× ই-পেপার প্রচ্ছদ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি ফিচার চট্টগ্রাম ভিডিও সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

স্বাধীনতা দিবস

একাত্তরের শত্রু-মিত্র

মযহারুল ইসলাম বাবলা

প্রকাশ : ২৬ মার্চ ২০২৪ ১৪:২৯ পিএম

একাত্তরের শত্রু-মিত্র

আমাদের মুক্তিযুদ্ধে ত্রিপুরার ভূমিকা নিয়ে পর্যালোচনা হয়নি বৃহৎ পরিসরে। পশ্চিম বাংলার অসামান্য ভূমিকার কথা আমরা সবাই জানি। ভারত রাষ্ট্রের প্রান্তবর্তী এবং তৃতীয় শ্রেণির মর্যাদাপ্রাপ্ত উত্তর-পূর্ব ভারতের এ পশ্চাৎপদ রাজ্যটি ভারতের অবহেলিত একটি ক্ষুদ্র রাজ্য। আমাদের জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের পর্বে আগরতলা এক ঐতিহাসিক রূপ পায়। আগরতলার মহিমা ও স্মৃতিময় গৌরব যুদ্ধকালের অসামান্য ঘটনা। শরণার্থী শিবির, ফিল্ড হাসপাতাল, মেলাঘর প্রশিক্ষণ শিবির আমাদের মুক্তিযুদ্ধকে বিশ্বের কাছে বিস্ময় সৃষ্টি করেছিল ছোট্ট এ আগরতলাকে। পাশাপাশি মর্মান্তিক ঘটনাও ছিল। অনাহার, ব্যাধিতে অগণিত যুদ্ধ-শিকার অসহায় শরণার্থীর মৃত্যু এবং, গণকবর, গণদাহÑসে এক মর্মস্পর্শী দৃশ্য।আমাদের জাতীয়তাবাদী আন্দোলন-সংগ্রামে আন্দোলনকারী নেতৃবৃন্দের ত্রিপুরা রাজ্যে গমন এবং সম্পৃক্ততার কথা জানা যায়। ১৯৬৩ সালে শেখ মুজিবুর রহমান আগরতলায় গিয়েছিলেন এ সম্পর্কে নানা তথ্য রয়েছে। অনেক গ্রন্থে প্রকাশিত হয়েছে তাঁর আগরতলায় যাওয়া নিয়ে।

বঙ্গবন্ধু শেখ শেখ মুজিবুর রহমানের তখন অর্থাৎ ১৯৬৩ সালে আগরতলায় যাওয়া প্রসঙ্গে সাংবাদিক হরিভূষণ পাল আগরতলার জাগরণ পত্রিকার সম্পাদক জিতেন্দ্রচন্দ্র পালের বরাত দিয়ে তার রচিত ‘আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা, ফিরে দেখা’ গ্রন্থে লিখেছেন, ‘শেখ মুজিবের থাকার ব্যবস্থা করা হয় অরুন্ধতীনগরে উমেশবাবুর (শচীন্দ্রলাল সিংহের) বাসস্থানে, যা প্রকৃতপক্ষে শচীন্দ্রলাল বাবুর ভগ্নি হেমাঙ্গিনী দেবীর বাড়ি।’ একই গ্রন্থে তিনি উল্লেখ করেন, আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা দায়েরের আগে বিদ্রোহী সেনা সদস্যদের প্রতিনিধিরূপে স্টুয়ার্ড মুজিব (মুজিবুর রহমান) আগরতলায় এসেছিলেন। স্পষ্ট করে লেখক লিখেছেন, শেখ মুজিবুর রহমান তখন আগরতলায় আসেননি। নামের অভিন্নতায় বিভ্রান্তির সৃষ্টি হয়েছিল। আমরা জানি রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় শেখ মুজিবকে প্রধান অভিযুক্ত করা হয়েছিল। স্টুয়ার্ড মুজিব মাদারীপুর অঞ্চলে ব্যাপক অবদান রেখেছেন। স্বাধীন দেশে ১৯৭২ সালের ২ জানুয়ারি ঢাকার জনবহুল গুলিস্তান থেকে কতিপয় সশস্ত্র যুবক তাকে জিপে তুলে নিয়ে যায়। তারপর তার আর সন্ধান পাওয়া যায়নি। স্বাধীনতার পর বিশিষ্ট চলচ্চিত্রকার জহির রায়হানসহ স্বাধীনতাকামী অনেকেই গুপ্তঘাতকদের শিকার হয়েছিলেন, রহস্যজনক নিখোঁজ হওয়ার প্রক্রিয়ায়। আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার দ্বিতীয় অভিযুক্ত লে. কমান্ডার মোয়াজ্জেম হোসেনকে ১৯৭১-এর ২৫ মার্চ ভোরে তার এলিফ্যান্ট রোডের বাসায় পাকিস্তানি হানাদাররা নির্মমভাবে হত্যা করে।

পাকিস্তান সামরিক বাহিনীতে কর্মরত সেনা সদস্যদের নানা ক্ষেত্রে জাতিবৈষম্যের শিকার হতে হয়েছিল। সমমর্যাদার বাঙালি ও পাঞ্জাবি সেনা সদস্যদের মধ্যে ক্ষমতা, সুযোগসুবিধা প্রাপ্তি নিয়ে বৈষম্য ক্রমাগত বৃদ্ধি পাওয়ার ফলে বিক্ষুব্ধ কতিপয় নৌবাহিনীর সদস্য করাচিতে সংঘবদ্ধ হয়েছিল লে. কমান্ডার মোয়াজ্জেম হোসেনের নেতৃত্বে বিদ্রোহ সংঘটনে। তাদের পরিকল্পনা বাস্তবায়নে চট্টগ্রামের সেনা ও বিমান বাহিনীতে কর্মরতদেরও সম্পৃক্ত করা হয়েছিল। রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের সহযোগিতা ও সমর্থনের অভিপ্রায়ে ১৯৬৪ সালে করাচিতে শেখ মুজিবের সঙ্গেও তারা সাক্ষাৎ করে তাদের পরিকল্পনার কথা জানায়। শেখ মুজিব বলেন, ‘তোমরা এগিয়ে যাও; অর্থ ও সমর্থন যা কিছু দরকার আমি দেব’ (আবু সাঈদ খান, ‘সেনাছাউনিতে মুক্তিসংগ্রাম ও আগরতলা মামলা’ নতুন দিগন্ত, ষোড়শ বর্ষের প্রথম সংখ্যা)। প্রতিবেশী ভারতের সমর্থনে তাদের প্রতিনিধিরূপেই স্টুয়ার্ড মুজিবুর রহমান আগরতলায় হয়তো গিয়েছিলেন। বিদ্রোহের পরিকল্পনা বেশিদূর এগোতে পারেনি। কারও বিশ্বাসঘাতকতার কারণে তথ্য ফাঁস হওয়ায় ১৯৬৭ সালের ৯ ডিসেম্বর লে. কমান্ডার মোয়াজ্জেমসহ সংশ্লিষ্টদের একে একে গ্রেপ্তার করা হয়।

রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে শেখ মুজিবকে গ্রেপ্তার করে ওই মামলার প্রধান অভিযুক্ত করা হয়। ১৯৬৮ সালের ২০ জুন ঢাকার কুর্মিটোলা সেনানিবাসে বিশেষ ট্রাইব্যুনালে শেখ মুজিব, লে. কমান্ডার মোয়াজ্জেমসহ ৩৫ জন অভিযুক্তের বিচারিক কার্যক্রম শুরু হয়। সরকারি ভাষ্যে মামলার নামকরণ হয় ‘রাষ্ট্র বনাম শেখ মুজিব ও অন্যান্য’। মামলায় অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহিতার অভিযোগ আনা হয়। ‘অভিযুক্ত ষড়যন্ত্রকারীরা পূর্ব পাকিস্তানকে পাকিস্তান রাষ্ট্র থেকে বিচ্ছিন্ন করতে ভারতের সহায়তা পেতে আগরতলায় ভারতীয় কর্তৃপক্ষের সঙ্গে বৈঠক করেছিল।’ সামরিক বাহিনীর জনসংযোগ কর্মকর্তা মেজর নাসির মামলা উত্থাপনের দিন সাংবাদিকদের কাছে ‘আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা’ উল্লেখ করায় মামলাটির পরিচিতি হয়ে পড়ে ‘আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা’। পাকিস্তান সেনা, নৌ ও বিমান বাহিনীর বাঙালি চাকরিরত, অবসরপ্রাপ্ত সেনা সদস্য ছাড়াও সিএসপি কর্মকর্তা, বেসরকারি চাকরিজীবী ও রাজনীতিকদের মামলায় অভিযুক্ত করা হয়েছিল।

আমাদের মুক্তিযুদ্ধে ত্রিপুরা রাজ্যের বিশেষ করে রাজ্যটির কেন্দ্রীয় শহর আগরতলার অপরিসীম অবদানের কথা ভোলার নয়। বাংলাদেশ ভূখণ্ডের তিন দিকে ঘেরা ত্রিপুরা রাজ্য। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের গণহত্যার পরপরই সীমানা পেরিয়ে ১৪ লাখ জনসংখ্যা অধ্যুষিত ত্রিপুরার জনগণ আমাদের ১৬ লাখ শরণার্থীকে আশ্রয়সহ সর্বপ্রকার সাহায্য-সহযোগিতা করেছিল। মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষণের জন্য ত্রিপুরার মেলাঘরে গঠিত হয়েছিল বিশাল প্রশিক্ষণ কেন্দ্র। মেলাঘর প্রশিক্ষণ শিবির থেকে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধাদের বীরত্বপূর্ণ ভূমিকা মুক্তিযুদ্ধে অসামান্য অবদান রেখেছিল।বামপন্থিদের মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণে নানা উপায়ে বাধা প্রদান করা হতো। তাদের হত্যার ঘটনাও ঘটেছিল। নকশালবাড়ি আন্দোলনে দিশাহারা কংগ্রেস সরকার বাংলাদেশের বামপন্থিদের নিয়ে প্রবল আতঙ্কের মধ্যে ছিল বলেই বামপন্থিদের মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ ঠেকাতে ভারতীয় জেনারেল উবানের তত্ত্বাবধানে গঠিত হয়েছিল বেঙ্গল লিবারেশন ফোর্স (বিএলএফ)। ওটি ‘মুজিব বাহিনী’ নামে সমধিক পরিচিত। এ বাহিনী প্রবাসী অস্থায়ী সরকারের নিয়ন্ত্রণাধীনে ছিল না। ছিল ভারতীয় কর্তৃপক্ষের নিয়ন্ত্রণে।

স্বীকার করতে হবে বাঙালি অধ্যুষিত বাংলাদেশের নিকট প্রতিবেশী ত্রিপুরা, পশ্চিম বাংলা এবং আসামের স্থলে অন্য ভাষাভাষী প্রদেশ হলে আমাদের জাতীয় মুক্তিসংগ্রামে ব্যাপক সাহায্য-সহযোগিতা-আশ্রয় আমরা নিশ্চয় পেতাম না। কেননা জাতিগত সংহতি অত্যন্ত সুদৃঢ়। মানুষ তাৎক্ষণিক ধর্ম পরিবর্তন করতে পারলেও জাতীয়তার পরিবর্তন কখনও করা যায় না। জাতীয়তার টান যে কত দৃঢ়-গভীর তা আমাদের মুক্তিযুদ্ধে প্রমাণিত সত্য। ত্রিপুরার জনগণের কাছে আমাদের অসীম ঋণ; যা শোধ হওয়ার নয়। তারা আমাদের রেখেছিল তাদের পাঁজরের ভাঁজে ভাঁজে। জাতির বাক পরিবর্তনের ইতিহাস একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধপর্ব আমাদের শত্রু-মিত্রও স্পষ্টভাবে চিহ্নিত করে দেয়। আমাদের স্বাধীনতা দিবসে ত্রিপুরার জনগণকে জানাই বিনম্র শ্রদ্ধা এবং গভীর কৃতজ্ঞতা ও ভালোবাসা।


  • নির্বাহী সম্পাদক, নতুন দিগন্ত
শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মুস্তাফিজ শফি

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০১৯১১০৩০৫৫৭, +৮৮০১৯১৫৬০৮৮১২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০১৭১২০৩৩৭১৫ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা