× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

যোগাযোগ অবকাঠামো

বিআরটি প্রকল্পে পরিকল্পনায় অসংগতি

ড. আদিল মুহাম্মদ খান

প্রকাশ : ০৪ মার্চ ২০২৪ ০৯:২৯ এএম

ড. আদিল মুহাম্মদ খান

ড. আদিল মুহাম্মদ খান

নগর-মহানগরে যানজট নিরসন ও যাতায়াত সুগম করতে বাস র‍্যাপিড ট্রানজিট (বিআরটি) বিশ্বব্যাপী স্বীকৃত। আমাদের দেশেও বিমানবন্দর থেকে গাজীপুর পর্যন্ত বিআরটি করিডোর নির্মাণ করা হয়েছে। চার হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত এই প্রকল্প যোগাযোগব্যবস্থায় কতটা স্বস্তি আনতে পারবে এ নিয়ে দেখা দিয়েছে সংশয়। ২৪ ফেব্রুয়ারি প্রতিদিনের বাংলাদেশ-এর শীর্ষ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিআরটি প্রকল্প নির্মাণকাজের কারণে গাজীপুর পর্যন্ত মহাসড়ক সরু হয়ে গেছে। কোথাও কোথাও মূল সড়কের অর্ধেক অংশে যান চলাচল করছে। প্রতিবেদনে এও বলা হয়েছে, প্রকল্পের কিছু ফ্লাইওভার চলাচলের জন্য উন্মুক্ত করা হয়েছে বলে গাজীপুর পর্যন্ত মহাসড়কে যানজট কিছুটা কম। কিন্তু বিআরটি করিডোরে ডেডিকেটেড বাস চালু করা হলে যানজট বাড়বে। বিশেষত করিডোরের দুই পাশের সড়কে গাড়ির চাপ কিছুটা সংকট তৈরি করবে।


বিআরটি প্রকল্প বিশ্বব্যাপী জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে। এ ধরনের প্রকল্পের নির্মাণ ব্যয় কম। তা ছাড়া বিআরটি প্রকল্প বাসনির্ভর হওয়ায় এখানে বৈদ্যুতিক সংযোগ ব্যবস্থাপনার প্রয়োজন হয় না। এ ধরনের প্রকল্পে যাতায়াতও সহজ। আমরা জানি, ঢাকা মহানগরে মেট্রোরেল যাত্রীদের দ্রুত ও সহজে যাতায়াতের পথ উন্মুক্ত করে দিয়েছে। তবে মেট্রোতে একটি নির্দিষ্ট সময়ে ওঠানামা করতে হয়। কিন্তু বিআরটি প্রকল্পে তেমন ঝক্কি নেই। করিডোরে পর্যাপ্ত বাস থাকলে মানুষ সহজেই যাতায়াত করতে পারবে। দ্রুতগতিতে যাতায়াতের জন্য দেশে বিআরটি প্রকল্প নেওয়া হয়। প্রাথমিকভাবে বিআরটি করিডোর পুরান ঢাকা পর্যন্ত বিস্তৃত করার পরিকল্পনা ছিল। পরে নানা সংকট, প্রতিবন্ধকতার অভিযোগ উত্থাপিত হওয়ায় প্রকল্পটিকে শহরের প্রান্তেই নির্মাণ করা হলো। প্রকল্পটির পরিসর গাজীপুর থেকে বিমানবন্দর পর্যন্ত। প্রকল্পের সীমানা নির্ধারণের ক্ষেত্রে ভাবনা ও পরিকল্পনাগত ত্রুটি দেখা যাচ্ছে। আর এই ত্রুটি বিবেচনায় সংগত কারণেই বিআরটির সুফল নিয়ে প্রশ্ন উত্থাপিত হয়েছে। প্রশ্ন উঠেছে, গাজীপুর থেকে বিমানবন্দর যাতায়াত সুগম হলেও শহরের কেন্দ্রের সঙ্গে যোগাযোগের মাধ্যম কী হবে। কারণ শহরের প্রান্ত থেকে অনেকেই মূল ঢাকায় যাওয়ার ক্ষেত্রে কিছুটা দুর্ভোগের শিকার হবেন। প্রতিদিনের বাংলাদেশ-এর ওই প্রতিবেদনে এও বলা হয়েছে, বিআরটি করিডোরে বাস চালু হলে তার সুফল শুধু ঢাকা-গাজীপুর রুটের যাত্রীরা ভোগ করবে। কিন্তু ঢাকার প্রান্তে সংযুক্ত ২৫ জেলার যাত্রী সরু মহাসড়কে ভোগান্তিতে পড়বে।

বিআরটি প্রকল্প বাস্তবায়নের প্রাক্কালে নানা অভিযোগ উত্থাপিত হয়। ঢাকায় এমন একটি অবকাঠামো নির্মানের পর্যাপ্ত জায়গা নেই। ফলে একাধিকবার পরিকল্পনায় সংস্কার আনা হয়। বিশ্বের অনেক দেশে বিআরটি প্রকল্প ভূমিতে রাখার চেষ্টা করা হয় যাত্রীদের সুবিধার কথা ভেবে। অনেক সময় উড়ালসড়কের মাধ্যমেও বিআরটি প্রকল্প নির্মিত হয়, তবে তা ভৌগোলিক-প্রাকৃতিকসহ নানা বাস্তবিক বিষয় পর্যালোচনা করে। আমাদের এখানে প্রথমেই সুপরিকল্পনার মাধ্যমে এই প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে নানা প্রতিবন্ধক তৈরি হয়। সংবাদমাধ্যমেই প্রকাশ, তিন দফায় প্রকল্প সংশোধনের পর বিমানবন্দর-গাজীপুর রুটে এই প্রকল্প বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত স্থির। সংশোধনের মধ্যবর্তীকালে প্রকল্প নির্মাণ ব্যয় বেড়ে যায়। শেষ পর্যন্ত যে বিআরটি নির্মিত হয়েছে সেটির অবকাঠামো আর যোগাযোগ ব্যবস্থাপনা দেখলে মনে হবে এটি যাত্রীসেবা সুগম করার ক্ষেত্রে অসম্পূর্ণ। বিআরটি প্রকল্পটি আংশিক উড়ালসড়ক এবং কিছু অংশ ভূমিতে নির্মাণ করা হয়েছে। বিআরটি সড়কের জন্য নির্ধারিত স্থানের বিষয়গুলো বিবেচনা করেই এমন নির্মাণ নকশার আশ্রয় নিতে হয়েছে। বিআরটির মাধ্যমে আন্তঃশহর বাস নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা হয়। তাই এ ধরনের প্রকল্পের সড়ক নির্মাণের ক্ষেত্রে অবকাঠামোগত পরিকল্পনা এবং শহরের সঙ্গে আন্তঃসংযোগের বিষয়ে স্বচ্ছ পরিকল্পনা রাখতে হয়। বিমানবন্দর-গাজীপুর পর্যন্ত যে বিআরটি করিডোর নির্মাণ করা হয়েছে তা আন্তঃশহর যোগাযোগের ক্ষেত্রে অসম্পূর্ণ বলে প্রতীয়মান মনে হচ্ছে।

হাইওয়েগুলোর আলাদা বৈশিষ্ট্য থাকে, সেখানে সাধারণত দ্রুতগতিতে গাড়ি চলাচল করার কথা। কর্তৃপক্ষেরও উচিত হাইওয়েতে সে অনুযায়ী প্রকল্প গ্রহণ করা। হাইওয়ের কোনো এক জায়গায় যানবাহন বাধাগ্রস্ত হলে পুরো সড়কেই তার চাপ পড়বে। বিমানবন্দর-গাজীপুর বিআরটির নিচে মহাসড়ক রয়েছে। এই মহাসড়কটির আলাদা গুরুত্ব রয়েছে। ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের বিআরটি প্রকল্প এলাকায় কোনো এক জায়গায়ও যদি সড়ক সংকীর্ণ থাকে এর প্রভাবে যানজট তৈরি হতে পারে। এই প্রকল্প বাস্তবায়নের ফলে প্রকল্পের নিকটস্থ মহাসড়ক সংকুচিত হয়ে পড়েছে। এই মহাসড়ক দিয়ে ঢাকা থেকে যাত্রীগামী বাস ও পণ্যবাহী ট্রাক চলাচল করে। উল্লেখ্য, মহাসড়কে ঢাকা মহানগরী, গাজীপুর, কিশোরগঞ্জ, টাঙ্গাইল, নরসিংদীর পাশাপাশি উত্তরবঙ্গ ও ময়মনসিংহ বিভাগের অন্তত ২৫ জেলার সংযোগ রয়েছে। ফলে এই মহাসড়কের কোনো অংশ সংকুচিত হয়ে গেলে যানজটের শঙ্কা বেড়ে যায়। বিআরটি প্রকল্প সফল হলেও এর সুবিধা শুধুমাত্র ঢাকা-গাজীপুর রুটের যাত্রীরা ভোগ করবে। এর বাইরে আঞ্চলিক বাসসহ ২৪ জেলার বাস চলবে নিচের সড়ক দিয়ে। এতে আবারও যানজটে থমকে যেতে পারে দেশের গুরুত্বপূর্ণ ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়ক। জাতীয় এই মহাসড়কটিতে যোগাযোগব্যবস্থা যেন কোনোভাবে বিঘ্নিত না হয় তা ভাবা উচিত ছিল। বিআরটি প্রকল্পের নকশা করার সময় মহাসড়কের চাহিদার বিষয়টি বিবেচনা করা হয়নি বলেই প্রতীয়মান হচ্ছে।

আমরা জানি, গাজীপুর মহাসড়কটি দেশের অন্যতম জনবহুল এলাকা বলে পরিচিত। জনবহুল এলাকায় প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে যাত্রীসেবার সঙ্গে ওই এলাকার বাসিন্দাদের কথাও বিবেচনা করতে হয়। বিআরটি করিডোর নির্মাণ করায় সড়কের একটি অংশ সংকুচিত হয়ে গেছে। অভিযোগ আছে, গুরুত্বপূর্ণ এই সড়কে ফুটপাথ নেই। সংগত কারণেই প্রশ্ন উঠেছে, শ্রমিক অধ্যুষিত ফুটপাথ না থাকা কি পরিকল্পনাগত অদূরদর্শিতা নয়? বিআরটি প্রকল্পের পরিকল্পনাগত ঘাটতি আমাদের চোখ এড়ায় না। বিআরটি প্রকল্পের নিকটবর্তী মহাসড়কের একটি অংশে ফুটপাথ নির্মাণ করতে হবে। পাশাপাশি পথ পারাপারের সুব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। কারণ বিআরটি নির্মাণ করাই হয় যাত্রীদের নিরাপদে ও অল্প খরচে নির্দিষ্ট গন্তব্যে পৌঁছে দেওয়ার জন্য। কিন্তু গন্তব্যে পৌঁছে দিলেই প্রকল্পের যাত্রীসেবার মান নিশ্চিত হয়ে যায় না। একজন যাত্রী তার গন্তব্যে পৌঁছে যেন নিরাপদে মহাসড়ক এলাকায় পার হতে পারেন, সে ব্যবস্থা গড়ে তোলাও জরুরি। ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের একাংশ সরু হয়ে গেছে এই প্রকল্পের কারণে। ফলে শুধু ফুটপাথ কেন, মহাসড়কে গাড়ি চলাচলের পর্যাপ্ত জায়গা নেই। এক্ষেত্রে সংকীর্ণ জায়গা ভূমি অধিগ্রহণের মাধ্যমে প্রশস্ত করার উদ্যোগ নেওয়ার বিষয়টি সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীলদের ভাবতে হবে।

দেশের অধিকাংশ পরিকল্পনায় নানা ত্রুটিবিচ্যুতির অভিযোগ নতুন নয়। যোগাযোগব্যবস্থা উন্নয়ন অবকাঠামো নির্মাণের ক্ষেত্রেও এই ত্রুটিবিচ্যুতি পরিলক্ষিত হয়। যাত্রী ও পথচারী এই দুটো উপাদানকে যোগাযোগ অবকাঠামো পরিকল্পনায় বিবেচনা করা হয় না। প্রকল্প বাস্তবায়নের পর তাই ভোগান্তির অভিযোগ উত্থাপিত হয়। আমাদের দেশে মানুষের চলাচলের বৈশিষ্ট্য অন্য দেশের তুলনায় ভিন্ন। আমাদের যোগাযোগব্যবস্থা এখনও সমন্বিত নয়। রাস্তা পারাপারের বিষয়টি নিয়েই বলা যাক। রাস্তার এপার-ওপারের যে সংযোগ তারও একটি অবকাঠামো রয়েছে। শ্রমিক অধ্যুষিত এলাকায় স্বল্প দূরত্বের কোনো স্থানে পদদলে যাতায়াত করে। আর এই জনবহুল এলাকায় আন্তঃশহর যোগাযোগব্যবস্থা গড়ে তুললে বিভিন্ন স্থানে পথচারী ও যাত্রীদের যাতায়াতের চরিত্রও বিশ্লেষণ করতে হয়। প্রকল্পের কারণে যেন তাদের যাতায়াত সুবিধা বিঘ্নিত না হয়, সেটিও নিশ্চিত করা জরুরি। অর্থাৎ বিআরটি প্রকল্পের ক্ষেত্রে যাত্রীসেবা, মহাসড়কে যাত্রী ও ভারী পণ্য পরিবহন ব্যবস্থা সুগম রাখা এবং পরিশেষে পথচারীবান্ধব অবকাঠামো গড়ে তোলা জরুরি। দুঃখজনক হলেও সত্য, যোগাযোগ অবকাঠামো নকশা প্রণয়নের ক্ষেত্রে ব্যবহারকারীদের কথা ভাবা হয় না।

পথচারী হোক, যাত্রী হোক কিংবা পরিবহনÑ তারা যোগাযোগ অবকাঠামো কীভাবে ব্যবহার করবে সেটি পরিকল্পনার অন্তর্ভুক্ত করা জরুরি। সমগ্র বিশ্বে বিআরটি প্রকল্প সফল বলেই বিবেচিত। কিন্তু আমাদের দেশে বিআরটি প্রকল্প পরিকল্পনাগত অসংগতি ও দূরদর্শিতার অভাবে নানা সংকট সৃষ্টি করেছে। অথচ আন্তঃশহর যোগাযোগ কাঠামো ও ব্যবস্থাপনা সুগম করার একটি বড় সম্ভাবনা নিয়ে এসেছিল এই প্রকল্পটি। এই সম্ভাবনা কি অদূরদর্শিতার কারণে অঙ্কুরেই বিনষ্ট করা হওয়ার ঝুঁকিতে পড়েছে? অন্য দেশে বিআরটি সফল হলেও আমাদের এখানে কেন হলো না- তা জরুরি প্রশ্ন বটে

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা