স্মরণ
তমালিকা হোসেন
প্রকাশ : ১৯ মার্চ ২০২৪ ১২:৩৫ পিএম
‘যে কবিতা শুনতে
জানে না/সে ঝড়ের আর্তনাদ শুনবে।/যে কবিতা শুনতে জানে না/সে দিগন্তের অধিকার থেকে বঞ্চিত
হবে।/যে কবিতা শুনতে জানে না/সে আজন্ম ক্রীতদাস থেকে যাবে।’Ñঅমর এ পঙ্ক্তিমালার রচয়িতা
আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ। জন্ম ৮ ফেব্রুয়ারি, ১৯৩৪ সালে বরিশালের বাবুগঞ্জ উপজেলার বাহেরচর-ক্ষুদ্রকাঠি
গ্রামে। পূর্ণনাম আবু জাফর মুহাম্মদ ওবায়দুল্লাহ খান। বাবা আবদুল জব্বার খান ছিলেন
পাকিস্তান আইন পরিষদের স্পিকার। আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ ১৯৪৮ সালে ময়মনসিংহ জিলা স্কুল
থেকে মাধ্যমিক, ১৯৫০ সালে ঢাকা কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক এবং ১৯৫৪ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের
ইংরেজি বিভাগ থেকে এমএ পাস করার পরই যোগ দেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগে প্রভাষক
পদে। ১৯৫৭ সালে অধ্যাপনা পেশা ছেড়ে যোগ দেন পাকিস্তান সিভিল সার্ভিসে। ১৯৮২ সালে সচিব
হিসেবে অবসর নেন। একই বছর এরশাদ সরকারের মন্ত্রিসভায় যোগ দিয়ে কৃষি ও পানিসম্পদ মন্ত্রী
হিসেবে দুই বছর দায়িত্ব পালন করেন। পরে যুক্তরাষ্ট্রে রাষ্ট্রদূত হিসেবেও দায়িত্ব
পালন করেন।
আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ (১৯৩৪-২০০১)
আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ
পঞ্চাশের দশকের অন্যতম কবি হিসেবে খ্যাতি অর্জন করেন। তার কবিতায় আবহমান বাংলার অকৃত্রিম
ছবি পাওয়া যায়। তার কবিতার সূচনা ভাষা আন্দোলন কেন্দ্র করে এবং বিকাশ মুক্তিযুদ্ধ
ও স্বাধীনতা-পরবর্তী বাংলাদেশের সামগ্রিক জনজীবনের আশা-নিরাশা এবং স্বপ্ন-বাস্তবতা
ঘিরে।
ভাষা আন্দোলনের
প্রেক্ষাপটে লেখা ‘কোনো এক মা’কে’ কবিতাটিও বাংলা সাহিত্যের অনন্য সংযোজন। ‘মাগো, ওরা
বলে,/সবার কথা কেড়ে নেবে।/তোমার কোলে শুয়ে/গল্প শুনতে দেবে না।/বলো, মা, তাই কি হয়?/তাইতো
আমার দেরি হচ্ছে।/তোমার জন্যে কথার ঝুড়ি নিয়ে/তবেই না বাড়ী ফিরবো।/লক্ষ্মী মা, রাগ
ক’রো না,/মাত্রতো আর কটা দিন।’ ভাষা আন্দোলনে শহীদ হওয়া কোনো এক সন্তানের পকেটে থাকা
ছেঁড়া আর রক্তে ভেজা এ চিঠির রচয়িতা আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ। কবিতাটি প্রকাশ পেয়েছিল
১৯৫৩ সালে হাসান হাফিজুর রহমান সম্পাদিত ঐতিহাসিক ‘একুশে ফেব্রুয়ারী’ সংকলনে। কবিতা
রচনায় অবদানের জন্য তিনি বাংলা একাডেমি ও একুশে পদক লাভ করেন। তার প্রতিষ্ঠিত কবিদের
সংগঠন ‘পদাবলি’ আশির দশকে দর্শনির বিনিময়ে কবিতাসন্ধ্যার আয়োজন করত।
গত শতাব্দীর পঞ্চাশের দশকের স্বতন্ত্র কণ্ঠের কবি আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ ‘কিংবদন্তির কবি’ হিসেবেই পরিচিত। আশির দশকে লেখা ‘আমি কিংবদন্তির কথা বলছি’ এবং ‘বৃষ্টি ও সাহসী পুরুষের জন্য প্রার্থনা’ আবু জাফর ওবায়দুল্লাহর অনবদ্য সৃষ্টি। এ দুটি দীর্ঘ কবিতা আধুনিক বাংলা সাহিত্যের ভান্ডারে অভূতপূর্ব সংযোজন। কবিতায় তিনি লোকজ ঐতিহ্য ব্যবহারের মাধ্যমে প্রকৃতির রূপ ও রঙের বিচিত্র ছবিগুলো ফুটিয়ে তুলেছেন। তার প্রকাশিত কবিতার উল্লেখযোগ্য বইয়ের মধ্যে রয়েছে : সাত নরীর হার, কখনো রং কখনো সুর, কমলের চোখ, আমি কিংবদন্তির কথা বলছি, সহিষ্ণু প্রতীক্ষা, প্রেমের কবিতা, বৃষ্টি ও সাহসী পুরুষের জন্য প্রার্থনা, আমার সময়, নির্বাচিত কবিতা, আমার সকল কথা, মসৃণ কৃষ্ণ গোলাপ ইত্যাদি। মহাকাব্যিক ব্যঞ্জনার বাংলা দীর্ঘ মৌলিক কবিতার কবি আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ ১৯ মার্চ, ২০০১ সালে ঢাকায় মারা যান। বাংলা কবিতায় অসংখ্য স্মরণীয় পঙ্ক্তির রচয়িতার কবির মৃত্যুদিনে শ্রদ্ধা।