× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

সম্পাদকীয়

আমরা স্তব্ধ-শোকাহত, দায়িত্বহীনতার বলি আর কত

সম্পাদকীয়

প্রকাশ : ০২ মার্চ ২০২৪ ১৩:০২ পিএম

আমরা স্তব্ধ-শোকাহত, দায়িত্বহীনতার বলি আর কত

বাংলাদেশ ফের শোকে মুহ্যমান। ২৯ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর অভিজাত এলাকা বেইলি রোডে অগ্নিদুর্যোগে মর্মস্পর্শিতার ছায়া পুনরায় যেভাবে প্রলম্বিত হলো তাতে প্রথমেই আমাদের প্রশ্ন, দায় ও দায়িত্বহীনতার বলি আর কত জীবন হলে ব্যবস্থাপনার ত্রুটি সারিয়ে মানুষের জন্য নিরাপদ পরিপার্শ্ব নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীল কর্তৃপক্ষগুলোর টনক নড়বে। বিনা মেঘে বজ্রপাতের মতো রোমহর্ষক ওই অগ্নিকাণ্ডে এ পর্যন্ত ৪৬ জনের জীবনপ্রদীপ নিভে যাওয়ার সংবাদ মিলেছে। অগ্নিদগ্ধ অনেকেই শেখ হাসিনা বার্ন ইউনিটে মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ছেন। দগ্ধ রোগীদের চিকিৎসায় বিশেষজ্ঞ স্বাস্থ্যমন্ত্রী ডা. সামন্ত লাল সেন সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছেন, দগ্ধ অনেকেরই অবস্থা সংকটাপন্ন। বেইলি রোড ট্র্যাজেডি আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে আবারও দেখিয়ে দিল, অগ্নিনির্বাপক ব্যবস্থার ঘাটতি এবং অবকাঠামোয় নিরাপদ নির্গমন ব্যবস্থা অগ্রাহ্য করার ফল কতটা ভয়াবহ হতে পারে। পুনর্বার যে অগ্নিবিভীষিকা প্রত্যক্ষ করলাম তাতে আমরা স্তব্ধ। শোকাহত। শোকসন্তপ্ত স্বজনদের সান্ত্বনা দেওয়ার ভাষা আমাদের জানা নেই।


রাজধানীর নিমতলী, চকবাজার, বনানী, বঙ্গবাজারসহ বিগত প্রায় দেড় দশকে ঘটে যাওয়া অনেকগুলো অগ্নিবিভিষীকার পরও অগ্নিদুর্যোগ প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা কেন নিশ্চিত করা যায়নি এও বড় প্রশ্ন। আমরা জানি, মনুষ্য সৃষ্ট কারণেই এই মর্মস্পর্শী দুর্যোগের মুখোমুখি আমাদের হতে হয়েছে। কিন্তু তারপরও সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীলদের যে সম্বিৎ ফেরেনি তা বিস্ময়কর। আমরা এই সম্পাদকীয় যখন লিখছি তখন পর্যন্ত বেইলি রোডের গ্রিন কটেজে অগ্নিকাণ্ডের বিচ্ছিন্নভাবে কিছু কারণ জানা গেলেও প্রকৃত রহস্য উদঘাটন করা যায়নি। সংবাদমাধ্যমে উঠে এসেছে, ওই ভবনের কেবল আট তলায় আবাসিকের অনুমোদন নেওয়া হয়েছিল। বাকি এক থেকে সাততলা পর্যন্ত বাণিজ্যিক অনুমোদন নেওয়া হলেও সেখানে কেবল অফিসকক্ষ ব্যবহারের অনুমোদন ছিল। কিন্তু এই অনুমোদনের ব্যত্যয় ঘটিয়ে সেখানে গড়ে ওঠে রেস্টুরেন্ট, শোরুম এবং অন্য আরও কিছু যেগুলোর কোনো অনুমোদন ছিল না। ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ওই ভবনে আগুন লাগে ২৯ ফেব্রুয়ারি রাত পৌনে ১০টার দিকে। ভবনে অবস্থিত ‘কাচ্চি ভাই’ নামক একটি রেস্টুরেন্টে খাবারে ছাড় দেওয়ায় ওই দিন সেখানে প্রচণ্ড জনচাপ ছিল। ‘কাচ্চি ভাই’ ছাড়াও ওই ভবনে আরও কিছু রেস্তোরাঁ কিংবা খাবারের দোকান রয়েছে। ফায়ার সার্ভিসের মহাপরিচালক সংবাদমাধ্যমকে জানান, ভবনটিতে কোনো অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা ছিল না এবং ঝুঁকিপূর্ণ জানিয়ে ভবন কর্তৃপক্ষকে ইতোমধ্যে তিনবার চিঠি দেওয়া হলেও তারা কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। আমরা মনে করি, সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীল মহলগুলোর তরফে নোটিস কিংবা চিঠি ইস্যু করেই দায় শেষ করার কোনো অবকাশ নেই।

অপরিকল্পিত নগরায়ণ, অগ্নিঝুঁকি নিরাপত্তা হ্রাসে করণীয় বিষয়ে ঘাটতি, অগ্নিদুর্যোগ মোকাবিলায় সক্ষমতার অভাব, অবকাঠামোগত ব্যবস্থাপনার ত্রুটি, প্রয়োজনীয় জলাধারের অভাবে রাজধানীতে অগ্নিদুর্যোগ ঝুঁকি প্রকট, এসব অভিযোগ নতুন কিছু নয়। কিন্তু রাজধানীতে একের পর এক আগুনের ভয়াবহ ঘটনাগুলো এসব অভিযোগ ছাপিয়েও আরও যেসব প্রশ্ন দাঁড় করিয়েছে এর কোনোটিই তদন্ত কিংবা খতিয়ে দেখার বাইরে রাখার অবকাশ আছে বলে আমরা মনে করি না। ওই ভবনে অনেকেই সেদিন অন্যান্য দিনের মতো খাবার খেতে কিংবা কেনাকাটায় গেলেও সেদিন রেস্টুরেন্টে খাবারে ছাড় দেওয়ায় জনচাপ বেশি ছিল। আমরা দেখছি, রাজধানীতে সুরম্য অট্টালিকা হিসেবে পরিচিত অনেক বহুতল ভবনই যেন মৃত্যুকূপ। আমরা এও জানি, ফায়ার সার্ভিস কিংবা সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীল পক্ষগুলোর তরফে অনেক বহুতল ভবন কর্তৃপক্ষকে সতর্কতামূলক নোটিস বা চিঠি দিলেও কারোরই এ ব্যাপারে সম্বিৎ ফিরছে না। ঢাকা মহানগরীতে আগুনসহ বিভিন্ন ধরনের দুর্যোগ মোকাবিলায় পূর্ব প্রস্তুতির ঘাটতির বিষয়টি যেমন আমরা গুরুত্বের সঙ্গে ফের উত্থাপন করি এবং পাশাপাশি এ প্রশ্নও রাখি, মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকা মৃত্যুকূপগুলোর ব্যাপারে যথাযথ পদক্ষেপ নেওয়ার দায় কি সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলো এড়াতে পারে? এই ভবনে কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করতেন এমন কারো কারোর প্রাণহানির কারণে তাদের পরিবারে নেমে এসেছে বিপর্যয়।  

আমরা জানি, ঢাকা মহানগরে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় স্ট্যান্ডিং অর্ডার অন ডিজাস্টারের ক্ষেত্রে মূল দায়িত্ব কাগজপত্রে সিটি করপোরেশনের। অথচ বিস্ময়কর হলো, সংশ্লিষ্ট সেবা সংস্থাগুলোর নিয়ন্ত্রণ সিটি করপোরেশনের হাতে নেই। দুর্যোগ মোকাবিলার ক্ষেত্রে আমরা মনে করি, এও বড় ধরনের জটিলতা। আমাদের স্মরণে আছে, ঢাকা মহানগরের জন্য ২০৩৫ সাল পর্যন্ত কুড়ি বছর মেয়াদি রাজউকের একটি মাস্টার প্ল্যান তৈরির ব্যাপারে ব্যাপক তোড়জোড় শুরু হয়েছিল। এই মাস্টার প্ল্যান প্রণয়নের আগে নগর পরিকল্পনাবিদদের সুপারিশ-মতামতও নেওয়া হয়েছিল। মহানগর-নগর-শহর কিংবা দেশের যেকোনো জনপদকে নিরাপদ করতে হলে যেমন সুপরিকল্পনা ও এর যথাযথ বাস্তবায়ন প্রয়োজন তেমনি প্রয়োজন রয়েছে প্রত্যেকটি সেবা সংস্থার মধ্যে যথাযথ সমন্বয়ের বিষয়টিও। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, এক্ষেত্রে যে যথেষ্ট ঘাটতি এখনও জিইয়ে আছে এরই সাক্ষ্য মিলেছে রাজধানীতে সাম্প্রতিক আগুন-বিস্ফোরণজনিত ঘটনাগুলোর ক্ষেত্রে। আমরা দেখছি, একেকটি মর্মন্তুদ ঘটনা ঘটে, তারপর গঠিত হয় তদন্ত কমিটি এবং বিস্ময়কর হলো, তদন্ত কমিটির সুপারিশ অনেক ক্ষেত্রেই থেকে যায় অবাস্তবায়িত। বঙ্গবাজার, নিউ সুপার মার্কেটে অগ্নিদুর্যোগের পর নতুন করে এ ব্যাপারে তোড়জোড় শুরু হলেও, তা মিইয়ে যেতেও খুব সময় লাগেনি। বেইলি রোড ট্র্যাজেডির পর আবারও এই বিষয়গুলোই সামনে এসেছে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, আলোচনা-পর্যালোচনা, সিদ্ধান্ত গ্রহণের বৃত্তবন্দিই সব থেকে যাবে! সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীল পক্ষগুলোর মধ্যে সমন্বয়হীনতার ঘাটতির অবসান কিংবা কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণে দৃষ্টান্ত কবে দৃশ্যমান হবে।

বেইলি রোড ট্র্যাজেডি পুনরায় গুরুত্বের সঙ্গে সতর্কবার্তাগুলো আমলে নেওয়ার তাগিদ দিয়েছে। আমরা গুরুত্বের সঙ্গে বলতে চাই, ব্যবস্থায় ঘাটতি থাকলে যেকোনো বাণিজ্যিক-আবাসিক কিংবা বসত এলাকা মুহূর্তেই ‘জতুগৃহ’ হয়ে উঠতে পারে।রআমরা মনে করি, এই অবহেলা-উদাসীনতা অপরিণামদর্শিতারই নামান্তর। যে বিষয়গুলো আমাদের বারবার উদ্বেগান্বিত করছে এর কারণগুলো চিহ্নিত করে উৎসে নজর না দিলে অগ্নিকাণ্ডের ঝুঁকি থেকে মুক্তি পাওয়া দুরূহ। শৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণে বিন্দুমাত্র ছাড় দেওয়ার অবকাশ নেই। এই গুরুত্বপূর্ণ কথাটি দায়িত্বশীলদের তরফে ফিরে ফিরে উচ্চারিত হলেও এর বাস্তবায়নে কতটা অসঙ্গতি রয়েছে এর ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ নতুন করে নিষ্প্রয়োজন। দেশে বিশেষ করে রাজধানীতে বহুতল ভবনে নিরাপত্তাহীনতা কিংবা অগ্নিদুর্যোগের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের কারণ নিবারণের চ্যালেঞ্জগুলো যেহেতু অচিহ্নিত নয় সেহেতু এর নিরসনও কঠিন নয় বলেই আমরা মনে করি। আমরা আশা করব, বেইলি রোড ট্র্যাজেডি থেকে ফের শিক্ষা নিয়ে এই কাজটিই অনতিবিলম্বে শুরু হবে। 

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা