× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

সম্পাদকীয়

শিক্ষার ব্যয়ে লাগাম টানতেই হবে

সম্পাদকীয়

প্রকাশ : ০১ এপ্রিল ২০২৪ ১১:৩১ এএম

শিক্ষার ব্যয়ে লাগাম টানতেই হবে

‘শিক্ষা জাতির মেরুদণ্ড’ -এই বাক্যটি আমাদের সমাজে বহুলচর্চিত। কিন্তু শিক্ষায় যেভাবে বাড়ছে তাতে এই মেরুদণ্ডটাই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এডুকেশন ওয়াচ-২০২৩-এর জরিপের সূত্র ধরে ৩১ মার্চ  প্রতিদিনের বাংলাদেশ-এ প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশের প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ে শিক্ষার ব্যয় গড়ে ২৫ থেকে ৫১ শতাংশ বেড়েছে। এই বাড়তি ব্যয়ের বড় কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে কোচিং-প্রাইভেট ও নোটগাইডকে। ২০২২ সালে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের একজন শিক্ষার্থীর পেছনে পারিবারিক বার্ষিক গড় ব্যয় যেখানে ছিল প্রায় ১৪ হাজার টাকা, তা বেড়ে এখন দাঁড়িয়েছে ২৭ হাজারেরও বেশি। ৩০ মার্চ ঢাকার সিরডাপ মিলনায়তনে শিক্ষাকেন্দ্রিক কার্যক্রম ও গবেষণায় যুক্ত বেসরকারি সংস্থাগুলোর মোর্চা গণসাক্ষরতা অভিযানের প্রতিবেদনে যে চিত্র উঠে এসেছে তাতে দেখা যায়, বিদ্যমান বাস্তবতায় সীমিত আয়ের পরিবারগুলোর জন্য বাড়তি চাপ সৃষ্টি করেছে। শিক্ষার ব্যয় বাড়ার ফলে বহুমুখী বিরূপ প্রভাব সঙ্গত কারণেই দৃশ্যমান হয়ে উঠেছে। এর ফলে একদিকে ঝরে পড়ার সংখ্যা যেমন বাড়ছে অন্যদিকে মাদ্রাসায় স্থানান্তরের প্রবণতাও সমভাবেই লক্ষণীয়। তা ছাড়া শিক্ষার্থীদের মোবাইল ফোন ব্যবহার বা আসক্তি তাদের মনোজগতে বড় ধরনের অভিঘাত ফেলেছে।

শিক্ষা খাতে রাষ্ট্রীয় বরাদ্দ নিয়ে বরাবরই প্রশ্ন আছে। দেশের শিক্ষা খাতে বেসরকারি উদ্যোগ যেমন বেড়েছে তেমনি এর সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে পরিবারপিছু শিক্ষাব্যয়ও। আমাদের স্মরণে আছে, গত বছরের প্রথম দিকে একটি বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা পরিচালিত স্কুলের ফি সরকারি প্রতিষ্ঠানের তুলনায় বেসরকারি পর্যায়ের স্কুলগুলোর ক্ষেত্রে ৯ গুণ বেশি এই চিত্রও উঠে এসেছিল। সরকার সবার জন্য শিক্ষা নিশ্চিত করতে প্রাথমিক থেকে মাধ্যমিক পর্যন্ত বিনামূল্যে পাঠ্যপুস্তক বিতরণ কর্মসূচি অব্যাহত রেখেছে। তারপরও শিক্ষার ব্যয়বৃদ্ধির হার ক্রমাগত যেভাবে বাড়ছে, তা অনেকের পক্ষেই বহন করা কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা প্রতিনিয়ত নানা সমস্যা ও প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, এ নিয়ে বিতর্কের অবকাশ নেই। আমরা জানি, প্রতিবেশী দেশ ভারতে শিক্ষার বিকেন্দ্রীকরণ হওয়ায় দিল্লিতে ৯০ শতাংশ সরকারি এবং মাত্র ১০ শতাংশ বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে। এটি একটি খণ্ডিত দৃষ্টান্ত হলেও সেখানকার শিক্ষায় অখণ্ড চিত্র এ রকমই। তা সম্ভব হয়েছে মূলত সরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো শক্তিশালী করায়। সরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার মানের পাশাপাশি সীমিতসংখ্যক আসনের কারণে উল্লেখযোগ্য একটি অংশের শিক্ষার্থী বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানমুখী হয়। শিক্ষা নিয়ে বাণিজ্যিক লাভালাভের হিসেব কষে ‘শিক্ষা বণিক’রা নিজেদের ফায়দা লুটছেন এই অভিযোগও নতুন নয়। মূল্যস্ফীতির কঠিন কষাঘাতে এমনিতেই মোট জনগোষ্ঠীর বৃহদাংশের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হয়ে পড়েছে। এই পরিস্থিতিতে শিক্ষার ব্যয় বাড়ায় অধিকাংশ পরিবারেই বাড়তি সংকট সৃষ্টি হয়েছে। শিক্ষা বাজারের কোনো পণ্যসামগ্রী নয়, শিক্ষা অত্যাবশ্যকীয় এবং অধিকার। শিক্ষা রাষ্ট্রের দায়িত্ব এবং নাগরিকের মৌলিক অধিকারের অন্তর্ভুক্ত। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, শিক্ষা নিয়ে বাণিজ্যের নানামুখী উদ্যোগ-আয়োজন ক্রমাগত বিস্তৃত হচ্ছে।

আমরা মনে করি, শিক্ষাব্যয়সংক্রান্ত যে তথ্যগুলো সামনে এসেছে তা আমলে নিয়ে জনগোষ্ঠীর সামর্থ্য বিবেচনায় তা কতটা সঙ্গতিপূর্ণ সার্বিকভাবে বিষয়টি খতিয়ে দেখে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় এবং পক্ষগুলোকে যথাযথ উদ্যোগ নিতে হবে। আমরা জানি, প্রতিবেশী ভারতসহ দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন দেশে মোট শিক্ষার্থীর উল্লেখযোগ্য একটি অংশ বিভিন্নভাবে প্রাথমিক থেকে বিশ্ববিদ্যালয় স্তর পর্যন্ত নানাভাবে সহযোগিতা পেয়ে থাকে। এ অঞ্চলের অন্য দেশগুলোর তুলনায় আমাদের দেশে বেসরকারি পর্যায়ে শিক্ষাদানের (প্রকারান্তরে যা বাণিজ্য) পরিসর ক্রমেই বিস্তৃত হচ্ছে। এর গুণগত মান নিয়ে যেমন প্রশ্ন আছে তেমনি ব্যয়ভারও ব্যাপকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ। তা ছাড়া আমাদের শিক্ষাক্ষেত্রে অনিয়ম-দুর্নীতি বহুল আলোচিত বিষয়। ব্যবস্থাপনাগত ত্রুটির বিরূপ ফল শিক্ষাঙ্গনে স্পষ্টত দৃশ্যমান। ইতঃপূর্বে আমরা এই সম্পাদকীয় স্তম্ভেই বলেছি, শিক্ষা খাত ক্রমেই যেভাবে ব্যাধিগ্রস্ত হয়ে পড়ছে তাতে সর্বাগ্রে প্রয়োজন সুশাসন নিশ্চিত করা। শিক্ষা একটি জাতির সামগ্রিক সমৃদ্ধি অর্জনের জন্য কতটা তাৎপর্যপূর্ণ তার ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ নতুন করে নিষ্প্রয়োজন। কোচিং-প্রাইভেট, নোট গাইডনির্ভরতার ব্যাপারে ইতোমধ্যে শিক্ষার্থীবান্ধব সিদ্ধান্ত কম হয়নি বটে কিন্তু বাস্তবতা হলো, এই সিদ্ধান্ত ফাইলবন্দি থাকায় কার্যকরতা দৃশ্যমান হয়নি। এডুকেশন ওয়াচের গবেষণা তথ্য বলছে, প্রাথমিক মাধ্যমিক পর্যায়ে তিন-চতুর্থাংশের বেশি শিক্ষার্থী প্রাইভেট শিক্ষা অথবা কোচিং সেন্টারনির্ভর। শ্রেণিকক্ষে যথাযথ পাঠদান না হওয়ায় শিক্ষার্থীরা গাইডের ওপর অনেক বেশি নির্ভর হয়ে পড়েছে এবং যথাক্রমে এর হার ৯২ ও ৯৩ শতাংশ। অনলাইন শিক্ষা কার্যক্রমের ব্যাপারে সমাজের নানা মহলের প্রতিক্রিয়ার পরিপ্রেক্ষিতে সরকারের গৃহীত কিছু সিদ্ধান্ত অভিভাবকদের মধ্যে আশার সঞ্চার করলেও তা কার্যকর না হওয়ায় কাঙ্ক্ষিত সুফল মেলেনি। প্রযুক্তির আশীর্বাদ বর্জন করে অনেক শিক্ষার্থী অভিশাপকে আলিঙ্গন করছে। এর বহুমুখী বিরূপ প্রভাব সমাজ এবং পরিবারে যে বৈরী ছায়া ফেলেছে তা ভবিষ্যতে আরও কতটা শঙ্কার কারণ হয়ে দাঁড়ায় এটিই বড় প্রশ্ন হয়ে দেখা দিয়েছে। এডুকেশন ওয়াচের গবেষণায় আরও জানা গেছে, গত করোনা দুর্যোগজনিত পরিস্থিতিতে শিক্ষার্থীদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ছাড়ার পর আর ফিরে আসেনি। ঝরে পড়া রোধকল্পে এবং প্রতিষ্ঠান ছেড়ে দেওয়া শিক্ষার্থীদের ফিরিয়ে আনার ব্যাপারেও অনেক সিদ্ধান্তই গৃহীত হয়েছিল কিন্তু এরও আশানুরূপ ফল মেলেনি।

আমরা মনে করি, সবার জন্য শিক্ষা নিশ্চিত করার পাশাপাশি শিক্ষার মানোন্নয়ন ও ব্যয় হ্রাসে সরকারকে বহুমুখী উদ্যোগ নিতে হবে। এর মধ্যে রয়েছে উপবৃত্তি ও পরিকল্পিত আর্থিক সহায়তা বাড়ানো, বৈষম্যের ছায়া সরানো, অভিভাবকদের সঙ্গে কার্যকর যোগাযোগ স্থাপন, শিক্ষার্থীদের শিখন ঘাটতির মাত্রার ভিত্তিতে অতিরিক্ত ক্লাসসহ আনুষঙ্গিক সবকিছু নিশ্চিত করা এবং শিক্ষকদের আর্থিক প্রণোদনার বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে আমলে নেওয়া। একই সঙ্গে শিক্ষার নামে বাণিজ্যের দ্বার বন্ধ করতেই হবে। শ্রেণিকক্ষে যথাযথ পাঠদান নিশ্চিত করাই যথেষ্ট নয় যদি শিক্ষাব্যয়ে লাগাম টানা না যায় তাহলে সবার জন্য শিক্ষার সংকল্প বাস্তবায়ন দুরূহ। কোচিং বন্ধে কঠোর অবস্থান নেওয়া বাঞ্ছনীয়। শিক্ষা খাতে বরাদ্দ বাড়ানোর বিষয়েও আমরা তাগিদ দিই। শিক্ষাঋণের প্রবর্তন ও বীমার কথাও এক্ষেত্রে ভাবা বাঞ্ছনীয় বলে আমরা মনে করি। শিক্ষা খাতে সরকারকে ব্যয় বাড়াতেই হবে। শিক্ষা বিশেষজ্ঞসহ বিভিন্ন পর্যায়ে গবেষকদের সংযুক্ত করে সমন্বিত ভিত্তিতে শিক্ষা নিয়ে পরিকল্পনা ও এর বাস্তবায়নের বিকল্প নেই। 

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা