× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

ফিলিস্তিন সংকট

ইসরায়েলের পৃষ্ঠপোষকরাও এখন শঙ্কিত

ডেভিড হার্স্ট

প্রকাশ : ১৭ মার্চ ২০২৪ ১১:০৪ এএম

ডেভিড হার্স্ট

ডেভিড হার্স্ট

বাচ্চা ছেলেটার বাচনভঙ্গি এখন প্রাপ্তবয়স্কদের মতো। ফয়সাল আল খালিদি আলারাবি টিভির প্রতিবেদককে সাক্ষাৎকার দেওয়ার সময় সে জানাচ্ছিল, গাজা শহরের শেখ রেদওয়ান এলাকায় ইসরায়েলি সেনারা এসে কীভাবে তার মাকে গুলি করে। সে বলে, ‘আমি স্কুলে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম। ইসরায়েলি সেনারা দরজা ঠেলে ঘরে ঢুকে পড়ে। ওরা আমার মায়ের পেটে গুলি করে। আমার মা সাত মাসের অন্তঃসত্ত্বা’। ছেলেটিকে জিজ্ঞেস করা হয়, ‘তোমার বাবা কোথায় ছিলেন?’ উত্তর আসে, ‘ঘুমাচ্ছিলেন। তাকে ঘুম থেকে জাগিয়ে করিডরে নিয়ে যাওয়া হয়। তারপর মার মতো গুলি করে মেরে ফেলে।’ আলারাবি টিভির প্রতিবেদক জিজ্ঞেস করেন, ‘তোমার চোখের সামনেই এসব ঘটেছে?’ ছেলেটির উত্তর, ‘হ্যাঁ।’


সম্ভবত রাব্বি এলিয়াহু মালির নির্দেশনাই ইসরায়েলি সেনারা অনুসরণ করছে। ইয়াফফা ইহুদি স্কুলের প্রধান বলেছিলেন, ‘আমাদের পবিত্র মিতজভাহ যুদ্ধের পথে জীবন পরিচালনা করতে হবে। গাজার কাউকে বেঁচে থাকতে দেওয়া যাবে না। আমাদের বক্তব্য এখানে স্পষ্ট। হয় মারো, না হয় ওদের হাতে একদিন মরো। আজকের জঙ্গিরা বিগত দিনের শিশু। বাস্তবে নারীরাই জঙ্গিদের জন্ম দেয়। তাই গাজায় কাউকে বেঁচে থাকতে দেওয়া যাবে না।’ তার বক্তব্য যেন বলছে, তোরাতে শিশু আর নারীদের হত্যা করার বিধান রয়েছে। তাহলে বয়স্ক মানুষের ক্ষেত্রে কী বলছে তার ধর্মগ্রন্থ? এ ক্ষেত্রেও তার কোনো দ্বিধা নেই। একজন প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তি যেকোনো সময় অস্ত্র ধারণ করতে পারে। আর ইসরায়েলকে ধ্বংস করার জন্য সবাই মুখিয়েই রয়েছে, মালির এমনটিই ধারণা। তিনি বলেছেনও, ‘তোরা যা বলেছে তার বাইরে যাওয়ার চেষ্টা কোরো না।’

সম্ভবত মালির এ নির্দেশনার পরই ইসরায়েলি সেনারা বধির ও মূক এক বৃদ্ধকে হত্যা করে উল্লাসে ফেটে পড়ে। এক সেনা তো টেলিভিশনের সামনে গর্ব করে জানায়, ‘আমি চারটি বুলেট ঠুকে দিয়েছি ওর গায়ে। এইযে এভাবে…।’ ৭৫ বছর ধরে পশ্চিমা দুনিয়া এ বিষয়টিকে যেভাবে দেখত এখন আর সেভাবে দেখতে পারছে না। ইসরায়েলের পশ্চিমা পৃষ্ঠপোষকরা ফিলিস্তিনে সংঘটিত হত্যাকাণ্ড এবং নৃশংসতা দেখে নিজেরাও শঙ্কিত হয়ে পড়েছে। অন্তত পাঁচ মাস আগেও পশ্চিমা দেশগুলো ইসরায়েলের কর্মকাণ্ড সঠিক বলে রায় দিত। কিন্তু ইসরায়েলি সেনারা প্রতিনিয়ত একের পর এক নৃশংস ঘটনা ঘটিয়ে চলেছে। গাজার মানুষের কাছে ত্রাণ পৌঁছাতে পারছে না। তাদের সঙ্গে কৌতুকচ্ছলে হেলিকপ্টার থেকে আরবিতে কিছু লিফলেট ছিটিয়েছে। লিফলেটে লেখা, ‘ক্ষুধার্তকে খাবার দিন’। ত্রাণের জন্য অপেক্ষারত ৪০০ মানুষকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছে। এত কিছু করার পর ইসরায়েল সহজে পার পেয়ে যাবে এমনটি ভাবার কোনো কারণ নেই। এ যুদ্ধের মাধ্যমে ইসরায়েল অন্ত্যজ রাষ্ট্র হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। ইসরায়েল ক্ষমার অযোগ্য একটি রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে। উদারপন্থি জায়নবাদ বর্তমানে বিতর্কের বিষয়। ইসরায়েল যেন শ্বেতাঙ্গ অভিমানের জ্বলজ্যান্ত প্রতিভূ হয়ে দাঁড়াচ্ছে। অতীতে ইহুদিদের ওপর নির্যাতন-নিপীড়নের দোহাই দিয়ে করা এ নৃশংস ঘটনাগুলোর সমর্থন সমগ্র বিশ্বে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা ইহুদিদেরও নেই।

‘নট ইন মাই নেম’ নামক এক আন্দোলনে প্রতি সপ্তাহান্তে লন্ডনে হাজারো ইহুদি তরুণ মিছিল করছে। তারা গাজায় অমানবিক এ যুদ্ধ বন্ধের আন্দোলন করছে। ইহুদি অত্যাচারের অতীত ইতিহাসের অজুহাতে বর্তমানে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হাসিলের পক্ষে নেই কোনো ইহুদি। ইসরায়েলের বর্তমান নীতিনির্ধারকরা সঙ্গত কারণেই চিন্তিত। পরবর্তী প্রজন্মের মার্কিন ও ব্রিটিশ ইহুদিরা বর্তমান নেতৃত্ব নিয়ে খুব একটা সন্তুষ্ট নয়। বিগত আট দশকে যুক্তরাষ্ট্র ও ব্রিটেন থেকে অভিবাসন করা ইহুদিদের মাধ্যমে ইসরায়েল রাষ্ট্র তার ক্ষমতার অস্তিত্ব ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছে। কিন্তু এ অভিবাসন অনুমোদন যতই কমবে ততই পশ্চিমা মহলে ইসরায়েলের গুরুত্ব কমতে শুরু করবে। ইসরায়েলের কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে যখন খোদ ইহুদিরাই সোচ্চার হয়ে ওঠে তখন আর বিষয়টির পক্ষে সমর্থন ধরে রাখা সহজ থাকে না। ব্রিটেনকে যেন দক্ষিণ আফ্রিকা পথ দেখাচ্ছে। যুদ্ধ শেষে যখন ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর সদস্য ফিরবে তখন তাকে প্রথমে বিচারপ্রক্রিয়ার মুখোমুখি হতে হবে। কাজটি দ্রুতই সম্পন্ন হবে না। কিন্তু পশ্চিমের গুরুত্বপূর্ণ শক্তিধর রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে ইসরায়েলের আঁতাত অনেকাংশে কমে যাবে, এ কথা নিশ্চিত বলা যায়। টোরি কিংবা শ্রমিক রাজনৈতিক সংগঠনের নেতারা এখন ইসরায়েলের সঙ্গে সুসম্পর্ক রাখার চেষ্টা করেন। পার্লামেন্ট পার্টিতে তাহলে শক্তিশালী অবস্থানে যাওয়া যায়। কিন্তু পরবর্তী প্রজন্মের রাজনীতিবিদদের ক্ষেত্রে এ কথা বলা যাবে না।

ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনজামিন নেতানিয়াহু এ যুদ্ধ যত দিন সম্ভব চালিয়ে রাখতে চাচ্ছেন। ওয়ার ক্যাবিনেটের দুজন সদস্য ইতোমধ্যে নেতানিয়াহুর একাধিক সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধাচরণ করেছেন। প্রথম বিরুদ্ধাচরণকারী ইয়ুয়াভ গ্যালান্ট যিনি কি না ইসরায়েলের বর্তমান প্রতিরক্ষামন্ত্রী। ইসরায়েলের সমরনায়কের স্বাধীনতাও কম। হামাস ও ইসরায়েলের মধ্যকার ক্ষমতার ফারাকও স্পষ্ট নয়। গাজায় ইসরায়েলের অভিযানে হামাসের ক্ষমতা কিছুটা হলেও কমেছে। কিন্তু সংগঠনটির কর্মীরা দোহা আর বৈরুতে অবস্থিত তাদের রাজনৈতিক ঘাঁটিতে বার্তা পাঠিয়েছে, এ যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার মতো সক্ষমতা তাদের রয়েছে।

ইসরায়েল-গাজা সংকটের একটি ইতিবাচক পরিণতিও রয়েছে। ইসরায়েলের নাগরিকরা হামাসের কাছে জিম্মি। ইসরায়েলে বন্দি থাকা ফিলিস্তিনিদের সঙ্গে বন্দিবিনিময়ের বিষয়ে আলাপ হচ্ছে। সাম্প্রতিক বন্দিবিনিময়ের তালিকায় থাকা ব্যক্তিরা হচ্ছেন মারওয়ান বারঘোতি, ফাতাহর এই নেতা ৪০ বছর ধরে ইসরায়েলের কারাগারে। পপুলার ফ্রন্টের সেক্রেটারি জেনারেল আহমেদ সাদাতও রয়েছেন। এ ছাড়া রয়েছেন হামাসের সামরিক নেতা আবদুল্লাহ বারঘোতি। এ তিনজনের একজনও যদি মুক্তি পান তাহলে ফিলিস্তিনের নেতৃত্বে বড় পরিবর্তন আসবে। অর্থাৎ প্যালেস্টাইন অথরিটির কার্যক্রমও বন্ধ হবে।

নেতানিয়াহুর সবচেয়ে বড় দুর্বলতা, তিনি পশ্চিমা নেতাদের সঙ্গে সুসম্পর্ক ধরে রাখতে জানেন না। এ যুদ্ধ থামলেও ইসরায়েলের ক্ষতির পরিমাণ কমবে না। পাঁচ মাস আগে যুদ্ধ থামাতে পারলে যতটুকু ক্ষতি এড়ানো যেত তার চেয়ে বেশি ক্ষতির মুখোমুখি হতে হবে তাদের এখন। ৭ অক্টোবরের পর বাইডেন ইসরায়েলকে যুদ্ধ পরিচালনার সবুজসংকেত দিয়েছিলেন। কিন্তু সম্প্রতি বাইডেন নিজে ভোটারদের প্রতিক্রিয়াও জানতে পেরেছেন। গাজা পরিস্থিতি সামলানোর ক্ষেত্রে তার ভূমিকা এখনই প্রশ্নবিদ্ধ। সম্ভবত নভেম্বরের ভোটেও তিনি বিপর্যয়ের মুখে পড়তে চলেছেন এ একটি সিদ্ধান্তের জন্য। সিনেটেও কিছুটা বদল এসেছে। সমগ্র বিশ্বে ঘৃণার পাত্র হয়ে উঠলে ইসরায়েলকে সমর্থন দেওয়া মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষেও কঠিন। শুমারের মতে, নেতানিয়াহু নিজের রাজনৈতিক স্বার্থ প্রাধান্য দিতে গিয়ে জাতীয় স্বার্থ বিঘ্নিত করছেন। পশ্চিমে ইসরায়েল জনসমর্থন হারিয়েছে। বিশেষত পশ্চিমা ইহুদিদের প্রতিবাদই বলে দেয়, এ যুদ্ধে ইসরায়েল কত ভুল করেছে।

  • সম্পাদক, মিডল ইস্ট আই

মিডল ইস্ট আই থেকে সংক্ষেপিত অনুবাদ : আমিরুল আবেদিন

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা