× ই-পেপার প্রচ্ছদ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি ফিচার চট্টগ্রাম ভিডিও সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

জিম্মি বাংলাদেশি জাহাজ

সোমালিয়ার উপকূল কীভাবে বিপদসংকুল হয়ে উঠল

ড. নাসির উদ্দিন আহাম্মেদ

প্রকাশ : ২০ মার্চ ২০২৪ ১০:২৭ এএম

ড. নাসির উদ্দিন আহাম্মেদ

ড. নাসির উদ্দিন আহাম্মেদ

কদিন আগে ভারত মহাসাগর অতিক্রমের সময় সোমালিয়ার জলদস্যুদের কবলে পড়ে ২৩ নাবিকসহ বাংলাদেশের পতাকাবাহী জাহাজ এমভি আব্দুল্লাহ। ঘটনাটি ঘটে ১২ মার্চ। এরপর জলদস্যুদের কাছে বন্দি ওই জাহাজের বাংলাদেশিদের আর্তনাদ সংবাদমাধ্যমে উঠে আসে এবং তাদের জীবন কি ভয়াবহ দুর্বিষহ উৎকণ্ঠার মধ্য দিয়ে কাটছে এর খণ্ড খণ্ড চিত্র মিলছে। ১৯ মার্চ সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত এ সম্পর্কিত প্রতিবেদনগুলোয় বলা হয়েছে, জিম্মি বাংলাদেশি জাহাজ উদ্ধারে সোমালিয়ার পুলিশ ও বিভিন্ন দেশের নৌবাহিনীর সদস্যরা অভিযানের প্রস্তুতি নিচ্ছেন। দেশটির অর্ধস্বায়ত্তশাসিত পান্টল্যান্ড অঞ্চলের পুলিশের বরাত দিয়ে বার্তা সংস্থা রয়টার্স ১৮ মার্চ এ খবর প্রকাশ করে। কিন্তু খবরটি প্রকাশের পর ওই জাহাজ কর্তৃপক্ষের প্রতিক্রিয়াও সংবাদমাধ্যমেই জানা গেছে। তাদের বক্তব্য, এ ধরনের অভিযানের বিষয়ে তারা কিছু জানেন না, তবে নাবিকদের নিরাপদে ফিরিয়ে আনার ওপরই সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন তারা। তাদের ওই বক্তব্যের শেষোক্ত অংশটুকু নিঃসন্দেহে অধিক গুরুত্বপূর্ণ।


আমাদের বক্তব্য, সবার আগে জিম্মিদের নিরাপত্তার বিষয়টি নিশ্চিত করা জরুরি। আমরা জানি, ১৪ মার্চ ইউরোপীয় ইউনিয়নের নৌবাহিনী জাহাজটির নাবিকদের উদ্ধারে অভিযানের প্রস্তাব দিয়েছিল। কিন্তু তাতে সম্মতি দেয়নি বাংলাদেশ, ওই বার্তা কদিন আগে দিয়েছে একটি টেলিভিশন চ্যানেল। বাংলাদেশ জিম্মিদের উদ্ধারে কৌশলী হওয়ার ওপর যে জোর দিচ্ছে তা সঠিক সিদ্ধান্ত বলেই মনে করি। বিষয়টি যেহেতু আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা সংকট হিসেবে দেখা দিয়েছে, সেহেতু এর নিরসনে বহুমাত্রিক সতর্কতা ও আন্তর্জাতিক দূরদর্শী যৌথ উদ্যোগ অত্যন্ত জরুরি। বিদ্যমান পরিস্থিতির স্থায়ী সমাধানের পথ খুঁজতে নজর দিতে হবে একেবারে উৎসে। জলদস্যুরা জিম্মি জাহাজ ও নাবিকদের নিয়ে তাদের অবস্থান ইতোমধ্যে কয়েকবার পরিবর্তন করে। এ সংকটের প্রেক্ষাপট কত গভীর ও বিস্তৃত তা আমাদের অনেকেরই অজানা নয় বটে; তবু ফিরে তাকাই পেছনের দিকে।

পূর্ব আফ্রিকা অঞ্চলে এক ব্যর্থ রাষ্ট্রের নাম সোমালিয়া। আফ্রিকার মানচিত্রের পুবদিকে নজর দিলেই দেখা যাবে একটি ভূখণ্ড পশুর সুচালো শিংয়ের মতো ভারত মহাসাগরের বুকে ঢুকে আছে। এ ভূখণ্ডের নামই সোমালিয়া, যা আজ বাংলাদেশসহ পৃথিবীর বহু দেশের সমুদ্রগামী জাহাজের মালিক ও নাবিকদের কাছে আতঙ্কের এক নাম। যুদ্ধবিধ্বস্ত এ দেশে সুশাসন দূরে থাক, ন্যূনতম শাসনও না থাকায় বহু নেতারূপী দুর্বৃত্তের অধীনে তাৎপর থাকা হরেকরকমের তথাকথিত বিদ্রোহী দল বা বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠন মেতে আছে জলদস্যুতায়। তাদের ক্রমাগত অপতৎপরতায় আরব সাগর ও লোহিত সাগরের মধ্যবর্তী গালফ অব এডেন (এডেন উপসাগর), ভারত মহাসাগরের পশ্চিমাঞ্চল সর্বোপরি সোমালিয়ার পশুর সিং আকৃতির ভূখণ্ড ও ইয়েমেনের সুকত্রা দ্বীপের মধ্যবর্তী গার্ডাফাই সামুদ্রিক চ্যানেলে যেকোনো নৌ চলাচল অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

এমনই সশস্ত্র দলের তথা জলদস্যুদের কবলে পড়ে বাংলাদেশের একটি বাণিজ্যিক জাহাজ। ১২ মার্চ (মঙ্গলবার) ২৩ নাবিকসহ বাংলাদেশের জাহাজ এমভি আব্দুল্লাহ ৫৮ হাজার মেট্রিক টন কয়লা নিয়ে মোজাম্বিক থেকে সংযুক্ত আরব আমিরাতে যাচ্ছিল। সোমালিয়ার উপকূলীয় ভূখণ্ডসংলগ্ন ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা বা রেড জোন এড়িয়ে প্রায় ৫০০ নটিক্যাল মাইল দূর দিয়ে যাওয়া সত্ত্বেও ওত পেতে থাকা জলদস্যুরা স্পিডবোটযোগে আচমকা জাহাজটিতে উঠে পড়ে এবং সবাইকে বন্দি করে জাহাজের নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করে। লেখাটি যখন লিখছি, তখন পর্যন্ত জাহাজটি জলদস্যুদের নিয়ন্ত্রণে আছে এবং তাদের দাবিদাওয়া নিয়ে গণমাধ্যমে কোনো তথ্য প্রকাশিত হয়নি। তবে ২০১০ সালে দেশের এসআর গ্রুপের এমভি জাহানমণি জাহাজ একই ভাবে জলদস্যুদের হাতে জিম্মি হয়। এর ১০০ দিন পর ২৫ জিম্মি নাবিককে উদ্ধারের ঘটনার আলোকে ধারণা করা যায়, মুক্তিপণের বিনিময়ে অক্ষতই উদ্ধার হবে বর্তমানে জলদস্যুদের অধীনে থাকা বাংলাদেশি জাহাজ এমভি আব্দুল্লাহ ও জাহাজের ২৩ নাবিক।

বহু বছর থেকেই গৃহযুদ্ধ ও কোন্দলের কারণে সোমালিয়া একটি ব্যর্থ ও ভঙ্গুর রাষ্ট্র হিসেবে কোনোরকমে টিকে আছে। ১৯৮১ থেকে ক্রমাগত কোন্দল এবং ২০০৬ থেকে ২০০৯ পর্যন্ত চলা চার বছরের সশস্ত্র যুদ্ধ দেশটিকে ধ্বংসের প্রান্তে ঠেলে দিয়েছে। আন্তর্জাতিক একাধিক সংস্থা ও বহুজাতিক বাহিনীর ক্রমাগত প্রচেষ্টাও এ গৃহযুদ্ধ ও কোন্দল থামাতে পারেনি। এর নেপথ্যে উগ্রবাদী ধর্মীয় সংগঠন আল শাবাবকে দায়ী করা হলেও বস্তুত দেশটিতে আইন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কোনো নিয়ন্ত্রণ না থাকায় যে-যার মতো চলছে। এরই মধ্যে সমুদ্রের জাহাজ হাইজ্যাক করে মুক্তিপণ আদায় সোমালীয়দের কাছে বেশ জনপ্রিয় এবং বাঁচার অন্যতম মাধ্যম হয়ে উঠেছে।

১৯৯৮ সালের ৭ আগস্ট কেনিয়ার রাজধানী নাইরোবি ও তানজানিয়ার রাজধানী দারুসসালামে মার্কিন দূতাবাসের সামনে প্রায় একযোগে বোমা হামলা চালায় জঙ্গিগোষ্ঠী। এতে মার্কিনিসহ ২২৪ জনের মৃত্যু ঘটে এবং ৪ হাজারের বেশি মানুষ আহত হয়। ২০০০ সালের ১২ অক্টোবর সোমালিয়ার নিকটবর্তী জলসীমায় মার্কিন নৌযানে (ডেসট্রয়ার) আচমকা আক্রমণ করে জঙ্গিরা। আত্মঘাতী এ হামলায় প্রাণ হারায় ১৭ মার্কিন নৌসেনা এবং আহত হয় ৩৭ জন। এরপর ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর (৯/১১) ঘটে টুইন টাওয়ার ধ্বংসের ঘটনা। হৃদয়বিদারক এ ঘটনায় প্রাণ হারায় ৩ হাজার জনের বেশি মানুষ এবং আহত হয় প্রায় ২৫ হাজার জন। একই সময়ে সোমালিয়ার ভূখণ্ডসংলগ্ন সমুদ্রসীমায় বেড়ে যায় জলদস্যুতার মাত্রা। বিশ্বজুড়ে জঙ্গিদের এমন বিধ্বংসী কর্মকাণ্ড ও সমুদ্রপথে যাতায়াতকারী বিভিন্ন বাণিজ্যিক জাহাজে জঙ্গিদের ঘন ঘন আক্রমণ নিয়ন্ত্রণে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তখন সোমালিয়ার জলসীমার নিরাপত্তায় কম্বাইন্ড টাস্ক ফোর্স ১৫০ (সিএফটি ১৫০) গঠন করে। এ টাস্ক ফোর্সে যোগ দেয় অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, ডেনমার্ক, ফ্রান্স, জার্মানি, ইতালি, নেদারল্যান্ডস, নিউজিল্যান্ড, পাকিস্তান, স্পেন, সৌদি আরব ও ব্রিটিশ নৌবাহিনীর যুদ্ধজাহাজ ও নৌসেনা। ভারতসহ অন্যান্য দেশও পরে এমন নৌনিরাপত্তা কার্যক্রমে সংযুক্ত হয়। তবে ক্ষুধা ও দরিদ্রপীড়িত সোমালিয়ার একাধিক বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠনের সদস্যরা না খেয়ে মরে যাওয়া বা নির্জীব পড়ে থাকার চেয়ে বিদেশি পণ্যবাহী জাহাজ ও মাছ ধরার নৌযান লুটপাট ও নাবিকদের পণবন্দি করে কিছুদিন অন্তত খেয়েপরে চলার পথ বেছে নেয়। তাদের এ দুর্বৃত্তপনার দুর্ভাগ্যের স্বীকার বাংলাদেশের পতাকাবাহী জাহাজ এমভি আব্দুল্লাহ‌‌‌।

এমন ক্রান্তিকালে এবং জিম্মি ২৩ পরিবারের জন্য চরম সংবেদনশীল সময়ে রাষ্ট্র ও নাগরিক সমাজের কাছে সুপরিকল্পিত ও বিচক্ষণ সিদ্ধান্ত ও পরিপক্ব আচরণ একান্ত প্রত্যাশিত। অতীতে বহু শক্তিশালী দেশের নৌযানও জলদস্যুদের কবলে পড়েছে। যার অধিকাংশই কমবেশি মুক্তিপণ দিয়ে নিস্তার পায়। জিম্মি উদ্ধারে সফল ও ব্যর্থ উভয় প্রকার সশস্ত্র কমান্ডো অভিযানের নজির রয়েছে। তাই এ মুহূর্তে সরকার বা জাহাজ মালিকপক্ষ কী করছে বা করছে না তা নিয়ে কাদা ছোড়াছুড়ির সময় নয়।

অতিসম্প্রতি ভারতীয় নৌবাহিনী একটি সফল অভিযান চালিয়ে এমভি আব্দুল্লার অবস্থানের নিকটবর্তী সমুদ্র অঞ্চলে থাকা ও আগেই জিম্মি হওয়া মাল্টিজ পতাকাবাহী কার্গো জাহাজ এমভি রুয়েন থেকে ১০০ দিন পর ১৭ নাবিককে উদ্ধার করে ও ৩৫ জন স্প্যালিও জলদস্যুকে আটক করে। ভারতের এমন অভিযানের পর বর্তমানে জিম্মি থাকা বিভিন্ন দেশের একাধিক জাহাজে অবস্থানকারী জলদস্যুরা সতর্ক এবং সম্ভাব্য সামরিক কার্যক্রমের বিপরীতে পাল্টা ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারে। আমাদের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক মুখপাত্রের বরাতে বিভিন্ন গণমাধ্যম প্রকাশ করেছে যে, ইউরোপীয় দেশসমূহের সম্মিলিত নৌকোয়ালিশন ইউনাভফর (ইউরোপীয় ইউনিয়ন নেভাল ফোর্স) শক্তি প্রয়োগ করে এমভি আব্দুল্লাহর নাবিকদের উদ্ধারের প্রস্তাব দিয়েছে। সোমালিয়ার স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল পুন্টল্যান্ড পুলিশের একটি ঘোষণাও প্রকাশিত হয়েছে বিভিন্ন গণমাধ্যমে। ঘোষণামতে, পুন্টল্যান্ড পুলিশ এমভি আব্দুল্লাহকে উদ্ধারে সম্ভাব্য বহুজাতিক নৌ অভিযানে কার্যকর সহায়তা করার জন্য প্রস্তুতি নিয়েছে। এসব অভিযানের তথ্য জলদস্যুদের অজানা থাকার কারণ নেই। তবে কোন পদ্ধতিতে নিশ্চিত সাফল্য বা শূন্য ক্ষয়ক্ষতির নিশ্চয়তা, তা নিরূপণ করা সম্ভব নয়। জিম্মি উদ্ধারে অভিজ্ঞ দেশবিদেশের প্রখ্যাত ব্যক্তি ও সংস্থার সঙ্গে পরামর্শক্রমে যেকোনো মূল্যে জিম্মিদের ফিরিয়ে আনতে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা চালানোর বিকল্প নেই।

এ অবস্থায় কায়মনো বাক্যে জিম্মিদের সুস্থতা ও নিরাপত্তা কামনা করি। সমবেদনা জানাই উৎকণ্ঠায় থাকা ২৩ পরিবারের প্রতি। এ সংবেদনশীল সময়ে সরকার ও সচেতন নাগরিক সমাজ ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর পাশে দাঁড়িয়ে থেকে শক্তি ও সাহস জোগাবেÑএটাই প্রত্যাশা।

  • অবসরপ্রাপ্ত মেজর, নিরাপত্তা-বিশ্লেষক ও গবেষক
শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মুস্তাফিজ শফি

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০১৯১১০৩০৫৫৭, +৮৮০১৯১৫৬০৮৮১২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০১৭১২০৩৩৭১৫ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা