রাজনীতি
ড. ফরিদুল আলম
প্রকাশ : ১৬ মার্চ ২০২৪ ১৩:০২ পিএম
ড. ফরিদুল আলম
দ্বাদশ জাতীয় নির্বাচন শেষে সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের দুই মাস
অতিক্রান্ত হয়েছে। এই সময়ের মধ্যে আমরা দেখছি সরকারের গুরুত্বপূর্ণ কিছু
মন্ত্রণালয়ে যেমন পরিবর্তন হয়েছে, বৈদেশিক সম্পর্কের ক্ষেত্রেও সরকার গুরুত্বপূর্ণ
দেশগুলোর সঙ্গে আস্থার সংকট উতরে আবারও একটা শক্ত অবস্থায় দাঁড়িয়েছে। সবকিছু
সরকারের অনুকূলে কাজ করছে বলেই দৃশ্যমান এখন। তারপরও আমাদের রাজনীতি নিয়ে কথা থেকে
যায়। সরকার যেমন সরকারের কাজ করে যাচ্ছে, একই রকমভাবে সরকারের বিরোধীরা, যাদের
জনগণের কাছে একধরনের দায়বদ্ধতার বিষয় রয়েছে, তারা কীভাবে এই দায়বদ্ধতার জায়গায় থেকে
কাজ করছেন তাও দিন শেষে আমাদের জন্য এক গুরুত্বপূর্ণ ভাবনার বিষয় হয়ে দাঁড়ায়। দেশে
সরকারি দল যখন রাজনৈতিকভাবে অপ্রতিরোধ্য থাকে তখন তাদের ভেতর থেকেই সরকারের জন্য
অনেক বিষয় অস্বস্তিকর হয়ে দাঁড়ায়। দিন শেষে এর দায়ভার সরকারের ওপর বর্তালেও সচেতন
ভাবনা থেকে আমরা এ কথাও বলতে পারি, এটা সামগ্রিকভাবে আমাদের রাজনীতির দায়বদ্ধতারই
অংশ।

গত বছর সরকারবিরোধী অবস্থান এবং এ থেকে একপর্যায়ে
নাশকতামূলক কাজে জড়িয়ে পড়ার দায়ে প্রধান বিরোধী দল বিএনপির গুরুত্বপূর্ণ বেশ কিছু
নেতাকে গ্রেপ্তার করে কারাগারে পাঠানো হয়। সাম্প্রতিক সময়ে তাদের প্রায় সবাই
জামিনে মুক্ত হয়ে আবারও সরকারবিরোধী অবস্থানে সক্রিয় হয়ে একই সঙ্গে দলকে চাঙ্গা
করতে এবং ভবিষ্যতের আন্দোলনের রূপরেখা ঠিক করতে কাজ শুরু করেছেন। তবে আন্দোলনের
গতি-প্রকৃতি যদি আবারও আগের মতো ভুলের বৃত্তে আবর্তিত হয়, তাহলে দলের সাধারণ
নেতাকর্মী এবং দেশের সাধারণ মানুষের জন্য তা হতাশার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। সাম্প্রতিক
সময়ে আমরা লক্ষ করলাম কারামুক্ত বিএনপি রমজান মাস থেকে সরকারবিরোধী নানা কর্মসূচি
শুরু করতে যাচ্ছে। এর বাইরে যে বিষয়টি আমরা প্রায়শই লক্ষ করছি সেটা হলো, তারা খুব
ঘন ঘন বিদেশি রাষ্ট্রদূতদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করছেন। প্রথমত দলের সক্ষমতা যাচাই না
করে রমজান মাসকে আন্দোলনের জন্য বেছে নেওয়ার বিষয়টি কতটুকু যুক্তিযুক্ত, দ্বিতীয়ত
সরকারবিরোধী অবস্থান শক্তিশালী করতে তারা এখনও বিদেশিদের শরণাপন্ন হচ্ছেন তা-েই বা
কতটা নৈতিক? এই দুটি বিষয় থেকে বোঝা যাচ্ছে যে তারা তাদের আন্দোলনের কৌশলে কোনো
পরিবর্তন আনেনি, বরং পুরোনো ধাঁচেই তা পরিচালনা করতে যাচ্ছেন। যদি এই হয় বাস্তবতা,
তাহলে যা হবে তা হলো পুরোনো সব ঘটনার ধারাবাহিকতা, যার মধ্য দিয়ে আন্দোলন একের পর
এক ব্যর্থতায় পর্যবসিত হবে, নিজেদের দলীয় অবস্থান দুর্বল হবে, সাংগঠনিক অবস্থা ভেঙে
পড়বে।
বিএনপির আন্দোলনের ব্যর্থতা সার্বিক অর্থে আমাদের
গণতন্ত্রের জন্যও ক্ষতিকর। তারা যত দুর্বল হবে, সরকার এবং সরকারি দলের অবস্থান ততই
শক্ত হবে। সরকারের রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে কোনো ধরনের চাপ থাকবে না, দলীয়
দৃষ্টিভঙ্গিকে চ্যালেঞ্জ করার মতো কোনো অবস্থার সৃষ্টি হবে না। রাষ্ট্র পরিচালনায়
আপাতদৃষ্টিতে সরকার ভালো করলেও মূলত গণতান্ত্রিক দেশগুলোতে যেভাবে জনমতকে আমলে
নিয়ে সরকারের সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া আবর্তিত হয় সে রকমটা আমাদের দেশে দেখা যায়
না। বিরোধী দলের অবস্থান এবং সরকারি সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় ভূমিকা তাদের
সার্বিক রাজনৈতিক কর্মসূচির মাধ্যমে প্রতিভাত হয়, যা জনমতের প্রতিফলন হিসেবে সরকার
মনে করে এবং এভাবেই তাদের সার্বিক সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। আমাদের দেশে বিরোধী দলগুলো
বলতে বর্তমানে দুই ধরনের বিরোধী দল বুঝে থাকি এখন, প্রথমত সংসদের বাইরে এবং
দ্বিতীয়ত সংসদের ভেতরে। দেশের সবচেয়ে বড় বিরোধী দল বিএনপি বর্তমানে সংসদের বাইরে
রয়েছে, সেক্ষেত্রে আনুষ্ঠানিকতার বিচারে দেশের সবচেয়ে বড় বিরোধী দল বলতে আমরা বুঝে
থাকি জাতীয় পার্টিকে।
সরকারের সব কর্মকাণ্ড আনুষ্ঠানিকভাবে যেহেতু জাতীয় সংসদের
মাধ্যমে একটা জবাবদিহির মধ্য দিয়ে পরিচালিত হয়, সেক্ষেত্রে আনুষ্ঠানিকভাবে বিরোধী
দলের অবস্থানে থাকা জাতীয় পার্টি সরকারের ওপর খুব বেশি একটা প্রভাব বিস্তার করতে
পারছে এমনটা বলা যাবে না। অপরদিকে শক্ত বিরোধী দল বিএনপি যেহেতু এখন সংসদের বাইরে
এবং রাষ্ট্র পরিচালনা এবং জনস্বার্থের বাইরে কেবল সরকারের পতন এবং নির্দলীয়
তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে জাতীয় নির্বাচন ইত্যাদি বিষয়কে কেন্দ্র করে তাদের
ভূমিকা পালন করছে, সঙ্গত কারণেই সরকারের জন্য রাষ্ট্র পরিচালনায় কোনো বিরোধিতার
মধ্য দিয়ে যেতে হচ্ছে না।
আমরা যদি আমাদের জাতীয় জীবনের খুব গুরুত্বপূর্ণ কিছু
অবস্থার সঙ্গে আমাদের বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর ভূমিকা মূল্যায়ন করতে চাই তাহলে বুঝতে
পারব আমাদের রাজনীতি বর্তমানে কোন অবস্থায় রয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে দেশে সবচেয়ে
গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি হচ্ছে মূল্যস্ফীতি। আমরা দেখতে পাচ্ছি, জীবনধারণের সবচেয়ে জরুরি
খাদ্যপণ্য ছাড়াও সবকিছুর দাম লাগামহীন হারে দাম বেড়ে চলছে। অবশ্য এই দর বৃদ্ধির বিষয়টি
কেবল আমাদের দেশেই নয়, সারা বিশ্বেই এমনটি ঘটছে, যার জন্য ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ,
মধ্যপ্রাচ্য সংকট এবং এসবের জের ধরে বৈশ্বিক সরবরাহ পর্যায়ে সংকট এবং উন্নয়নশীল দেশগুলোতে
বৈশ্বিক বেকারত্বের সংকট বাড়ার ফলে রেমিট্যান্স প্রবাহে সংকট ইত্যকার নানা ইস্যুকে
দায়ী করা যায়।
তবে এও বলতে দ্বিধা করতে চাই না, যে বাস্তবিক কিছু যৌক্তিক
সংকটের বাইরেও কিছু কৃত্রিম সংকট তৈরি হচ্ছে দেশের অভ্যন্তরে। এই সংকটের হোতা
দেশের একধরনের অসৎ মজুদদার। নিয়মকানুন তোয়াক্কা না করে নিজেদের মতো করে বিভিন্ন
দ্রব্যের সংকট তৈরি করে মূল্য নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে অনেক দিন ধরেই। সিন্ডিকেটকে
ভাঙতে সরকারের বিভিন্ন সংস্থা বারবার চেষ্টা করছে কিন্তু পারছে না। কী কারণে পারছে
না, এটাও একটা বড় প্রশ্ন। জীবন এবং জীবিকা ভীষণ কঠিন হয়ে পড়ছে! বিরোধী দলগুলোকে
এসব বিষয় নিয়ে সরব হতে দেখা যায় না। তাহলে কি আওয়ামী লীগ
সাধারণ সম্পাদক যা বলেছেন, অর্থাৎ এসবের পেছনে বিরোধী দলের উস্কানি রয়েছে, এটাই
সত্যি?
মানুষের মূল দুই চাহিদার জায়গা হচ্ছে স্বাস্থ্য ও শিক্ষা।
স্বাস্থ্য খাতে সরকারি পর্যায়ে সুযোগসুবিধার অপ্রতুলতার কারণে মানুষের ছুটতে হচ্ছে
বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবার দিকে। বেসরকারি পর্যায়ে কোনো ধরনের আর্থিক শৃঙ্খলা না
থাকায় একশ্রেণির অসাধু প্রতিনিয়ত পকেট কেটে চলছেন সাধারণ রোগীদের। এসব ঘটনা চলছে
দিনের পর দিন। স্বাস্থ্যমন্ত্রী ডা. সামন্তলাল সেন দায়িত্ব নিয়েই এর বিরুদ্ধে কিছু
তৎপরতা শুরু করেছেন। তিনি কতটুকু পারবেন সেটা সময়ই বলে দেবে। শিক্ষা ক্ষেত্রে আমরা
যেন এখনও একধরনের পরীক্ষা-নিরীক্ষার মধ্য দিয়ে চলছি! স্বাধীনতার ৫২ বছর
অতিক্রান্তেও আমাদের শিক্ষা নিয়ে প্রতিনিয়ত গবেষণা করে চলছি। শিক্ষাকে এখনও
যুগোপযোগী করা যায়নি। ফলে স্কুল-কলেজের শিক্ষার সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের
শিক্ষার ব্যাপক ফারাক তৈরি হয়েছে।
দেশের শিক্ষাব্যবস্থায় যারা সরকারি স্কুল-কলেজগুলোতে পড়ে
তাদের জন্য খরচ এক রকম, আবার যারা বেরসকারি পর্যায়ে পড়াশোনা করে তাদের খরচ গুনতে
হয় আরও ব্যাপক হারে এবং উভয়ের জন্যই রয়েছে প্রাইভেট এবং কোচিং সেন্টারগুলোর
দৌরাত্ম্য। সবকিছু মিলিয়ে শিক্ষা এখন আমাদের দেশে এক ব্যাপক খরচের বিষয় হয়ে
দাঁড়িয়েছে। দেশের সরকারের নীতির বাইরে এ নিয়ে ব্যাপকভাবে বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর
সমন্বিত প্রচেষ্টা দিয়ে আমাদের মানুষের জন্য স্বাস্থ্য এবং শিক্ষার মতো
জায়গাগুলোতে একধরণের স্বস্তিকর পরিবেশ আনয়ন করা যেত। আমাদের উচ্চশিক্ষার সরকারি
পর্যায়টি আরও ভয়ংকর। ছাত্ররাজনীতির দলীয় অবস্থান এখন সাধারণ শিক্ষার্থীদের রীতিমত
আতঙ্কে রেখেছে। দেশের মানুষের করের অর্থে পরিচালিত পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো এখন
আর সাধারণ শিক্ষার্থীদের নিরাপদ শিক্ষার নিশ্চয়তা দিতে পারছে না। অসুস্থ
ছাত্ররাজনীতিতে আক্রান্ত বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে যদি দ্রুত সুস্থ করার ব্যবস্থা করা
না হয়, তাহলে ভবিষ্যতে আমাদের দেশে মেধার এক গুরুতর সংকট দেখা দেবে। এসব কিছুর
জন্য দায়ী নিশ্চিতভাবেই আমাদের রাজনৈতিক নেতৃত্ব।
রাজনৈতিক দলগুলো যদি তাদের কার্যক্রম সত্যই জনমুখী হিসেবে দাবি করে, তাহলে দেশের সার্বিক অবস্থা বর্তমানে কোথায় রয়েছে এবং ভবিষ্যতে আমরা নিজেদের কোথায় নিয়ে যেতে চাই সেসব লক্ষ্য স্থির করে রাজনীতির লক্ষ্য নির্ধারণ করতে হবে। কেবল সরকার ব্যবস্থার পরিবর্তনের নামে আন্দোলন করে নিজেদেরই বা কোথায় নিয়ে যাওয়া হচ্ছে এরও মূল্যায়ন জরুরি। রাজনৈতিক দলগুলোকে মনে রাখতে হবে গণতান্ত্রিক হওয়ার প্রথম ধাপ হচ্ছে জনমুখী হওয়া।