× ই-পেপার প্রচ্ছদ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি ফিচার চট্টগ্রাম ভিডিও সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

শিক্ষার্থীর আত্মহত্যা

অবন্তিকাও শিক্ষাঙ্গনে কলুষতার বার্তা দিয়ে গেলেন

এলিনা খান

প্রকাশ : ১৯ মার্চ ২০২৪ ১২:৪১ পিএম

আপডেট : ১৯ মার্চ ২০২৪ ১৩:২৪ পিএম

এলিনা খান

এলিনা খান

দেশের প্রায় সব স্তরে বিশেষ করে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে অনাচার-দুরাচার-কদাচারের যে ছায়া ক্রমেই দৃশ্যমান হচ্ছে, তা কোনোভাবেই সভ্য কিংবা মানবিক সমাজে কাম্য হতে পারে না। আমাদের স্মরণে আছে, মাধ্যমিক পর্যায় থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত যৌন হয়রানি-নিপীড়নে অনেক অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটেছে এবং প্রতিবারই ঘটে যাওয়া ঘটনা আমাদের সামনে প্রশ্ন রাখছে- এসব কি শুধুই মূল্যবোধের অবক্ষয় থেকে সৃষ্ট? আমরা দেখছি, শিক্ষার্থীদের মাঝে নারী শিক্ষার্থীরা কীভাবে শিক্ষক নামের কতিপয় দুরাচারীর রোষ ও লোভের কবলে পড়ছেন। অনেক ক্ষেত্রেই সামাজিকতা কিংবা লোকলজ্জার ভয়ে তাদের বড় অংশই মুখ খোলেন না বটে কিন্তু তাদের এ মৌনতা জীবনকে ঠেলে দেয় আত্মহননের পথে। অবন্তিকা যার সর্বশেষ মর্মস্পর্শী নজির।


১৬ মার্চ প্রতিদিনের বাংলাদেশ-এ প্রকাশিত ‘প্রতিবাদী অবন্তিকার করুণ সমাপ্তি’ শিরোনামের প্রতিবেদনে বেদনাকাতর চিত্তে চোখ আটকে যায়। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ওই বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী প্রক্টর এবং সহপাঠীর বিরুদ্ধে তিনি যৌন হয়রানি-নিপীড়নের অভিযোগ আনেন এক ফেসবুক পোস্টে। তারপর আত্মহননের পথ বেছে নেন। ১৮ মার্চ প্রতিদিনের বাংলাদেশ-এর ভিন্ন এক প্রতিবেদনে জানা যায়, অবন্তিকাকে নিয়মিত উত্ত্যক্ত করতেন অভিযুক্ত সহপাঠী আম্মান সিদ্দিকী। প্রথম বর্ষে পড়ার সময় অভিযুক্ত আম্মান অবন্তিকাকে প্রেমের প্রস্তাব দিলে অবন্তিকা প্রত্যাখ্যান করেন। এর পর থেকে আম্মান অবন্তিকাকে নিয়মিত উত্ত্যক্ত করতেন। এ ছাড়া ভিন্ন একটি কারণে অবন্তিকাকে উত্ত্যক্ত করতেন তার অন্য কিছু সহপাঠীও। অবন্তিকাকে ‘সেক্সুয়াল অ্যাবিউজ’-এর সঙ্গে জড়িয়ে গেছে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী প্রক্টর দ্বীন ইসলামের নাম।

আমরা দেখছি, শিক্ষাঙ্গনে নারীর প্রতি সহিংসতা-যৌন নিপীড়ন বেড়েছে। অতিসম্প্রতি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজ, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, এমনকি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েও নারী শিক্ষার্থীরা শিক্ষক, সহপাঠী কিংবা বিশ্ববিদ্যালয়েরই শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে যৌন নিপীড়ন কিংবা ধর্ষণের অভিযোগ উত্থাপন করেছেন। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে নারীকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণের প্রতিবাদে এবং জড়িতদের শাস্তির দাবিতে বিশ্ববিদ্যালয়টিতে চলছে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন। শিক্ষকের বিরুদ্ধে ওঠা যৌন নির্যাতনের অভিযোগে আন্দোলন চলছে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়েও। সঙ্গত কারণেই প্রশ্ন দাঁড়ায়Ñশিক্ষাঙ্গন কি নিপীড়কদের নিরাপদ ভূমি হয়ে উঠছে? নিপীড়কদের ছায়ায় নারী শিক্ষার্থীরা শিক্ষাঙ্গনে হাঁসফাঁস করছেন। ইতোমধ্যে এ কারণে ঝরে পড়েছে অনেক প্রাণ। আবার অনেকেই সরে যাচ্ছেন শিক্ষাঙ্গন থেকে।

শিক্ষাঙ্গনে নারীর প্রতি সহিংসতা নতুন নয়। অতীতে আলোচিত যত ধর্ষণ কিংবা নারী সহিংসতা-নিপীড়নের ঘটনা ঘটেছে, যে ঘটনাগুলোর কারণে পুরো দেশ আলোড়িত হয়েছে, সচেতন মানুষের বিবেক কেঁদেছে, সেগুলোসহ প্রতিটি ঘটনার যথাযথ তদন্তক্রমে ন্যায়বিচারের দাবিও নতুন নয়। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রেই এ দাবি অনুযায়ী বিচার নিশ্চিত হয়নি। নারীর প্রতি সহিংসতার বিরুদ্ধে প্রথম অভিযোগ আসে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে। ১৯৯৮ সালে জসিমউদ্দিন মানিক ওই বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ, তিনি দলীয় ক্ষমতা ব্যবহার করে ক্যাম্পাসে ১০০-এর অধিক নারীকে ধর্ষণ করে তা উদ্‌যাপন করেছিলেন। এজন্য তার নাম হয়েছিল ‘সেঞ্চুরি মানিক’। পরে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের মুখে ওই নিপীড়ককে ক্যাম্পাস থেকে তাড়ানো হয়। প্রশংসনীয় ওই আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে পরে শিক্ষাঙ্গনে নিপীড়নকারীদের পদচারণ বন্ধের জোরালো দাবি সত্ত্বেও এখন পর্যন্ত মানিকের বিচার নিশ্চিত করা যায়নি। শিক্ষাঙ্গনে ধর্ষণের প্রসঙ্গ এলেই তার নাম আমাদের স্মরণে আসে। বিশেষত প্রভাবশালী মহলের একটি অংশ এখনও সেঞ্চুরি মানিকের বিচারপ্রক্রিয়ার কথা শুনলে চেপে যান। বিষয়টি নিঃসন্দেহে দুঃখজনক। সম্প্রতি শিক্ষাঙ্গনে একের পর এক যেভাবে নারীর প্রতি সহিংসতা ও নিপীড়নের ঘটনার খবর আসছে, তাতে আমরা ক্ষুব্ধ, যুগপৎ উদ্বিগ্ন। একই সঙ্গে দ্রুত এসব ঘটনার বিচার না হওয়ায় অধিকতর উদ্বিগ্ন। ধর্ষণের মতো গুরুতর অপরাধকে আদালত দেখছেন বিশাল মানবিক বিপর্যয় হিসেবে। যত দ্রুত অপরাধীর দণ্ড নিশ্চিত করা যাবে, সামাজিক শৃঙ্খলা ফেরাতে তা তত বেশি কার্যকর হবে। শিক্ষাঙ্গনে পুনঃপুনঃ নারী নির্যাতন ও সহিংসতার মতো অপরাধ সংঘটিত হওয়াকে শুধু অনাকাঙ্ক্ষিত ও দুঃখজনক বলে অভিহিত করে পার পেয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই।

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান জাতিকে মানবিক হওয়ার শিক্ষা দেবে এটাই স্বাভাবিক প্রত্যাশা। উচ্চশিক্ষাঙ্গনে আমরা শিক্ষার পরিপূর্ণ রূপের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ পাই। জীবন পরিচালনার জন্য মূল্যবোধ-মানবিকতার পাশাপাশি নির্দিষ্ট বিষয়ে শিক্ষার্থীদের বিশেষভাবে উৎকর্ষ করার প্রেক্ষাপট তৈরি করে। যেকোনো উচ্চশিক্ষাঙ্গনে তাই আমরা আলোকিত মানুষ পাব, এমন প্রত্যাশা স্বাভাবিক কারণেই করি। উচ্চশিক্ষাঙ্গনে যখন এমন অপরাধ সংঘটিত হয় এবং এর কোনো বিচার হয় না তখন স্বাভাবিক কারণেই এর বহুমুখী বিরূপ প্রভাব পড়ে অন্যত্রও। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে মানিক অপরাধ করেও যখন পার পেয়ে গেলেন, তখন অন্য শিক্ষাঙ্গনের নিপীড়করাও উৎসাহিত হয়ে উঠলেন। এভাবে শিক্ষাঙ্গনে নারী শিক্ষার্থীদের ওপর নির্যাতন বাড়তে থাকে। এ বিষয়ে আলোচনা-সমালোচনা কম হয়নি। নারী নির্যাতন-নিপীড়নের বিষয়ে বৃহৎ পরিসরে আলোচনা সত্ত্বেও এবং নিপীড়নের বিরুদ্ধে কঠোর আইন প্রণীত হলেও অন্ধকারের ছায়া সরেনি। দেশের সামগ্রিক উন্নয়ন-অগ্রগতির বহুমুখী চিত্র দৃশ্যমান হওয়া সত্ত্বেও একই সঙ্গে অতীতের যেকোনো সময়ের তুলনায় নারীর অগ্রগতি নানা ক্ষেত্রে দেখা গেলেও কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় নারীর নিরাপত্তা যে এখনও নিশ্চিত হয়নি, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী অবন্তিকা এরই মর্মস্পর্শী নজির।

নিকট অতীতে ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজে শিক্ষার্থীর ওপর যৌন নিপীড়ন-হয়রানির যে অভিযোগ উত্থাপিত হয় তা চলমান ঘটনা থেকে বিচ্ছিন্ন কিছু নয়। আমাদের স্মরণে আছে, ওই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেরই পরিমল নামে এক শিক্ষকের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ উঠেছিল এবং তিনি এর জন্য আদালতে দণ্ডিত হন। কিন্তু আমরা দেখছি, এর পরও পরিমলদের কদর্যতা বন্ধ হয়নি। সাম্প্রতিক ঘটনা এরই সাক্ষ্যবহ। যখনই কোনো শিক্ষকের বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ আসে তখন ওই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সম্পর্কে অভিভাবকদের নেতিবাচক ধারণা তৈরি হয়। সম্প্রতি জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী অবন্তিকার আত্মহননের প্রেক্ষাপটে নানা চিত্র আমাদের সামনে উঠে আসছে। সচেতন মানুষের মনে ওই বিশ্ববিদ্যালয় সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণা তৈরি হয়েছে। শিক্ষাঙ্গনে ব্যক্তি অপরাধের দায় ওই প্রতিষ্ঠান এড়াতে পারে না। তাই শিক্ষাঙ্গনে নারীর প্রতি সহিংসতার যেকোনো অভিযোগ নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া সবার আগে কর্তৃপক্ষের তরফে জরুরি। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ অবন্তিকার আত্মহননের পর দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ায় আমরা সাধুবাদ জানাই বটে; তবে এ পর্যন্তই যেন বিষয়টি থেমে না থাকে এরও নিশ্চয়তা দাবি করি। অতীতের অনেক ঘটনায় পরবর্তী ধাপগুলোর ব্যাপারে কোনো কোনো ক্ষেত্রে আমাদের অত্যন্ত অপ্রীতিকর অভিজ্ঞতা রয়েছে। আমরা এর পুনরাবৃত্তি কোনোভাবেই চাই না।

বিভিন্ন মহলের অভিযোগ, রাজনৈতিক প্রভাব কিংবা প্রভাবশালী কারও মদদে অনেকেই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ পান। রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে নিয়োগ পাওয়া এসব শিক্ষক কোনো কিছুরই তোয়াক্কা করেন না, এমনকি শিষ্টাচারও ভুলে যান। তাদের উন্মত্ততার শিকার হন শিক্ষার্থীরা বিশেষ করে নারী শিক্ষার্থীরা। কিন্তু এর কোনো দৃষ্টান্তযোগ্য প্রতিবিধান অনেক ক্ষেত্রেই নিশ্চিত না হওয়ায় ফিরে ফিরে আমাদের অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হচ্ছে যা নৈতিক অবক্ষয়ের সাক্ষ্য দাঁড় করানোর পাশাপাশি কদর্যতার বিস্তৃত অধ্যায় তুলে ধরে। এমনটি কোনোভাবেই আর চলতে দেওয়া যায় না। উচ্চশিক্ষা নিলেই মানুষ হওয়া যায় না, মানুষ হতে গেলে মানবিক গুণাবলি অর্জন করতে হয়। যাদের মধ্যে কোনো ধরনের মানবিক গুণাবলি নেই তারা কোনো ক্ষেত্রেই দায়িত্বশীল কোনো পদে থাকবে পারেন না। শিক্ষক হিসেবে তো নয়ই, তা যেকোনো স্তরের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানই হোক না কেন। একজন শিক্ষক কিংবা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ঊর্ধ্বতন কেউ যদি নিপীড়কের ভূমিকায় অবতীর্ণ হন তাহলে সমাজে অন্ধকারের ছায়া কতটা গাঢ় হয়ে পড়েছে এর ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ নিষ্প্রয়োজন। আমাদের স্মরণে আছে, ফেনীর সোনাগাজীর মাদ্রাসা শিক্ষার্থী সেই নুসরাত জাহানের কথা, যার প্রাণ ঝরে পড়েছিল অধ্যক্ষের প্রত্যক্ষ হিংস্রতায়।

অবন্তিকার আত্মহনন পুনর্বার দেশের শিক্ষাঙ্গনে জিইয়ে থাকা নিরাপত্তাহীনতার যে চিত্র উন্মোচন করেছে এর যথাযথ প্রতিকারই হতে পারে ভবিষ্যতের জন্য উপযুক্ত প্রতিবিধান। আইনের শাসন কিংবা ন্যায়বিচারের পথে কোনোরকম প্রতিবন্ধকতা যাতে না থাকে তা নিশ্চিত করার দায় রাষ্ট্রশক্তির। শিক্ষাঙ্গন বিশেষ করে বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো উচ্চশিক্ষাঙ্গনে যৌন নিপীড়নসহ নানাবিধ নেতিবাচক ঘটনার অপচ্ছায়া যেভাবে প্রলম্বিত হচ্ছে, এর কঠোর প্রতিকার নিশ্চিত হোক এ প্রত্যাশা শুভবোধসম্পন্ন সবার।

  • আইনজীবী ও মানবাধিকারকর্মী
শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মুস্তাফিজ শফি

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০১৯১১০৩০৫৫৭, +৮৮০১৯১৫৬০৮৮১২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০১৭১২০৩৩৭১৫ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা