সম্পাদকীয়
সম্পাদকীয়
প্রকাশ : ১৭ মার্চ ২০২৪ ১১:৪৫ এএম
বাবা-মায়ের কাঁধে
সন্তানের লাশের চেয়ে ভারী আর কিছু হতে পারে না। শুভবোধসম্পন্ন সবার কাছেই কোনো কোনো
ঘটনা কতটা দুর্বহ হতে পারে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী ফাইরুজ অবন্তিকা এরই দুঃসহ
স্মারক। শুধু বিশ্ববিদ্যালয় নয়, সামগ্রিকভাবে দেশের শিক্ষাঙ্গন কতটা বন্যদের অভয়ারণ্য
হয়ে উঠেছে এর মর্মস্পর্শী নজির সম্প্রতি পরপর কয়েকটি ঘটনার মধ্য দিয়ে অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে
প্রতীয়মান হয়। ১৬ মার্চ ‘প্রতিবাদী অবন্তিকার করুণ সমাপ্তি’ শিরোনামে প্রতিদিনের বাংলাদেশ-এ
প্রকাশিত প্রতিবেদনে যে তথ্য উঠে এসেছে তা আমাদের যেমন চরম বেদনাকাতর করেছে তেমনি করেছে
ক্ষুব্ধও। বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন ছাত্রী তার ওপর যৌন নিপীড়নের অভিঘাত সইতে না পেরে স্বেচ্ছামৃত্যুর
পথ অবলম্বন করে ফের জানিয়ে গেলেন, নির্যাতনের অন্ধকারে নিমজ্জিত রয়েছে দেশের সব স্তরের
শিক্ষাঙ্গন। সম্প্রতি ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজ এবং ঢাকা, জাহাঙ্গীরনগর ও
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক আর সমাজবিরোধীদের দ্বারা যৌন নিপীড়নের প্রেক্ষাপটে
সমাজে চলমান ক্ষোভের মধ্যেই জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী প্রক্টর দ্বীন ইসলাম ও
অবন্তিকার সহপাঠী আম্মান সিদ্দিকীর বিরুদ্ধে অভিযোগ জানিয়ে নিভে গেছে সম্ভাবনাময় একটি
জীবনের আলো!
নিপীড়ন-নির্যাতন
ভয়াবহতার কোন পর্যায়ে পৌঁছালে সমাজমাধ্যম ফেসবুকে পোস্ট দিয়ে একজন ছাত্রী আত্মহননের
পথ বেছে নেন, এর ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ নিষ্প্রয়োজন। অবন্তিকার পোস্টে স্বেচ্ছামৃত্যুর
আগে তিনি যে বিবরণ দিয়ে গেছেন তাতে আমরা ফের প্রশ্ন রাখতে চাইÑশিক্ষাঙ্গন কি নিপীড়কের
চারণভূমি হয়েই থাকবে? তবে আমরা জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. সাদেকা
হালিমকে সাধুবাদ জানাই, অভিযুক্ত সহকারী প্রক্টর দ্বীন ইসলামকে সাময়িক বরখাস্তের নির্দেশ
দেওয়ার পাশাপাশি প্রতিবিধানের পরবর্তী পদক্ষেপের ব্যাপারেও তিনি তার কঠোর অবস্থানের
জানান দিয়েছেন। অবন্তিকার মা তার আত্মহননের জন্য আরও ছয়জনকে দায়ী করেছেন। একই দিন প্রতিদিনের
বাংলাদেশ-এর অনলাইন সংস্করণে বলা হয়েছে, তার মা তাহমিনা শবনম অভিযোগ করেন, আরও যারা
অবন্তিকাকে আত্মহননের পথে ঠেলে দিতে বাধ্য করে ওই ছয়জনই অবন্তিকার সহপাঠী। বিশ্ববিদ্যালয়
কর্তৃপক্ষকে বারবার জানিয়েও হয়রানির বিচার পাননি তারা, এ অভিযোগও তিনি করেন।
শিক্ষা যদি জাতির
মেরুদণ্ড হয় তাহলে নিঃসন্দেহে শিক্ষাঙ্গন সেই মেরুদণ্ড তৈরির উর্বর জমিন। কিন্তু দুঃখজনকভাবে
লক্ষ করা যাচ্ছে, প্রায় সব স্তরের শিক্ষাঙ্গনেই যৌন নিপীড়ন-নির্যাতনের মতো ভয়াবহ অপরাধ
ক্রমেই বাড়ছে। শিক্ষাক্ষেত্রে ছাত্রীদের নিগ্রহ এবং নিগ্রহকারী হিসেবে শিক্ষকের নাম
উঠে আসা শুধু গভীর উদ্বেগেরই নয়, একই সঙ্গে প্রশ্ন জাগেÑশিক্ষাঙ্গন কেন কদাচারের চারণভূমি
হয়ে উঠেছে? অনেক ক্ষেত্রেই আমাদের অভিজ্ঞতায় আছে, গলদ রয়েছে গোড়ায় এবং শিক্ষাঙ্গন কলুষিত
করার হোতারা প্রতিপালিত হন বটবৃক্ষের ছায়ায়! নিপীড়ন-নির্যাতনের অন্ধকারে শিক্ষাঙ্গন
নিমজ্জিত হবে এমনটি কোনো সভ্য কিংবা মানবিক সমাজে মেনে নেওয়া যায় না। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে
যৌন নিগ্রহের মতো ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে নানা পর্যায়ে সরব প্রতিবাদের পরও এমন ঘটনা শুধু
মূল্যবোধের চরম অবক্ষয়ের বিষয়টিই সামনে আনে না, একই সঙ্গে নিরাপত্তাহীনতার ছায়া কতটা
ভয়াবহভাবে সর্বব্যাপী হয়ে পড়েছে এরও সাক্ষ্য দেয়। সমাজের বিভিন্ন পর্যায় থেকে এমন পরিস্থিতির
পরিপ্রেক্ষিতে সামাজিক অনুশাসনের পাশাপাশি দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তনের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।
কিন্তু আমরা মনে করি, এটুকুই যথেষ্ট নয়। যে ভয়াবহ ব্যাধির সংক্রমণ শিক্ষাঙ্গনের মতো
জাতি গঠনের উর্বর ক্ষেত্র সংক্রমিত করেছে এর একমাত্র প্রতিবিধান সুশাসন নিশ্চিত করা।
আমরা জানি, সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যৌন নিপীড়ন বিরোধী কমিটি গঠনে উচ্চ আদালতের নির্দেশনা
রয়েছে। কিন্তু এর অগ্রগতি কতটুকু তাও সচেতন কারওই অজানা নয়। নিকট অতীতে এক সমীক্ষায়
প্রকাশ, যৌন হয়রানির চাপা কষ্ট নিয়েই শেষ হয় অনেক ছাত্রীর শিক্ষাজীবন এবং ৯০ শতাংশ
ভুক্তভোগীই মানসম্মান কিংবা বলবানদের ভয়ে মুখ খোলেন না। আরও অভিযোগ আছে, শিক্ষাঙ্গনে
যৌন হয়রানির অনেক বিষয় রাজনৈতিক প্রভাবেও চাপা পড়ে যায়।
আমরা জানি, নারী
শিক্ষায় নিরন্তর উৎসাহদানের নানানরকম কর্মসূচি সরকারের তরফে চলমান সত্ত্বেও শিক্ষাঙ্গনছুট
ও বাল্যবিবাহ ঘটেই চলেছে। এমনকি উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার ক্ষেত্রে গবেষকদের সাফল্য অনেকটাই
নির্ভর করে নির্দেশকের আত্মতুষ্টির ওপর। কোনো কোনো ক্ষেত্রে চাকরির ব্যাপারেও তাদের
প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ প্রভাব থাকে, এমন অভিযোগও কম নয়। নিপীড়ন-নির্যাতনের শিকার অনেককেই
দোষারোপের মুখে পড়তে হয় এমন খবরও সংবাদমাধ্যমে ইতোমধ্যে কম আসেনি। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান
এবং কোনো কোনো পরিবারেও এ প্রবণতা লক্ষ করা যায়। এমনকি রাজনৈতিক চাপান-উতরের পাশাপাশি
প্রযুক্তির মাধ্যমে শুরু হয় কুৎসিত ট্রলও। এর সঙ্গে ক্যারিয়ারের অনিশ্চয়তা তো আছেই।
অতীতের যেকোনো সময়ের তুলনায় দেশে নারীর উন্নয়ন-অগ্রগতি অনেকটা বেশি পরিলক্ষিত হলেও
একই সঙ্গে অন্ধকারের ছায়াও কতটা প্রলম্বিত এরও ফিরে ফিরে সাক্ষ্য মিলছে একেকটি কদর্য
ঘটনায়।
আমরা অবন্তিকার
আত্মহননের উৎসে নজর দিয়ে দ্রুত এর দৃষ্টান্তযোগ্য প্রতিবিধান চাই। শিক্ষাঙ্গন থেকে
নিপীড়কদের মূলোৎপাটন করতেই হবে। দৃষ্টান্তযোগ্য প্রতিকারের পাশাপাশি গড়ে তুলতে হবে
প্রতিরোধও। একই সঙ্গে সন্ধান করতে হবে শিক্ষাঙ্গন অনাচার-দুরাচার-অপরাধের অভয়ারণ্য
করে তুলছে কারা। আমরা দেখতে চাই, যথাযথ প্রতিকারের মধ্য দিয়ে অন্ধকারের ছায়া সরাতে
শিক্ষাঙ্গন কর্তৃপক্ষ তো বটেই, রাষ্ট্রের দায়িত্বশীল সব পক্ষ যথাযথ তৎপর হয়ে উঠেছে।
সমাজবিরোধী কিংবা অভিযুক্তকে নানাভাবে সুরক্ষা দেওয়ার অপনজির কম নেই। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে
যৌন নিপীড়করা কী কারণে এতটা বেপরোয়া হয়ে উঠেছে এবং এ কাতারে শিক্ষকদের হার ক্রমাগত
কেন বাড়ছে, এরও উৎস সন্ধান করতে হবে। নিপীড়নের ঘটনা শিক্ষাঙ্গনকে নিশ্চয়ই বিব্রতকর
পরিস্থিতির মুখে ঠেলে দিচ্ছে কিন্তু এর চেয়েও জরুরি প্রশ্ন হলো, সমাজে-শিক্ষাঙ্গনে
ব্যাধির সংক্রমণ কী কারণে এত উদ্বেগজনক পর্যায়ে গিয়ে ঠেকেছে। সব স্তরে নারীকে তার প্রাপ্য
মর্যাদা নিশ্চিত করার পাশাপাশি যৌন নিপীড়ন কিংবা ধর্ষণসহ নারীর প্রতি সহিংসতার যেকোনো
অপরাধ সংঘটনের খবর মিললেই দ্রুত তদন্ত করে অভিযুক্তদের বিচার নিশ্চিত করতে হবে।