× ই-পেপার প্রচ্ছদ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি ফিচার চট্টগ্রাম ভিডিও সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

উপজেলা নির্বাচন

ইসি ও সরকার উভয়ের জন্যই চ্যালেঞ্জ

ড. মোসলেহউদ্দিন আহমেদ

প্রকাশ : ২০ এপ্রিল ২০২৪ ১৩:৩৩ পিএম

ইসি ও সরকার উভয়ের জন্যই চ্যালেঞ্জ

স্থানীয় সরকার কাঠামোর গুরুত্বপূর্ণ স্তর উপজেলা পরিষদ নির্বাচন কয়েক ধাপে হতে যাচ্ছে। ৮ মে প্রথম ধাপে প্রতিদ্বন্দ্বিতার জন্য ১ হাজার ৮৯১ জন মনোনয়নপত্র দাখিল করেছেন বলে ১৬ এপ্রিল প্রতিদিনের বাংলাদেশ-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। নির্বাচন কমিশন (ইসি) সচিবালয়ের অতিরিক্ত সচিব অশোক কুমার দেবনাথের বরাত দিয়ে ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘এবার সম্পূর্ণ অনলাইনে মনোনয়নপত্র জমা নেওয়া হয়েছে এবং তাতে চেয়ারম্যান পদে ৬৯৬, সাধারণ ভাইস চেয়ারম্যান পদে ৭২৪ ও নারী ভাইস চেয়ারম্যান পদে ৪৭১ জন মনোনয়নপত্র দাখিল করেছেন।

১৭ এপ্রিল প্রতিদিনের বাংলাদেশ-এ প্রকাশিত প্রতিবেদনে জানা যায়, মন্ত্রী-এমপিদের উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে হস্তক্ষেপ না করার নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। নির্বাচন যেন শান্তিপূর্ণ পরিবেশে হয় সেই সতর্কবার্তাও তিনি দলীয় নেতাকর্মীদের জানিয়ে দিয়েছেন। প্রথম ধাপের নির্বাচনের প্রচারাভিযান ইতোমধ্যে বেশ জমে উঠেছে। সংঘাত-সংঘর্ষও কিছু ঘটেছে। আমরা জানি, তৃণমূল পর্যায়ের নির্বাচনে বিশেষ করে স্থানীয় সরকার কাঠামোগুলোর বিভিন্ন স্তরের নির্বাচনে উৎসবমুখর পরিবেশ সৃষ্টি হয়। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, স্থানীয় সরকার কাঠামোর নিকট অতীতের কিছু নির্বাচনে আমাদের এ অভিজ্ঞতা অনেকটাই ম্লান হয়েছে। আমরা দেখেছি, সংঘাত-সংঘর্ষে শুধু নির্বাচনী পরিবেশেরই বিঘ্ন ঘটেনি, গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার অন্যতম অনুষঙ্গ নির্বাচন ঘিরে অনেক প্রশ্নও উঠেছে। স্থানীয় সরকার কাঠামোর স্তরের নির্বাচন দলীয় প্রতীকে করার বিধান আওয়ামী লীগই করেছিল। কিন্তু এবার দলটির শীর্ষপর্যায়ের সিদ্ধান্তÑদলীয় প্রতীকে উপজেলা নির্বাচন হচ্ছে না। দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনেকটাই প্রশ্নমুক্ত হলেও ওই নির্বাচন সব দলের অংশগ্রহণে সম্পন্ন হয়নি এটাই তো সত্য। ধারণা করি, উপজেলা নির্বাচন অংশগ্রহণমূলক করার চিন্তা মাথায় রেখে আওয়ামী লীগ দলীয় প্রতীকে নির্বাচন করার সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসে।

১৮ এপ্রিল প্রতিদিনের বাংলাদেশ-এ তৃতীয় ধাপের ভোট ২৯ মে এবং ২১ উপজেলায় ইভিএমে ভোটগ্রহণের কথা কমিশনের তরফে জানানো হয়েছে। দ্বিতীয় ধাপের ভোট ২১ মে। চতুর্থ ধাপের নির্বাচনের তফসিল এখনও ঘোষণা করা হয়নি তবে ইসি জানিয়েছে, ৫ জুন ওই ধাপের ভোটগ্রহণ হতে পারে। আমরা জানি, নির্বাচন গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ। এ নির্বাচন প্রক্রিয়া যদি ব্যাহত হয় তাহলে গণতন্ত্রের ঔজ্জ্বল্য হারায় এবং এর নজির আমাদের সামনে আছেও। কিছুদিন আগে নির্বাচন কমিশনের দায়িত্বশীল একজন কর্মকর্তা বলেছেন, তারা দৃষ্টান্তযোগ্য উপজেলা নির্বাচন করতে চান। নিঃসন্দেহে তার এ বক্তব্য সাধুবাদযোগ্য। কিন্তু অতীতে বহুবারই এমন অঙ্গীকার-প্রতিশ্রুতির ব্যত্যয় ঘটতে আমরা দেখেছি। নির্বাচন অনুষ্ঠান সম্পন্ন করার মুখ্য কর্তৃপক্ষ নির্বাচন কমিশন। সরকার তাদের সহযোগী শক্তি মাত্র। তবু সরকারের দায় যে কম নয় এর ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ নতুন করে দেওয়া নিষ্প্রয়োজন। এ প্রেক্ষাপটে নির্বাচন কমিশন তো বটেই, একই সঙ্গে সরকারের জন্যও উপজেলা নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করা নিঃসন্দেহে বড় চ্যালেঞ্জ। আমরা আশা করব, ইসি এবং সরকার তাদের চ্যালেঞ্জ জয়ে গণতান্ত্রিক পরিবেশ-আবহ সমুজ্জ্বল করতে কাঙ্ক্ষিত ভূমিকা পালন করবে। দেশের অন্যতম বৃহৎ রাজনৈতিক দল বিএনপি উপজেলা নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে না, এটা তারা ইতোমধ্যে স্পষ্ট করেছে। বিএনপির হাইকমান্ড সূত্রে সংবাদমাধ্যমকে এও বলা হয়েছে, দলের কেউ অংশ নিলে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। একই সঙ্গে বিএনপির সমমনারাও এ নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে না।

৭ এপ্রিল প্রতিদিনের বাংলাদেশ-এ ‘বিনা ভোটের উপজেলাগুলোয় এবার প্রতিদ্বন্দ্বিতার আভাস’ শিরোনামে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০১৯ সালে শতাধিক উপজেলায় বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জয়ী হলেও এবার পরিস্থিতি কিছুটা ভিন্ন হবে। আর এ উৎসবমুখর পরিবেশের সুষ্ঠু অবস্থান নিশ্চিত করতে হলে ভোটার উপস্থিতি নিশ্চিত করা জরুরি এও বলা হয়েছে। আমি মনে করি, অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন মানে শুধু সব রাজনৈতিক দলের অংশগ্রহণই নয়, এর সঙ্গে ভোটারের অংশগ্রহণ জরুরি। ভোটারই নির্বাচনের মূল শক্তি। স্বাধীনভাবে ভোটার ভোটাধিকার প্রয়োগ করে প্রার্থী নির্বাচন করবে গণতন্ত্রের এটাই সিদ্ধ রীতি। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, আমাদের অভিজ্ঞতায় এর বিপরীত চিত্রও অতীতে দৃশ্যমান হয়েছে। সংবাদমাধ্যমে বলা হয়েছে, সুষ্ঠু ভোটের প্রধান চ্যালেঞ্জ মন্ত্রী-এমপির স্বজন। ১৯ এপ্রিল প্রতিদিনের বাংলাদেশ-এর শীর্ষ প্রতিবেদনে আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদকের বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, উপজেলা নির্বাচন অবাধ-নিরপেক্ষ ও উৎসবমুখর করার স্বার্থে মন্ত্রী ও সংসদ সদস্যদের নিজ পরিবারের সদস্যকে প্রার্থী না করার জন্য অনুরোধ করা হয়েছে। এ প্রেক্ষাপটে প্রতীয়মান হয়, আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারকরা মনে করছেন উক্ত নির্বাচনের ক্ষেত্রে ক্ষমতার অপপ্রয়োগ বিরূপ প্রভাব ফেলতে পারে। তাদের এ ধারণা অমূলক নয় বলেই মনে করি। আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারকদের উচিত, নির্মোহ অবস্থান নিয়ে নির্বাচন প্রশ্নমুক্ত করার ক্ষেত্রে যথাযথ সহযোগিতা প্রদান করা। আমরা দেখছি, উপজেলা নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ছাড়া অন্য কোনো দলের প্রার্থী মাঠে নেই। তবু তৃণমূল আওয়ামী লীগে আতঙ্ক ছড়াচ্ছেন মন্ত্রী-এমপির আশীর্বাদপুষ্ট প্রার্থীরা, এও সংবাদমাধ্যমেরই খবর। ধারণা করি, এ প্রেক্ষাপটেই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা উপজেলা নির্বাচনে মন্ত্রী-এমপিদের হস্তক্ষেপ না করার নির্দেশ দিয়েছেন। নিশ্চয়ই শান্তিপ্রিয় সবারই প্রত্যাশা, নির্বাচন শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন হোক। দলীয়ভাবে বিএনপি ও জামায়াত উপজেলা নির্বাচন বর্জনের ঘোষণা এবং দলীয় নির্দেশ অমান্য করে কেউ নির্বাচনে অংশ নিলে তার বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দিলেও সংবাদমাধ্যমেই প্রকাশ, দুটি দল থেকেই স্থানীয় কিছু নেতা নির্বাচনে অংশ নিচ্ছেন। ১৬ এপ্রিল একটি দৈনিকের প্রতিবেদনে জানা যায়, বিএনপির এমন কমপক্ষে ৪৫ জন স্থানীয় নেতা রয়েছেন যারা চেয়ারম্যান পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে। অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামীর অন্তত ২২ জন স্থানীয় নেতা স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছেন বলে জানা গেছে। এ চিত্র হলো প্রথম ধাপের নির্বাচনের। দ্বিতীয়, তৃতীয় ও চতুর্থ ধাপের চিত্র কী হবে তা বলবে ভবিষ্যৎ।

এ স্তম্ভেই অতীতে লিখেছি, স্থানীয় সরকারের কাঠামোটাই আছে, দর্শন হারিয়ে গেছে। পরে এ স্তম্ভেই লিখেছি, কাঠামোটাও অনেকটাই হারিয়ে গেছে। এ বিষয়গুলো মোটেই কাঙ্ক্ষিত নয়। স্থানীয় সরকারব্যবস্থা শক্তিশালীকরণের জনদাবি নতুন নয়। স্থানীয় সরকারের বর্তমান অবস্থার বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করতে হলে পেছনে ফিরে তাকাতে হয়। এ অঞ্চলে স্থানীয় সরকার কাঠামো গড়ে তোলে ব্রিটিশরা। ব্রিটিশরা যে অবকাঠামো কিছুটা হলেও গড়ে তুলতে পেরেছিল তাতে পাকিস্তান আমলে ক্ষয় ধরে। ব্রিটিশরা মূলত স্থানীয় স্বশাসন গড়ে তোলার চেষ্টা করেছিল। পাকিস্তান শাসনামলে তা সরকারের তাঁবেদারে পরিণত করা হয়। আর বাংলাদেশের স্বাধীনতার বায়ান্ন বছর অতিক্রান্তেও আমরা স্থানীয় সরকার কাঠামোর বিভিন্ন স্তরের রূপ কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে দিতে পারিনি, ব্যবস্থা শক্তিশালী করতে পারিনি। স্থানীয় সরকারের সুসংহত কাঠামো এত দিনে কেন আমরা গড়তে পারিনি, এটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন বটে।

স্থানীয় সরকার কাঠামো নিয়ে এখনও রয়ে গেছে অনেক প্রশ্ন। আমাদের নিকট প্রতিবেশী ভারতের পাঞ্জাব, কেরালাসহ কয়েকটি অঞ্চলে স্থানীয় সরকার কাঠামো ‘পঞ্চায়েত’ বলে পরিচিত। ভারতে ক্ষমতাসীন দল স্থানীয় সরকারের ওপর কোনো ধরনের প্রভাব বিস্তার করে না। এমনকি স্ক্যান্ডিনেভিয়ান দেশগুলোয় স্থানীয় সরকারই জনগণের যাবতীয় সেবার মান সুনিশ্চিত করার দায়িত্ব পালন করে। স্ক্যান্ডিনেভিয়ান দেশগুলোয় স্থানীয় সরকার মানুষের আবাসন ব্যবস্থাপনার দায়িত্বও নিয়ে থাকে। স্থানীয় সরকার কাঠামোর সর্বজনব্যাপী সেবার বিষয়টি আমরা এখনও প্রতিষ্ঠা করতে পারিনি। স্থানীয় সরকার কাঠামোয় নারী প্রতিনিধিদের ক্ষমতায়নের বিষয়টি বিভিন্ন মহলে এখনও প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে আছে। একদিকে বলা হচ্ছে নারীর ক্ষমতায়নের কথা, অন্যদিকে অনেক ক্ষেত্রেই দৃশ্যমান হচ্ছে ক্ষমতাহীনভাবে দায়িত্ব পালনের প্রক্রিয়া। নারীর ক্ষমতায়নের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক মুক্তি একটি বড় বিষয়। এ মুক্তির কাজটি স্থানীয় পর্যায় থেকে শুরু করা অত্যাবশ্যক এবং এ সুযোগও আমাদের রয়েছে। এসব বিষয় নিয়ে ভাবা জরুরি। স্থানীয় সরকার কাঠামো বিভিন্নভাবে শক্তিশালী করার সুযোগ রয়েছে।

স্থানীয় সরকার কাঠামো বিভিন্নভাবে শক্তিশালী করার সুযোগ যেহেতু রয়েছে সেহেতু আমাদের সামগ্রিক স্বার্থ ও প্রয়োজনে সেদিকে মনোযোগ গভীর করা জরুরি বলে মনে করি। উপজেলা নির্বাচন প্রশ্নমুক্ত করার মধ্য দিয়ে নির্বাচন কমিশন ও সরকারের সামনে যে চ্যালেঞ্জ রয়েছে তা তারা উত্তরণে সক্ষম হবে এ প্রত্যাশাও রাখি। বিশ্বাস করি, ব্যবস্থা যদি ভালো হয় তাহলে অবস্থা সঙ্গত কারণেই ভালো হতে বাধ্য। নির্বাচন কমিশন ঘিরে এখনও জন-আস্থায় ঘাটতি রয়েছে। নির্বাচন কমিশনকে তাদের কর্মকাণ্ডের মধ্য দিয়েই ঘাটতি দূর এবং তাদের প্রতি আস্থার পারদ ঊর্ধ্বমুখী করতে হবে। সরকারকে নির্মোহভাবে সহযোগিতা দিতে হবে নির্বাচন কমিশনকে। নির্বাচন যদি প্রশ্নমুক্ত হয় এবং জননিরাপত্তায় যদি কোনো চিড় না ধরে তাহলে উভয়ের জন্যই মঙ্গল।


  • স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞ এবং অধ্যাপক, লোকপ্রশাসন বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মুস্তাফিজ শফি

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০১৯১১০৩০৫৫৭, +৮৮০১৯১৫৬০৮৮১২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০১৭১২০৩৩৭১৫ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা