পরিপ্রেক্ষিত
ডা. মনিলাল আইচ লিটু
প্রকাশ : ১৩ মে ২০২৪ ০৯:৩৬ এএম
সন্ধানীতে চক্ষু দান করে গেলেন বাংলাদেশের বিশিষ্ট বামপন্থি নেতা
কমিউনিস্ট আন্দোলনের অন্যতম প্রবাদপুরুষ বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির প্রেসিডিয়াম
সদস্য মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক বীর মুক্তিযোদ্ধা হায়দার আকবর খান রনো। এর কিছুদিন
আগে সন্ধানীতে চক্ষু দান করে গেছেন বাংলাদেশের প্রথম পতাকার অন্যতম রূপকার বীর মুক্তিযোদ্ধা
শিব নারায়ণ দাস। তার চোখে পৃথিবী দেখছেন রংপুরের মশিউর রহমান এবং চাঁদপুরের আবুল কালাম।
সন্ধানী বিশেষভাবে কৃতজ্ঞ চক্ষুদাতা সালেহা সুলতানের কাছে, যিনি ছিলেন বাংলাদেশের প্রগতিশীল
রাজনীতির পুরোধা, সমাজসেবী এবং সচেতন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব। তার চোখে আলো ফিরে পেয়েছে
ময়মনসিংহের খোকন রবি দাস এবং বগুড়ার তানিয়া আক্তার।
জনকণ্ঠের সম্পাদনা সহকারী বিভাগের প্রধান হারুনুর রশিদের চোখে পৃথিবী
দেখছে কেরানীগঞ্জের মুকিম শেখ এবং দাউদকান্দির আরব আলী। মাতৃভাষা বাংলার জন্য আমরা
যে সৈনিকদের কাছে কৃতজ্ঞ তাদের মধ্যে অন্যতমÑ ভাষাসৈনিক আব্দুল মতিন। সেই মহান ভাষাসৈনিকের
চোখে পৃথিবী দেখছে এখন রেশমা। সারাহ ইসলাম ঐশ্বর্য বাংলাদেশের প্রথম ক্যাটাবারিক অর্গান
ডোনেশনকারী। তার দুটো কিডনি প্রতিস্থাপিত হয়েছে দুজন কিডনি রোগীর মাঝে আবার তার দুটো
চোখে দেখছে ফেরদৌসী আক্তার ও সুজন। আরও অনেক উদাহরণ রয়েছে আমাদের মাঝেÑ যারা তাদের
জীবনের সবটুকু দিয়ে ভালোবেসে গেছেন এই দেশের মানুষকে।
বাংলাদেশের ১৪ লাখ অন্ধ ব্যক্তির মধ্যে ৫ লাখ কর্নিয়াজনিত অন্ধ।
বাংলাদেশের যেহেতু কর্নিয়াজনিত অন্ধত্ব নিয়ে কোনো সঠিক পরিসংখ্যান নেই তাই আমরা ভারতের
অন্ধ্র প্রদেশের একটি পরিসংখ্যানকে ব্যবহার করে তুলনামূলক আলোচনা করছি। ৫ লাখ অন্ধ
মানুষের চোখের আলো ফিরিয়ে দিতে হলে বর্তমানে বাংলাদেশে যে পরিমাণ কর্নিয়া পাওয়া
যায় এবং কর্নিয়া অপারেশন হয় তাতে প্রায় ছয় থেকে সাত হাজার বছর লাগবে। জনসংখ্যাবহুল
একটি দেশে দক্ষ জনসম্পদ নিশ্চিত করতে হলে এই বিশেষ অংশের দিকে বাড়তি মনোযোগ দিতেই হবে।
এই জনগোষ্ঠীকে মূল স্রোতের সঙ্গে সম্পৃক্ত করতে হলে তাদের অন্ধত্ব নিবারণ নিয়ে ভাবতে
হবে।
সন্ধানী জাতীয় চক্ষুদান সমিতি ১৯৮৪ সাল থেকে এই অন্ধত্ব নিবারণের
জন্য নিরলস কাজ করে আসছে। চার হাজারের অধিক কর্নিয়া কালেকশন করেছে এবং সাড়ে তিন হাজারের
মতো কর্নিয়াজনিত অন্ধ মানুষকে আলো ফিরিয়ে দিতে সক্ষম হয়েছে। কর্নিয়া সংগ্রহ বাড়াতে
হলে আমাদের কিছু স্বল্প এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। প্রথমত হাসপাতালে
মৃত ব্যক্তির আত্মীয়স্বজনের কাছে কর্তব্যরত চিকিৎসক, নার্স এবং সংশ্লিষ্ট অন্যান্য
ব্যক্তি কর্নিয়ার জন্য আবেদন করার পাশাপাশি কর্নিয়া সংগ্রহ করে আই ব্যাংকে পাঠাতে
হবে। দুর্ঘটনাজনিত মৃত্যুর পর মৃতদেহ থেকে কর্নিয়া সংগ্রহ করার জন্য হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ
এবং সরকারের সহযোগিতা পেলে অনেক কর্নিয়া সংগ্রহ করা সম্ভব। শিক্ষাক্রমে চক্ষুদান সম্পর্কে
সচেতনতা বাড়ায় এমন প্রবন্ধ, গল্প সংযোজন করা জরুরি। পৃথিবীর অনেক দেশে ড্রাইভিং লাইসেন্স,
জাতীয় পরিচয়পত্র ইত্যাদিতে চক্ষুদানের বিষয়ে একটি কলাম উল্লেখিত থাকে। আমাদের দেশেও
তা চালু করা যেতে পারে। ২০১৮ সালের মানবদেহে অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ সংযোজন আইনটি চক্ষুদানের
ক্ষেত্রে অনেকটা সহযোগী যা মানব দেহ অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ সংযোজন আইন ১৯৯৯ সংশোধনকল্পে প্রণীত
হয়েছে। দুর্ঘটনা বা অপঘাতে মৃত্যু যেগুলোর পোস্টমর্টেম প্রয়োজন হয় এসব কেস থেকে
চোখ নেওয়ার বিষয়টি সংযুক্ত করলে আরও অধিক কর্নিয়া সংগ্রহের পথ উন্মুক্ত হবে এবং
এই দেশের ৫ লাখ কর্নিয়াজনিত মানুষ তারা অন্ধত্বের অভিশাপ থেকে মুক্তি পাবে।