স্থানীয় সরকার নির্বাচন
ড. মোসলেহউদ্দিন আহমেদ
প্রকাশ : ১২ মার্চ ২০২৪ ১০:২৮ এএম
ড. মোসলেহউদ্দিন আহমেদ
আমাদের সংবিধানের
প্রথম ভাগে সপ্তম অধ্যায় অনুসারে দেশের সব ক্ষমতার উৎস জনগণ। সংবিধানের একুশতম অধ্যায়ে
স্পষ্ট উল্লেখ রয়েছে, ‘প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিযুক্ত প্রত্যেক ব্যক্তির কর্তব্য জনগণকে
সেবা প্রদান করা’। সংবিধানে উল্লিখিত সেবার সুষম বণ্টন তখনই নিশ্চিত হয় যখন স্থানীয়
পর্যায়ে সেবার মান ও কাঠামো গড়ে তোলা সম্ভব হয়। কিন্তু স্বাধীনতার বায়ান্ন বছর অতিক্রান্তেও
দেশে স্থানীয় সরকার কাঠামো, ব্যবস্থাপনা ও তদারকি নিশ্চিত করা যায়নি। অতীতে বহুবার
লিখেছি, স্থানীয় সরকার কাঠামোর দর্শন ছিল। ব্রিটিশ উপনিবেশের গড়ে তোলা এ দর্শন হারিয়ে
গেছে। স্থানীয় সরকার কাঠামোর সে দর্শন আজ বিলুপ্ত। যতটুকু কাঠামো অবশিষ্ট ছিল তা-ও
যেন আর দেখা যাচ্ছে না। স্বাধীনতার পর অনুষ্ঠিত স্থানীয় সরকার কাঠামোর বিভিন্ন স্তরের
নির্বাচনের দিকে তাকালে বিষয়টি বোঝা সম্ভব।

স্থানীয় সরকার
মূলত স্থানীয় পর্যায়ে স্বায়ত্তশাসন পরিচালনা করে। অথচ দেশে স্থানীয় সরকারব্যবস্থা অনেকাংশে
ক্ষমতাসীন দলের তাঁবেদার হয়ে রয়েছে। স্থানীয় সরকার কাঠামোয় নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিরা
সরকারকে কীভাবে সহযোগিতা করবে তা নিয়েই বেশি ব্যস্ত থাকেন। ফলে স্থানীয় পর্যায়ে উন্নয়নের
সুষম বণ্টন ঘটে না। স্থানীয় সরকারের প্রতিনিধি হিসেবে নির্বাচিত ব্যক্তি ক্ষমতাসীন
দলের সঙ্গে আঁতাত না করলে কোনো স্থানীয় উন্নয়নমূলক কার্যক্রম করতে পারেন না। তার পরও
এ নির্বাচনের রয়েছে বাড়তি গুরুত্ব। স্থানীয় সরকার কাঠামোর নির্বাচন সচরাচর উৎসবমুখর
হয়ে থাকে। এ নির্বাচনে ভোটার প্রার্থীকে ভোট দেন স্থানীয় উন্নয়নের প্রসঙ্গ যাচাই করে।
কিন্তু আমাদের প্রশ্ন হচ্ছে, স্থানীয় সরকার কাঠামো কি কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন আনয়ন এবং জনপ্রত্যাশা
পূরণ করতে পারে?
৯ মার্চ দুই
সিটি করপোরেশন ছাড়াও সারা দেশে স্থানীয় সরকারের আরও ২২৯টি নির্বাচন ও উপনির্বাচনের
ভোট গ্রহণ করা হয়েছে। কিছু অনিয়ম-দুর্নীতি ও ভুলের খবর পাওয়া গেলেও শেষ পর্যন্ত প্রথম
ধাপের স্থানীয় সরকার কাঠামোর নির্বাচন প্রশ্নমুক্তভাবে করতে পেরেছে নির্বাচন কমিশন।
এর ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে কমিশনকে দৃঢ় থাকতে হবে। পরবর্তী আরও কয়েক ধাপে স্থানীয়
সরকার কাঠামোর বিভিন্ন পদে নির্বাচন হবে। জাতীয় নির্বাচন এবং স্থানীয় সরকার কাঠামোর
বিভিন্ন স্তরের নির্বাচনের মধ্যে মোটা দাগে বেশ কিছু পার্থক্য রয়েছে। বিভিন্ন মহল থেকে
বারবার বলা হচ্ছে, স্থানীয় সরকার কাঠামোর নির্বাচনগুলো দলীয় মনোনয়ন কিংবা প্রতীকে হওয়া
উচিত নয়। অনেক বিশ্লেষকই এ নির্বাচন প্রক্রিয়া পুরোনো ব্যবস্থায় ফিরিয়ে নেওয়ার কথা
বলছেন। আমরা জানি, স্থানীয় সরকার কাঠামোর বিভিন্ন পদের নির্বাচনে দলীয় মনোনয়নে অনুষ্ঠিত
হওয়ার বিষয়টি আওয়ামী লীগই চালু করেছিল। কিন্তু এবার দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পরে
দলের শীর্ষ পর্যায়ের বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয় দলীয় প্রতীকে কিংবা মনোনয়নে এ নির্বাচন হবে
না। আওয়ামী লীগ সরকার বিধিবিধান ঠিক রেখে অলিখিতভাবে তাদের গৃহীত সিদ্ধান্ত থেকে ফিরে
দলীয় প্রতীক কিংবা দলীয় মনোনয়ন ছাড়া নির্বাচন করার যে সিদ্ধান্ত নেয় তা মনে করি সঠিক।
নিকট অতীতে এ স্তম্ভেই লিখেছি, স্থানীয় সরকার কাঠামোর বিভিন্ন স্তরের নির্বাচনে ভোটার
ও প্রার্থী একে অন্যের পরিচিত থাকে বিধায় এ ধরনের নির্বাচন হয় উৎসবমুখর। দলীয় প্রতীকে
বা মনোনয়নে নির্বাচন করা না হলে নির্বাচনে অংশগ্রহণে কোনো নেতাকর্মীর বাধা থাকে না।
আমরা দেখেছি, রাজনৈতিক ক্ষমতা ব্যবহার করে অনেক ক্ষেত্রেই ভোটপর্বে পেশিশক্তির ব্যবহার
করে ভোটকেন্দ্রে আধিপত্য বিস্তারের চেষ্টা করা হয়। বিদ্যমান রাজনৈতিক সংকটে তাই এ সিদ্ধান্ত
যথোপযুক্ত মনে করি।
আমরা জানি, ব্রাহ্মণবাড়িয়া
জেলা পরিষদে চেয়ারম্যান পদে উপনির্বাচনে আওয়ামী লীগের দুই নেতাকে হারিয়ে বিজয়ী হয়েছেন
ব্যবসায়ী বিল্লাল মিয়া। সংবাদমাধ্যমে প্রকাশ, স্থানীয় এক নেতার প্রতি মন্ত্রিপরিষদের
কয়েকজন সদস্যের প্রত্যক্ষ সমর্থনও ছিল। তাই বিল্লাল মিয়ার মূলত জয়ী হওয়ার বিষয়টি অনেকেরই
ধারণার বাইরে ছিল। স্থানীয় সরকার নির্বাচনের আগে তিনি ভোটারের কাছে প্রার্থীর ভূমিকায়
অবতীর্ণ হয়েছিলেন। ভোটারের দ্বারে দ্বারে গিয়ে তিনি যোগ্য প্রার্থীর মতোই আচরণ করেছেন
যা আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের মধ্যে পাওয়া যায়নি। তাদের প্রচার কার্যক্রম অনেকটা দলীয়
প্রচারের মতো ছিল বলেই প্রতীয়মান হয়েছে। প্রচার ও জনসংযোগে এ সামান্য পার্থক্যই জয়পরাজয়ের
পারদে ফারাক গড়ে দিয়েছে। এ ঘটনা থেকে অনুমেয়, জনগণ ভোটাধিকার প্রয়োগের ক্ষেত্রে ইচ্ছুক।
স্থানীয় সরকারব্যবস্থার
নির্বাচনে জনপ্রতিনিধিদের সঙ্গে ভোটারের সংযোগ সাধিত হলে ফলাফল যে-কারও দিকে মোড় নিতে
পারে। কুমিল্লা ও ময়মনসিংহেও দৃশ্য পরিলক্ষিত হয়েছে। এমনটি আগামীর নির্বাচনব্যবস্থার
জন্য নিঃসন্দেহে ইতিবাচক। ভোটাররা স্বতঃস্ফূর্তভাবে ভোট দিয়েছেন এবং পছন্দের প্রার্থী
নির্বাচিত করেছেন। ভোটার উপস্থিতি কিছুটা কম হয়েছে। সহজেই অনুমেয়, দ্বাদশ জাতীয় সংসদ
নির্বাচনকেন্দ্রিক উদ্বেগ-শঙ্কাও ভোটারের মনে প্রভাব রেখেছে। তা ছাড়া বিএনপিও এ নির্বাচনে
অংশ না নেওয়ার ক্ষেত্রে তাদের দৃঢ় অবস্থান ধরে রেখেছিল। তাদের জনসমর্থনও রয়েছে ব্যাপক।
সঙ্গত কারণেই অনেকে ভোট দিতে আসেনি।
স্থানীয় সরকার
কাঠামো নিয়ে এখনও রয়ে গেছে অনেক প্রশ্ন। আমাদের নিকটতম প্রতিবেশী দেশ ভারতের পাঞ্জাব,
কেরালাসহ কয়েকটি অঞ্চলে স্থানীয় সরকার কাঠামো ‘পঞ্চায়েত’ বলে পরিচিত। ভারতে ক্ষমতাসীন
দল স্থানীয় সরকারের ওপর কোনো ধরনের প্রভাব বিস্তার করে না। এমনকি স্ক্যান্ডিনেভিয়ান
দেশগুলোয় স্থানীয় সরকারই জনগণের যাবতীয় সেবার মান সুনিশ্চিত করার দায়িত্ব পালন করে।
স্ক্যান্ডিনেভিয়ান দেশগুলোয় স্থানীয় সরকার মানুষের আবাসন ব্যবস্থাপনার দায়িত্বও নিয়ে
থাকে। স্থানীয় সরকার কাঠামোর সর্বজনব্যাপী সেবার বিষয়টি আমরা এখনও প্রতিষ্ঠা করতে পারিনি।
স্থানীয় সরকার কাঠামোর নারী প্রতিনিধিদের ক্ষমতায়নের বিষয়টি বিভিন্ন মহলে এখনও প্রশ্নবিদ্ধ
হয়ে আছে। একদিকে বলা হচ্ছে নারীর ক্ষমতায়নের কথা, অন্যদিকে অনেক ক্ষেত্রেই দৃশ্যমান
হচ্ছে ক্ষমতাহীনভাবে দায়িত্বপালনের প্রক্রিয়া। নারীর ক্ষমতায়নের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক
মুক্তি একটি বড় বিষয়। এ মুক্তির কাজটি স্থানীয় পর্যায় থেকে শুরু করা অত্যাবশ্যক এবং
এ সুযোগও আমাদের রয়েছে।
স্থানীয় পর্যায়ে
উন্নয়নের ক্ষেত্রে জনগণের প্রায় অর্ধেকের মতামত যাচাইয়ের সুযোগ তৈরি হয় যখন নারী জনপ্রতিনিধি
থাকেন। উপজেলা পরিষদ, পৌরসভা কিংবা ইউনিয়ন পরিষদÑস্থানীয় সরকারব্যবস্থার এ তিন স্তরে
নারী সদস্য সংরক্ষিত আসনে প্রত্যক্ষ ভোটে নির্বাচিত হন। প্রত্যক্ষ এ ভোটে নারী-পুরুষ
একসঙ্গে ভোট দিতে পারেন। তিনটি ওয়ার্ড থেকে একজন নারী সদস্য নির্বাচিত হন। অন্যদিকে
প্রতিটি ওয়ার্ড থেকে একজন পুরুষ সদস্য নির্বাচিত হন। ব্যবস্থাপনায় বৈষম্যের ফলে স্থানীয়
পর্যায়ে নারী প্রতিনিধিরা পিছিয়ে পড়েন। স্থানীয় পর্যায়ে নারীর ক্ষমতায়ন উৎসাহিত করতে
হলে তাদের আরও ক্ষমতা দেওয়া দরকার। এ সমস্যা নিরসনেরও ব্যবস্থা রয়েছে। একটি প্যানেল
চেয়ারম্যান পদ তৈরি করা যেতে পারে। এ ব্যবস্থা চালু করা গেলে স্থানীয় সরকারব্যবস্থায়
নারীর অংশগ্রহণ আরও বাড়বে।
স্থানীয় সরকার
কাঠামোর প্রথম ধাপের নির্বাচনে ইভিএম পদ্ধতিতে ভোট গ্রহণে কোনো কোনো ক্ষেত্রে ভোগান্তি
ও জটিলতার বার্তা সংবাদমাধ্যমে উঠে এসেছে। ১০ মার্চ প্রতিদিনের বাংলাদেশ-এর একটি প্রতিবেদনে
বলা হয়েছে, ময়মনসিংহে আঙুলের ছাপ না মেলায় ভোট দিতে পারেনি অনেকে। আঙুলের ছাপ না মেলায়
সংশ্লিষ্ট সহকারী প্রিসাইডিং অফিসাররা পানি, জেলি ও কাপড় দিয়েও ফিঙ্গারপ্রিন্ট মেশিন
মোছার চেষ্টা করেন। তাতেও কোনো কাজ হয়নি। ইভিএমের মাধ্যমে ভোট জালিয়াতি অনেকাংশে কমানো
সম্ভব। সময়ের সঙ্গে তাল মেলাতে গিয়ে আমাদের নির্বাচনব্যবস্থায় আধুনিক যন্ত্রের ব্যবহারেরও
বিকল্প নেই। তবে আধুনিক কোনো যন্ত্র ব্যবহার করলেই ব্যবস্থা আধুনিক হয় না। আধুনিক যন্ত্রেরও
আধুনিকায়ন জরুরি। ইভিএমে ভোট দিতে না পারা বা মেশিনে আঙুলের ছাপ না মিললে ভোট জালিয়াতের
পরোক্ষ সুযোগ তৈরি হয়। পরোক্ষ এ সুযোগ ইভিএমের ব্যবহারিক বাস্তবতা প্রশ্নবিদ্ধ করে
তুলছে।
ইভিএমে ভোটগ্রহণ প্রক্রিয়ার আধুনিকায়নের বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে সেভাবেই নির্বাচন কমিশনকে কাজ করতে হবে। পরীক্ষামূলকভাবে ক্ষুদ্র পরিসরের নির্বাচনে প্রযুক্তির বিকাশের উপহার এ যন্ত্রটি ব্যবহার করা যেতে পারে। নির্বাচন কমিশন এ ক্ষেত্রে শুধু লজিস্টিক সহযোগিতা দিতে পারে। পরীক্ষামূলকভাবে ক্ষুদ্র পরিসরে ইভিএম পদ্ধতি যাচাইবাছাইয়ের মাধ্যমে আরও চৌকশ করতে হবে। যদি তা করা না যায় তাহলে ইভিএম ব্যবস্থা বাতিল করা ছাড়া কোনো সমাধান খুঁজে পাওয়া যাবে না।