× ই-পেপার প্রচ্ছদ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি ফিচার চট্টগ্রাম ভিডিও সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

হালদার বেহালের দায় কার

সম্পাদকীয়

প্রকাশ : ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৪ ১৫:৩১ পিএম

হালদার বেহালের দায় কার

নদ-নদী এদেশের প্রাণের স্পন্দন। শিল্প, সাহিত্য, সংস্কৃতি এবং সংগীতেরও বাহন। এই সংগীতের সুরের মূর্ছনায় ক্ষণিকের জন্য হলেও থেমে যায় চলার গতি, জটিল-কুটিল বৈষয়িক ভাবনাও। সতত বহমান নদ-নদীর শুধু প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষার ক্ষেত্রেই নয়, অর্থনীতিতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। কিন্তু অনেকের অপরিণামদর্শী কর্মকাণ্ডে এবং উন্নয়নের মহাযজ্ঞে অনেক নদ-নদীর প্রাণ প্রায় ওষ্ঠাগত। এ থেকে বিচ্ছিন্ন নয় দেশের পূর্ব-পাহাড়ি অঞ্চলের খাগড়াছড়ি ও চট্টগ্রাম জেলার হালদা নদীও। ২৪ ফেব্রুয়ারি ‘হালদাকে বিপন্ন করে সড়ক উন্নয়ন' শিরোনামে প্রতিদিনের বাংলাদেশ-এ প্রকাশিত প্রতিবেদনের গর্ভে যে তথ্যচিত্র উঠে এসেছে তা আমাদের বিস্মিত ও ক্ষুব্ধ না করে পারে না। মৎস্য হেরিটেজ হিসেবে ঘোষিত হালদা থেকে মাটি-বালু উত্তোলন আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ হলেও এর কোনো কিছুরই তোয়াক্কা করছে না ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স মহসিন অ্যান্ড ব্রাদার্স। নদীর চর থেকে নির্বিচারে মাটি উত্তোলনে হুমকির মুখে পড়েছে দক্ষিণ এশিয়ার একমাত্র প্রাকৃতিক মৎস্য প্রজননক্ষেত্র হালদা। হালদা নদী এবং এর পানির কিছু বৈশিষ্ট্যের জন্য ওখানে মা মাছ ডিম ছাড়তে আসে, যা দেশের অন্যান্য নদী থেকে ভিন্নতর এবং এর বৈশিষ্ট্যগুলো হলো- ভৌত, রাসায়নিক ও জৈবিক। অনেকগুলো পাহাড়ি ঝরনাবিধৌত হালদার পানিতে প্রচুর ম্যাক্রো ও মাইক্রো পুষ্টির উপাদান থাকার ফলে নদীটিতে পর্যাপ্ত খাদ্যাণুর সৃষ্টি হয় এবং এই বৈশিষ্ট্যগুলোর কারণে হালদার অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টির মাধ্যমে রুই এবং কার্পজাতীয় মাছ বর্ষাকালে ডিম ছাড়তে আসে।

আমরা জানি, হালদার বাঁকগুলোকে ‘অক্সবো” বাঁক বলে। এই বাঁকগুলোর প্রধান বৈশিষ্ট্য হচ্ছে পানির প্রচণ্ড ঘূর্ণন, যার ফলে গভীর স্থানের সৃষ্টি হয়। স্থানীয়ভাবে এই গভীর স্থানগুলোকে 'কুম' বলা হয়। কিন্তু বিধিনিষেধ উপেক্ষা করে নিজেদের লাভালাভের হিসাব কষে অনেকেরই অপরিণামদর্শী কর্মকাণ্ডে এসবই পড়েছে হুমকির মুখে। সম্প্রতি এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে একটি সড়কের এক কিলোমিটার অংশের এইচবিবির দ্বারা চলমান উন্নয়ন কার্যক্রম। ওই ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানটি হালদা থেকে বালুমিশ্রিত মাটি উত্তোলনের পাশাপাশি বেড়িবাঁধের বড় একটি অংশ কেটে মাটি পরিবহন করার কারণে ভাঙনের আশঙ্কাও প্রকট হয়ে উঠেছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের বালু-মাটি উত্তোলন কার্যক্রম এক সপ্তাহের বেশি সময় ধরে চললেও প্রশাসনের সেদিকে কোনো দৃষ্টিই নেই। 'বঙ্গবন্ধু মৎস্য হেরিটেজ' হালদার জীববৈচিত্র্য রক্ষায় সরকার যে নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে তা উপেক্ষিত দায়িত্বশীলদের দায়িত্বহীনতায়। ফটিকছড়ি উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা প্রতিদিনের বাংলাদেশ-এর প্রতিবেদকের প্রশ্নের উত্তরে জানিয়েছেন, হালদা থেকে মাটি-বালু উত্তোলনে অভিযান পরিচালনার নির্দেশ তিনি দিচ্ছেন। প্রশ্ন হচ্ছে, সংবাদমাধ্যমের অনুসন্ধানের পর তাদের ঘুম ভাঙল কেন। এত দিন ধরে যে আত্মঘাতী কর্মকাণ্ড চলছে তা বন্ধ করতে কেন প্রশাসন তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ নেয়নি, এই প্রশ্নের জবাব দেওয়ার দায় তারা এড়াতে পারে না।

হালদা আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিত একটি নদী। বিশ্বের একমাত্র জোয়ার-ভাটার নদী হচ্ছে হালদা, যেখানে প্রাকৃতিক মৎস্য প্রজননকেন্দ্র রয়েছে এবং মৌসুমে হালদা থেকে মাছের ডিম উত্তোলন করে একদিকে যেমন জেলেরা জীবিকা নির্বাহ করছে অন্যদিকে দেশের একমাত্র প্রাকৃতিক এই ‘জিনব্যাংক' অর্থনীতিতে ব্যাপক অবদান রাখছে। এর গুরুত্ব অনুধাবন করে সরকার এর সুরক্ষায় যে ব্যবস্থা নেয় তা যেন এখন অতীত অধ্যায়। প্রাণিসম্পদ গবেষকদের অভিমত, কোনো কারণে হালদার মা মাছ যদি ক্ষতিগ্রস্ত বা অন্য মাছের সঙ্গে ক্রস হয়ে যায় তাহলে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে প্রকৃত রুই ও কার্পজাতীয় মাছের অস্তিত্ব হারিয়ে যাবে। এসব তথ্যের ভিত্তিতে সহজেই অনুমেয় হালদার প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য সংরক্ষণের কোনো বিকল্প নেই। চট্টগ্রামের ‘লাইফ লাইন' হিসেবে পরিচিত হালদার বৈশিষ্ট্য ও অস্তিত্ব হুমকির কারণগুলো যেহেতু অচিহ্নিত নয় সেহেতু এর প্রতিবিধানে কোনোভাবেই সময়ক্ষেপণ কাম্য নয়। হালদা থেকে প্রতি বছর যে পরিমাণ মাছের ডিম সংগ্রহ করা হয় এবং পর্যায়ক্রমে তা যেভাবে মৎস্যসম্পদে পরিণত হয় তাতে জাতীয় অর্থনীতিতে হালদা প্রায় ৮০০ কোটি টাকার অবদান রাখছে। অথচ জীববৈচিত্র্য ও হালদার বৈশিষ্ট্য সুরক্ষায় দায়িত্বশীলদের যে ঔদাসীন্য লক্ষ করা যাচ্ছে তা নিশ্চয় প্রশ্নবোধক। যারা হালদাকে বিপন্ন করে নিজেদের আখের গোছাচ্ছেন তারা দেশের শত্রু। আমরা স্পষ্টতই মনে করি, তাদের প্রতি কোনো রকম অনুকম্পা প্রদর্শনের অবকাশ নেই। তা ছাড়া সরকারের বিধিনিষেধ উপেক্ষা করে কোন খুঁটির জোরে হীনস্বার্থবাদীরা নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছে এরও উৎসে নজর দেওয়া বাঞ্ছনীয়।

যেকোনো উন্নয়নকাজে সর্বাগ্রে পরিবেশ-প্রতিবেশের সুরক্ষায় শ্যেনদৃষ্টি রাখার তাগিদ আমরা দিই। পরিবেশ- প্রতিবেশের সুরক্ষা নিশ্চিত না হলে কোনো উন্নয়নই টেকসই হবে না। হালদা যেমন আমাদের সম্পদ তেমনি ঐতিহ্যও বটে। বাণিজ্যিক ও বন্দরনগরী চট্টগ্রামের সুপেয় পানির অন্যতম প্রধান উৎস হালদা, যেখান থেকে ওয়াসা প্রতিদিন প্রায় দুই কোটি গ্যালন পানি উত্তোলন করে। এত গুরুত্বপূর্ণ হালদার বিপন্নদশা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। হালদা নদী নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে গবেষকরা গবেষণা চালিয়ে আসছেন। তারা হালদার ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও সম্পদের তথ্যও সংগ্রহ করছেন। মিঠাপানির মাছের প্রজননক্ষেত্র হালদায় স্বার্থান্বেষীদের যে থাবা পড়েছে তা গুটাতে যথাযথ আইনানুগ ব্যবস্থা নিশ্চিত করতেই হবে। হালদার সুরক্ষায় দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনাসহ এর বাস্তবায়নে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়াও সমভাবেই গুরুত্বপূর্ণ। উচ্চ আদালত নদীকে 'জীবন্ত সত্তা' হিসেবে ঘোষণা করেছেন। এই প্রেক্ষাপটে তো বটেই, একই সঙ্গে বিপুল ঐশ্বর্যপূর্ণ নদী হালদাকে রক্ষা করার গুরুদায়িত্ব যাদের তাদের নির্বিকারত্ব কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। আমরা জানি, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী উপলক্ষে ২০২০ সালের ২২ ডিসেম্বর হালদা নদীকে ‘বঙ্গবন্ধু মৎস্য হেরিটেজ' ঘোষণা করা হয়েছে। দখল ও দূষণ বন্ধের পাশাপাশি হালদার মাটি-বালুখেকোদের বিরুদ্ধে অনমনীয় অবস্থান নিতেই হবে। হালদা মরলে প্রভাবশালী কতিপয় লুটেরার লাভ হতে পারে কিন্তু সামগ্রিকভাবে ক্ষতি হবে দেশের। এমনটি হতেই পারে না।

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মুস্তাফিজ শফি

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০১৯১১০৩০৫৫৭, +৮৮০১৯১৫৬০৮৮১২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০১৭১২০৩৩৭১৫ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা