× ই-পেপার প্রচ্ছদ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি ফিচার চট্টগ্রাম ভিডিও সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

পানি সংকট

জলবায়ু লাল কার্ড দেখিয়ে দিয়েছে

ড. মইনুল হাসান

প্রকাশ : ০৩ মে ২০২৪ ১৩:২২ পিএম

জলবায়ু লাল কার্ড দেখিয়ে দিয়েছে

সুখবর নেই, শুধুই মন খারাপ করা দুঃসংবাদ। বেশ কিছুদিন থেকেই বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যমগুলোর সংবাদের প্রধান শিরোনাম হচ্ছে তীব্র দাবদাহ। অস্বাভাবিক দাবদাহে জনজীবন বিপর্যস্ত। মাথার ওপর তপ্ত সূর্যের বিচ্ছুরিত তাপের কারণে অসহায় মানুষের মৃত্যুর বিষণ্ন খবরও বাদ যাচ্ছে না। রাজধানীসহ দেশের বড় শহরগুলোতে লু হাওয়া বইছে। গরমের সঙ্গে শুষ্ক আবহাওয়ার কারণে ধুলার পরিমাণ বেড়ে মানুষের কষ্ট আর দুর্ভোগ আরও বাড়িয়ে তুলেছেশিক্ষার্থীদের নিরাপত্তার কথা ভেবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে। তাপমাত্রার মাত্রা ছাড়া পীড়নে মানুষ দিশাহারা। এক ফোঁটা পানির জন্য, একটু বৃষ্টির হিমেলধারায় প্রাণ জুড়াবার আকুল বাসনায় চোখের পানি ঝরিয়ে মানুষ আকাশের দিকে হাত তুলে অদৃশ্য শক্তির কাছে প্রার্থনা করছে।

সুপেয় পানির জন্য মানুষের আকুতি আগেও ছিল, আজও আছে। অ্যাজটেক সভ্যতায় তেলালোক ছিল বৃষ্টি, জল এবং পার্থিব উর্বরতার দেবতা। বৃষ্টি ও ফসলের ভালো ফলন আশা করে দেবতার তুষ্টি লাভের জন্য নর হত্যার রেওয়াজ ছিল। দেবতার সন্তুষ্টির জন্য শিশুদের অগ্নিদগ্ধ করার সময় অমানুষিক যন্ত্রণা দেওয়া হতো। কারণ জলের দেবতা শিশুদের চোখের জলও খুব পছন্দ করত। এ ছিল অ্যাজটেকদের ধর্মীয় বিশ্বাস। পানি আর বৃষ্টির জন্য আহাজারি, হাহাকার দিন দিন বেড়েই চলছে। গেল বছর পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে দাবদাহ মানুষসহ অন্য জীবদের জীবন দুর্বিষহ করেছিল। ইরাক ও কুয়েতের বহু স্থানের তাপমাত্রা ৫০ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছাড়িয়ে গিয়েছিল। ইউরোপ, আমেরিকার বনজঙ্গল পুড়ে উজাড় হয়েছিল। গুরুতর খরা আফ্রিকার দুই কোটি মানুষকে দুর্ভিক্ষের মুখে ঠেলে দিয়েছিল।

বিশ্বজুড়ে কোনো সুসংবাদ নেই। বিজ্ঞানীরা বারবার সতর্ক করছেন, মহামূল্যবান তরল সুপেয় পানিদ্রুত নিঃশেষ হয়ে যাচ্ছে। তারা জানিয়েছেন, এই গ্রহের ২০০ কোটি মানুষ আজও নিরাপদ পানি পান করার সুযোগ পাচ্ছে না। পানির কারণে ৩০০ কোটি মানুষ খাদ্য নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে। পানির অভাবজনিত কারণে সৃষ্ট রোগে আক্রান্ত হয়ে প্রতি ১৭ সেকেন্ডে একটি করে শিশু মৃত্যুবরণ করছে। মানুষ যেমন বাতাস ছাড়া বাঁচতে পারে না, তেমনি পানি ছাড়া জীবনের অস্তিত্ব থাকবে না, জীবজগৎ বিলুপ্ত হবে। পৃথিবীর দেশে দেশে সুপেয় পানির সংকট মানবতাকে চোখ রাঙাচ্ছে। বিশেষজ্ঞ ও বিজ্ঞানীরা সতর্ক করে সুপেয় পানির সংকটের চারটি প্রধান কারণ উল্লেখ করেছেন

বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধি : জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে মেরু অঞ্চলের বিশাল সুপেয় পানির ভান্ডার, বরফ দ্রুত গলে যাচ্ছে। আশির দশকে, অ্যান্টার্কটিকায় প্রতিবছর ৪ হাজার কোটি টন বরফ গলে পানি হতো। ২০০৯ থেকে ২০১৭ এই সময়ে বরফ গলা বৃদ্ধি পেয়েছে ছয় গুণেরও বেশি অর্থাৎ বছরে ২৫ হাজার ২০০ কোটি টন। মোটকথা প্রতিমুহূর্তে নোনাপানিতে বিলীন হয়ে যাচ্ছে বিপুল পরিমাণ পানের পানি।

কৃষি ও শিল্পকারখানায় পানির ব্যবহার : কৃষি ও শিল্পকারখানার কাজে নদীনালা এবং হ্রদের পানিসহ ভূগর্ভস্থ পানির অতিরিক্ত ব্যবহার সুপেয় পানি সংকটের অন্যতম কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশ্বব্যাপী কৃষিকাজে ৭০ শতাংশ মিঠাপানি ব্যবহার করা হয়। এর একটি বড় অংশ সেচকাজে ব্যবহার হয়। কিছু উন্নয়নশীল দেশে কৃষি ও শিল্পকারখানায় পানির ব্যবহার আরও বেশি। ফলে ইতোমধ্যে ৩০টিরও বেশি কৃষিনির্ভর দেশ তীব্র পানি সংকটের সম্মুখীন। বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ইতোমধ্যে ভূগর্ভস্থ পানি হ্রাস পাচ্ছে এবং পানির স্তর অনেক নিচে নেমে গেছে বলে খবর পাওয়া যাচ্ছে।

পানির অতিরিক্ত খরচ ও অপচয় : আজও আমরা পানি খরচ করতে যথেষ্ট হিসাবি বা দায়িত্বশীল হয়ে উঠতে পারিনি। আমাদের ধারণা, পৃথিবীতে মিঠাপানির অফুরন্ত নহর বইছে। অবস্থা মোটেই তা নয়, আমাদের ধরণিতে দৈনন্দিন কাজে ব্যবহারের পানি রয়েছে মোট পানির মাত্র ২ দশমিক ৫ শতাংশ। তাই আমাদের বুঝতে মোটেও অসুবিধা হওয়ার কথা নয় যে, পানিতে সয়লাব হলেও ব্যবহার্য পানির পরিমাণ নিতান্তই অল্প। ফরাসি পরিসংখ্যান বিভাগের দেওয়া তথ্যানুসারে জানা যায়, ১৯৭৬ সালে ফরাসিরা প্রতিদিন মাথাপিছু ১০৬ লিটার বা ২৮ গ্যালন পানি ব্যবহার করত। বিশের দশকের শুরুতে তা বৃদ্ধি পেয়ে হয়েছে ১৬৫ লিটার বা ৪৪ গ্যালন। পানি খরচে ইংরেজরা অনেক বেশি বেহিসাবি। আমেরিকানদের কথা আমেরিকানরাই ভালো বলতে পারবে। মরুভূমিতে গড়ে ওঠা মরূদ্যান লাস ভেগাস নগরী দিকে দৃষ্টি দিলেই তাদের পানি খরচের অনেকটা ধারণা পাওয়া যাবে।

লাস ভেগাসে ২০ লাখ বাসিন্দা আর সংখ্যায় বিপুল পর্যটকের পানির চাহিদা মেটাতে মিড হ্রদ থেকে দানবাকৃতির সুড়ঙ্গপথে প্রতিদিন ১৫০ কোটি লিটার অর্থাৎ ৪০ কোটি গ্যালন পানি সরবরাহ করতে হয়। ক্যাসিনোখ্যাত এই নগরীর বাসিন্দারা গড়ে প্রতিদিন মাথাপিছু ৮৭০ লিটার অর্থাৎ ২৩০ গ্যালন পানি খরচ করেন। প্রথমবারের মতো ২০২২ সালে এই নগরীর সবাইকে পানি খরচে মিতব্যয়ী হওয়ার জোর তাগিদ দেওয়া হয়। কারণ কলোরাডো নদীতে পানিস্বল্পতা দেখা দিয়েছে ফলে মিড হ্রদ শুকিয়ে যাচ্ছে।

দূষণ ও দখল : শোধনাগারে পরিশোধন করার পরও প্রতিবছর প্রায় ১ হাজার ৫০০ টন অণুপ্লাস্টিক ও ন্যানোপ্লাস্টিক পানিতে থেকে যায়। প্লাস্টিকে সংক্রামিত হচ্ছে জলজ উদ্ভিদ ও প্রাণী। পানীয়জলের সঙ্গে অত্যন্ত বিষাক্ত প্লাস্টিকের ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র কণা আমাদের শরীরের অভ্যন্তরীণ অঙ্গপ্রত্যঙ্গে ঢুকে পড়ছে। বহু দেশে বর্জ্য, কৃষি ও শিল্পকারখানার ব্যবহৃত অপরিশোধিত পানি সরাসরি নদীতে ফেলে দেওয়া হয়। নদীনালা, খালবিল, হ্রদ হচ্ছে মিঠাপানির প্রাকৃতিক আধার, আমাদের গ্রহের জীবন, রক্তনালির মতো। রক্ত যেমন দূষিত হলে বেঁচে থাকা দায় হয়ে যায়; তেমনি নদী দূষিত হলে দুর্যোগ নেমে আসে। নদীকে আবর্জনার ভাগাড় মনে করা মোটেই উচিত নয়। অন্যদিকে অবৈধ দখল ও ভরাট করে স্থাপনা নির্মাণের ফলে পানীয়জলের প্রাকৃতিক উৎসগুলো বিলীন হয়ে যাচ্ছে, ব্যাহত হচ্ছে জলচক্র।

দিন দিনই ফুরিয়ে আসছে সুপেয় পানি যেটুকু এখনও অবশিষ্ট আছে, তাও আমরা অতিরিক্ত ব্যবহার, অপচয় ও দূষণ-দখলে নিজেদের বিপর্যয়কে ত্বরান্বিত করছি। দুঃখজনক হলেও বিদ্যমান বাস্তবতায় এ কথা সত্যি, পৃথিবীর আয়ু মেপে জলবায়ু তার লাল কার্ড দেখিয়ে দিয়েছে অঝোরে ঝরতে শুরু করেছে পানির জন্য চোখের পানি।



  • গবেষক ও ফ্রান্স প্রবাসী লেখক

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মুস্তাফিজ শফি

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০১৯১১০৩০৫৫৭, +৮৮০১৯১৫৬০৮৮১২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০১৭১২০৩৩৭১৫ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা