মে দিবস
আর কে চৌধুরী
প্রকাশ : ০১ মে ২০২৪ ১৯:২৭ পিএম
পহেলা মে শ্রমজীবী মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার শপথ নেওয়ার দিন। শ্রমজীবী মানুষের অধিকার আদায়ের জন্য শ্রমিকদের আত্মত্যাগের এ দিন বিশ্বে ‘মে দিবস’ বা আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস হিসেবে পালিত হয়। যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগো শহরের শ্রমিকরা ১৮৮৬ সালের পহেলা মে বুকের রক্ত দিয়ে নিজেদের ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠা করেন। রক্তাক্ত আন্দোলনের মুখে মালিকপক্ষ ন্যায্য মজুরি ও দৈনিক আট ঘণ্টা কাজের সীমা মেনে নিতে বাধ্য হয়। পহেলা মের পথ ধরে স্বীকৃত হয় শ্রমিকদের ট্রেড ইউনিয়নের অধিকার। আন্দোলন-সংগ্রামের ধারাবাহিকতায় শিল্পক্ষেত্রে মালিক-শ্রমিক দরকষাকষি বৈধতা পায়।
১৮৮৬ সালের রক্তক্ষরণের দিনটি শ্রমিক সংহতির দিন হিসেবেও পালিত হয়। বুলেটবিদ্ধ শ্রমিকদের রক্তে ভেজা শার্ট আন্দোলন-সংগ্রামের লাল পতাকা হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে শ্রমজীবী মানুষের কাছে। শিকাগো শহরে মালিকপক্ষের নৃশংসতার শিকার শ্রমিকরা প্রাণ দিয়ে প্রমাণ করেন শ্রমজীবী মানুষের শৃঙ্খল ছাড়া হারানোর কিছু নেই। মে দিবস বিশ্বজুড়ে সমাজবাদী চেতনারও বিকাশ ঘটায়। পুঁজিবাদের মানবিক বিকাশেও মে দিবসের অবদান অনস্বীকার্য। শ্রমিকদের ঠকিয়ে কিংবা তাদের ওপর নিপীড়ন চালিয়ে পুঁজির সুষ্ঠু বিকাশ যে সম্ভব নয় তা এখন ধনবাদীরাও স্বীকার করেন। নারীমুক্তির ক্ষেত্রেও মে দিবসের চেতনা অনন্য ভূমিকা রেখেছে।
মে দিবসের শতাধিক বছরের ইতিহাসে শ্রমিকদের স্বার্থরক্ষার বিষয়ে অনেক আলোচনা, দেনদরবার হয়েছে, শ্রমিক আন্দোলন অনেক চড়াই-উতরাই পেরিয়েছে। উন্নত অনেক দেশেই আজ শ্রমিকস্বার্থের বিষয়টি যথেষ্ট সুরক্ষা পেয়েছে। আন্তর্জাতিকভাবে আইএলও কনভেনশনসহ শ্রমিকদের অধিকার নিয়ে স্বীকৃত অনেক ব্যবস্থা গৃহীত হয়েছে। কিন্তু অনেক স্বল্পোন্নত বা উন্নয়নশীল দেশেই শ্রমিকদের অধিকার এখনও ব্যাপকভাবে উপেক্ষিত। কয়েকটি পেশা ছাড়া বাকি পেশার শ্রমিকরা এখনও কোনো হিসাবেই আসে না। এসব ক্ষেত্রে না আছে নিয়োগপত্র, না আছে কর্মঘণ্টা, না আছে উপযুক্ত মজুরি।
মে দিবস এসেছে এমন এক সময়ে যখন করোনাভাইরাসের প্রভাব ওতরানো পৃথিবীতে রাশিয়া-ইউক্রেন এবং ইসরায়েল-ফিলিস্তিন যুদ্ধের অভিঘাতে একের পর এক কর্মহীন হয়ে পড়ছে মানুষ। করোনায় সৃষ্ট অর্থনৈতিক সংকটে বিশ্বব্যাপী শ্রম খাতের সঙ্গে যুক্ত কর্মীর প্রায় অর্ধেকই জীবিকার ঝুঁকিতে। বাংলাদেশসহ উন্নয়নশীল দেশগুলোর অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে দৈনিক মজুরি বা কর্মঘণ্টার ভিত্তিতে শ্রমিকরাও রয়েছেন ঝুঁকিতে।
মে দিবসে শ্রমিকশ্রেণির মানবেতর জীবনের অবসান ঘটানোর অঙ্গীকার করতে হবে সবাইকে। শ্রমের মর্যাদা নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি। দেশের অগ্রগতির স্বার্থে উৎপাদন ক্ষেত্রে শ্রমিক ও মালিক পক্ষের সুষ্ঠু সম্পর্কের প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য। উভয় পক্ষের সুসম্পর্কের মধ্যেই উৎপাদনব্যবস্থার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সবার স্বার্থ নিহিত।
আর কে চৌধুরী
বীর মুক্তিযোদ্ধা ও শিক্ষাবিদ