× ই-পেপার প্রচ্ছদ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি ফিচার চট্টগ্রাম ভিডিও সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

যুদ্ধাপরাধী পাকিস্তানিদের বিচার হতে হবে

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী

প্রকাশ : ২৬ মার্চ ২০২৪ ০০:৩১ এএম

আপডেট : ২৬ মার্চ ২০২৪ ১১:১২ এএম

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী। প্রবা ফটো

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী। প্রবা ফটো

দেশের উন্নতি হয়েছে। অবশ্যই। কিন্তু কার উন্নতি? উন্নতি সুবিধাভোগীদের। বাদবাকিদের কী অবস্থা তার ছবি একাত্তরের লাঞ্ছিত নারীদের কাহিনীতে পাওয়া যাবে। আর পাওয়া যাবে গভীরে, খুব গভীরে আছে যে ব্যাধি তার ছবিতে- ব্যাধিটির নাম বৈষম্য। পুঁজিবাদ যাকে লালন করে। উন্নতি চেপে বসে আছে লাখো কোটি মানুষের বঞ্চনা ও আত্মত্যাগের বুকের ওপর। ফিরে তাকাই পেছনে। একাত্তরে যে-মেয়েরা ধর্ষিতা হয়েছেন তারা সবাই বলেছেন তারা অসহায় ছিলেন হানাদারদের বন্দুকের মুখে। ওই দস্যুরা বন্দুক দেখিয়েছে এবং বুটের তলায় মেয়েদের চেপে ধরেছে। বন্দুক ও বুট দুটোই ক্ষমতার প্রতিনিধি। এখন যারা ক্ষমতাবান তাদের হাতেও অস্ত্র রয়েছে। প্রকাশ্য ও আচ্ছাদিত, উভয়বিধ। অল্পসংখ্যক মানুষের এ উন্নতি জনগণকে ভয় দেখায় এবং জব্দ করে। বঞ্চিত মানুষ কাঁদে, অভিশাপ দেয়। কিন্তু তাতে কাজ হয় না। কাজ হবে যদি একত্র হয়ে যুদ্ধে যাওয়া যায়, যেমনটা ঘটেছিল একাত্তরে। তেমন ঘটনা কবে ঘটবে জানি না। না-ঘটা পর্যন্ত আমাদের মুক্তি নেই। তত দিন উন্নয়নের অভিশাপ আমাদের বহন করে চলতে হবে।

প্রসঙ্গত, ধর্ষিতা নারীদের কতগুলো অভিজ্ঞতার কথা স্মরণ করা যাক। এগুলো আপ্তবাক্য নয়, সাজানো কথা নয়, সংলাপ নয় নাটকের; অভিজ্ঞতার ভেতর থেকে বেরিয়ে আসা সত্য। কথাগুলো ধিক্কার দেয় উন্নতিকে। যেমন ১. যুদ্ধের পরে সাড়ে চার বছর আমি হাসপাতালে রইছি। পাঁচটা অপারেশন করাইয়া আর চিকিৎসা করাইতে পারি নাই। ডাক্তার কইছে আর অপারেশন চলত না। আমারে সব সময় একটা কাপড় পিন্দাইয়া রাখত। আমার চারদিকে তখন বালিশ আর বালিশ। বুকের ওপর বাসুন (প্লেট) রাইখা মা খাওয়াইয়া দিত। নড়তে পারি নাই। যুদ্ধের বহু বছর পরেও আমি লাঠি ভর কইরা কইরা হাঁটছি আমি কই হায়রে! মরি না কেরে। ২. হঠাৎ কইরা আইসা থাবা দিয়া ধরল আমাকে। বাবাকে ধরে পিছমোড়া বাইন্ধা রাখল। বাবার চক্ষের সামনে পাঁচজন আমাকে ধর্ষণ করল। আমার বাবা চায় না যে সে আমার দিকে ওই অবস্থায় তাকায়া থাকে। আমার দিকে না চাইলে আমার বাবারে রাইফেলের গোড়া দিয়ে খালি বাড়ি মারে। আমাকে যে তারা ধর্ষণ করতেছে তা আমার বাবাকে তাকাইয়া থেকে দেখতে হবে। এসব কথা মনে অইলে এখনও আমার কলজেডা ছিঁড়ে যায়। ৩. একটা মেয়েরে চার পাঁচটায় ধরে।... শরীরের বিভিন্ন জায়গায় কামড়ায়। … একেবারে ছিন্নিভিন্নি কইরা হালাইছে। ৪. যুদ্ধের কারণে আমার জীবনডা এমন অইছে। ৫. যুদ্ধের লাইগাই খারাপ হইল জীবনডা। ৬. যুদ্ধের কারণেই জীবনডা, সংসারডা একদম তছনছ হইয়া গেছে। ৭. মুক্তিযুদ্ধ আমারে টোকাই বানাইয়া দিচ্ছে।... যুদ্ধ আমার বাপ-মায়ের নাম ভুলাইয়া দিছে। আমি আমার নিজ বাড়ি চিনি না। মাইনষে জিজ্ঞাসা করলে ঠিকানা কইতে পারি না। ৮. আজ যদি দেশে যুদ্ধ না লাগত তাইলে আজকা আমার জীবনডা এমন তছনছ অইত না। ৯. এ মুক্তিযুদ্ধের কারণে সারা জীবনটাই কষ্ট কইরা গেলাম। ১০. কী অইব মুক্তিযুদ্ধের কথা কইয়া।... বায়ান্ন বছর এই বক্তৃতা দিয়া যায়। ১১. যুদ্ধের পর আমার মাথা আর উঁচু হয়নি। সেই দুঃখ সারা জীবন ধইরা আমারে এই কথাটা কইছে। আমার কি দোষ আছে? ১২. সব সময়ে মনের মধ্যে একটা প্রশ্নই ঘুরপাক খায় যে কেনইবা বাংলাদেশ স্বাধীন হইল আমরাই বা কেন যুদ্ধ করলাম? আর কেনইবা আমরা আজকে মানসম্মান-ইজ্জত হারায়ে ফেললাম।

রাষ্ট্র মূল্যায়ন করে না, সমাজ সম্মান দেয় না। একজন বলছেন, ‘আমি সম্মান দিয়া কী করুম? নিজে কামাই কইরা খাই। নিজে কামাই কইরা খাটলে খাও, না খাটতে পারলে নাই।’ সমাজকে এরা ‘ডরান’। সাংবাদিক ও গবেষকরা যে খোঁজাখুঁজি করেন, সে-বিষয়ে অন্য একজনের মত- এ রকম কইরা কথা কইলে ওহানের সমাজের মানুষ তো আমারে কিছুদিন পর ভালা পাইত না। যুদ্ধের পরে নির্যাতিতা যে মেয়েটি হারিয়ে যাননি, বাড়িতে ফিরে এসেছেন, তার অভিজ্ঞতা : [কাঁদতে কাঁদতে মা বলেছেন] আহারে! তোরে আল্লায় বাঁচাইয়া রাখল ক্যা? তুই মইরা যা।অন্য একজন ভাবছেন : মরি নাই। মরণ আমার কপালে ছিল না। আরেকজন বলছেন, ‘[...] অপবাদের প্রতিবাদ করি নাই। খালি কানছি (কান্না)। প্রতিবাদ আর কী করুম? মানুষ আমারে ঘিন্না করছে।’ হানাদাররা গুলি করে স্বামীকে মেরেছে। তরুণী স্ত্রী দুঃখ করবেন এমন সুযোগ নেই। পালাতে হচ্ছে। বলছেন, ‘কোনো বাঁশ কাপড় ছাড়াই লাশ মাটিতে চাপা দিয়ে শুইয়ে দিলাম।’ একজনের স্বামী গেছেন হালচাষ করতে। ক্ষেতের মধ্যেই পাঞ্জাবিরা তাকে মেরে ফেলেছে। লাশ সেখানেই পড়ে ছিল। পরে আত্মীয়দের দুয়েকজন মিলে লাশ নিয়ে এসেছে, রেখেছে উঠানে। 

স্ত্রী স্মরণ করছেন : ‘আমি তো আর পাঞ্জাবির ভয়ে লাশের কাছে একলা একলা বসে থাকতে পারি না। আবার ওই মুহূর্তে খবর আইল পাঞ্জাবিরা আইয়া পড়তাছে।... তখন ওই মরা মানুষ থুইয়া দৌড় দিয়া পশ্চিম বাড়ি চলে গেলাম।... আমার শাশুড়ি ওই লাশের পাশে বইসা থাকছে।... কোরান পড়ছে।’ আরেকজনের স্বামীকে মেরে ফেলেছে ঘরের ভেতরেই। বায়ান্ন বছর আগের সেই ঘটনা স্মরণ করে স্ত্রী বলছেন : ‘এহন আমি কী করি? লাশ মাটি দেই কেমনে? আমি ঘরের দুয়ারে বইয়া কানতাছি। পরে ওই লাশ গলি ঘরে (গোয়ালঘরে) নিয়া থুইছি। আমার মেয়ের জন্য নতুন পায়জামা বানাইছিল হেই পায়জামা দিয়া লগে ৫টা খেতা (কাঁথা) দিয়া মুইড়া রাখছি যাতে কুত্তায় না নেয়। আমার ননদের জামাইডারে মারছে। হেরেসহ তিন-চার জনের সাথে মাটি দিছি।’

বাপের বাড়িতে গিয়ে লুকিয়েছিলেন ওই স্ত্রী। তিন দিন পরে ফিরে এসেছেন। এসে দেখেন ভিটা শূন্য। ঘর পুড়িয়ে দিয়েছে হানাদাররা। লুট হয়ে গেছে সবকিছু। আর স্বামীকে যেখানে মাটি দিয়েছিলেন সেখানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে আছে হাড়গোড়, মাথার খুলি। কুকুরে খেয়ে নিয়েছে মাংস। নির্যাতিতা মেয়েরা বলছেন : ‘আমরা দেশের জন্য কিছু করি নাই? মান দিলাম, সম্মান দিলাম, ইজ্জত দিলাম, যুদ্ধে গেলাম। তো হেইডা যদি সরকার বুইঝাও না বোঝে তা আমাদের কিছু করার নাই।’ বন্দি অবস্থা থেকে মুক্তিযোদ্ধারা নির্যাতিতদের একজনকে উদ্ধার করেছিলেন। মেয়েটির জন্য সেই দুঃসাহসিক মুক্তির ঘটনাও কোনো সান্ত্বনা নয়। ‘[...] আমি এগুলো মনে রাখতেও চাই না, কেন চাই না; কারণ যে দেশের জন্য সবই হারাইলাম, তারপর বাঁচতে না পাইরা বাপ-মারে ছেইড়া ঢাকা আইসা মাইনসের বাড়ি কাম করছি (কান্না) সে-কথা মনে কইরা কী অইব?’

মুক্তিযুদ্ধ এ মানুষদের কিছুই দেয়নি জ্বালাযন্ত্রণা, অসুখ, অপমান, দারিদ্র্য ছাড়া। যুদ্ধ শেষে তরুণী মায়ের কাছে ফিরে এসেছেন, আশ্রয় ও সান্ত্বনা পাবেন আশা করে। কিন্তু সেখানে এক গ্লাস পানিও পাননি, বেরিয়ে এসেছেন চোখের পানি ফেলতে ফেলতে। একাত্তরে শুধু যুদ্ধ হয়নি, গণহত্যাও ঘটেছে। নারী নির্যাতন ছিল এ গণহত্যারই অংশ। হানাদাররা যুদ্ধ করবে ভাবেনি, ভেবেছে নির্ভয়ে হত্যা, লুণ্ঠন ও ধর্ষণ চালাবে। যখন দেখল যুদ্ধ করতে বাধ্য হচ্ছে তখন নৃশংস ও বেপরোয়া হয়ে উঠল। এক বৃদ্ধার প্রলাপ : হানাদারদের উদ্দেশ করে তিনি বলছেন, ‘তোরা দেশ রক্ষা করবার আইছস, না মা-বোনের ইজ্জত মারবার আইছস?’ তারা ইজ্জত মেরেছে। যুদ্ধে তাদের শোচনীয় পরাজয় ঘটেছে।

আমরা জয়ী হয়েছি। কিন্তু সে-জয় পরিপূর্ণ নয়। প্রমাণ? প্রমাণ যুদ্ধাপরাধী পাকিস্তানি হানাদারদের বিচার না-হওয়া। বিলম্বে হলেও পাকিস্তানি হানাদারের দোসর রাজাকার-আলবদরদের বিচার হয়েছে-হচ্ছে। কিন্তু অন্তত ১৯৫ জন বিশেষ অপরাধীর বিচার হওয়াটা অত্যাবশ্যক ছিল। তাদের বিরুদ্ধে সাক্ষ্যপ্রমাণের অনেক দলিলের একটি হলো নির্যাতিত নারীদের কাহিনী। আর সামগ্রিক বিজয়ের অপূর্ণতার সবচেয়ে বড় প্রমাণ সমাজ না-বদলানো। সমাজ তো মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্পর্কের মানচিত্র বই কিছু নয়। সে-সম্পর্ক আগে যে মানবিক ছিল তা নয়, একাত্তরের পরও মানবিক হয়নি, বরং অনেক ক্ষেত্রে খারাপ হয়েছে। স্বাধীন বাংলাদেশে আজ মেয়েরা ধর্ষিত হচ্ছে। শিক্ষাঙ্গনে হচ্ছে সহপাঠীর দ্বারা, এমনকি শিক্ষকদের দ্বারাও। নারী একাত্তরেও নিরাপদে ছিল না, আজও নয়। স্বাধীনতা অর্জনের বায়ান্ন বছর অতিক্রান্তেও এই চিত্র সাক্ষ্য দেয় আমরা পরিপূর্ণভাবে বিজয় পাইনি। 

লেখক : ইমেরিটাস অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মুস্তাফিজ শফি

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০১৯১১০৩০৫৫৭, +৮৮০১৯১৫৬০৮৮১২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০১৭১২০৩৩৭১৫ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা