অপরিনামদর্শী কর্মকাণ্ড
পাভেল পার্থ
প্রকাশ : ০৯ মে ২০২৪ ০৯:৩৬ এএম
পাভেল পার্থ
সমাজমাধ্যম ও গণমাধ্যমে আলতাদীঘি শালবনের দুটি আলোকচিত্র নিয়ে অনেকেই প্রতিক্রিয়া জানাচ্ছেন। ২০১৯ সালে আলোকচিত্রী মো. রাশেদুজ্জমানের তোলা ছবিটিতে দেখা যায় সবুজ বনের ভেতর টইটম্বুর এক দীঘি, আর ২০২৪ সালে আলোকচিত্রী আশিক হোসাইনের ছবিটিতে দেখা যায় বৃক্ষশূন্য বিরান এলাকায় এক নিহত দীঘির শুষ্ক নিথর কঙ্কাল। আলতাদীঘি শালবনের সাম্প্রতিক এ নির্দয় বিনাশ নিয়ে গণমাধ্যমে কিছু সচিত্র প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। প্রতিদিনের বাংলাদেশ ‘দীঘি শুকিয়ে বন উজাড় করে উন্নয়ন’ কিংবা দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড তাদের বাংলা অনলাইনে ‘আলতাদীঘি কীভাবে একটি সংরক্ষণ প্রকল্প জাতীয় উদ্যানের সর্বনাশ ঘটাল’ শিরোনামে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। গণমাধ্যমে ধামইরহাট বনবিট কর্মকর্তা আলতাদীঘির অপরিকল্পিত উন্নয়নের কথা স্বীকার করেছেন এবং নওগাঁ জেলা প্রশাসক বিষয়টি তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়েছেন। রাষ্ট্র যাদের ওপর প্রাণপ্রকৃতি দেখভালের দাপ্তরিক দায়িত্ব দেয় তারা কেন বনবিনাশের সময় নিশ্চুপ থাকেন? যখন সংবাদমাধ্যম কিংবা নাগরিকসমাজ এসব নিয়ে তর্ক তোলে তখন তারা কিছুটা তৎপর হন। ২০২৩ সালে সরকারের বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তন ট্রাস্টের অর্থায়নে ‘আলতাদীঘি পুনঃখননের মাধ্যমে আলতাদীঘি জাতীয় উদ্যানের জীববৈচিত্র্য পুনরুদ্ধার ও সংরক্ষণ প্রকল্প’ শীর্ষক ৬ কোটি ৪৯ লাখ ৯৭ হাজার টাকার একটি উন্নয়ন কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়। এ প্রকল্পের অংশ হিসেবে রাজশাহী সামাজিক বন বিভাগের তত্ত্বাবধানে আলতাদীঘি শালবনের সুপ্রাচীন দীঘিটি পুনঃখননের কাজ শুরু হয়।

গণমাধ্যমসূত্রে প্রকাশ, উল্লিখিত প্রকল্পের
পরিকল্পনা অনুযায়ী দীঘির চারপাশের পাড় উঁচু ও প্রশস্ত করে প্রায় ৪ ফুট গভীর করে খনন
করার কথা। আর দীঘি পুনঃখনন বাস্তবায়ন করতে গিয়ে দীঘির চারধারের সহস্র গাছ কেটে ফেলা
হয়েছে। এ ছাড়া রহস্যময় আগুন লেগে পুড়ে যায় বন ও বন্য প্রাণীর বাসস্থান। বনের ভেতর মাটির
রাস্তা পাকা করে বহিরাগতদের প্রবেশ বাড়ায় বিপন্ন হচ্ছে আলতাদীঘির পরিবেশ। জলবায়ু পরিবর্তন
ট্রাস্ট তহবিলের টাকা দিয়ে আজ দেশের একটি প্রাচীন পত্রঝরা বন মেরে ফেলার মানে কী? জনগণের
টাকায় খুন হবে এক প্রাচীন অরণ্য? তাও আবার জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত মোকাবিলা এবং পরিবেশ
সংরক্ষণের অসিলায়? নতুন প্রজন্ম এখান থেকে কী বার্তা পাবে, কিংবা বিশ্ববাসী এ নির্দয়
উদাহরণকে কীভাবে দেখবে? জলবায়ু সম্মেলনের মঞ্চে আলতাদীঘির এ করুণ কাহিনী নিয়ে বাংলাদেশ
কীভাবে দাঁড়াবে? যারা এ প্রকল্পের সঙ্গে জড়িত, এর পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন করছেন তারা
কি নিজেদের প্রশ্ন করবেন? আলতাদীঘি বাঁচাতে বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা), গ্রিনভয়েস,
নওগাঁ একুশে পরিষদসহ সামাজিক ও পরিবেশ সংগঠন নওঁগায় মানববন্ধন করেছে।
আমরা কোনোভাবেই জলবায়ু তহবিলের টাকায় প্রাণপ্রকৃতির
এমন সর্বনাশ চাইতে পারি না। জলবায়ু তহবিলের সঙ্গে দেশের সুনাম ও সক্ষমতা জড়িত। জলবায়ু
পরিবর্তনের প্রভাব ও ক্ষয়ক্ষতি মোকাবিলায় বিশ্বব্যাপী জলবায়ু তহবিল ও অর্থায়নের তর্ক
চলছে দীর্ঘ সময়। প্যারিসসহ প্রায় সব জলবায়ু সম্মেলনে জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য দায়ী বিশ্বনেতৃত্ব
ক্ষতিগ্রস্ত দেশসমূহের জন্য জলবায়ু তহবিল গঠনে অঙ্গীকার করেছিলেন, যা এখনও বাস্তবায়িত
হয়নি। বাংলাদেশ উন্নত দেশের সেসব অঙ্গীকারের জন্য বসে থাকেনি। ২০০৯ সালে তৈরি করে
‘বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তন কৌশল ও কর্মপরিকল্পনা ২০০৯’। ২০০৯-২০১০ অর্থবছরে নিজস্ব
অর্থায়নে বিশ্বে প্রথম জলবায়ু তহবিল (ক্লাইমেট চেঞ্জ ট্রাস্ট ফান্ড/সিসিটিএফ) গঠন করে
বাংলাদেশ। এ তহবিল পরিচালনার জন্য তৈরি হয় ‘জলবায়ু ট্রাস্ট আইন ২০১০’। ওই আইনের আলোকে
২০১৩ সালে গঠিত হয় ‘বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তন ট্রাস্ট’। এ ট্রাস্টের একটি লক্ষ্য হলো,
জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে মানুষ, প্রাণবৈচিত্র্য ও প্রকৃতির ওপর বিরূপ প্রভাব মোকাবিলায়
অভিযোজন, প্রশমন, প্রযুক্তি উন্নয়ন ও হস্তান্তর, সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং অর্থায়নের ব্যবস্থা
গ্রহণ করা বা করার পক্ষে প্রয়োজনীয় কার্যক্রম গ্রহণ।
পরিবেশ-প্রতিবেশ আলতাদীঘি শালবনে জলবায়ু ট্রাস্টের
তহবিলে বাস্তবায়িত প্রকল্পটি কি কোনোভাবেই রাষ্ট্রের এ গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের লক্ষ্য-উদ্দেশ্য
ধারণ করে? এ ট্রাস্ট কিংবা আলতাদীঘি শালবন ‘পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের’
অধীন, আর এ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে আছেন বিশিষ্ট পরিবেশবিদ সাবের হোসেন চৌধুরী। কেবল
একজন দায়িত্বশীল পরিবেশমন্ত্রী হিসেবে নয়; বিশ্বের একজন গুরুত্বপূর্ণ জলবায়ু-কূটনীতিক
হিসেবে আলতাদীঘি বনের সুরক্ষায় আশা করি তিনি তৎপর হবেন। জলবায়ু তহবিলের টাকা দিয়ে আলতাদীঘি
শালবনে যা ঘটছে তার সুষ্ঠু নিরপেক্ষ তদন্ত দরকার এবং তদন্ত প্রতিবেদন পাবলিক পরিসরে
প্রকাশ করা দরকার। তদন্ত সাপেক্ষে ঘটনায় জড়িতদের আইন ও বিচারের আওতায় আনা জরুরি।
নওগাঁর ধামইরহাট উপজেলার উমর ও ধামইরহাট ইউনিয়নে
অবস্থিত আলতাদীঘি শালবন রাজশাহী সামাজিক বন বিভাগের পাইকবান্ধা রেঞ্জের ধামইরহাট রেঞ্জের
অধীন। ২০১৪ সালে বন বিভাগ আমাকে জানিয়েছিল, এ বনে শাল, আমলকী, হরীতকী, বহেরা, শিমুল,
বেল, ছাতিম, নিম, পাকুড়, কুম্ভী ও তেণ্ডু গাছ আছে। কাঠবিড়ালি, শিয়াল, বেজি, বনবিড়াল,
গুইসাপ, পানকৌড়ি, কাঠঠোকরা, বক, মাছরাঙা, দোয়েল, ময়না, ঘুঘু ও বিভিন্ন প্রজাতির সাপ
আছে। ‘বৃক্ষসম্পদ সংরক্ষণ, বন্য প্রাণী সংরক্ষণ ও পর্যটন সুবিধার্থে উন্নয়নের জন্য’
বন অধিদপ্তর ২০১১ সালের শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবসে আলতাদীঘিকে জাতীয় উদ্যান ঘোষণা করে।
২৬৪.১২ হেক্টর আয়তনের এ বনের সুপ্রাচীন দীঘিটির আয়তন পাড়সহ প্রায় ৫৫.৪৬ একর। আলতাদীঘির
১৭.৩৪ হেক্টর বনভূমিকে ২০১৬ সালে জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ এলাকা ঘোষণা করা হয়। বন বিভাগ
গণমাধ্যমকে জানায়, সম্প্রতি দীঘির চারধারের ১ হাজার ২টি গাছ ৩৫ লাখ ৯৫ হাজার ২৫৬ টাকায়
টেন্ডারের মাধ্যমে বিক্রি করা হয়েছে। আলতাদীঘির উন্নয়নে ওয়াচ টাওয়ার, বনের ভেতর পাকা
সড়ক ও নানা নির্মাণের কাজ চলছে। বন বিভাগের এ ধরনের বনবিনাশী কর্মকাণ্ডকে সব সময় ‘ইকোট্যুরিজম’
নাম দেওয়া হয়। এটি আমরা মৌলভীবাজারের মাধবকুণ্ডে কিংবা টাঙ্গাইলের মধুপুর শালবনে দেখেছি।
বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে ২০১১ থেকে ২০১৬ পর্যন্ত বাস্তবায়িত ‘স্ট্রেংদেনিং রিজিওনাল
কো-অপারেশন ফর ওয়াইল্ডলাইফ প্রটেকশন প্রজেক্ট (এসআরসিডব্লিউপি)’-এর মাধ্যমেও এ বন তার
প্রাকৃতিক বিকাশের অধিকার হারিয়েছে।
আলতাদীঘি বনের স্থানীয় আদিবাসী বনবিজ্ঞান অনুযায়ী
এ বনের বিশেষ বৈশিষ্ট্য উঁচু উইঢিবি। এ উইঢিবিগুলোই এ বনের প্রাণ। বৃষ্টির জল জমা রেখে
মাটির তলায় অসংখ্য নালা দিয়ে সারা বনের মাটিতে রস জোগায় এ ঢিবিগুলো। বন বিভাগ দাবি
করেছে, দীঘির চারধারের ইউক্যালিপটাস ও অ্যাকাশিয়া গাছ কাটা হয়েছে, শাল গাছ কাটা হয়নি।
শালবনের বাস্তুতন্ত্র বিনষ্ট করে এসব আগ্রাসি গাছের চারা ‘সামাজিক বনায়নের’ নামে বন
বিভাগই লাগিয়েছিল। এখন ৩ হাজার প্রজাতির দেশি গাছের চারা লাগানোর পরিকল্পনা করেছে বন
বিভাগ। আলতাদীঘির সুরক্ষায় স্থানীয় বাস্তুতন্ত্র এবং খাদ্যশৃঙ্খলাকে বোঝা জরুরি।
স্থানীয় মানুষের লোকায়ত বনবিদ্যা ও অনুশীলনকে বন সংরক্ষণে যুক্ত করা জরুরি। বিনাশী
উন্নয়নের তাণ্ডব বন্ধ করে, স্থানীয় জনগণকে যুক্ত করে আলতাদীঘির সুরক্ষায় পরিকল্পনা
করুন জলবায়ু তহবিলের দায়িত্বশীলরা।