× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

স্বাস্থ্যখাতের সমস্যা অচিহ্নিত নয়, জরুরী প্রয়োজন হচ্ছে সুশাসন

ড. মুনীর উদ্দিন আহমদ

প্রকাশ : ০৭ নভেম্বর ২০২২ ২১:৫৮ পিএম

আপডেট : ০৭ নভেম্বর ২০২২ ২২:১৯ পিএম

স্বাস্থ্য খাত স্পর্শকাতর খাতগুলোর মধ্যে অন্যতম একটি খাত

স্বাস্থ্য খাত স্পর্শকাতর খাতগুলোর মধ্যে অন্যতম একটি খাত

এ বছর ডেঙ্গু পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নিতে পারেÑজনস্বাস্থ্য ও কীটতত্ত্ববিদদের এই সতর্কবার্তা অনেক আগে থেকেই শোনা যাচ্ছিল। কিন্তু সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীলরা এই সতর্কবার্তা আমলে নিয়ে কাজের কাজ কতটা করেছেন বিদ্যমান বাস্তবতাÑএই প্রশ্নটিই সামনে নিয়ে এসেছে


৬ নভেম্বর প্রতিদিনের বাংলাদেশসহ বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে ডেঙ্গু পরিস্থিতির যে খবর জানা যায়, তাতে এই প্রশ্নও দাঁড়ায়, কর্তৃপক্ষ কিংবা দায়িত্বশীলদের অব্যবস্থাপনা ও সময়ের কাজ সময়ে করতে না পারার দুঃখজনক মাশুলই গুনতে হচ্ছে দেশের মানুষকে।

৬ নভেম্বর সংবাদমাধমের তথ্য, দেশে গত ২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হয়ে ভর্তি হয়েছেন আরও ৬৩৭ জন। এ নিয়ে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৯ হাজার ২৮৩ জনে। ২৪ ঘণ্টায় প্রাণ হারিয়েছেন ৫ জন এবং ওই দিনের মৃতের সংখ্যা নিয়ে এখন পর্যন্ত চলতি বছরে মৃতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৬৭। যখন এই লেখাটি প্রকাশিত হবে তখন আক্রান্ত ও মৃতের সংখ্যা কী দাঁড়াবে বলা মুশকিল।

সন্দেহ নেই, নানা ক্ষেত্রে আমাদের সার্বিক অগ্রগতি কম নয়। স্বাস্থ্য খাতও এর বাইরে নয়। কিন্তু তারপরও এই খাতের ভঙ্গুর পরিস্থিতির নিরসন ঘটেনি। আমরা করোনাকালে কতরকম বৈরী পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছি তা সচেতন মানুষমাত্রই অবগত। অব্যবস্থাপনা, অদূরদর্শিতার ফলে নেতিবাচক চিত্র তো ওই সময় বহুবারই দেখা গেছে, একইসঙ্গে অনিয়ম-দুর্নীতির একের পর এক ঘটনা এ প্রশ্নও দাঁড় করিয়েছিল, অপশক্তির খুঁটির জোরের উৎস কোথায়? সরকার প্রতিকারমূলক পদক্ষেপ নেয়নি তা নয়, কিন্তু তারপরও অনিয়ম-দুর্নীতি বন্ধ হয়নি। আমাদের সামর্থ্যরে জোর অনেক কম। নানারকম সীমাবদ্ধতা আমাদের অনেক অতিপ্রয়োজনীয় কাজের ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতার দেয়াল দাঁড় করিয়েছে। এর মধ্যে যদি অনিয়ম-দুর্নীতির অপছায়া থাকে তাহলে আশা দুরাশায় পরিণত হবে এটাই স্বাভাবিক। আমরা অনেক ক্ষেত্রেই এই অনাকাঙ্ক্ষিত বৃত্তবন্দি হয়ে পড়ছি।


আমরা জানি, স্বাস্থ্য খাত স্পর্শকাতর খাতগুলোর মধ্যে অন্যতম একটি খাত। দেশের সিংহভাগ মানুষের পক্ষে যথাযথ স্বাস্থ্যসেবা পাওয়ার পথটি এখনও মসৃণ নয়। এর মধ্যে বেসরকারিভাবে স্বাস্থ্যসেবার নামে অধিকাংশ ক্ষেত্রে চলছে রমরমা বাণিজ্য। তা ছাড়া ভুল চিকিৎসা কিংবা নকল ওষুধের ছড়াছড়ির যেসব সংবাদ সংবাদমাধ্যমে প্রায়ই দেখা যায় তা উদ্বেগের মাত্রা আরও বাড়িয়ে দেয়। স্বাস্থ্যসেবাপ্রাপ্তি মানুষের মৌলিক অধিকার। কিন্তু এ নিয়ে অসাধুদের নৈরাজ্যের পেছনে নানা শক্তি যে ইন্ধন জোগায় সময়-সুযোগে, এরও অনাকাক্সিক্ষত নজির কি আমাদের সামনে নেই? অতীতে সংবাদমাধ্যমেই এও জানা গেছে, দেশের দুর্নীতিগ্রস্ত খাতগুলোর মধ্যে স্বাস্থ্য খাত অন্যতম। অতীতে অবনতিশীল ডেঙ্গু পরিস্থিতির সুযোগও অসাধুরা নানাভাবে নিয়েছিল, যেমনটি নিয়েছিল করোনা দুর্যোগে। দেশের স্বাস্থ্য খাতের নানা ব্যর্থতা আছে। ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতা আরও প্রকট। দায়িত্বশীলরা যত অজুহাতই দাঁড় করান না কেন, ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে তারা যে ব্যর্থ, বিদ্যমান পরিস্থিতি এরই সাক্ষ্যবহ। প্রতিকারের চেয়ে প্রতিরোধ ভালোÑএ কথাটি আমরা প্রায়ই বলে থাকি। কিন্তু মুখে যতই বলি না কেন, বাস্তবে তা প্রয়োগ করি না। কোনো কোনো রোগ বা আপদ-বিপদ আমাদের বিবেক-বুদ্ধিকে নাড়া দিয়ে যায়, আতঙ্কিত করে।


ডেঙ্গুর কথাই ধরা যাক। এ রোগের প্রতিকার ও প্রতিরোধে কমবেশি সবই দায়িত্বশীলরা জানেন। জানেন মশার ওষুধ ছিটানো এ ক্ষেত্রে জরুরি। কিন্তু যতই ওষুধ ছিটানো হোক আর কামান দাগানো হোক, মশা মরবে সামান্য ও সাময়িককালের জন্য। এটা চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত নয়। কয়েকদিন পর আবার মশা হবে। আবার ডেঙ্গু হবে। মানুষ মরবে। মশা মারার জন্য আমরা ওষুধ ছিটানোর কথা বলছি। কিন্তু মশা প্রতিরোধের জন্য আমাদের পরিবেশ সংরক্ষণের কথা সেভাবে কি বলা কিংবা কাজ করা হচ্ছে? প্রশ্ন হচ্ছে, কর্তৃপক্ষই বা কী করছে?


ঢাকা শহরসহ পুরো দেশটাকে নোংরা, আবর্জনাময় ও অস্বাস্থ্যকর করার পেছনে আমাদের সবার কমবেশি অবদান রয়েছে। আমি বলি না হাজারও চেষ্টা করেও মশামুক্ত পরিবেশ সৃষ্টি করা যাবে। কিন্তু মনে করি আমরা সচেষ্ট হলে, যুক্তিসঙ্গত আচরণ করলে, বিবেক-বুদ্ধি খাটালে, এত বেশি স্বার্থপর না হলে, অন্যের সুবিধা-অসুবিধার প্রতি মমত্ববোধ থাকলে, পরিবেশ সংরক্ষণের মাধ্যমে স্বাস্থ্যসচেতন হলে পরিস্থিতি অনেক নিয়ন্ত্রণে থাকত।


পরিবেশের সুরক্ষা কিংবা পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কাজটি তো এক বা দুই দিনের নয়, এটি বছরের ৩৬৫ দিনই করতে হবে। তা ছাড়া আমাদের এখানে অনেক দায়িত্বশীল কিংবা বড় পদে অধিষ্ঠিতরাই যেখানে কাজের কাজ করেন না, সেখানে ছোটদের কথা কী আর বলার আছে। যারা মশার ওষুধ ছিটান, তাদের প্রশিক্ষণের অভাব রয়েছে। অভাব রয়েছে পরিস্থিতি বোঝার মতো জ্ঞানের। মশা নিধনের নামে এ পর্যন্ত কত টাকা খরচ হলো এর হিসাব মেলানো ভার, কিন্তু সুফল নেই। নিম্নমানের ওষুধ, মশার ওষুধ কেনা ও ব্যবহার নিয়ে দুর্নীতি ইত্যাদিও কম হয়নি। দুর্নীতির ডালপালা ছড়ানো। এর অপছায়া নানা দিকে। স্বাস্থ্য খাত নিয়ে সরকারের নানারকম ইতিবাচক উদ্যোগ এসব কারণে প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে। এই সরকারের অর্জনের খতিয়ান কম দীর্ঘ নয়। কিন্তু যাদের কারণে সরকারের অর্জনের বিসর্জনের পথ তৈরি হচ্ছে তাদের বিরুদ্ধে সাঁড়াশি অভিযান চলমান নয় কেন এও প্রশ্ন।  


আমরা অনেকেই জানি, একাদশ জাতীয় সংসদের ১৮তম অধিবেশনের প্রথম দিনে প্রশ্নোত্তর পর্বে অংশ নিয়ে দেশের স্বাস্থ্য খাতের বেহাল দশা নিয়ে ক্ষোভ ও অসন্তোষ প্রকাশ করেন সরকার এবং বিরোধী দলের সংসদ সদস্যরা। তারা বলেছেন, বর্তমান সরকারের একটানা ১৩-১৪ বছরের শাসনামলেও দেশের তৃণমূল পর্যায়ের স্বাস্থ্য খাতের বেহাল দশার চিত্র খুব একটা বদলায়নি। কবে নাগাদ বদলাবেÑতাও কেউ জানে না। সংসদ সদস্যরা আরও বলেন, অবকাঠামোগত ব্যাপক উন্নয়ন হচ্ছে। নতুন নতুন দৃষ্টিনন্দন ভবন হচ্ছে। কিন্তু দক্ষ এবং প্রয়োজনীয় জনবল না থাকায় তৃণমূলের মানুষ এর সুফল ভোগ করতে পারছে না। দেশের আইনপ্রণেতাদের এমন বক্তব্য অবশ্যই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।


দেশের গরীব জনগণ টাকার অভাবে উন্নত চিকিৎসা নিতে ব্যর্থ হবেঅন্যদিকে স্বাস্থ্য খাতের কিছু লোক দুর্নীতির মাধ্যমে ফুলে-ফেঁপে উঠবেÑএটা হতে পারে না। 


এই আলোচনাও নানা মহলে ইতোমধ্যে বহুবার হয়েছে, স্বাস্থ্য খাতে জনস্বাস্থ্যকে গুরুত্ব দিয়ে একটি ব্যবস্থাপনা কাঠামো গড়ে তোলা খুব প্রয়োজন। যুগোপযোগী একটা কাঠামো কেমন হওয়া উচিত এবং ওই ব্যবস্থায় কী ধরনের পেশাদারি দক্ষতা ও প্রশিক্ষণ প্রয়োজন, তার উত্তর খুঁজতে হবে। এ জন্য বিভিন্ন দেশের মডেল তো আছেই, প্রয়োজনে আরও অনুসন্ধান চালানো যেতে পারে। তবে এটিও মনে রাখা জরুরি, এসব নিয়ে কথা এ পর্যন্ত কম হয়নি, কিন্তু কাজের কাজ হয়নি কাঙ্ক্ষিত মাত্রায়। সাধারণ মানুষ এত কিছু শুনতে কিংবা জানতে চায় না, তারা তাদের অধিকার ভোগ করতে চায় প্রতিবন্ধকতাহীনভাবে। স্বাস্থ্য খাতের অনিয়ম-দুর্নীতির ব্যাপারে নিকট অতীতে দুর্নীতি দমন কমিশন যে সুপারিশ করেছিল তাও আমলে রাখা জরুরি। সর্বাগ্রে জরুরি সুশাসন। সুশাসনের আলো যত ছড়াবে জনকল্যাণও ততই নিশ্চিত হবে। সরকারকে কঠোর থেকে কঠোরতর অবস্থান নিতে হবে। দেশের গরীব জনগণ টাকার অভাবে উন্নত চিকিৎসা নিতে ব্যর্থ হবে, অন্যদিকে স্বাস্থ্য খাতের কিছু লোক দুর্নীতির মাধ্যমে ফুলে-ফেঁপে উঠবেÑএটা হতে পারে না। আজ যে ডেঙ্গু ফের ভয়ঙ্কর রূপ নিয়েছে এবং এখনও তা দেশের জনস্বাস্থ্যের জন্য দুশ্চিন্তার ভাঁজ কপালে ফেলছে, তা সামগ্রিকভাবে স্বাস্থ্য খাতের ব্যর্থতারই অংশ।


আমরা চাই, সরকারের অঙ্গীকার-প্রতিশ্রুতির যেন বাস্তবায়ন হয় পূর্ণাঙ্গভাবে। এ জন্য এই খাতটির পাল্টাতে হবে খোলনলচে। সমস্যাগুলো অচিহ্নিত নয়। নিজ নিজ ক্ষেত্রে সবাই দায়িত্বশীলতা, স্বচ্ছতা, দায়বদ্ধতা ও জবাবদিহির পরিচয় দিলে সমস্যা নিরসন না হওয়ার কারণ নেই। দায়িত্বশীলরা যেন অতীত ভুলে না যান। অনস্বীকার্য, দেশে শিশু ও মাতৃমৃত্যুর হার কমেছে, জন্মনিয়ন্ত্রণ করা অনেকটাই সম্ভব হয়েছে, টিকাদান কর্মসূচি গতি পেয়েছে ইত্যাদি। দেশের প্রান্তিক অঞ্চলের জনসাধারণের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার জন্য সরকার কমিউনিটি ক্লিনিক স্থাপন করেছে। কিন্তু এত কিছুর পরও সবার জন্য সহজলভ্য ও মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা যাচ্ছে না। কারণ স্বাস্থ্য খাতে পরিকল্পনা বাস্তবায়নে ব্যবস্থাপনায় ঘাটতি রয়েছে। স্বাস্থ্যসেবাকে জনগণের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে হলে অনিয়ম-অব্যবস্থাপনা দূর করতেই হবে। তা হলেই সাধারণ মানুষের স্বাস্থ্যসেবার ব্যয় ও ভোগান্তি অনেকটাই কমবেÑএমন আশা করা যায়।

 

লেখক : অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক, ক্লিনিক্যাল ফার্মাসি ও ফার্মাকোলজি বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা