবিলার উপায় বের করা ও তার যথাযথ বাস্তবায়নের মাঝেই রয়েছে আমাদের প্রাণপ্রকৃতির অস্তিত্ব।

  • জলবায়ু ও পরিবেশ গবেষক-বিশ্লেষক। উপাচার্য, মেট্রোপলিটন ইউনিভার্সিটি, সিলেট

[email protected]

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা