ড. সালেহ উদ্দিন আহমেদ
প্রকাশ : ১২ নভেম্বর ২০২২ ১৮:১৯ পিএম
অলঙ্করন : জয়ন্ত জন
আমাদের বর্তমান রিজার্ভ পরিস্থিতি উদ্বেগজনকই বলতে হয়। দেশের অর্থনীতি নিয়ে সরকার বেশ চাপে আছে। রিজার্ভ কমে যাচ্ছে। রেমিট্যান্সও কমে যাচ্ছে। রপ্তানি বাড়লেও তা আশানুরূপ নয়। সংকটের কারণে প্রতিনিয়ত রিজার্ভ থেকে ডলার বিক্রি করছে বাংলাদেশ ব্যাংক। নানা বিধিনিষেধের কারণে আমদানি ঋণপত্র খোলা কমানোর পাশাপাশি রিজার্ভ ভেঙে উন্নয়নকাজ চালানোর সিদ্ধান্ত শুনেছি কোনো কোনো ক্ষেত্রে। পরিস্থিতি সামাল দিতে যেসব দুর্ভাবনা দেখা দিয়েছে তা এড়িয়ে যাওয়ার অবকাশ নেই। আমাদের বিদ্যমান কিছু নেতিবাচক পরিস্থিতির সঙ্গে যোগ হয়েছে বৈশ্বিক সমস্যা। এ সমস্যা কাটিয়ে উঠতে হলে প্রথমে বুঝতে হবে আমাদের বাজারব্যবস্থা বেশ খারাপ। বাজারব্যবস্থার পাশাপাশি আমাদের ব্যাংকব্যবস্থাও বেশ নাজুক। ব্যাংক খাতে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হলেও তা সংকট নিরসনে পর্যাপ্ত নয়। ব্যাংক খাতে সংস্কারের বদলে ব্যাংকের সংখ্যা বাড়ানো হয়েছে। ফলে অর্থ পাচার, খেলাপি ঋণ বাড়ছে এবং ঋণ অনাদায়ের মতো সমস্যা দেখা দিয়েছে। এর মধ্যে রিজার্ভ ভেঙে উন্নয়নকাজ অব্যাহত রাখা মোটেও ভালো কিছু হবে না। তা ছাড়া অর্থনৈতিক ব্যবস্থার অবনতি সামনে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার আভাসও দিচ্ছে। এত সংকটের মধ্যে আইএমএফের ঋণ দেশের জন্য মঙ্গলবার্তাই বয়ে এনেছে।
রিজার্ভ কেন কমছে - এ নিয়ে আমরা আশঙ্কার কথা শুনতে পাচ্ছি। অথচ এই ঘাটতি কেন হচ্ছে এবং সমস্যাগুলো কোথায়-তা চিহ্নিত করার পরও সংকট নিরসনে কতটা পরিকল্পিতভাবে এগুনো হচ্ছে, এ নিয়ে প্রশ্ন আছে। অনেকে বলছেন রেমিট্যান্স প্রবাহের ধীরগতির কারণে রিজার্ভে ঘাটতি হচ্ছে। কিন্তু রেমিট্যান্সে ঘাটতি কেন হচ্ছে, তা বোঝা জরুরি।
আমরা জানি বিদেশ থেকে রেমিট্যান্স সাধারণত দেশের ব্যাংক এবং এক্সচেঞ্জ কোম্পানির মাধ্যমে আসে। রেমিট্যান্সের অর্থ কোথায় এবং কীভাবে পাঠাতে হবে সেজন্য বাংলাদেশের ব্যাংকগুলো এসব কোম্পানির সঙ্গে বিশেষ ব্যবস্থা করেছে। এও মনে রাখা জরুরি, বিদেশ থেকে আসা সব অর্থই রেমিট্যান্স নয়। কারণ ব্যাংকিং চ্যানেলে অন্য আরও অনেক লেনদেন সম্পন্ন হয়। রেমিট্যান্সের সুবিধা পেতে হলে কিছু শর্ত ও নিয়ম মানতে হয়। এসব নিয়ম মেনে বৈধপথে টাকা আনলে ২ শতাংশ হারে প্রণোদনা দেওয়া হয়। কিন্তু সম্প্রতি দেশের এক্সচেঞ্জ হাউসগুলোতে ভিন্ন ভিন্ন এক্সচেঞ্জ রেট থাকায় সমস্যা দেখা দিয়েছে। এ ছাড়া অনেকে বৈধপথে রেমিট্যান্স না পাঠিয়ে অন্য মাধ্যমে টাকা পাঠাচ্ছেন। ফলে রেমিট্যান্সের একটি বড় অংশ হাতছাড়া হয়ে যাচ্ছে। শুধু তাই নয়, রেমিট্যান্স হাউসগুলোতে ডলার রেটের তারতম্যও নানা সমস্যা তৈরি করেছে।
আমার মনে হয় বাংলাদেশ ব্যাংককে পূর্ণ স্বাধীনতা দেওয়া না হলে ব্যাংক খাতের সংকট নিরসন করা যাবে না। মানুষকে বৈধপথে অর্থ পাঠানোর সুবিধা বোঝাতে হবে এবং পুরো প্রক্রিয়া আরও সহজ করতে হবে। আমি মনে করি, এক্ষেত্রে রেমিট্যান্স হাউসদের সুযোগ-সুবিধা বাড়ানো প্রয়োজন। আমাদের দেশে রেমিট্যান্স ও ডলার ভাঙানোর ক্ষেত্রে সচরাচর চার ধরনের রেট নির্ধারণ করা হয়। মুক্তবাজারে রেটের হেরফের হয়ে থাকে। এমন হলে ডলারের বাজার সংকটময় হওয়াটাই স্বাভাবিক। ডলারের একটি নির্দিষ্ট রেট নির্ধারণ করে দিতে হবে। যদিও সম্প্রতি এমন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, কিন্তু নজরদারির অভাবে নিয়ন্ত্রণ আনা যাচ্ছে না। রেমিট্যান্সের পাশাপাশি কর আদায়ের ক্ষেত্রে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের পক্ষ থেকে বেশ কিছু উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কিন্তু এসব উদ্যোগ পূর্ণমাত্রায় চালু করা না গেলে কাক্সিক্ষত ফল মিলবে না। রাজস্ব বোর্ডকে তাই অল ফরমেট অ্যাকশনের বিষয়ে মনোযোগী হতে হবে। তবে রেমিট্যান্স কমার ধারাটি আমার ধারণা সাময়িক। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার অপেক্ষা করতে হবে। বৈশ্বিক পরিস্থিতি কিছুটা শান্ত হলে আমাদের রেমিট্যান্সের প্রবাহ আবার স্বাভাবিক হয়ে যাবে-এমনটাই আমার ধারণা। সব দেশই এখন পুনর্গঠন নিয়ে ব্যস্ত। বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলার জন্য আমাদেরও পুনর্গঠনে মনোযোগ দিতে হবে। আর এই পুনর্গঠনে ব্যাংক খাতকে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে হবে। ব্যাংক খাতের এ বিষয়ে শক্ত অবস্থান নেওয়া জরুরি। আপাতত মুদ্রা পাচার ও হুন্ডি বন্ধে আশু কঠোর কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। কারণ এই দুই সমস্যার কারণে বহু বিদেশি অর্থ আমাদের হাতছাড়া হয়ে যাচ্ছে। শুধু তাই নয়, স্বল্পমেয়াদি ঋণের কারণে সামনে রিজার্ভে চাপ বাড়তে পারে। তাই স্বল্পমেয়াদি ঋণ নেওয়া বন্ধ করতে হবে।
আমদানি ব্যয় মেটাতে রিজার্ভ থেকে কেন্দ্রীয় ব্যাংক অন্যান্য ব্যাংকের কাছে ডলার বিক্রি করছে। দ্রুত তাও বন্ধ করতে হবে। শুধু রেমিট্যান্স আসা কমে গেছে বলেই আমাদের সামনে ডলার সংকট প্রকট হয়ে উঠেছে তা কিন্তু নয়। সারা বিশে^ই সরবরাহ ঘাটতি ও জ্বালানি সংকটের কারণে অর্থনৈতিক খাতে সমস্যা দেখা দিচ্ছে। বিশ্বের দেশে দেশে দুর্ভিক্ষের আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। দুর্ভিক্ষ যেহেতু এখনও আশঙ্কামাত্র, তাই দুর্ভিক্ষ সামাল দিতে প্রস্তুতি নিতে হবে। সেজন্য আমাদের রফতানি সক্ষমতা বাড়াতে হবে। এক্ষেত্রে আমাদের অবস্থা এখনও আশানুরূপ নয়। এখনও আমরা অনেক ক্ষেত্রেই আমদানিনির্ভর। রপ্তানি আয়ের পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা বাড়ানোর সুযোগ থাকলেও আমরা এর সদ্ব্যবহার করতে পারছি না। উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানোর বিষয়ে আমাদের মনোযোগ আরও বাড়ানো দরকার। দেশের শিল্পব্যবস্থা প্রতিযোগিতামূলক করতে হবে। এক্ষেত্রে প্রযুক্তিগত উন্নয়নের বিকল্প নেই। আমরা এখনও প্রযুক্তিগত দিকে অনেকটাই পিছিয়ে আছি। বহু আগে থেকেই আমরা আমদানির ক্ষেত্রে সতর্ক হওয়ার পরামর্শ দিয়ে আসছি। কিন্তু সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংক দেখব, দেখছি বলে সময় ক্ষেপণ করেছে। এ কারণে দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। গত অর্থবছরে প্রায় ৯০ বিলিয়ন ডলারের আমদানি হয়েছে। প্রকৃতই এ পরিমাণ পণ্য দেশে আমদানি হয়েছে কি না, সেটি বড় প্রশ্ন। কারণ দেশের শিল্পায়ন, কর্মসংস্থান থেকে শুরু করে অর্থনীতির কোনো সূচকেই এ আমদানির প্রতিফলন নেই। আমদানির নামে দেশ থেকে অর্থ পাচার হয়ে গেল কি না, খতিয়ে দেখা দরকার। আমাদের অর্থনীতির আরেকটি বাজে দিক হলো আমরা এককেন্দ্রিক রপ্তানির দিকে গিয়েছি। মূল্যস্ফীতি বাড়ছে। বাজার নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না। একদিকে জোগান কম উপরন্তু চাহিদা বেশি। কতিপয় অসাধু ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট করে বাজার নিয়ন্ত্রণ করছে। বাজার নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থাগুলো কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারছে না।
আমরা জানি, প্রতিটি উন্নয়নশীল রাষ্ট্রেই বেশকিছু খাতে ভর্তুকি দেওয়া জরুরি প্রয়োজন হিসেবে দেখা দেয়। বিশেষত কৃষি খাতে কৃষককে ভর্তুকি দিতেই হবে। কৃষক আমাদের উৎপাদনের মেরুদণ্ড। তাদের সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করলে আমাদের উৎপাদনব্যবস্থা সচল থাকবে। তাই শুধু আইএমএফ কেন, যেকোনো বিদেশি সংস্থার ঋণসুবিধার জন্য সব ভর্তুকি তুলে দেওয়ার যৌক্তিকতা নেই। আমাদের রিজার্ভ কমে গেছে, নিশ্চয় এটি চিন্তার। তবে পরিস্থিতি এতটা খারাপ হয়নি। এজন্যই আগাম ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। রাজস্ব আয় বাড়ানোর দিকে মনোযোগ বাড়াতে হবে। দেশে এখন আলোচনার আরেকটি বিষয়, আইএমএফের ঋণ। বাংলাদেশ এখন যে পরিস্থিতিতে আছে তাতে ঋণ নেওয়ার বিষয়ে আইএমএফের সঙ্গে কিছুটা সমঝোতা হতে পারে তা আগেই বলেছিলাম। এও বলেছিলাম, সমঝোতার মাধ্যমে আইএমএফ থেকে ঋণ নেওয়া যেতে পারে। বস্তুত হলোও তাই। যেসব শর্তে বাংলাদেশ আইএমএফ থেকে ঋণ পাচ্ছে, সেসব শর্ত অনেকের মতেই সহজ। আমিও মনে করি এই ঋণ দেশের অর্থনীতির জন্য মঙ্গলকর হবে। তবে সবচেয়ে বড় কথা হলো, ঋণের সদ্ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। একইসঙ্গে নানা খাতে সংস্কারের বিষয়ে যেসব কথা আছে সেসব বিষয়ে আমাদের স্বার্থ ও প্রয়োজন অনুসারে পদক্ষেপ নিতে হবে। অন্য কারো নয়, বরং আমাদেরই সিদ্ধান্ত মোতাবেক।
ব্যাংকসহ আরও কিছু খাতে আমাদের নিজেদের স্বার্থেই সংস্কার জরুরি। ভর্তুকি কমানো, রাজস্ব আয় বাড়ানো, আর্থিক খাতে সংস্কার-এগুলো নিজেদেরই করার কথা। এও মনে রাখতে হবে, আইএমএফের এই ঋণ পাওয়ায় বাংলাদেশের জন্য অন্য দাতাসংস্থা থেকেও ঋণ পাওয়া সহজ হবে। তবে আত্মতুষ্টিতে না ভুগে দেশের অর্থনীতির ক্ষতি হয় এমন কিছু যেন না হয়। কৃষিতে ভর্তুকির বিষয়ে গুরুত্ব দিতে হবে। কারণ ভর্তুকি পশ্চিমা দেশেও রয়েছে। ফ্রান্স, কানাডাও কৃষিতে ভর্তুকি দেয়। আমাদের কৃষকদেরও ভর্তুকির প্রয়োজন রয়েছে। এর সঙ্গে দেশের খাদ্য নিরাপত্তার বিষয় জড়িত। সরকার অন্য খাতে কিছুটা ব্যয় কাটছাঁট করতে পারে। রিজার্ভ কমে যাচ্ছে তা অসত্য নয়, তবে এ নিয়ে আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই। বরং উচিত প্রয়োজনীয় কাজগুলো দ্রুততার সঙ্গে শেষ করা।
লেখক : অর্থনীতিবিদ ও সাবেক গভর্নর, বাংলাদেশ ব্যাংক